porikkha24.com

LightBlog

Breaking

Tuesday, July 14, 2026

July 14, 2026

মাধ্যমিক পরীক্ষা ২০২৭ রুটিন প্রকাশ: সম্পূর্ণ সময়সূচি, নিয়মাবলী ও প্রস্তুতির গাইড

মাধ্যমিক পরীক্ষা ২০২৭ রুটিন প্রকাশ: সম্পূর্ণ সময়সূচি, নিয়মাবলী ও প্রস্তুতির গাইড



পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (West Bengal Board of Secondary Education) আনুষ্ঠানিকভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষা ২০২৭-এর সম্পূর্ণ রুটিন প্রকাশ করে দিয়েছে। বর্তমানে যারা দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে এবং আগামী বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসতে চলেছে, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খবর। পর্ষদের নোটিফিকেশন নম্বর EMU/C/35 অনুযায়ী, ১৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে এই রুটিন প্রকাশিত হয়েছে।

এই প্রতিবেদনে থাকছে সম্পূর্ণ পরীক্ষাসূচি, পরীক্ষা শুরুর সঠিক সময়, প্রশ্নপত্র পড়ার সময়, ঐচ্ছিক বিষয়ের নিয়ম এবং পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ।

গত বছরের তুলনায় এবার পরীক্ষা শুরু হচ্ছে দেরিতে

২০২৬ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ফেব্রুয়ারি মাসের ২ তারিখ থেকে। কিন্তু ২০২৭ সালের পরীক্ষাসূচিতে দেখা যাচ্ছে, পরীক্ষা শুরু হচ্ছে তার প্রায় দুই সপ্তাহ পরে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতির জন্য বাড়তি কিছুটা সময় হাতে পাচ্ছে, যা রিভিশন ও অনুশীলনের জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে।

মাধ্যমিক পরীক্ষা ২০২৭-এর সম্পূর্ণ সময়সূচি

নিচের সারণিতে বিষয়ভিত্তিক তারিখ ও দিন উল্লেখ করা হলো:

দিন তারিখ বিষয়
সোমবার ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৭ প্রথম ভাষা (ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ)
মঙ্গলবার ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৭ দ্বিতীয় ভাষা (সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ)
বুধবার ১৭ ফেব্রুয়ারি ছুটি
বৃহস্পতিবার ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৭ ইতিহাস
শুক্রবার ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৭ ভূগোল
শনি-রবি ২০-২১ ফেব্রুয়ারি ছুটি
সোমবার ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৭ অঙ্ক (গণিত)
মঙ্গলবার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৭ ভৌতবিজ্ঞান
বুধবার ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৭ জীবনবিজ্ঞান
বৃহস্পতিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৭ ঐচ্ছিক/অতিরিক্ত বিষয় (নিচে বিস্তারিত দেখুন)

লক্ষণীয় বিষয় হলো, অঙ্ক পরীক্ষার ঠিক পরের দিনই ভৌতবিজ্ঞান পরীক্ষা রাখা হয়েছে — এই দুটি বিষয়ের মাঝে কোনো ছুটি নেই। তাই এই দুটি বিষয়ের প্রস্তুতি আগে থেকেই গুছিয়ে রাখা জরুরি।

যাদের কোনো অতিরিক্ত (অপশনাল) বিষয় নেই, তাদের পরীক্ষা ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৭ তারিখেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

পরীক্ষার সময়সূচি: কখন প্রশ্নপত্র হাতে পাবে, কখন লিখতে শুরু করবে

পর্ষদের নোটিশ অনুযায়ী প্রতিদিন একটি করে বিষয়ের পরীক্ষা হবে এবং সময়সূচি হলো:

  • সকাল ১০টা ৪৫ মিনিট — পরীক্ষার্থীদের হাতে প্রশ্নপত্র দেওয়া হবে।
  • ১০টা ৪৫ থেকে সকাল ১১টা — এই ১৫ মিনিট শুধুমাত্র প্রশ্নপত্র পড়ার জন্য বরাদ্দ। এই সময় লেখা যাবে না।
  • সকাল ১১টা — উত্তর লেখা শুরু করা যাবে।
  • দুপুর ২টো — পরীক্ষা শেষ হবে।

অর্থাৎ মূল লিখিত পরীক্ষার সময়সীমা ১১টা থেকে দুপুর ২টো, মোট তিন ঘণ্টা। কিন্তু যেহেতু পরীক্ষা প্রকৃতপক্ষে ১০টা ৪৫ মিনিটেই শুরু হয়ে যায় (প্রশ্নপত্র বিতরণ ও পঠনের মাধ্যমে), তাই পরীক্ষার্থীদের উচিত সকাল সাড়ে দশটার মধ্যেই পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করে ফেলা, যাতে শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়ো এড়ানো যায়।

ঐচ্ছিক (অপশনাল) বিষয়ের পরীক্ষাসূচি

যেসব শিক্ষার্থী মূল বিষয়গুলোর পাশাপাশি একটি অতিরিক্ত বা ঐচ্ছিক বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করে, তাদের জন্য পরীক্ষা হবে ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৭ তারিখে। তবে বিষয়ভেদে সময়সূচিতে পার্থক্য আছে:

ঐচ্ছিক বিষয় পরীক্ষার সময়
সেলাই ও নিডল ক্রাফট (Sewing and Needle Craft) সকাল ১০.৪৫ থেকে বিকেল ৩.০০
সংগীত (Music Vocal & Instrumental) সকাল ১০.৪৫ থেকে দুপুর ১.০০ (ব্যবহারিক পরীক্ষার তারিখ ও স্থান পরে জানানো হবে)
কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন সকাল ১০.৪৫ থেকে দুপুর ১.৩০ (ব্যবহারিক পরীক্ষা নেবে সংশ্লিষ্ট স্কুল)
ভোকেশনাল বিষয়সমূহ (ঐচ্ছিক হিসেবে) সকাল ১০.৪৫ থেকে দুপুর ১২.৩০ (ব্যবহারিক পরীক্ষা নেবে সেক্টর স্কিল কাউন্সিল বা স্কুল)
বাকি সব ঐচ্ছিক বিষয় সকাল ১০.৪৫ থেকে দুপুর ২.০০
ফিজিক্যাল এডুকেশন ও সোশ্যাল সার্ভিস তারিখ পরে জানানো হবে
ওয়ার্ক এডুকেশন তারিখ পরে জানানো হবে

অর্থাৎ ফিজিক্যাল এডুকেশন এবং ওয়ার্ক এডুকেশনের পরীক্ষার তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি; পর্ষদ পরবর্তী সময়ে এই তারিখ ঘোষণা করবে।

প্রথম ও দ্বিতীয় ভাষার বিষয় তালিকা

প্রথম ভাষা (First Language) হিসেবে যেসব ভাষা নেওয়া যায়: বাংলা, ইংরেজি, গুজরাটি, হিন্দি, মডার্ন তিব্বতি, নেপালি, ওড়িয়া, গুরুমুখী (পাঞ্জাবি), তেলুগু, তামিল, উর্দু ও সাঁওতালি।

দ্বিতীয় ভাষা (Second Language)-এর নিয়ম হলো:

  • যদি প্রথম ভাষা হিসেবে ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা নেওয়া হয়, তাহলে দ্বিতীয় ভাষা হবে ইংরেজি।
  • যদি প্রথম ভাষা ইংরেজি হয়, তাহলে দ্বিতীয় ভাষা হবে বাংলা অথবা নেপালি।

পরীক্ষাকেন্দ্র কীভাবে জানা যাবে

কোন স্কুলে পরীক্ষা কেন্দ্র পড়েছে, তা মূল পরীক্ষা শুরুর প্রায় সাত-আট দিন আগে অ্যাডমিট কার্ডে উল্লেখ করা থাকবে। স্কুল কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার্থীদের হাতে অ্যাডমিট কার্ড তুলে দেবে, এবং সেখানেই পরীক্ষাকেন্দ্রের নাম ও ঠিকানা স্পষ্টভাবে লেখা থাকবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এক নজরে (সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন)

  • ১৩ জুলাই, ২০২৬ — পর্ষদের তরফে মাধ্যমিক ২০২৭ পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ।
  • ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৭ — পরীক্ষা শুরু (প্রথম ভাষা)।
  • ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৭ — মূল বিষয়গুলোর পরীক্ষা শেষ।
  • ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৭ — ঐচ্ছিক বিষয়ের পরীক্ষা (যাদের প্রযোজ্য)।
  • পরীক্ষা শুরুর ৭-৮ দিন আগে — অ্যাডমিট কার্ড বিতরণ।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: মাধ্যমিক পরীক্ষা ২০২৭ কবে থেকে শুরু হচ্ছে?
উত্তর: ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৭, সোমবার থেকে প্রথম ভাষার পরীক্ষা দিয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হচ্ছে।

প্রশ্ন: পরীক্ষাকেন্দ্রে কখন পৌঁছাতে হবে?
উত্তর: যেহেতু সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে প্রশ্নপত্র দেওয়া শুরু হয়, তাই সাড়ে দশটার মধ্যেই কেন্দ্রে প্রবেশ করে ফেলাই নিরাপদ।

প্রশ্ন: প্রশ্নপত্র পড়ার জন্য কত সময় দেওয়া হয়?
উত্তর: ১৫ মিনিট (সকাল ১০.৪৫ থেকে ১১টা পর্যন্ত), এই সময় শুধু প্রশ্ন পড়া যাবে, লেখা যাবে না।

প্রশ্ন: উত্তর লেখার জন্য মোট কত সময় পাওয়া যাবে?
উত্তর: সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টো পর্যন্ত, অর্থাৎ ৩ ঘণ্টা।

প্রশ্ন: অঙ্ক ও ভৌতবিজ্ঞান পরীক্ষার মধ্যে কি কোনো ছুটি আছে?
উত্তর: না, ২২ ফেব্রুয়ারি অঙ্ক পরীক্ষার ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ ২৩ ফেব্রুয়ারিই ভৌতবিজ্ঞান পরীক্ষা হবে।

প্রশ্ন: ফিজিক্যাল এডুকেশন ও ওয়ার্ক এডুকেশনের পরীক্ষা কবে?
উত্তর: এই দুটি বিষয়ের তারিখ পর্ষদ এখনও ঘোষণা করেনি; পরবর্তী সময়ে জানানো হবে।

পরীক্ষার্থীদের জন্য কিছু জরুরি পরামর্শ

  • রুটিন হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই একটি নিজস্ব প্রস্তুতির সময়সূচি তৈরি করে ফেলা উচিত, যাতে প্রতিটি বিষয়ের জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ থাকে।
  • অঙ্ক ও ভৌতবিজ্ঞানের মাঝে ছুটি না থাকায় এই দুটি বিষয়ের প্রস্তুতি আগে থেকেই সম্পূর্ণ রাখা ভালো।
  • অ্যাডমিট কার্ড হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই নাম, রোল নম্বর, বিষয় ও পরীক্ষাকেন্দ্রের ঠিকানা ভালোভাবে মিলিয়ে নেওয়া উচিত।
  • পরীক্ষার দিন অন্তত ৩০-৪৫ মিনিট আগে কেন্দ্রে পৌঁছানোর চেষ্টা করা উচিত, যাতে অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ এড়ানো যায়।
  • ঐচ্ছিক বিষয় থাকলে তার পরীক্ষার সময়সীমা আলাদা হতে পারে, তাই নিজের বিষয় অনুযায়ী সময়সূচি ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।

Friday, June 19, 2026

June 19, 2026

অষ্টাদশ শতাব্দীর যুগ-বৈশিষ্ট্য

অষ্টাদশ শতাব্দীর যুগ-বৈশিষ্ট্য



যুগের প্রেক্ষিতে ভারতচন্দ্র ও রামপ্রসাদের কাব্যচর্চা

এক. ভারতচন্দ্র

১. সাধারণ আলোচনা

অষ্টাদশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান ও উল্লেখযোগ্য কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর। মঙ্গলকাব্যধারার তিনিই সর্বশেষ কবি। মঙ্গলকাব্যের প্রথানুবর্তনে তিনি কাব্য রচনায় ব্রতী হলেও অনাগত আধুনিককালের বাণীবৈশিষ্ট্য তাঁর মধ্যে দেদীপ্যমান হয়ে উঠেছে। ভারতচন্দ্রের কাব্য ভাবগত আদর্শে আধুনিকযুগ লক্ষণাক্রান্ত।

ভূমিকা প্রাচীন ও নতুনের মধ্যস্থলে দাঁড়িয়ে নতুনের দিকেই গতি নির্দেশ করেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর যুগধর্মের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতচন্দ্রের কবিমানসটি গড়ে উঠেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রজীবনে নানা পালাবদল চলতে থাকে। মুরশিদকুলি খাঁর পর যাঁরা বাংলার মসনদে বসেছেন তাঁরা সবাই বিলাসব্যসন ও সমসাময়িক সমাজ উচ্ছৃঙ্খলতায় মত্তবিভোর হয়ে উঠেছেন। সেই সুযোগে-জমিদার, আমির-ওমরাহ ও দেশিবিদেশি বণিকের দল দেশের মধ্যে প্রভুত্ব বিস্তার করতে থাকে। নবাব আলিবর্দীর সময়ে (১৭৪০) বর্গীরা বার বার দেশ লুণ্ঠন করে নির্মম অত্যাচারে সন্ত্রাসের আবহাওয়া সৃষ্টি করে। বর্গির হাঙ্গামার ফলে বাংলার কৃষিজীবন সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ঘরে ঘরে হা-অন্ন হা-অন্ন রব। পর্তুগিজ জলদস্যুদের উপদ্রবে তখন বাংলার বাণিজ্যের অবস্থা শোচনীয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম। করভারে প্রপীড়িত সাধারণ মানুষ। লঘু অপরাধে ও বিনা অপরাধে ষড়যন্ত্রীদের কলাকৌশলে অসহায় দরিদ্র ব্যক্তিরা গুরুদণ্ড ভোগ করছে। বিচারের নামে প্রহসন চলেছে। বাংলাদেশের সর্বত্র তখন নিদারুণ আর্থিক সংকট-জনসাধারণের দুঃখ-দুর্গতির অবধি নেই। মানুষের নিঃস্ব শোচনীয় অবস্থার কথা একটি ছড়ায় ধরা পড়েছে-

'ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো।/ বর্গী এলো দেশে। বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/খাজনা দেব কিসে।'

