Breaking

Monday, July 20, 2026

100 years of RSS: একশো বছরের সংগঠন কীভাবে ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে এল

আরএসএস: একশো বছরের সংগঠন কীভাবে ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে এল

শুরুর কথা

১৯২৫ সালের বিজয়া দশমীর দিন, নাগপুরে কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার নামে এক চিকিৎসক একটি সংগঠন গড়ে তোলেন — রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, সংক্ষেপে আরএসএস। শুরুতে এটি ছিল হিন্দু যুবকদের মধ্যে শৃঙ্খলা, ঐক্য আর সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তোলার একটি সংগঠন। ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে যখন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ছিল, তখনই এই সংগঠনের জন্ম। একশো বছর পর, আজ আরএসএস নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বলে দাবি করে, আর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র আদর্শগত অভিভাবক হিসেবে পরিচিত।

কংগ্রেসের সঙ্গে কিছুদিন যুক্ত থাকার পর হেডগেওয়ার এই দলের নীতির প্রতি আস্থা হারান, বিশেষত খিলাফত আন্দোলনে কংগ্রেসের সমর্থনের প্রশ্নে। বিনায়ক দামোদর সাভারকরের 'হিন্দুত্ব' ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি একটি পৃথক পথ বেছে নেন — হিন্দু সমাজকে সংগঠিত করে ভারতকে একটি "হিন্দু রাষ্ট্র" হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে।

আদর্শ ও ইতিহাসের জটিল অধ্যায়

আরএসএস নিজেকে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন বলে পরিচয় দেয়, রাজনৈতিক দল নয়। তবে ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ১৯৩০-এর দশকে ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদী আন্দোলন এই সংগঠনের কাঠামো গঠনে প্রভাব ফেলেছিল। হিন্দু মহাসভার নেতা বি এস মুঞ্জে ১৯৩১ সালে ইতালি সফরে গিয়ে মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সেখানকার যুব সংগঠনগুলির কাঠামো পর্যবেক্ষণ করেন বলে ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ আছে।

আরএসএসের দ্বিতীয় প্রধান এম এস গোলওয়ালকরের কিছু লেখা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। তাঁর রচনায় জার্মানির জাতিগত ঐক্যকে "শিক্ষণীয়" বলে উল্লেখ করা হয়েছিল — যদিও এই মন্তব্য হলোকাস্টের পূর্ণ ভয়াবহতা জনসমক্ষে আসার আগে লেখা হয়েছিল, এবং তিনি আদৌ গণহত্যাকে সমর্থন করেছিলেন কিনা তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। আরএসএস-সমর্থকরা বলেন, সংগঠনের মূল লক্ষ্য চরিত্র গঠন আর জাতীয় গৌরব, বিদ্বেষ নয়।

মহাত্মা গান্ধী হত্যার পর ১৯৪৮ সালে প্রথমবার আরএসএসকে নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও হত্যাকারী নাথুরাম গডসে সরাসরি সংগঠনের সদস্য ছিলেন না সেই সময়ে (তিনি হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং অতীতে আরএসএসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল), তবু সরকার সংগঠনটির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরবর্তী তদন্তে সংগঠনের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, আর ১৯৪৯ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। এরপর জরুরি অবস্থার সময় ১৯৭৫ এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর ১৯৯২ সালেও আরএসএস নিষিদ্ধ হয়েছিল — প্রতিবারই নিষেধাজ্ঞা কয়েক বছরের মধ্যে প্রত্যাহার হয়েছে।

রাম মন্দির আন্দোলন ও রাজনৈতিক উত্থান

১৯৯০-এর দশকে অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের দাবিতে আন্দোলন আরএসএস পরিবারকে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে। বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণীর রথযাত্রা লক্ষ লক্ষ মানুষকে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর সারা দেশে সাম্প্রদায়িক হিংসায় বহু মানুষের প্রাণহানি হয়। এই ঘটনা ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণের একটি স্থায়ী ছাপ ফেলে।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন — তিনি নিজে আরএসএসের একজন দীর্ঘদিনের প্রচারক ছিলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অযোধ্যায় রাম মন্দিরে প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠান তাঁর একটি প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করে এবং আরএসএসের কাছে এটি একশো বছরের একটি লক্ষ্যপূরণের প্রতীক হয়ে ওঠে।

শতবর্ষে আরএসএস: ভাগবত যা বলেছেন

২০২৫ সালে আরএসএস তার প্রতিষ্ঠার একশো বছর উদযাপন করে। দিল্লিতে আয়োজিত শতবর্ষ অনুষ্ঠানে সরসংঘচালক মোহন ভাগবত ব্যাখ্যা করেন যে তাঁদের কল্পনার "হিন্দু রাষ্ট্র" পাকিস্তানের মতো কোনো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র নয় — তাঁর ভাষায়, "রাষ্ট্র" শব্দটি এখানে "রাজনৈতিক জাতি" নয় বরং সাংস্কৃতিক-সভ্যতাগত অর্থ বহন করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংঘের কল্পনার হিন্দু রাষ্ট্র কোনো সম্প্রদায়ের বিরোধী নয় এবং কাউকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি নয়। একইসঙ্গে তিনি ধর্মান্তরকরণ ও অবৈধ অভিবাসনকে "জনসংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা"-র কারণ হিসেবে উল্লেখ করে সমাজকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