অর্থনৈতিক দুর্দশা দেশের সর্বত্র। তখন মানুষ বিদেশি বণিকের কাছে সমর্থ পুরুষ, সুন্দর শিশু ও সুন্দরী নারীদের বিক্রি করছে।

এই নিদারুণ অবস্থায় মুরশিদাবাদের নবাবি রাজতন্ত্রের বিলাসকলার ব্যাপক প্রভাব পড়ছে নগরজীবনে। কৃষ্ণনগরের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভা তখন বিলাসব্যসনে টলটলায়মান। সমাজের অভিজাতশ্রেণির লোকেরা নবাবি বিলাসে গা ভাসিয়ে দিয়েছেন। ছলাকলাময় হাস্য-পরিহাস, বিকৃত রুচির কৌতুক ও ভাঁড়ামি, নৃত্যগীতাদি প্রভৃতিতে কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভা উচ্চকিত। একদিকে সমাজের নিম্নতলে দরিদ্র মানুষের এক মুষ্টি অন্নের জন্য হাহাকার, অন্যদিকে ক্ষমতাসম্পন্ন লোকদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য খোসামুদি-মোসাহেবি, সুবিধাবাদ, ভণ্ডামি ও স্তাবকতার অন্ত নেই। আর দেশে ধর্মচর্চা ও শিক্ষাদীক্ষা বলতে কিছু নেই। উচ্চবর্ণের সমাজে তখন ঘুণ ধরে গেছে। বুচিবিকৃতি তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পরস্পর খিস্তি খেউড় হাসি ঠাট্টা তামাশাকে সবাই আভিজাত্য মনে করছে। দেশব্যাপী এরূপ ভণ্ডামি বিলাসব্যভিচার-কলুষিত অবক্ষয়ী সমাজের মধ্যে ভারতচন্দ্রের আবির্ভাব।

কৃষ্ণচন্দ্রের রাজপ্রাসাদে সম্বর্ধিত ভারতচন্দ্র ছিলেন মহারাজের আনন্দবাজারের অন্যতম হোতা। রাজসভায় অনুগৃহীত কবি হয়ে সভাসদদের মনোরঞ্জন না করে তাঁর উপায় ছিল না।

উপসংহার যুগধর্ম ও ভারতচন্দ্র কিন্তু ভারতচন্দ্র ছিলেন আত্মসচেতন কবি। তাই কৌতুকের আড়ালে নিজের অন্তরাত্মাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছেন। সেই যুগের বেদনাকে, নিদারুণ শিথিলতাপূর্ণ ক্লেদপিচ্ছিল সমাজজীবনের গ্লানিকে সুতীক্ষ্ণ ব্যঙ্গবিদ্রুপের কশাঘাতে জর্জরিত করে মুক্ত জীবনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

২. ভারতচন্দ্রের জীবনী

আত্মপরিচয় ১৭০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হুগলি জেলার অন্তর্গত ভুরশুট পরগনায় পেঁড়ো গ্রামে এক ব্রাহ্মণকূলের জমিদারবংশে কবির জন্ম। পিতার নাম নরেন্দ্র রায়। ভারতচন্দ্রের জীবন বাল্যকাল থেকেই দুঃখময়। পিতার সম্পত্তি বর্ধমান রাজার চক্রান্তে বেদখল হয়ে যায়। তারপর কবি মাতুলালয়ে লালিতপালিত হন। বাড়ির কারও মতামত না নিয়ে পছন্দমতো এক কন্যাকে বিয়ে করে সকলের বিরাগভাজন হন। বিনাদোষে বর্ধমানরাজ কর্তৃক কারারুদ্ধ হন। সেখান থেকে পালিয়ে যান কটকে। তারপর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাঁকে ফিরিয়ে আনেন। নানা ভাগ্যবিপর্যয়ের পর তিনি কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি নিযুক্ত হন। মহারাজ প্রদত্ত মূলাজোড় গ্রামে তিনি বেশ কিছুদিন নিশ্চিন্তে বসবাস করে কাব্য রচনার অবসর পান। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধের ঠিক তিন বছর পরে বহুমূত্র রোগে তাঁর মৃত্যু হয়।

ভারতচন্দ্র নানা বিদ্যায় পণ্ডিত ছিলেন। কোন্ কোন্ বিষয়ে তাঁর পড়াশোনা ছিল তা কবি সংক্ষেপে জানিয়েছেন-

'ব্যাকরণ, অভিধান, সাহিত্য, নাটক। অলঙ্কার, সঙ্গীত শাস্ত্রের অধ্যাপক।পুরাণ আগমবেত্তা, নাগরী, পারসী।।'

বিবিধ কাব্য কিশোর বয়সেই ভারতচন্দ্রের কবিশক্তির স্ফূরণ ঘটে। পনেরো বছর বয়সে দেবানন্দপুরের মুনসিবাড়িতে নিজে সত্যনারায়ণের পাঁচালি রচনা করে পাঠ করেন। রচনাশক্তির নৈপুণ্যের সাফল্যে শ্রোতা মুগ্ধ হন। সে যা হোক, ভারতচন্দ্র 'সত্যপীরের পাঁচালি', 'রসমন্বরী', 'বিবিধ কবিতাবলী', 'নাগাষ্টক' ও 'চণ্ডী নাটক' প্রভৃতি গ্রন্থের রচয়িতা। কিন্তু তাঁর কবিপ্রতিভার স্বকীয়তা ও শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটেছে 'অন্নদামঙ্কাল' কাব্যে (১৭৫২-৫২)।

৩. ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল

অন্নদামঙ্গাল 'অন্নদামঙ্গল' ভারতচন্দ্রের শ্রেষ্ঠ রচনা। এটি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত তিনটি কাব্য। প্রথম আলিবর্দী কর্তৃক কৃষ্ণচন্দ্রকে কারাগারে বন্দি এবং দেবী অন্নপূর্ণা কর্তৃক উদ্ধারের কাহিনি। এরপর সংস্কৃত 'কাশীখণ্ড' ও 'শিবপুরাণ' অবলম্বনে সতীর দেহত্যাগ ও তাঁর পুনর্জন্মের কাহিনি বিবৃত। তারপর স্থান পেয়েছে ব্যাসদেব কর্তৃক দ্বিতীয় কাশী নির্মাণের ইতিবৃত্ত ও হড়িহোড়ের কাহিনি।

দ্বিতীয় খন্ডের নাম 'কালিকামঙ্গল' বা 'বিদ্যাসুন্দর কাব্য'। আদিরসাত্মক কাব্য এটি। রাজকুমারী বিদ্যার সঙ্গে রাজকুমার সুন্দরের গোপন প্রণয়, বিদ্যার পিতা কর্তৃক সুন্দরের প্রাণদণ্ড; দেবী কালিকার কৃপায় সুন্দরের প্রাণরক্ষা ও বিদ্যাসুন্দরের বিবাহ এর উপজীব্য। এই গ্রন্থে আদি রসের প্রাচুর্য আছে। 'অন্নদামঙ্গলে'র শেষ অংশ 'মানসিংহ' বা 'অন্নদামঙ্গল'। রচনা হিসাবে এটি নিকৃষ্ট। দেবী অন্নদার ভক্ত ভবানন্দ মজুমদারের সহায়তায় ও দেবীর কৃপায় মানসিংহের হাতে প্রতাপাদিত্যের পরাজয় ও পথিমধ্যে তাঁর মৃত্যু। দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গির কর্তৃক হিন্দু দেবদেবীর নিন্দায় দেবীর অনুচর ভূতপ্রেত প্রমথগণের দ্বারা দিল্লিনগরী তছনছ ও বিপদগ্রস্ত সম্রাটের অন্নদার পুজো প্রভৃতি অনেক ইতিহাস বিবৃত ও অবিশ্বাস্য অতিরঞ্জিত কাহিনি স্থান পেয়েছে।

কাব্য-বৈশিষ্ট্য ভারতচন্দ্রকে যুগসন্ধির কবি নামে অভিহিত করা হয়। মধ্যযুগীয় মঙ্গলকাব্যের বিশেষ কাঠামো অনুসরণ করে তিনি কাব্যরচনা করলেও তাঁর ভাবধারা সম্পূর্ণ নতুন। দেবলীলার পটভূমিকায় কবি মানুষের কাহিনিই মুখ্যত বিবৃত করেছেন। তাঁর কাব্যে দেবচরিত্রের মহিমা অপেক্ষা মনুষ্যচরিত্রই অধিকতর সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। দীর্ঘকালের মঙ্গলকাব্যের একঘেয়েমির মধ্যে ভারতচন্দ্র নতুনত্ব এনে তাকে আস্বাদ্য করে তুলেছেন। যুগ-সচেতন কবি ভারতচন্দ্র পুরাতনকে নামমাত্র গ্রহণ করে নতুনত্বের উদ্বোধন ঘটিয়েছেন। অন্নদামঙ্গল কাব্যে পুরাতন ও নতুন যুগ পরস্পর মুখ দেখাদেখি করেছে। তিনি পুরাতন পাত্রে নতুন রস পরিবেশন করেছেন। অন্নদামঙ্গল নতুন রীতির মঙ্গলকাব্য-মানুষের মঙ্গলচেতনায় তাঁর কাব্যসাধনা-

'নূতন মঙ্গাল আসে ভারত সরস ভাসে/রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আজ্ঞায়।'
এই নতুন মঙ্গলকাব্যে দেবদেবীরা স্বর্গলোক ও স্বর্গের মহিমা পরিত্যাগ করে বাংলাদেশের নরনারীতে পরিণত হয়েছে। শিব, অন্নপূর্ণা ও ব্যাসদেব-এদের চরিত্রে পৌরাণিক ঐতিহ্য রক্ষিত হয়নি। শিব ও অন্নপূর্ণা ওই যুগের মানবিক রূপ ধারণ করেছে। বৃদ্ধ বর শিবকে দেখে মেনকার বিলাপ ও তার শ্লথ চরিত্র নিয়ে গৌরীর ঠাট্টা প্রভৃতি সহজেই প্রমাণ করে দেবদেবীর চরিত্রে স্বর্গধামের অলৌকিক মহিমা নেই। ভারতচন্দ্রের কবিমানসিকতা বিচার করে ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, মানবশিশুরা শিবকে ঘিরে যে কোলাহল ও রঙ্গরসিকতা শুরু করেছে-
'কেহ বলে জটা হৈতে বার কর জল/কেহ বলে জ্বাল দেখি কপালে অনল।।
কেহ বলে নাচ দেখি গাল বাজাইয়া। ধুলামাটি গায়ে তার দেয় ফেলাইয়া।"

দেবতার গায়ে এই যে ধুলামাটি নিক্ষেপ-এখান থেকেই বাংলা কাব্যে আধুনিকতার শুরু। ভারতচন্দ্র স্বর্গের তথা কৈলাসের দেবদেবীর সংসার বর্ণনায় স্বামী, স্ত্রী ও পুত্রদের একেবারে মাটির ঘরের দরিদ্র মানুষ রূপে চিত্রিত করেছেন।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র ঈশ্বরী পাটনি। তাঁর কণ্ঠে শোনা গেল বাঙালির চিরন্তন প্রাণের কথা-

'আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে।'

দেবী অন্নদার কাছে গ্রাম্য অশিক্ষিত খেয়াপারের মাঝি ঈশ্বরী ধনদৌলত বা মুক্তি আকাঙ্ক্ষা করেনি। সন্তানের জন্য স্বাবলম্বন শক্তি প্রার্থনা করেছেন। বাৎসল্যরসের রসিক সমগ্র বাঙালি জাতির মর্মোদ্‌ঘাটন করেছেন ভারতচন্দ্র এই চরিত্রে। কুলবধূর ছদ্মবেশে দেবী অন্নদা খেয়াপারাপারের মাঝি ঈশ্বরীর নৌকায় ধনন্দ মজুমদারের বাড়ি যান। দেবীর পাদস্পর্শে তার কাঠের সেঁউতি সোনা হয়ে যায়। সেটিকে পাটনি হেলাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। কুলবধূকে অঘটন ঘটন পটিয়সী দেবী জেনেও ঈশ্বরী দেবীর কাছে শুধু প্রার্থনা করেছেন তার সন্তানরা যেন দুমুঠো খেতে পায়। মানুষের প্রাণের ভালোবাসার দাবি সে প্রার্থনা করেছে। দেবতার কাছে মানুষের এটি বড়ো চাওয়া যে তার সন্তান, পরিজন যেন সুখে আনন্দে থাকে-তাদের জীবনের আলো যেন নিভে না যায়। ভারতচন্দ্রের কাব্যে ইতিহাস-প্রসিদ্ধ বড়ো বড়ো মানুষের আনাগোনা। কিন্তু এই ঈশ্বরী পল্লিপ্রাণ দরিদ্র, সরল খাঁটি বাঙালি সন্তান। ঈশ্বরী পাটনি ইতিহাসের সরণি থেকে আসেনি। তার পথ বাংলা নদীর তীরবর্তী পায়ে চলার পথ। কবি মোহিতলাল মজুমদারের মতে ঈশ্বরী পাটনি চরিত্রটি স্বল্পে সত্তুন্ট স্বাবলম্বী ও সচ্ছল চিরন্তন বাঙালি জাতির প্রতিনিধিস্থানীয় চরিত্র।

ভারতচন্দ্রের কাব্যে রয়েছে তীক্ষ্ণ ও উজ্জ্বল কৌতুকপ্রিয়তা, ব্যঙ্গবিদ্রুপ ও তির্যক দৃষ্টিভঙ্গি। মধ্যযুগের পৌরাণিক ও লৌকিক দেবতার অন্তঃসারশূন্যতা সামাজিক জড়ত্ব ও মিথ্যার প্রতি ভারতচন্দ্রের বক্রোক্তি ব্যঙ্গ বিদ্রূপের আঘাত অন্নদামঙ্গলে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সমস্ত কাব্য জুড়ে রঙ্গব্যঙ্গ ও কৌতুকের ছটায় অষ্টাদশ শতকের শূন্যতাবোধ ও শেষ অঙ্কের ঘণ্টাধ্বনি তাঁর কাব্যে বেজে উঠেছে। প্রমথ চৌধুরী তাৎপর্যপূর্ণ উক্তি করেছেন যে ভারতচন্দ্রের হাসি বীরের হাসি। বাস্তবিকই ভারতচন্দ্রের হাসির কাছে শতাব্দীব্যাপী দেবতার ভন্ডামি, ঔদ্ধত্য ও স্বেচ্ছাচারিতা কোথায় উড়ে গেছে।

ভারতচন্দ্র স্বচ্ছ এবং অলংকৃত ও প্রবচনবহুল বাগুঙ্গির সুষম প্রয়োগে কবি মৌলিকতার স্বাক্ষর রেখেছেন অন্নদামঙ্গলে। অনুপ্রাস, যমক, উপমা, শ্লেষ, রূপক ব্যজস্তুতি ও উৎপ্রেক্ষা প্রভৃতি অলংকারের সার্থক প্রয়োগে, ভুজঙ্গপ্রয়াত, তোটক ও তোণক প্রভৃতি ছন্দের ব্যবহারনৈপুণ্যে এবং শ্লেষকৌতুকপূর্ণ, তির্যক দৃষ্টিভঙ্গির পরিস্ফুটনে, বর্ণনার পরিপাট্যে, বৈচিত্র্য ও মাধুর্যে অন্নদামঙ্গল অসাধারণ শিল্পমণ্ডিত সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই মন্তব্য করেছেন- "রাজসভার কবি রায়গুণাকরের অন্নদামঙ্গল গান রাজকণ্ঠের মণিমালার মতো- যেমন তাঁহার উজ্জ্বলতা তেমনি তাহার কারুকার্য।" ভারতচন্দ্রের পূর্বে বাংলা কাব্যে ছন্দবৈচিত্র্যের অভাব পরিলক্ষিত হয়। ভারতচন্দ্র ছন্দনির্বাচনে অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। এ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উক্তি প্রণিধানযোগ্য "ভারতচন্দ্রই প্রথম ছন্দকে সৌষম্যের নিয়মে বেঁধেছিলেন। তিনি ছিলেন সংস্কৃত ও পারসিক ভাষায় পণ্ডিত। ভাষাবিন্যাসে ছন্দে প্রাদেশিকতার শৈথিল্য তিনি মানতে পারেন নি।" ভারতচন্দ্র নতুন নতুন ছন্দের প্রবর্তন করে বাংলা কাব্যের বৈচিত্র্য ও গতিশীলতা বাড়িয়ে দিয়েছেন। সতীর দেহত্যাগের সংবাদে বিচলিত শিবের বিষাদবিক্ষুব্ধ চিত্তের সম্যক অভিব্যক্তিতে তিনি সংস্কৃত ভুজঙ্গপ্রয়াত ছন্দের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন-

"মহারুদ্ররূপে মহাদেব সাজে। ভভন্তম্ভভস্তম্ শিঙ্গা ঘোর বাজে。
লিটাপট জুটাজুট সংঘট্ট গঙ্গা। ছলচ্ছল টলটল কলক্কল তরঙ্গা।।"

ভূতপ্রেতগণ দক্ষযজ্ঞনাশে মেতে উঠেছে। তাঁদের উন্মত্ত কোলাহল কবি তোণক ছন্দের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন-

"ভূতনাথ ভূতসাথ দক্ষযজ্ঞ নাশিছে। যক্ষরক্ষ লক্ষলক্ষ অট্ট অট্ট হাসিছে।।
প্রেতভাগ সানুরাগ ঝম্প ঝম্প ঝাঁপিছে। ঘোর রোল গন্ডগোল চৌদ্দ লোক কাঁপিছে।।"

শুধু ছন্দ নয়, অলংকার ও প্রবচন প্রয়োগে ভারতচন্দ্রের কৃতিত্ব সমধিক। শ্লেষ অলংকার প্রয়োগের অপূর্ব নিদর্শন মেলে তাঁর কাব্যে

'অতি বড়ো বৃদ্ধ সিদ্ধিতে নিপুণ/কোন গুণ নাহি তার কপালে আগুন。
কুকথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠভরা বিষ। কেবল আমার সঙ্গো দ্বন্দ্ব অহর্নিশ।।'

অন্নদামঙ্গলে ভারতচন্দ্রের প্রযুক্ত- 'নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়', 'মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন', 'বড়র পীরিতি বালির বাঁধ' ও 'নীচ যদি উচ্চভাষে সুবুদ্ধি উড়ায়ে হাসে' প্রভৃতি প্রবচনগুলি বাঙালি জীবনের শাশ্বত কথাকলিতে পরিণত হয়েছে। এককথায় পয়ার ত্রিপদীর বাঁধধরা শিল্পরীতির মধ্যে ভারতচন্দ্র অপূর্ব বাণীবিন্যাস ও মণ্ডনকলায় নতুন শক্তি ও সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছেন।

ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে রুচিবিকৃতি আছে। অশ্লীলতার অভিযোগও অনেকে আনেন। বস্তুত ভারতচন্দ্র সজ্ঞানে কিছু করেননি। রাজসভার ঝাড়লণ্ঠন বাতির আলোর তলায় বসে তাঁর কাব্যসাধনা। সুতরাং রাজদরবারের দোষগুণ তাঁর কাব্যে প্রতিফলিত হবেই। অবক্ষয়ী সমাজের জীবনচিত্রের তিনি শিল্পী। এর জন্য দায়ী সেই যুগ। কুরুচি ও অশ্লীলতা ভারতচন্দ্রের ব্যক্তিগত ত্রুটি নয়, যুগগত ত্রুটি। ভারতচন্দ্রের নিরাসক্ত দৃষ্টিতে যুগজীবনের চিত্র উদ্‌ঘাটিত। তবে ভারতচন্দ্রের কাব্যে জীবনদৃষ্টির গভীরতা নেই। তিনি জীবনের বহিঃরঙ্গের কবি। কৌতুক, রঙ্গব্যঙ্গ, হাসি ঠাট্টা তামাশা তাঁর প্রধান সম্পদ। রাজসভায় কবি হিসাবে মৌলিক সৃষ্টি অপেক্ষা রচনাকৌশলের দিকেই তাঁর দৃষ্টি ছিল বেশি। রাজদরবারের বৈশিষ্ট্য-ছলাকলা, চাতুর্য ও রূপসজ্জার পরিপাট্যে তাঁর রচনা সমৃদ্ধ। তিনি বিশ্বাস করতেন-যে হোক, সে হোক ভাষা কাব্যরস লয়ে। তৎসম, দেশি ও ফরাসি ভাষার মার্জিত প্রয়োগে তিনি নিজস্ব ভাষাভঙ্গি বা স্টাইলের জগৎ তৈরি করে গেছেন। তীক্ষ্ণতা, তির্যকতা, কৌতুকরস, রঙ্গব্যঙ্গের উতরোল উল্লাস, অসঙ্গতির চমকপ্রদ উজ্জ্বলতা ও অসাধারণ বাবৈদগ্ধ্যে এবং সর্বোপরি কাহিনিগ্রন্থন, চরিত্র সৃষ্টি ও পৌরাণিক লৌকিক ভাবরূপরসের সংমিশ্রণে ও আত্মগত ভাবনার লিরিক মূর্ছনায় তিনি আশ্চর্য মৌলিক সৃষ্টিশক্তির পরিচয় দিয়েছেন। কবি হিসাবে ভারতচন্দ্রের প্রধান গৌরব ও কৃতিত্ব এই যে তিনি তাঁর কাল থেকে অনেকটা এগিয়ে আছেন। আধুনিকতার বাণী-যুক্তি, বুদ্ধি ও মানবতার আদর্শ হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো তাঁর কাব্যে দীপ্তি বিকীর্ণ রয়েছে।
June 19, 2026

দুই. রামপ্রসাদ

দুই. রামপ্রসাদ



১. সাধারণ আলোচনা

বাংলাদেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর তৃতীয়পাদে মুসলিম কুশাসনে নানা ভেদাভেদে, রাষ্ট্রিক অত্যাচার, অবিচার ও নির্যাতনে, অভিজাতদের ভোগবিলাসে, ব্যভিচারে, সর্বোপরি বন্যা, মহামারি, দস্যু, তস্কর, ঠগি ও বর্গি হানাদারদের উৎপীড়নে সমাজের সাধারণ মানুষ দারিদ্র্যে আতঙ্কে হতাশায় সাংঘাতিকভাবে বিপর্যস্ত। সমগ্র জাতীয় জীবন তখন আত্মপ্রত্যয়হীন, সংকট ও নৈরাশ্যে মুহ্যমান। সাহিত্য সংস্কৃতিতে জাতির সেই হতাশাক্লিষ্ট পরিচয় সুপরিস্ফুট।

সাহিত্য সংস্কৃতিতে সে সময় জাতির সেই হতাশাক্লিষ্ট পরিচয় তথা পুরাতন ধর্মীয় প্রথা ও অনুশাসনেরই অনুবৃত্তি ঘটেছে। অবশ্য জাতীয় জীবনের এই অধোগতির দিনে বড়ো কবি ও সাধকরা তিমিরহননের বাণী রচনা করেন। তাঁরা জাতিকে জড়তাতামস হতাশা থেকে উত্তরণের জন্য আত্মিক বল, আশ্বাস ও নির্ভরতার ভাবলোক সৃষ্টি করেন। সমকালীন শাক্ত পদাবলি ও বাউলগানে রয়েছে জীবনচর্যার গভীর আশ্বাস ও উন্নত আদর্শের শক্তিমন্ত্র। তাই অষ্টদশ শতাব্দীর শেষার্ধে রচিত শাক্ত পদাবলি ও বাউলগান সমসাময়িক গতানুগতিক সাহিত্যের মধ্যে লক্ষণীয় স্বাতন্ত্র্যে দেদীপ্যমান। আমাদের পাঠ্য শাক্তপদাবলির কবি রামপ্রসাদ।

২. শাক্ত পদাবলির সামাজিক পটভূমি

মধ্যযুগে আখ্যাত কাব্যের পর রচিত হয়েছে শাক্ত পদাবলি। কাব্যোৎকর্ষের দিক থেকে বৈশ্বব সাহিত্যের পরে শাক্ত পদাবলির স্থান।

ভূমিকা শাক্ত কবিরা মাতৃভাবের উপাসক-তাদের পুজোর নাম শক্তিপুজো। শক্তি বলতে শিবের শক্তি অর্থাৎ শিবগৃহিণী দুর্গা। তিনি কখনও চণ্ডী, উমা ও কখনও কালী। বাংলাদেশ প্রাচীনকাল থেকেই তন্ত্রপ্রধান মাতৃকাপুজোর পীঠস্থান। শ্যামা বা কালী আমাদের প্রাচীন দেবতা। তন্ত্রে যে কালীদেবীর আরাধনা করা হয়েছে, তিনি শ্মশানচারিণী, নরকঙ্কালশোভিতা, নৃমুণ্ডমালিনী ও রক্তাপ্লুতা। বৈখুব কবিদের ভক্তিভাবের সংস্পর্শে অষ্টাদা শতকের কবিরা এই শক্তিদেবীকে কোমলে কঠোরে রূপায়িত করলেন। কালী লেলিহজিহ্বা, খণ্ডাখর্পরধারিণী, আবার বরাভয়রূপিণী কল্যাণাত্মিকা বরদাত্রী। কালীকে বাঙালি কবিরা মনের মতো করে গড়ে তুললেন। সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়কারিণী দেবী হয়ে উঠলেন আমাদের মা ও কন্যা।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে মোগল শাসকের ভিত্তি একেবারে শিথিল-জীর্ণদশাপ্রাপ্ত। বিলাসভোগে মত্ত উচ্ছৃঙ্খল নবাবের কুশাসনের ফলে দেশব্যাপী অরাজকতা। দরিদ্র মানুষ কর দিতে না পারলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়- কারাগারের যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। সমসাময়িক সমাজ কেন্দ্রীয় শাসকের দুর্বলতার সুযোগে দেশের ভূস্বামীগণ সাধারণ মানুষের উপর অবিচার, অত্যাচার ও পীড়নের অবাধ কার্য চালিয়ে যাচ্ছে। আর শাসকশ্রেণি ও অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষমতালাভের জন্য হীন ষড়যন্ত্র, হিংসা ও দলাদলির বেপরোয়া কাণ্ড চলছে। সমাজজীবনে বামাচারী তান্ত্রিক ব্যভিচারের বাহা আড়ম্বরপূর্ণ উপাসনা বলিদানপ্রথা-সব মিলিয়ে 'ধর্মস্য গ্লানি' ব্যাপক। তারপর বাংলাদেশে দারুণ বিপর্যয় দেখা দিল বর্গির আক্রমণে। এই আক্রমণে নবাব, রাজা, জমিদার, গ্রামবাসী কেউই নিস্তার পায়নি। তদুপরি ছিল মগ ও বিদেশি পর্তুগিজ জলদস্যুদের নৃশংস অত্যাচার। বৈদেশিক শক্তির অত্যাচারে বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল একেবারে শ্মশানভূমিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

বাংলাদেশের ঘরে ঘরে তখন হা-অন্ন, হা-অন্ন চিৎকার। অভাবে অনটনে, রোগে-শোকে মুহ্যমান হয়ে মৃতকল্প, জীবনযাপন করছে সাধারণ বাঙালি। নৈতিক অধঃপতনে সমাজজীবন নির্বাপিত প্রায়। শাক্ত পদাবলিতে সমাজজীবন তার সমস্ত কুরতা, বঞ্চনা, অত্যাচার, উৎ পীড়ন, অভাব-অনটনের বোঝা নিয়ে প্রকটিত হয়ে উঠেছে। এখানে আমরা ডিক্রি, ডিসমিস, কৃষিকাজ, তহবিল তছরূপ, হিসাবখাতা প্রভৃতি বৈষয়িক জীবনের নানা প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হতে দেখি। বহুবিবাহ, বিড়ম্বিত পরিবারের বিমাতার স্নেহহীনতা ও বিমাতৃশাসিত পিতার ঔদাসীন্যেরও খবর পাই। এই ঘোর তমসাঘন দারুণ দুর্দিনের মহাসংকটে শাক্তকবিরা অনন্ত-শক্তিময়ী 'কালভয় হারিণী' বরাভয়দাত্রী জগজ্জননীর শক্তিমন্ত্র উচ্চারণ করলেন। শাক্ত পদাবলিতে কবিরা বাস্তবজীবনের দুর্যোগ, দুঃখদৈন্য, হতাশা ও অবক্ষয়ের বিপরীত এক উজ্জ্বল আধ্যাত্মিক সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেছেন। কবিরা সর্বব্যাপী অবক্ষয় থেকে উত্তরণের সংগীত গাইলেন। জানালেন মাতৃচরণে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণই দুঃখজয়ের শ্রেষ্ঠ উপায়। কালী হলেন কল্যাণবতী বরাভয়দাত্রী মা।