সমালোচকরা অবশ্য ভাগবতের কিছু মন্তব্যকে স্ববিরোধী বলে চিহ্নিত করেছেন। একদিকে তিনি সাম্প্রদায়িক বিভাজন উস্কে দিয়ে কেউ "হিন্দুদের নেতা" হতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন, অন্যদিকে রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার দিনটিকে ভারতের "প্রকৃত স্বাধীনতা"-র দিন বলায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এই দ্বৈততা আরএসএসের রাজনৈতিক অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক — সংগঠনটি নিজেকে সাংস্কৃতিক বলে তুলে ধরলেও তার নেতৃত্বের বক্তব্য বারবার রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।

পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের নীরব সম্প্রসারণ

পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে আরএসএসের গল্পটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯২৬ সালে কলকাতার মানিকতলা অঞ্চলে প্রথম শাখা স্থাপিত হলেও, দীর্ঘদিন ধরে এই রাজ্যে সংগঠনের প্রভাব তুলনামূলক সীমিত ছিল — বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনকালে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে কার্যত প্রান্তিক রাখা হয়েছিল।

তবে গত দেড় দশকে ছবিটা আমূল বদলেছে। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১১ সালে বামফ্রন্টের পতনের পর থেকে রাজ্যে আরএসএস শাখার সংখ্যা গত চোদ্দ বছরে প্রায় পাঁচশো থেকে বেড়ে আড়াই হাজারের বেশি হয়েছে। শুধু ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যেই রাজ্যে পাঁচশোরও বেশি নতুন শাখা যুক্ত হয়েছে, বিশেষত মধ্য বঙ্গ প্রান্তে (পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ, পুরুলিয়া) এই বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা গেছে। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গ প্রান্তেও একই সময়ে শাখা-মিলন-মণ্ডলীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোহন ভাগবত এগারো দিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে থেকে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির কাজ পর্যালোচনা করেন। একই সময়ে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন-পরবর্তী অস্থিরতা এবং সেখানকার সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা প্রশ্নকে কেন্দ্র করে সংগঠন সীমান্তবর্তী এলাকায় নিজের বার্তা আরও জোরালোভাবে পৌঁছে দেওয়ার কৌশল নেয়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যজুড়ে আট হাজার ইউনিট গড়ে তোলার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে।

২০২৬ সালের নির্বাচন: একটি নতুন অধ্যায়

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যায়। রাজ্যে প্রথমবারের মতো কোনো দক্ষিণপন্থী দল ক্ষমতায় আসে — বিজেপি প্রায় দুইশো সাতটি আসন জিতে তৃণমূল কংগ্রেসের পনেরো বছরের শাসনের অবসান ঘটায়, আর তৃণমূল আশিটি আসনে সীমাবদ্ধ থাকে। এই নির্বাচনে রেকর্ড পরিমাণ ভোটদানের হার লক্ষ করা গিয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, এই ফলাফলের পেছনে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাবিরোধী মনোভাব, দুর্নীতির অভিযোগ এবং আরজি কর হাসপাতাল সংক্রান্ত ঘটনার মতো বিষয় যেমন কাজ করেছে, তেমনই আরএসএসের বছরের পর বছরের ধৈর্যশীল সাংগঠনিক কাজও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন। সংগঠনের সমর্থকরা এটিকে বাংলার "সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস" পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া বলে বর্ণনা করেন, আর সমালোচকরা একে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত মেরুকরণের ফল বলে চিহ্নিত করেন। বাস্তবতা সম্ভবত এই দুই ব্যাখ্যার মাঝামাঝি কোথাও — একটি জটিল রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কোনো একক কারণে ব্যাখ্যা করা কঠিন।

দুই দৃষ্টিভঙ্গি, একটি প্রশ্ন

আরএসএস নিয়ে ভারতীয় সমাজে আজও গভীর মতবিরোধ আছে। সংগঠনের সমর্থকরা এর দুর্যোগ ত্রাণ কাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং শৃঙ্খলা-চরিত্র গঠনের ঐতিহ্যকে তুলে ধরেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আরএসএস স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা বহুবার প্রশংসিত হয়েছে। অন্যদিকে সমালোচক ও একাংশ গবেষক মনে করেন, সংগঠনের মূল আদর্শে সংখ্যালঘু-বিরোধী, বিশেষত মুসলিম-বিরোধী একটি প্রবণতা প্রোথিত আছে, যা বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও ঘৃণাভাষণের পথ তৈরি করেছে।

এই দুই ব্যাখ্যাই ভারতীয় গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিতর্কে সমান্তরালভাবে উপস্থিত। একশো বছর পূর্তির পর আরএসএস আজ শুধু একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়, বরং দেশের শাসক দলের আদর্শগত মেরুদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রমাণ করে যে সংগঠনটির প্রভাব এখন এমন রাজ্যেও পৌঁছেছে, যেখানে দীর্ঘদিন এই ধরনের রাজনীতির জায়গা সীমিত ছিল বলে মনে করা হতো।

আগামী দিনে ভারতীয় গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে এই সংগঠনের ভবিষ্যৎ পথচলার ওপর — আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দেশের প্রতিটি রাজ্যের মানুষকেই এখন সজাগ দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে।


No comments:

Post a Comment