শাক্ত পদাবলির একটি বিশিষ্ট দিক আগমনী ও বিজয়া শীর্ষক গার্হস্থ্য সংগীতগুলি। এর মধ্যে তৎকালীন সমাজজীবনের নিষ্ঠুর এক প্রথার প্রতিফলন ঘটেছে। প্রতিদিনব্যাপী দুর্গোৎসবের সঙ্গে অল্পবয়স্ক বিবাহিত বাঙালি কন্যার তিনদিনের জন্য পিতৃগৃহে আগমনের ব্যাপারটি এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

কৌলীন্যপ্রথা অষ্টাদশ শতকে কৌলীন্য প্রথাদুষ্ট নারীর বাল্যবিবাহ, অসমবিবাহ এবং পুরুষের বহুবিবাহের প্রচলন ছিল বাংলাদেশে। অষ্টমবর্ষীরা কন্যাকে গৌরীদানপ্রধার মধ্যে পড়ে বর্ণহিন্দুর নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের দুর্দশার মধ্যে শোচনীয় জীবনযাপন করতে হত। এই প্রথা বা নিয়মসংস্কার খুবই কঠোর ও নির্মম ছিল।

বিত্তহীন পিতামাতার পক্ষে উপযুক্ত পাত্রের হাতে কন্যা সম্প্রদান করা সম্ভবপর হত না। আট নয় বছরের কন্যাকে বাঙালি পিতামাতা বাধ্য হয়ে অপাত্র অর্থাৎ প্রৌঢ়, বৃদ্ধ ও কপর্দকবিহীন দারিদ্র্যগ্রস্ত ব্যক্তির হাতে সঁপে দিতে বাধ্য হতেন। সোনার পুতলি কন্যাকে বৃদ্ধ ঘরে সতিনের সঙ্গে ঘর সংসার করতে হত। এইরূপ অল্পবয়স্ক কন্যাকে সম্বল সংগতিহীন বৃদ্ধ পাত্রের হাতে ছেড়ে দিয়ে মন্দভাগ্য মাতা নীরবে অশ্রুপাত করতেন। দারুণ উৎকণ্ঠা ও মনোবেদনায় তার দিন কাটত। নিয়ম ছিল বৎসরান্তে দুর্গাপুজোর সময় তিনি দিনের জন্য বাপের বাড়িতে কন্যাকে নিয়ে আসতে হবে। সারাবছর কন্যার জন্য মায়ের ব্যাকুল প্রতীক্ষা ও ব্যথাকাতর মনোভাবটি উচ্ছলিত হয়ে উঠেছে 'আগমনি' ও 'বিজয়া' শীর্ষক সংগীত। এই অংশে বাঙালি পরিবারের জীবনের একটি অন্তরঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়। কবিদের কল্পনায় মেনকা হয়েছেন বাৎসল্যময়ী গৃহজননী, মহেশ্বর জামাতা ও জগজ্জননী উমা ঘরের মেয়ে。

নেশাখোর কপর্দকহীন শ্মশানবিহারী কৃদ্ধ শিবের সঙ্গে উমার বিয়ে দিয়ে মা মেনকার উৎ কণ্ঠা ব্যাকুলতা ও দুশ্চিন্তার শেষ নেই। কেঁদে স্বামীকে বলেন-

যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী উমা বুঝি আমার কেঁদেছে。
উমার যতেক বসনভূষণ ভোলা সব বুঝি বেচে খেয়েছে।

উপসংহার শাক্ত পদাবলিতে আমরা দেখি ভিখিরি শিবের সঙ্গে উমার বিয়ে হয়েছে। সতিনের সঙ্গে উমা ঘর করে। মাঝে মাঝে উমাকে স্বপ্নে দেখে দারুণ উৎকণ্ঠায় অধীর হয়ে উঠেন মেনকা। দেখতে দেখতে শারদীয়া সপ্তমী তিথি সমাগত হয়। পুরবাসীর মুখে কন্যার আগমনবার্তা শুনতে পান, দুচোখে আনন্দের বান ডেকে যায়। সপ্তমী তিথিতে মিলনের রাগিণী বেজে ওঠে-তিন দিন মা ও মেয়ের মিলনে বেশ আনন্দে কাটে। নবমীর রাতে জননীর অন্তর বিচ্ছেদ বেদনায় ভারাক্রান্ত যায়। নবমীনিশি পোহালে কন্যাকে বিদায় দিতে হবে। মায়ের প্রাণ দুঃসহ বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। মায়ের ব্যাকুল প্রার্থনা- 'ওরে নবমী নিশি না হইওরে অবসান।' নবমী নিশির অবসান ঘটে-আসে রাক্ষসী বিজয়া। উমা স্বামীগৃহে চলে যায়। পুনরায় মেনকার হৃদয় বেদনায় ভরে যায়। তাই শাস্ত পদাবলির বিজয়া গান বৈশ্বব কবির অশ্রুগ গম্ভীর মাথুর সংগীতের মতো। অষ্টাদশ শতাব্দীতে যত বাঙালি মেনকা কন্যার জন্য কেঁদে কেঁদে চোখের জলে গৃহের প্রাঙ্গণ ভাসিয়ে দিয়েছেন-তাদের অশ্রুর প্রবাহে রসসিক্ত এই 'আগমনি' ও 'বিজয়া'র গানগুলি।

৩. রামপ্রসাদ সেন:

আত্মপরিচয় শাক্ত পদাবলির আদি ও শ্রেষ্ঠ কবি রামপ্রসাদ সেন। অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে আনুমানিক ১৭২০-২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি চব্বিশ পরগনার হালিশহরের কুমারহট্ট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে তিনি দেহত্যাগ করেন। রামপ্রসাদের পূর্বপুরুষ খুব প্রতিষ্ঠাসম্পন্ন ছিলেন। পরে তাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। কবি তাঁর পিতার দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান। রামপ্রসাদ দুই পুত্র ও দুই কন্যার জনক।

কাব্য-বৈশিষ্ট্য কবি কালীমায়ের ভক্ত ছিলেন। কলকাতার এক ধনী জমিদারের সেরেস্তায় মহুরিগিরি করায় সময় খাতায়- 'আমায় দে মা তবিলদারী, আমি নেমকহারাম নই মা শঙ্করী'- গানটি লিখে বিত্তমান প্রভুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জমিদার এতে খুবই সন্তুষ্ট হয়ে কবিকে তাঁর সাধনার পথে ব্যাপৃত থাকার জন্য মাসিক বৃত্তির অবস্থা করে দেন। গুণগ্রাহী রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও আরও কয়েকজন ভূস্বামী নির্লোভ কবিকে জমিজমা ও বৃত্তি দিয়ে তাঁর সাধনা ও কাব্যচর্চার সুযোগ করে দেন। কাব্য-বৈশিষ্ট্য রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে সভাসদ্রুপে পেতে চেয়েছিলেন। কবি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তবুও তিনি রামপ্রসাদকে 'কবিরঞ্জন' উপাধিতে ভূষিত করেন। এতেই প্রমাণিত হয় কবির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা কত গভীর ছিল। রামপ্রসাদ 'বিদ্যাসুন্দর' ও 'কৃষ্ণকীর্তন' প্রভৃতি কাব্য লিখেছিলেন, কিন্তু তাঁর অসামান্য সাহিত্যকীর্তি ভক্তিরসোজ্জ্বল শ্যামাসংগীতগুলি।

রামপ্রসাদের শ্যামাসংগীতের সংখ্যা প্রায় তিন শতাধিক। গানগুলির মধ্যে আগমনি ও বিজয়া, শ্যামাজননীর বিরাটত্বের স্বরূপ, নানাধরনের নীতিকথা ও তন্ত্রসাধনার প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। সাধন-বিষয়ক পদে নানা উপমা রূপকের সাহায্যে সাধনভজনের কথা অভিবাস্ত। সহজ ভাষায়, সরল সুরে ও চলিতভাষার ছন্দে এবং প্রাণঢালা আবেগে গানগুলি অতুলনীয়। রামপ্রসাদ তাঁর সংগীতগুলিতে মানুষের শান্তি, স্বস্তি ও নির্ভরতার এক আশ্চর্য জগৎ গড়ে তুলেছেন।

রামপ্রসাদ ভক্ত ও সাধক ছিলেন বলে মহাশক্তিরূপিণী আরাধ্য কালীমায়ের সঙ্গে তাঁর মাতাপুত্রের আন্তরিক ভক্তি ও সহজ স্নেহ ভালোবাসা ও মান অভিমানের মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বিশ্বজননীকে তিনি ঘরের মায়ের আসনে বসিয়ে মৃৎপ্রদীপ জ্বালিয়ে ভক্তি-অর্ঘ্য নিবেদন করেছেন। রামপ্রসাদী সংগীতে শিশুসুলভ আবদার অভিযোগ ও তিরস্কারের বিচিত্রভাব ব্যঞ্চিত হয়ে উঠেছে।

ধর্মীয় উদারতা রমাপ্রসাদের গানের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। রামপ্রসাদের শ্যামা মা ব্রহ্মময়ী সর্বঘটে। তিনি সাম্প্রদায়িক ধর্মবিদ্বেষের মূলে কুঠারাঘাত করে শাস্ত্রীয় পুজো ও পুজোর উপকরণের তুচ্ছতার দিকটি সহজ ভাষায় সকলের কাছে তুলে ধরলেন। বাহ্য আড়ম্বর-সর্বস্ব পুজোপদ্ধতির অন্তঃসারশূন্যতা ও ভক্তিভাবের গভীরতা তাঁর গানে অনবদ্য ভাষায় প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে। রামপ্রসাদ বললেন, শ্রেষ্ঠ পুজোয় জাঁকজমকের অহংকার নয় অন্তরের ভক্তিই আসল নির্মাল্য, ষড়রিপুগুলিই বলিদানের বস্তু।-

তুমি, লুকিয়ে তাকে করবে পূজা জানবে নারে জগজ্জনে。
তুমি মনোময় প্রতিমা গড়ি বসাও হৃদি পদ্মাসনে।।
তুমি ভক্তি সুধা খাইয়ে তারে তৃপ্তি কর আপন মনে।। তুমি মনোময় মাণিক্য জ্বেলে দাও না জ্বলুক রাত্রি দিনে。
তুমি জয় কালী বলে দাও করতালি, বলি দাও যড় রিপুগণে।

কালীমায়ের বন্দনার প্রসঙ্গে অনেক নীতিকথাও প্রচার করেছেন রামপ্রসাদ। যেমন-

১. ডুব দেরে মন কালী বলে, হৃদি রত্নাকরের অগাধ জ্বলে。
কামাদি ছয় রিপু আছে আহার লোভে সদাই চলে。
তুমি বিবেক হলদী গায়ে মেখে নাও-ছোঁবে চিহ্নিত তার গন্ধ পেলে।

২. যদি মোহ গর্তে টেনে নেয়/ধৈর্য খোঁটা ধরে রাখ。

রামপ্রসাদ সারা জীবনে অনেক দুঃখ পেয়েছিলেন- 'মিঠার লোভে তিত মুখে সারা দিনটা গেল।' কিন্তু দুঃখকে তিনি আমল দেননি। নীলকণ্ঠের মতো বিষ পান করে তিনি অমৃতের সাধনা করে গেছেন- 'দেখ সুখ পেয়ে লোক গর্ব করে, আমি করি দুঃখের বড়াই।' তাই জীবনযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত পর্যুদস্ত মানুষের নিকট রামপ্রসাদের গান পরম সান্তনায় আশ্রয়স্থল।

রামপ্রসাদের গানে সমকালীন সমাজের সুখদুঃখ, নিপীড়ন ধর্মান্ধতা ও দরিদ্রের ক্রন্দন ও রূপক উপমা প্রয়োগে বিপুল গ্রাম্যচিত্র ভিড় করে এসেছে। মানব জমিন, কলুর বলদ, ডিক্রিজারি, সংসার বাজার, চাষির চাষ-প্রভৃতি বাগভাষার প্রয়োগে সুখদুঃখে ভরা বাঙালির চারপাশের পরিচিত জীবন ও গ্রাম্য পরিবেশ উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছে। এককথায় আমাদের নিত্যপরিচিত সংসারজীবনের লীলাবৈচিত্র্য থেকেই তাঁর কাব্যের মন্দাকিনী ধারা প্রবাহিত।

বর্ণগন্ধময় এই জগতে ভগবানের লীলারস আস্বাদন করতে করতে রামপ্রসাদ পরম শান্তির কোলে চিরবৈরাগ্য লাভ করতে চেয়েছেন-

'প্রসাদ বলে থাকো বসে ভবার্ণকে ভাসিয়ে ভেলা。
যখন আসবে জোয়ার উড়িয়ে যাবে, ভাঁটিয়ে যাবে ভাঁটার বেলা।।

আগমনি ও বিজয়ার গানেও রামপ্রসাদের কৃতিত্ব সমধিক। মেনকার অন্তর্ভাবনার মধ্যে তিনি চিরকালের বাৎসল্যময়ী কন্যাগতপ্রাণা জননীর স্নেহমূর্তি চিত্রিত করেছেন। মা মেনকা স্বামীকে বলেছেন-

গিরি, এবার উমা এলে আর উমা পাঠাব না。
বলে বলবে লোকে মন্দ, কারো কথা শুনব না।
কালী ও কৃষ্ণের অভিন্নাত্মক কল্পনার মধ্যে নানা ধর্মসমন্বয়কে রামপ্রসাদ সহজ সুরে অসামান্য গুরুত্ব দিয়েছেন। 'কালী হলি মা রাসবিহারী নটবর বেশে বৃন্দাবনে', ও 'মন কর না দ্বেষাদ্বেষি'-প্রভৃতি পদগুলি শাক্ত ও বৈশ্ববধর্মের নিগূঢ় ঐক্য ভাবনা তথা উদার মানবধর্মের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জনজীবনের সুখদুঃখে রামপ্রসাদের পদাবলি রসসিক্ত। তিনি সর্বকালের লোককান্ত কবি।
June 19, 2026

নব জাগরণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

নব জাগরণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস



বাঙালির সমাজে ও সাহিত্যে তার প্রভাব

১. নবজাগরণ ও বাংলা সাহিত্যে নবযুগ

ইউরোপের আধুনিক যুগের ইতিহাসে রেনেসাঁস বা নবজাগরণ অধ্যায়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইতালি ভাষার 'রিনাসিমেনতো' শব্দটি ফরাসি ভাষায় রেনেসাঁস নামে অভিহিত। এর বাংলা প্রতিশব্দ পুনর্জন্ম। কিন্তু ব্যাপকার্থে এটি নবজাগরণ নামে প্রচলিত। জন্মের পর কোনোকিছু স্থির অনড় থাকে না- তার বিবর্তন ও বিকাশ ঘটে। এক ঐতিহাসিক কারণে পঞ্চদশ শতকে ইউরোপের চিত্ত পূর্বের চিরাভ্যস্ত আচার অনুশাসনের বন্ধন থেকে মুক্তিলাভ করে এবং সর্বত্র সেই জন্মান্তরের প্রাণচেতনার বিচিত্রমুখী বিকাশ ঘটে।

ইতিহাসের নতুন ঘটনা কখন কীভাবে আরম্ভ হয় এবং তার গতিপ্রকৃতির স্বরূপ আগে থেকে জানা যায় না। বিশেষ কোনো ঘটনার ঝঞ্ঝাঘাতে মাঝে-মধ্যে ঘড়ির সময়ের কাঁটা বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়। তখন মনে হয় চলমান সভ্যতা বুঝি এবার থমকে দাঁড়াবে। কিন্তু অচিরে বন্ধ কাঁটা দ্বিগুণ বেগে চলতে শুরু করে। তার চলার ছন্দে ছন্দে চারদিকে বিবিধ জ্যোতি বিকীর্ণ হয়।

দ্বাদশ শতাব্দীতে ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। সেগুলিতে স্বাধীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা চলত। জার্মানদের হাতে পশ্চিম রোম সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে সেখানকার জ্ঞানীগুণী পণ্ডিতরা প্রাণের ভয়ে পুঁথিপত্র নিয়ে পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে আশ্রয় নেয়। ১৪৫৩ সালে বর্বর অটোমান দুর্ধর্ষ তুর্কি দ্বিতীয় মহম্মদ কনস্টান্টিনোপল বিধ্বস্ত করলে সেখানকার গ্রিক রোমান পন্ডিতরা প্রাচীন পুঁথিপত্র নিয়ে ইতালিতে প্রবেশ করে। ইতালি তাঁদের স্বাগত জানায়। ইতালির বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন, চিকিৎসাশাস্ত্র, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের শিক্ষা দেওয়া হত। পণ্ডিতদের আগমনে তারা নবজাগরণের মূল সূত্র ধরে ফেলে।

ইতালির রেনেসাঁস ছিল নগরকেন্দ্রিক। মধ্য ইতালির রোম ও উত্তর ইতালির ফ্লোরেন্স, পিসা, ভেনিস, মিলান, জেনোয়া প্রভৃতি শহরে নবজাগরণ প্রবল ঢেউ তোলে। তবে ইতালির নামকরা শহর আর্নো নদীতীরে ব্যাবসাবাণিজ্যে সমৃদ্ধ প্রজাতান্ত্রিক ফ্লোরেন্স শহরে নবজাগরণের ভাবাবেগ খুবই তীব্র ছিল। বলতে গেলে ফ্লোরেন্স ছিল নবজাগরণের মূল কেন্দ্র। এখানকার অধিবাসীর। ছিল স্বাধীনতাপ্রিয়, শিক্ষানুরাগী ও শিল্পরসিক। দুই বিত্তশালী বণিক কসিমো ও মেডিসি ছিলেন সাহিত্য ও শিল্পের অনুরাগী।

ফ্লোরেন্সে মনীষার দীপাবলি পজ্জ্বলিত হল। সেই আলোকের ঝর্ণাধারায় পরিস্নাত হল ভেনিস, মিলান ও রোমের অন্যান্য নগর। মানবিকবিদ্যার চর্চা শুরু হল। মানুষই সব কিছুর মানদণ্ড এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেল। ইহজীবনকে বুচিসম্মত ও সর্বাঙ্গসুন্দর করে তোলার জন্য সর্বাধিক উদ্যোগ দেখা দিল। নরনারীর প্রেম মিলন বিরহ দুঃখ বেদনা নিয়ে সাহিত্য রচিত হল। মানব-মানবীর বিচিত্র অনুভূতি ও শরী সংস্থান নিয়ে স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রশিল্প গড়ে উঠল। প্রাচীন পুঁথির অনুসন্ধান, গবেষণা ও অনুবাদের কাজ শুরু হল। ছাপাখানা আবিষ্কারে অল্পসময়ে অভিধান, ভাষাতত্ত্ব, রাজনীতি, ভ্রমণ, ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিতা, সংস্কৃতি ও হাস্যরসাত্মক নানা বিষয়ের বই বেরোল। গ্রন্থাগারে গ্রন্থ সংরক্ষিত হল। নবজাগরণের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল ফ্রান্স, ইংলন্ড, স্পেন, পর্তুগাল, ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ড প্রভৃতি ইউরোপের দেশে দেশে। ইতালির দান্তে (১২৬৫-১৩২১), পেত্রার্কা (১৩০৪-১৩৭৪), বোকাচ্চিও (১৩১৩-১৩৭৫), মেকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭), ইংলন্ডের চসার (১৩৪০-১৪০০), ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬), এডমন্ড স্পেন্সার (১৫৫২-১৫৯৯), উইলিয়ম শেক্সপিয়ার (১৫৬৪-১৬১৬), নেদারল্যান্ডের ইরাসমাস (১৪৬৯-১৫৩৬), স্পেনের সার্ভেন্টিস (১৫৪৭-১৬১৬), ফ্রান্সের ফ্রাঙ্কোয়া রেবলো (১৪৯০-১৫৫৩) বিচিত্র বিষয়ের গ্রন্থে মর্ত্যের মানব-মানবীর প্রেম ভালোবাসা, মিলন বিরহের কাহিনি তুলে ধরলেন।

নবজাগরণ স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও শিল্পকলায় যুগান্তর সাধন করল। চার্চের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে শিল্প হয়ে উঠল জীবনমুখী, বাস্তব ও বিচিত্র অনুভূতিতে প্রাণবন্ত। লিওনার্দো দা ভিস্তির (১৪৫২-১৫১৯) মোনালিসা, লাস্টসাপার, পিয়েটা (মেরির কোলে মৃত যিশু); মাইকেল এঞ্জেলোর (১৪৭৫-১৫৬৮) মাতা মেরি, যিশু ও ডেভিড প্রস্তর মূর্তি, চিত্রশিল্প লাস্টজাজমেন্ট এবং রাফায়েলের (১৪৮৩-১৫২০) ম্যাডোনা (মা মেরির কোলে যিশু) বিখ্যাত। বিজ্ঞানে ইংলন্ডের রোজার বেকন (১২১৪-১২৯৪), ফ্রান্সিস বেকন, পোলান্ডের কোপারনিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩), ইতালির গ্যালিলিও (১৫৬৪-১৬৪২) এবং মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারে গুটেনবার্গ (১৪০০-১৪৬৮) উল্লেখযোগ্য। এঁরা প্রাকৃতিক ঘটনাবলি, জাগতিক বিষয়, শারীরিক সংস্থান ও মহাকাশের রহস্য সন্ধানে নানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অনেক অজানা তথ্য আবিষ্কার করে পূর্বের ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দিলেন। এভাবে ইতালির রেনেসাঁস বা নবজাগরণের তরঙ্গোচ্ছ্বাস সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে মানুষকে মধ্যযুগের অন্ধকার থেকে আলোর জগতে পৌঁছে দিল।

নবজাগরণ মানে Reawakening- জীবনের পুনর্জাগরণ, জীবনের রূপান্তর। জীবনকে নতুন করে চেনা ও জানা, নতুন করে বলা ও নতুন করে চলার নামই নবজাগরণ। ইতালির নবজাগরণে সারা ইউরোপে দিন বদলের পালা শুরু হয়েছিল। ইতালি আধুনিক ইউরোপের জন্ম দেয়। সেখানে সাংস্কৃতিক পুনর্জন্মের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন চিন্তা, বুদ্ধিবৃত্তি ও মানবতাবাদের আবেগ উদ্বেলতায় মানস-মুক্তির বিপুল তরঙ্গাঘাতে ইউরোপের দেশে দেশে সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প, ললিতকলা, সংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতি, ব্যাবসাবাণিজ্য ও ভৌগোলিক আবিষ্কারে মানুষ তার জীবনের বিপুল শক্তি ও অপরিমিত ঐশ্বর্য প্রকাশ করল। এভাবে চিন্তায় কর্মে ভৌগোলিক ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে পাহাড়-পর্বত, দুর্গম অরণ্য, আকাশ ও সমুদ্রের রহস্য সন্ধানে দিকে দিকে জীবনের জয়যাত্রা শুরু হল।

পূর্বেই বলা হয়েছে, ইউরোপে নবজাগরণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মানবতাবাদ। ঈশ্বরের মহিমা কীর্তন বা পারলৌকিক জীবন নয়, স্থান পেল সর্বতোভাবে মানুষের পার্থিব জীবন। মানুষের সুখ-দুঃখ, ভয়-ভাবনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সমস্যা, বেদনা, ভালোবাসা ইত্যাদি বিশেষ গুরুত্ব পেল। পূর্বে গ্রিক দার্শনিক পিথাগোরাস বলেছিলেন, মানুষই সব কিছুর মানদণ্ড। সবার উপরে মানষ সত্য তার উপরে নেই। মানুষের অনন্ত শক্তি ও সম্ভাবনা শাছে। চিন্তা, কর্ম, আবিষ্কার ও সৃজনী শক্তিতে ইহজীবনকে বুচিসম্মতভাবে ভোগ করা যায়।

যুক্তি, বুদ্ধি, মানবতা ও বিজ্ঞান চর্চা, অজানাকে জানার আগ্রহ, প্রকৃতির রহস্য উদ্ভাবনায় চিন্তা, বিশ্বের চতুর্দিকে নিজেকে ব্যাপ্ত করে দিয়ে যুক্তি দিয়ে সমস্ত কিছুকে গ্রহণ করার প্রবণতাই হল নবজাগরণ। প্রাচীনকে বর্জন করে নয়, প্রাচীন ও অন্যান্য সব কিছুকে যুক্তি ও মুক্ত মন নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে তার সারবত্তা গ্রহণ করতে হবে। নবজাগরণে যুক্তিবাদী আধুনিক মানুষ অন্ধ-কুসংস্কার ও সংকীর্ণ ধর্মচেতনার আচার, অনুশাসন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলেন। ভাষা, সাহিত্য, ব্যাকরণ, ন্যায়, দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও শিল্পের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হল। মানুষ উপলব্ধি করল, মানুষকে মূল্য দিয়ে মানুষকে ভালোবেসে নিজের অনন্ত শক্তির স্বরূপ জানা যায়। মানুষের চেষ্টায় নতুনভাবে সমাজ গড়া যায় এবং পাহাড় ডিঙিয়ে জঙ্গল পেরিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নতুন দেশ ও সেখানকার মানুষ, অনেক অজানা জীব ও অপরিচিত তবুর পরিচয় পাওয়া যায়। ব্যাবসা-বাণিজ্যে জীবনের সমৃদ্ধি ঘটে। নবজাগরণে মানুষ এভাবে মানবতাবাদী হয়ে উঠল। রেনেসাঁসের প্রভাবে সারা ইউরোপে শুধু সাংস্কৃতিক পুনর্জন্ম নয়, সামগ্রিক ও সর্বাঙ্গীণ জীবনে নতুনত্ব সৃষ্টি হল।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণের স্বরূপ আলোচনার পূর্বে পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইতালির নবজাগরণের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য আলোচনার প্রয়োজন ছিল। কারণ বাংলার নবজাগরণের আলোচনায় ইতালির নবজাগরণের প্রসঙ্গ অনিবার্য। কনস্টান্টিনোপলের পতনের পর গ্রিক-রোমান পন্ডিতদের ইতালি আগমনে নবজাগরণ শুরু হয়। তেমনি পাশ্চাত্য জাতির সান্নিধ্যে এসেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণ শুরু হয়। এই নবজাগরণের সঙ্গে বাংলা তথা ভারতে আধুনিক যুগের শুরু এবং বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার নিবিড় সংযোগ রয়েছে।

নির্দিষ্ট কোনো তারিখ দিনক্ষণ ধরে নবজাগরণের কার্যকলাপ শুরু হয়নি। অনেক আগে থেকে তার প্রস্তুতি চলতে থাকে। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে ব্যাবসা-বাণিজ্যের জন্য ইউরোপীয় বণিকরা ভারতে প্রবেশ করে। তখন থেকে ইউরোপীয় জাতির সান্নিধ্যে ভাবতে পাশ্চাত্য ভাবধারার অনুপ্রবেশ। তারপর প্রতিযোগিতায় ইংরেজ বণিকরা প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

তখন ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। বলতে গেলে মোগল মহিমার শ্মশান-শয্যা রচিত হয়ে গেছে। ভারতের সর্বত্র ব্যাপক অরাজকতা। ঐক্যবদ্ধ মোগল সাম্রাজ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত। এই বিচ্ছিন্নতা ধর্ম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তখন স্বভাবতই দেশের অগ্রগতি বিপর্যস্ত হয়। কোনো দেশের সংস্কৃতি যখন চলৎশক্তিরহিত হয়ে যায়, তখন সে দেশের মানুষের জীবনে নেমে আসে অজ্ঞতার অন্ধকার। অন্ধ কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও বুদ্ধিহীন আচার-সর্বস্বতায় আবদ্ধ হয়ে ভারতীয় জীবন সংকীর্ণ, খণ্ড, ক্ষুদ্র, নির্জীব ও পঙ্গু হয়ে পড়ে। দীর্ঘকাল এই তামসিকতার ছায়াতলে তন্দ্রাচ্ছন্ন জীবনযাপন করার ফলে ভারতীয় মন থেকে বুদ্ধিবৃত্তি বিলুপ্ত হয়ে যায়। মোগল যুগের শেষদিকে ভারতীয় জীবন যখন রুদ্ধ, অগ্রগতিহীন হয়ে পড়েছিল, তখন এদেশে বিশেষত বাংলাদেশে ব্রিটিশ প্রাধান্য স্থাপিত হওয়ায় ক্রমে ক্রমে পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তার হতে থাকে। ফলে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে আমাদের সংস্কৃতির নবমূল্যায়নের চেষ্টা চলে। এই ভাবপরিমণ্ডলকে ইউরোপের নবজাগরণের সঙ্গে তুলনা করে বাংলার নবজাগরণ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ নিয়ে তর্কবিতর্কের অন্ত নেই। অনেকের মতে ইতালির নবজাগরণ এত প্রবল ও সৃষ্টিধর্মী ছিল যে শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, সংগীত প্রভৃতি জ্ঞানবিজ্ঞান সর্বক্ষেত্রে তার ব্যাপক আত্মপ্রকাশ ও বিস্তৃতি ঘটেছিল। তুলনাগত বিচারে আমাদের নবজাগরণ অনেকটা ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত। ভিন্ন মতে, ইতালির নবজাগরণ থেকে আমাদের নব জাগরণের গতিবেগ আরও প্রবল ছিল। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য বিদ্যার অনুশীলনের ফলে ধীরে ধীরে আমাদের জড়ত্ব ও অন্ধতা দূর হতে থাকে। শিক্ষা, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি-জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে ও সর্বস্তরে নবজাগরণের গতিবেগ প্রবল আন্দোলনের ঢেউ তোলে। এর ফলে জাতি তার আপন সংস্কৃতির আদর্শ ও ঐতিহ্যগত চিন্তাচেতনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। এই নবলব্ধ চেতনার আলোকে একটা আত্মবিস্মৃত জাতি তার আত্মশক্তির পরিচয় পেয়ে আত্ম-মর্যাদাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। তখন সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একান্ত উদ্‌গ্রীব হয়। সাহিত্য ও শিল্প রচনায় তার প্রকাশ ঘটতে থাকে। এই আত্মমর্যাদাবোধই নবযুগের বা নবজাগরণের ভিত্তি।

ঐতিহাসিক দিক থেকে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন ক্লাইভের পলাশির যুদ্ধজয় বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পলাশির যুদ্ধ ভারতের ইতিহাসে এক নবযুগের সূচনা করে। ওই দিনটিতে বাঙালি যে মধ্যযুগীয় তমসাবৃত স্থবির জীবন পরিত্যাগ করে আধুনিক জীবনের সিংহদ্বারে উপনীত হয়। বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ডরূপে দেখা দিল। প্রবল ইংরেজ তার তেজ বিকীর্ণ করল। পোহাল শর্বরী। উদিল রবিচ্ছবি। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের ভাষায়-

"On June 23, 1757, the middle ages of India ended and her modern age began."

পলাশি যুদ্ধের পর বাংলাদেশে প্রায় অর্ধ-শতাব্দীব্যাপী নবজাগরণের প্রস্তুতিপর্ব এবং উনবিংশ শতাব্দীর আরম্ভ থেকে চিন্তার ক্ষেত্রে তার ব্যাপক প্রসার। কলকাতা মাদ্রাসা স্থাপিত হয় ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে। যদিও এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এমন সব লোক তৈরি করা, যারা ইংরেজকে নিজেদের আইন বুঝিয়ে দেবে, তবুও জাতীয় চেতনা জাগাতে এই প্রতিষ্ঠান কম সাহায্য করেনি। দেশের প্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পুরাতত্ত্ব চর্চার উদ্দেশ্যে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত হয় এশিয়াটিক সোসাইটি। সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে। ব্যাপটিস্ট মিশনারি উইলিয়াম কেরী কলকাতায় পদার্পণ করেন ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। যদিও কলেজ সৃষ্টির পিছনে ইংরেজ শাসকের মুখ্য অভিপ্রায় ছিল এদেশের সমস্ত আচার-ব্যবহার, আইনকানুন সম্পূর্ণভাবে জেনে নিয়ে ইংরেজ শাসন কায়েম করা, তবুও এর অন্য শুভফল ঘটেছিল। প্রাচ্য-সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে ওঠে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ।

রেনেসাঁস বা নবজাগরণের কথা বঙ্কিমচন্দ্র 'বিবিধ প্রবন্ধে'র বাঙালির ইতিহাস প্রবন্ধে কবি বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য, রঘুনাথ, গদাধর, রঘুনন্দন প্রভৃতি ধর্মবেত্তা, কবি ও মনীষীদের আবির্ভাবে পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাংলার রেনেসাঁসের কথা বলেছেন-

"অকস্মাৎ বিনষ্ট বিস্মৃত অপরিজ্ঞাত গ্রিক সাহিত্য ইউরোপ ফিরিয়া পাইল। ফিরিয়া পাইয়া যেমন বর্ষার জলে শীর্ণা স্রোতস্বতী কূলপ্লাবণী হয়, যেমন মুমূর্ষু রোগী দৈব ঔষধে যৌবনে বল প্রাপ্ত হয়, ইউরোপের অকস্মাৎ সেইরূপ অভ্যুদয় হইল।"

বঙ্কিমচন্দ্র পঞ্চদশ শতকের বাংলাকে রেনেসাঁসের বাংলা বলেছেন এবং হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বাংলাকে মেডিচির ফ্লোরেন্স নামে অভিহিত করেছেন। কেশবচন্দ্র সেন 'নবজাগরিত' শব্দ ব্যবহার করেছেন। বিপিনচন্দ্র পাল তাঁর 'নবযুগের বাংলা' গ্রন্থে ইতালি ও বাংলার রেনেসাঁসের আলোচনা প্রসঙ্গে রাজা রামমোহন রায়কে পুরোধা বলেছেন। পরবর্তীকালে স্যার যদুনাথ সরকার, অন্নদাশঙ্কর রায়, সুশোভন সরকার, অশোক মিত্র ও অমলেশ ত্রিপাঠী বাংলার নবজাগরণকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছেন। এঁদের মধ্যে অনেকের মতে বাংলার নবজাগরণ ইতালির থেকে শ্লথগতি ও খুবই সীমাবদ্ধ ছিল。

দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের বাণিজ্য-বিপ্লব, নগর-বিপ্লব প্রভৃতি আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন ইতালি তথা ইউরোপীয় রেনেসাঁসের যে মজবুত ও ব্যাপক সামাজিক অর্থনৈতিক পটভূমি রচনা করে, বাংলার নবজাগরণের পশ্চাতে সেই প্রেক্ষাপট অনুপস্থিত ছিল। ইতালির ফ্লোরেন্স নগরী রেনেসাঁসকে যেভাবে বরণ করে এবং শিল্পীদের যেভাবে লালন করে, বাংলার নবজাগরণের কেন্দ্র কলকাতা কখনো সেই ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়নি। কলকাতা ছিল ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক শাসনের কেন্দ্র। ফ্লোরেন্সের মতো তার স্বাধীন মানসিকতা ও শিল্পের সমঝদারী মনোভাব ছিল না। কলকাতার ব্রিটিশের চাকুরিয়া বা ব্রিটিশের বাণিজ্যে অংশগ্রহণকারী কিছু ধনবান লোক বাংলার নবজাগরণে নেতৃত্ব দেন। জনসাধারণের সঙ্গে তাঁদের যোগ ছিল ক্ষীণ।

অর্থসম্পদ ও বাণিজ্যের দিক থেকেও কলকাতায় ফ্লোরেন্সের মতো ব্যাপক পশমের বাণিজ্য ও মেডিচি (Medici) পরিবারের বিশাল ব্যাঙ্ক ব্যাবসা ছিল কুল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদার সম্প্রদায় কৃষকের কাছ থেকে শোষিত অর্থে ধনশালী হয়ে কলকাতায় বসবাস করেন। তাঁরাই ছিলেন বাংলার নবজাগরণের পৃষ্ঠপোষক। ফ্লোরেন্সের বুর্জোয়া শ্রেণির সঙ্গে এই সামন্ত জমিদারশ্রেণিকে তুলনা করা যায় না। ব্রিটিশের বাণিজ্যের সহযোগী বেনিয়ান বা কর্ণওয়ালিসের ভূমি সংস্কারের ফলে জমিদার বা সরকারি চাকুরির দ্বারা ধনশালী মধ্যবিত্তের পক্ষে মহান শিল্প এবং সাহিত্যের সমঝদারি ও পৃষ্ঠপোষকতা করা অসম্ভব ছিল। কোনো মহান শিল্প সৃষ্টির দিকে তাঁদের মানসিকতা ছিল না। কলকাতার বাবুরা কিছু ইতালীয় মার্বেলের তৈরি নিকৃষ্ট ভাস্কর্যকে তাঁদের উদ্যানে স্থাপন করে নিম্নরুচির পরিচয় দেন এবং তাঁরা তৃতীয় শ্রেণির নগ্ন নারীচিত্র নিয়ে স্থূল ইন্দ্রিয় বিলাসে মশগুল থাকতেন।

সাম্প্রতিক ঐতিহাসিকদের মতে বাংলার নবজাগরণের বেশির ভাগ নায়ক ছিলেন সরকারি কর্মচারী। বিদ্যাসাগর ছিলেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ, রাজনারায়ণ ছিলেন প্রধান শিক্ষক, রঙ্গলাল, বঙ্কিমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। একমাত্র ব্যতিক্রমী ঠাকুর পরিবার বাণিজ্যে লক্ষ্মীলাভ করেন। সুতরাং এঁদের মধ্যে ফ্লোরেন্সের বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিচ্ছায়া খোঁজা নিষ্ফল। এঁরা ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার ছাড়া আর কোনো বলিষ্ঠ শিল্প-সাহিত্যকর্মের উদ্যোগ নিতে সক্ষম ছিলেন না।

বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে যে নতুন সৃষ্টির জোয়ার দেখা দেয় তার প্রেরণা আসে মূলত ইংরাজি সাহিত্য থেকে। অবশ্য সংস্কৃত সাহিত্যের প্রভাব নিশ্চয়ই ছিল। উনবিংশ শতকের কিছু মননশীল চিন্তাবিদ সংস্কৃত সাহিত্য, দর্শন, ধর্মশাস্ত্রের যুক্তিসিদ্ধ ব্যাখ্যায় অগ্রণী হন। এ প্রসঙ্গে রামমোহন, বিদ্যাসাগরের নাম কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণীয়। বঙ্কিমের কৃষ্ণচরিত্র হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের যুক্তিবাদী ব্যাখ্যা। মোট কথা, বাংলার নবজাগরণের বীজ ছিল মিশ্র, কিছুটা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি কিছুটা প্রতীচ্য বিশেষত ইংলন্ডীয় সংস্কৃতির মিশ্রণ। বাংলা সাহিত্য কেবলমাত্র ইংরেজি সাহিত্যের দ্বারা প্রভাবিত ছিল না, তা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃত সাহিত্যের আদর্শে সমৃদ্ধ ছিল।
June 19, 2026

বাংলার নবজাগরণ ও আধুনিক সাহিত্যের উন্মেষ

সমাজ, সংস্কৃতি ও মননশীলতার যুগান্তকারী বিবর্তন



মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য, কৃষ্ণকুমারী নাটক, গিরীশচন্দ্রের প্রফুল্ল, বঙ্কিমের কৃষ্ণকান্তের উইল গ্রন্থাদিতে অবশ্য শেক্সপিয়রের বিয়োগান্ত নাটকের সুর খুঁজে পাওয়া যায়। সুতরাং পঞ্চদশ শতকের ইতালীয় রেনেসাঁসের আলোকে ঊনবিংশ শতকের বাংলার রেনেসাঁসকে বিচার করা ভুল।

দেশকালে উভয়ের প্রেক্ষাপট ও চরিত্র আলাদা। বাংলার রেনেসাঁস ছিল প্রাচ্যপ্রতীচ্যের সমন্বয়ী আদর্শের মিশ্র ফল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মতে 'দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে'। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যর ভালো গুণ নিয়ে মধ্য পন্থায় নবীন ও প্রবীণ উভয়ের একসঙ্গে পথ চলাই শ্রেয়।

আসল কথা পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির সান্নিধ্যে কলকাতা মহানগরীতেই নবজাগরণের আন্দোলন চলে এবং তা ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। মোহিতলাল মজুমদার যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস সারা ভারতেরই ইতিহাস। পূর্বেই বলা হয়েছে, রেনেসাঁসের মৌলিক অর্থ পুনর্জন্ম লাভ। এর প্রচলিত অর্থ হল জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে নবজাগরণ বা পুনরুজ্জীবনের আন্দোলন। এই আন্দোলন কেবল সাহিত্য ও শিল্পকলার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বিশেষত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রেই প্রসার লাভ করে। নবজাগরণ মানে কেবল পুরাতনের অনুবৃত্তি নয়। পুরাতন বিদ্যা ও ঐতিহ্যের ভিত্তির উপর নতুন আদর্শের প্রতিষ্ঠা-পুরাতন ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন ও পরিবর্তনশীল সামাজিক অবস্থার সামঞ্জস্য সাধন। নবজাগরণের ফলে সমাজে এক নতুন সৃজনী শক্তির স্ফুরণ দেখা দিয়েছিল।

বাংলাদেশে নবজাগরণের সূত্রপাত কখন থেকে তা সঠিকভাবে বলা যায় না। আলোচনার সুবিধার জন্য সাহিত্যের ঐতিহাসিকেরা ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই নবজাগরণের শুভারম্ভ কাল ধরে নিয়েছেন। আমরা দেখি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের পর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা, শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা এবং তার কিছুদিন পরে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি ঘটনার পর শিক্ষিত বাঙালির যে মানস-পরিবর্তন ঘটে তারই প্রতিফলনে বাংলা সাহিত্যে নবযুগের প্রতিষ্ঠা। এবং রামমোহন, ডিরোজিও ও বিদ্যাসাগরের বিস্ময়কর প্রতিভা বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম ও সাহিত্যকে নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়। তবে বাংলার নবজাগরণে শিল্পের দিকটা উপেক্ষিত থাকে-একথা স্বীকার্য। ইউরোপে রেনেসাঁসের যে প্রচন্ড গতিবেগ এবং সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও ভৌগোলিক আবিষ্কারের মধ্যে মানুষের যে সৃষ্টিশীলতা ও নতুনকে আবিষ্কারের উদ্যম ছিল-বাংলার নবজাগরণ সে তুলনায় খুবই ধীর মন্থর গতিতে বিস্তৃতি লাভ করে। এ ছাড়া বাংলার এই রেনেসাঁস নগরকেন্দ্রিক শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পক্ষান্তরে স্যার যদুনাথ সরকারের মতে উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণ ইউরোপীয় রেনেসাঁস অপেক্ষা আরও ব্যাপক, গভীর ও অধিকতর বৈপ্লবিক ছিল। তিনি লিখেছেন-

"It was truly a Renaissance wider, deeper and more revolutionary than that of Europe after the fall of Constantinople."
স্যার যদুনাথ সরকারের এই উক্তি কলকাতা মহানগরীকে কেন্দ্র করে এবং তা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। বিপিনচন্দ্র পালের 'নবযুগের বাংলা' ও শিবনাথ শাস্ত্রীর 'রামতনুলাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ' গ্রন্থটি পড়লে জানা যাবে যদুনাথ সরকারের মন্তব্য যথার্থ। নবজাগরণের ভাববিপ্লব কলকাতা মহানগরীর বাইরে গ্রামাঞ্চলে পরিব্যাপ্ত হয়নি। সে সুযোগও ছিল না-কারণ গ্রামাঞ্চলের মানুষের মন পড়েছিল মধ্যযুগে। মফস্বল অঞ্চলে তখন শিক্ষাদীক্ষার প্রসার ঘটেনি। তা ছাড়া চিন্তাভাবনা ও কোনো প্রকার আন্দোলন কবি শেলির মতে নগর থেকেই গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

Liberty কবিতায় শেলি স্বাধীনতার ভাব আন্দোলন সম্পর্কে লিখেছেন- "From city to hamlet thy dawning is cast." কলকাতা মহানগরীতে যে নবজাগরণের ভাবাদর্শে শিক্ষিত যুবকেরা উদ্বুদ্ধ হয় সেই নবজাগরণের আন্দোলন গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েনি। কিন্তু কলকাতা মহানগরীতে তার গতিবেগ ছিল কনস্টান্টিনোপল থেকে আরও তীব্র, গতিশীল ও বৈপ্লবিক।

স্যার যদুনাথ সরকারের মন্তব্যের সমর্থন মিলে রবীন্দ্রনাথের কথায়-

"আমার বিশ্বাস, ইউরোপীয় সংস্কৃতি সর্বপ্রথমে বাংলাদেশের অন্তঃকরণ গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল, নানা দিক থেকে বিচলিত করেছিল তার মন। মুক্তির বেগ লাগল তার জীবনে, তার মননশক্তি জাগরিত হয়ে উঠল পূর্বযুগের অজগর নিদ্রা থেকে। বুদ্ধির সর্বজনীনতা, দৃষ্টির সর্বব্যাপকতা, সর্বমানবের পরিপ্রেক্ষণিকায় মানবত্বের উপলব্ধি বাংলাদেশেই রামমোহন রায়ের মতো মহামনীষীদের চিত্তে অপূর্ব প্রভাবে অকস্মাৎ আবির্ভূত হল। আচার ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় বন্ধনের মুক্তি বাংলাদেশেই সর্বপ্রথম উদ্যত হয়ে উঠেছিল, অতি অল্পকালের মধ্যে চলৎশক্তিমতী হয়ে উঠল বাংলা ভাষা, তার আড়ষ্টতা ঘুচে গেল নবযৌবন সঞ্চারে, সাহিত্য দেখা দিতে লাগল অভূতপূর্ব সফলতার আশা বহন করে, পৃথিবীর আদিযুগে যেমন দ্বীপ উঠেছিল সমুদ্রগর্ভ থেকে নব নব প্রাণের অন্নদায়িনী ভূমি আশ্রয় করে।"

বাংলার নবজাগরণের সুতীব্র বৈপ্লবিক গতিবেগের পরিচয় মেলে শিবনাথ শাস্ত্রী রচিত 'রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ' গ্রন্থে। এই গ্রন্থে তিনি লিখেছেন-

"১৮২৫ হইতে ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিংশতি বর্ষকে বঙ্গের নবযুগের জন্মকাল বলিয়া গণ্য করা যাইতে পারে। এই কালের মধ্যে কী রাজনীতি, কী সমাজনীতি, কী শিক্ষাবিভাগ, সকল দিকেই নবযুগের প্রবর্তন হইয়াছিল।"

অবশ্য ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বাংলার নবজাগরণ বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ১৮০১-১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নবজাগরণের প্রাণচাঞ্চল্য তীব্র আকার ধারণ করে এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। নবজাগরণের প্রবল গতিবেগ ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের পরে বহু পরিমাণে সংহত হয়। শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয়ের উক্তি যথার্থ যে, কুড়ি বছরের মধ্যে প্রাচীন ও নবীনের সংঘর্ষণ ও ঘোর সামাজিক বিপ্লবের সূচনা ঘটে। এই সময়ের মধ্যে রামমোহন, ডিরোজিও ও ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী, বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, কালীপ্রসন্ন সিংহ, প্যারীচাঁদ মিত্র এবং আরও অনেকে ধর্মসংস্কার, সমাজসংস্কার, শিক্ষাসংস্কার, রাজনীতি প্রভৃতি বিষয়ে প্রবল আন্দোলন সৃষ্টি করেন। ইতালির নবজাগরণ অপেক্ষা তা ছিল আরও তীব্র ও বৈপ্লবিক। পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইউরোপের রেনেসাঁসের পর বাংলায় নবজাগরণ ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দীতে। প্রায় চারশো বছরের ব্যবধানে ইউরোপে সভ্যতার বিপুল অগ্রগতি ও বিকাশ ঘটেছে। ইউরোপের চিত্তদূত হিসেবে ভারতে আসে ইংরেজ। ইংরেজ শাসনকে কেন্দ্র করে পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষার সান্নিধ্যে বাংলার নবজাগরণ ইতালির নবজাগরণ থেকেও অধিক ক্রিয়াশীল ছিল-স্যার যদুনাথ সরকারের এই মন্তব্য অত্যুক্তি নয়। বাংলার নবজাগরণের অন্যতম ফসল বাংলা সাহিত্যের দ্রুত বিকাশ। কাব্য, নাটক, কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধ-সাহিত্যের সব শাখাকেই নবজাগরণ নব নব উন্মেষশালিতায় সমৃদ্ধ করে তোলে। সবদিক থেকে বিচারে নবজাগরণ ছিল বিপুল আলোড়নের যুগ। প্রাচীন ও নবীনের, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভাবসংঘাতের সমুদ্রমন্থনে অজাগর গরজে সমুদ্রতরঙ্গ উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। আর সেই মন্থনে লক্ষ্মীদেবী সুধাভাণ্ড হাতে নিয়ে আবির্ভূত হন। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির সান্নিধ্যে দীর্ঘ অর্ধ-শতাব্দীব্যাপী প্রাচ্য সংস্কৃতির পুনর্জন্ম, বিবর্তন ও বিকাশ চলছিল।

নবজাগরণ বাংলাদেশে কেবল পাশ্চাত্যের অনুকরণ ছিল না। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সান্নিধ্যে বাঙালির মানসমুক্তি ঘটে এবং ভাবসংঘাতের ফলে তার বিপুল আলোড়ন-বিক্ষোভ চলে দীর্ঘকাল। শেষে পাশ্চাত্যকে প্রাচ্য ভাবে ভাবিত করেই ভাব সংস্থিতি ঘটে।

২. বাংলার সমাজ জীবনে নবজাগরণের প্রভাব

বাংলার নবজাগরণের মূলগত আদর্শ ছিল যুক্তি, বুদ্ধি, সাম্য, মৈত্রী ও মানবতা। মানবতা বলতে নারী ও পুরুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধের উজ্জীবন, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা ও ঐহিক কল্যাণ। নারী ও পুরুষ আপাতদৃষ্টিতে একটু ভিন্ন প্রকৃতির হলেও উভয়েই রক্তমাংসের সত্তা-হৃদয়, মন ও বুদ্ধির সম-অধিকারী। তাঁদের প্রাণ-মন-আত্মার স্বাভাবিক ধর্ম, মনঃপ্রবৃত্তির সুষ্ঠুভাবে বিকাশ ও চরিতার্থতার নামই মানবতা। সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা ও ব্যক্তির বিকাশ উভয়েরই কাম্য। পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষার সান্নিধ্যে এসে ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের নেতারা উপলব্ধি করেন যে, দেশের সামন্ততান্ত্রিক অচলায়তন দেশের অবনতির মূল কারণ। মূঢ়তা ও সংস্কারাচ্ছন্নতায় এবং নারীপুরুষের বৈষম্য ও নানাপ্রকার ভেদাভেদে দেশের প্রাণশক্তি অচল অসাড়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-

'যে নদী হারায়ে স্রোত, চলিতে না পারে, অজস্র শৈবাল দাম বাঁধে আসি তারে。
যে জাতি জীবনহারা অচল অসাড়,
পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।'

সতীদাহ নামে প্রাণঘাতী নিষ্ঠুর প্রথা বহু আগে থেকে সমাজে প্রচলিত ছিল। এই প্রথা অনুসারে হিন্দুসমাজে মৃত স্বামীর সঙ্গে চিতায় বিধবা পত্নীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হত। লোকের অন্ধবিশ্বাস ছিল যে, এতে পরলোকে সতী নারী স্বামীর সাহচর্য পাবে। সম্রাট আকবর এই প্রথার বিরোধী ছিলেন। জাহাঙ্গীর সহমরণের বিরুদ্ধে রাজবিধি তৈরি করেন। কিন্তু কিছু ফল হয়নি। এ স্থলে মনে রাখা দরকার যে, মুসলিম প্রশাসনের অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার শৈথিল্যে নীতিভ্রষ্ট ব্যক্তিরা কুমারী নারীদের উপর অত্যাচার করত। বোধ হয় সেজন্য স্মার্ত রঘুনন্দন সতীদাহ সমর্থন করেন। তারপর উচ্চবর্ণের মধ্যে সতীদাহ প্রবল হয়ে ওঠে।

লর্ড মিন্টো ১৮১৩ সালে এক সার্কুলারে ঘোষণা করেন যে, বলপ্রয়োগে কোনো অনিচ্ছুক নারীকে সহমৃতা করা যাবে না। গর্ভবতী নারী ও অভিভাবকহীন শিশুসন্তানের জননীকেও সহমৃতা নিষিদ্ধ করা হয়। কোনো সতীদাহের ঘটনায় নিকটবর্তী পুলিশ ফাঁড়িতে শীঘ্র সংবাদ জানাতে বলা হয়। ১৮১৭ সালের সেপ্টেম্বরে সহমরণকে নরহত্যার পর্যায়ভুক্ত করে শান্তির নির্দেশ দেওয়া নখ। তা সত্ত্বেও সতীদাহ নিবারণে ধুরন্ধর সমাজপতিরা নিরস্ত থাকেননি।

সমাজদেহ থেকে সতীদাহ সম্পূর্ণ নির্মূল করার জন্য নবজাগরণ যুগের শিক্ষিত সম্প্রদায় বিশেষভাবে সক্রিয় ভূমিকা নেন। রাজা রামমোহন রায় ও দ্বারকানাথ ঠাকুর নেতৃত্ব দেন। রামমোহনের বড়োদাদার স্ত্রী সহমৃতা হন। রামমোহন তখন রংপুরে। রামমোহন এই ঘটনার সতীদাহ নিবারণকল্পে বিশেষ উৎসাহী ও উদ্যোগী হয়ে প্রবল আন্দোলন চালান। রামমোহন সমাজ-সংস্কারের কাজে পথিকৃৎ ছিলেন। হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথার কুফল সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। সমাজ-সংস্কারক হিসেবে প্রথমেই হিন্দু নারীদের দুরবস্থার ওপর তাঁর দৃষ্টি পড়েছিল। নারী আন্দোলনের তিনি পথপ্রদর্শক। তিনি সর্বাধিক কুৎসিত লোকাচার সতীদাহকে ধিক্কার জানিয়ে আন্দোলনে অগ্রণী হন।

সতীদাহ নিবারণের জন্য ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে নভেম্বর মাসে সহমরণ বিষয়ে 'প্রবর্তক নিবর্তকের সংবাদ' এবং ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে 'সহমরণ বিষয়ে প্রবর্তক নিবর্তকের দ্বিতীয় সংবাদ' রচনায় প্রমাণ করেন যে, স্মৃতিশাস্ত্রে বিধবাদের সংযমী জীবনযাপনের কথা বলা হয়েছে। সহমরণের কোনো প্রস্তাব নেই। মানবতাবোধ ও শাস্ত্রমতে সতীদাহ নিন্দনীয়। এ কাজ নরহত্যা ছাড়া আর কিছু নয়। ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে 'সংবাদ কৌমুদী' পত্রিকার মাধ্যমে সতীদাহ নিবারণের সপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে প্রয়াসী হন। এই বর্বর প্রথা অবসানের জন্য তিনি মানুষের বুদ্ধি, কাণ্ডজ্ঞান ও মানবতার কাছে আবেদন করেন। এ ব্যাপারে সরকারের কাছেও বহু আবেদনপত্র পাঠান। রামমোহনের আন্দোলনের বিরুদ্ধে রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে রক্ষণশীল হিন্দুদের প্রতিবাদও সমান্তরালে প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা ডিসেম্বর ১৭ নং রেগুলেশন দ্বারা লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সতীদাহ নিষিদ্ধ করেন। সতীদাহ নিবারণে রামমোহনের সংগ্রাম সেকালের বিচারে এক গুরুত্বপূর্ণ, সাহসিক, ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এবং নারীসমাজের পক্ষে খুবই কল্যাণকর। এছাড়া রামমোহন স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার, অসবর্ণ বিবাহ, বিধবাবিবাহ প্রভৃতির পক্ষে এবং জাতিভেদ, বাল্যবিবাহ, কৌলীন্যপ্রথা ও পুরুষের বহু বিবাহের বিপক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি হিন্দু আইন সংশোধন করে নারীদের পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভের জন্যও ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে একটি পুস্তিকা রচনা করে বলিষ্ঠ মন্তব্য রাখেন। গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন, কন্যাসন্তানের হত্যা প্রভৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। বেন্টিঙ্ক গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন নিষিদ্ধ করেন。

রামমোহনের অনুগামী হিন্দু কলেজের অধ্যাপক ডিরোজিওর শিষ্যবৃন্দ গুরুর অনুপ্রেরণায় হিন্দু সমাজের রক্ষণশীলতা, গতানুগতিকতা, বর্বর কুপ্রথা, পৌত্তলিকতা, জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক ব্যবহার, নারী নির্যাতন, দাসপ্রথা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ এবং সমাজের আরও বহু কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ইয়ং বেঙ্গল দেখিয়ে দেয় কতকগুলি অসার পচনশীল প্রথাকে আঁকড়ে ধরে হিন্দু সমাজ অবক্ষয়ের অতলে তলিয়ে যেতে বসেছে। তবে তারা স্বাধীন চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিচর্চার নামে মদ্যপান, গোমাংস ভক্ষণ ও পৈতে ছিড়ে ফেলা প্রভৃতি উচ্ছৃঙ্খলতাকে বহুস্থলে প্রশ্রয় দেন। ইয়ং বেঙ্গলের অন্যতম নেতা রাধানাথ শিকদারের ভ্রান্ত ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, 'গোমাংস' না খেলে জাতির মঙ্গল নেই। অধিক গোমাংস খেয়ে চর্মরোগে তাঁর মৃত্যু হয়। সে যা হোক, ডিরোজিও এবং তাঁর শিষ্যবৃন্দ সমাজ থেকে অন্ধ আচার-অনুষ্ঠান, কুপ্রথা, কুসংস্কার ও অজ্ঞানতা দূর করার জন্য বদ্ধপরিকর ছিলেন। স্বাধীন যুক্তি ও চিন্তাবহির্ভূত কোনো জিনিসকে তাঁরা ব্যবহারযোগ্য মনে করেননি। তবে গঠনকর্ম অপেক্ষা ধ্বংসসাধনের দিকে তাঁদের সর্বশক্তি নিয়োজিত হয়েছিল। ত্রুটি সত্ত্বেও একথা স্বীকার্য যে, ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর কার্যকলাপের মাধ্যমে জাতির জড়তা দূর হয়ে মুক্ত জীবনাদর্শ বিস্তৃতির পথ অনেকটা প্রশস্ত হয়ে যায়। নানা আচার ও কুসংস্কারগ্রস্ত সমাজে তাঁরা ছিলেন বন্ধনহীন চঞ্চল উদ্দাম জীবনের উপাসক। ঐতিহাসিক দিক থেকে এর গুরুত্ব অবশ্য স্বীকার্য।

কলকাতায় এ সময় মদ্যপান, বেশ্যাসক্তি, লাম্পট্য প্রভৃতি ব্যভিচার অনাচারের স্রোত বাবু-সমাজে প্রবল ছিল। অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এই দোষে নৈতিক অধঃপতনে কলঙ্কিত ছিল। ১৮৬৪ সালে প্যারীচরণ সরকার কলকাতায় সুরাপান নিবারণের জন্য একটি সমিতি গঠন করেন। রাজনারায়ণ বসু মেদিনীপুরে সুরাপান নিবারণী সভা স্থাপন করেন। রাধাকান্ত দেব, ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও বিদ্যাসাগর মদ্যপানের অত্যন্ত বিরোধী ছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অক্ষয়কুমার দত্ত পরিমিত সুরাপান করতেন।

ইয়ং বেঙ্গলের 'মদ খাওয়া ও খানা খাওয়া' ছাড়া আর একটি ঘটনা হিন্দুসমাজে প্রবল আন্দোলন তোলে-'গেল গেল হিন্দুয়ানি'। সেটি 'কালীপ্রসাদী হেঙ্গাম' নামে সুপরিচিত। হাটখোলার কালীপ্রসাদ দত্ত 'বিবি আনার' নামক এক পরমাসুন্দরী মুসলিম মহিলাকে উপপত্নী রাখেন। তিনি জাত্যন্তরিত হলে তাঁর সমর্থকরা তাঁকে জাতিতে তোলে। কালীপ্রসাদী হেঙ্গাম ও ইয়ং বেঙ্গলের কার্যকলাপ জাতপাতের বন্ধন শিথিল করে সমাজে পরিবর্তনের ঢেউ তোলে।

ব্রাহ্মসমাজ বিশেষ করে কেশবচন্দ্র সেন সমাজ-সংস্কারে বিশেষভাবে ব্রতী হন। তিনি নব্য ব্রাহ্মদের সহায়তায় পুরুষের বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ ও জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন চালান। কেশবচন্দ্র সেন সর্বভারতীয় সমাজ-সংস্কারক হিসেবে পরিচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে ব্রাহ্মত্ম-সমাজ অসবর্ণ বিবাহ, বিধবাবিবাহ, স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার, সমাজসেবা, পর্দাপ্রথা বর্জন প্রভৃতি বিভিন্ন সমাজসংস্কারমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করে। ১৮৭২ সালে ভারতীয় বিবাহ আইন পাশ হয়। অসবর্ণ বিবাহ আইনসিদ্ধ হয়। বিবাহে পাত্রপাত্রীর বয়স যথাক্রমে আঠারো ও ষোলো বছর আবশ্যিক হয়। বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হয়। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ বৈধ ঘোষিত হয়। পৌত্তলিকতা ও জাতিভেদ ত্যাগ করা হয়। কেশবচন্দ্র 'সুলভ সমাচার' নামে সুলভ মূল্যের পত্রিকা বের করে সমাজ-সংস্কারের আদর্শ সর্বসাধারণের মধ্যে প্রচার করেন। 'মদ না গরল' এক পয়সা দামের পত্রিকার দ্বারা শ্রমিকদের মধ্যে সুরাপান বন্ধের প্রচার চালান। ব্রাহ্মসমাজের আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এদের সমাজ-সংস্কারের ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে হিন্দুসমাজ বহুলাংশে রক্ষণশীলতা ও গোঁড়ামি পরিত্যাগ করে। ব্রাহ্মসমাজের নারীমুক্তির আদর্শ হিন্দুনারীদের প্রভাবিত করে।

১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে এক রেগুলেশনে দাসপ্রথা ও দাসের ক্রয়বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়। চৈত্র মাসে গাজন ও চড়ক পুজো উপলক্ষে ভক্তদের বড়শি বিঁধিয়ে বাঁশে বেঁধে অমানবিক ঘোরানো প্রথা ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে নিষিদ্ধ করা হয়।

রামমোহনের আন্দোলনে সতীদাহ আইনে নিষিদ্ধ হয়। বিধবা নারীরা স্বামীর চিতায় জীবন্ত দগ্ধ হওয়া থেকে নিষ্কৃতি পেল। কিন্তু বিধবাদের সমস্যা জটিল হয়ে উঠল সমাজে। নারীকে স্বভাবধর্মের চরিতার্থতা এবং সুষ্ঠু ও সুস্থভাবে জীবন উপভোগ থেকে ভিন্ন ধরনের লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হল। বিধবাদের আহারে বিধিনিষেধ কড়া করা হল। বারব্রত করে শুদ্ধাচারী জীবন কাটাতে বাধ্য করা হল। এর মধ্যে নিষ্ঠুর নিরম্বু অনাহারের একাদশী পালন অন্যতম। আর গোপনে তথাকথিত সম্ভ্রান্ত প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিরা বিধবা যুবতীদের সঙ্গে অবৈধ ক্রিয়াকলাপে লিপ্ত হল। সমাজের অভ্যন্ততে চলল নানা অনাচার ও ভ্রুণ হত্যা হত্যাদি পাপক্রিয়া। বিধবা নারীকে সমাজপতিরা দেবীর আসনে বসিয়ে তাদের হৃদয়কে বিশুষ্ক করে তুলল। প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষ বিদ্যাসাগর তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করে বিধবা নারীদের মুক্তি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বিধবা-বিবাহ সমাজে চালু করার জন্য তিনি দিন বদলের পালায় বৈপ্লবিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন।

৩. বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণের প্রভাব

পূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি বাংলার নবজাগরণের বৈশিষ্ট্য হল বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তিনির্ভর বাস্তবজীবনের প্রাধান্য। জীবনের সর্বক্ষেত্রে যুক্তি ও বুদ্ধির প্রতিষ্ঠা, বিজ্ঞানচেতনায় জীবনকে পরিশুদ্ধ করা এবং মৃত্তিকাতলচারী মানুষের হাসি অশ্রু কল্লোলিত জীবনের প্রতি অসীম কৌতূহল ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, মানবজীবনের অপার বিস্ময় উপলব্ধি এবং মানুষ ও মনুষ্যত্বকে মহিমান্বিত মূল্য দেওয়ার অনুপ্রেরণা ও এষণা। ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের আদর্শে উদ্বুদ্ধ সাহিত্যিকরা এই নব্যতন্ত্রকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে। তবে এই নবজাগরণগত নতুন জীবনচেতনা হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো একদিনে আবির্ভূত হয়নি। ঐতিহাসিক দিক থেকে পলাশি যুদ্ধের পরেই বাঙালি নতুন জীবনবোধে উদ্বুদ্ধ হয়। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দী থেকেই তার প্রস্তুতিপর্ব বলা যেতে পারে। ওই সময় বিদেশি বণিকরা ভারতে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য প্রবেশ করে। ইউরোপে তখন পঞ্চদশ শতাব্দীর নবজাগরণের বিস্তৃতি ঘটেছে। জাহাজে পণ্যদ্রব্য আমদানির সঙ্গে সঙ্গে বণিকরা ইউরোপীয় ভাবধারাও বহন করে আনে। বিদেশি বণিকদের সান্নিধ্যে এসে বাঙালির মনোজীবনেও পরিবর্তন সাধিত হতে থাকে। তারপর পলাশি যুদ্ধের পর বাংলায় ব্রিটিশ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় প্রবল ইংরেজ তার তেজ বিকীর্ণ করল। সাহিত্যে আনন্দ ও দুঃখবেদনা-নির্ভর মানুষের হাসি-অশ্রু-কল্লোলিত বিচিত্র জীবনকথা লীলায়িত ও কল্লোলিত হয়ে উঠল। বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ পূর্বের যাত্রা, কথকতা, সংকীর্তন, রামায়ণ-মহাভারত, বৈষ্ণব সাহিত্যের কাহিনি-আশ্রিত কবিগানের কথা বলেছেন। তারপর বাংলার নবজাগরণে বাংলা সাহিত্যের যুগান্তর - সাধিত হল।

আরম্ভেরও যেমন আরম্ভ থাকে, তেমনই বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূত্রপাতের পূর্বে অস্পষ্ট নীহারিকাপুঞ্জের মতো একটা পূর্বপরিমণ্ডল বা প্রেক্ষাপট ছিল। সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার স্বরূপ আভাসিত হতে থাকে। কাশীরাম দাসের পর রচিত রামায়ণ-মহাভারতের অনুবাদে লঘুতরল ভঙ্গিতে ভক্তির কৌতুককাহিনি বর্ণিত হয়েছে। জগৎরামের রামায়ণে দেবভত্তিতে অনীহা প্রকাশ পেয়েছে এবং উদ্ভট গল্পের অবতারণা ঘটেছে। রামানন্দ যতি জগন্নাথ দেবের দারুমূর্তিকে নীরস প্রাণহীন বলে জগন্নাথ পুজোর ব্যর্থতার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। রাধাকৃষ্ণ মিশ্র মঙ্গলকাব্যের দেবীর স্বপ্নাদেশকে ব্যঙ্গ করেছেন। সপ্তদশ শতাব্দীর মুসলমান কবিদের রচনায় মানব-মানবীর প্রণয়কাহিনী স্থান পেয়েছে। ভারতচন্দ্র দেবদেবীর মাহাত্ম্যের উপর ব্যঙ্গের ধূলি নিক্ষেপ করে দেবতার ভণ্ডামি ও স্বেচ্ছাচারিতার মুখোশ খুলে দিয়েছেন। তাঁর কাব্যে প্রাধান্য পেয়েছে নতুন জাগ্রত মানুষ- 'আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে'। অষ্টাদশ শতাব্দীর রামপ্রসাদ ও কমলাকান্ত প্রমুখ শাক্ত পদকর্তাদের রচনায় সমকালীন রাষ্ট্রিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে। শিব বাঙালি ভিখারী স্বামী। মেনকা ও উমা দৈবীসত্তা ছাড়িয়ে মাটির ঘরের স্নেহপ্রেম ও বাৎসল্যের মা ও মেয়ে হয়ে উঠেছেন। শাক্তপদাবলিতে জাতপাতের ঊর্ধ্বে মানবমহিমা কীর্তিত হয়েছে। গঙ্গারাম দত্ত সমসাময়িক ইতিহাস ও যুগচেতনানির্ভর বাস্তব জীবননিষ্ঠা ও মানবিক প্রেরণায় মহারাষ্ট্রপুরাণ বা ভাস্করপরাভব কাব্য রচনা করেছেন। ময়মনসিংহগীতিকা, পূর্ববঙ্গগীতিকায় নরনারীর মুক্তপ্রেম উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে।

পাশ্চাত্য বণিকদের আগমনে এবং যুগধর্মের প্রভাবে সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর ধর্মকেন্দ্রিক দেবপ্রভাবপুষ্ট বাংলা সাহিত্যে মানবিক জীবনচেতনার যে ভাবভাবনা প্রকাশ পেতে থাকে তা পলাশিযুদ্ধের পর আরও ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে। পুরোদমে বাংলা সাহিত্যে ঋতু পরিবর্তন শুরু হয়। চার দেয়ালের সংকীর্ণ গণ্ডি ভেঙে বাঙালি বেরিয়ে এল মুক্ত নীলাকাশতলে। তার দৃষ্টি সম্প্রসারিত হল দিগন্তে-দিগন্তের পারে। সাতসমুদ্রের পারে ইউরোপ-আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি কত দেশ রয়েছে। সেখানকার মানুষের কত বিচিত্র জীবন, ভাষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির কত ঐশ্বর্যে ভরা। বাঙালি জীবনমুখী সৃষ্টিপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হল। বাঙালির ভাবকল্পনা ঊর্ধ্বমুখী হল না-সাহিত্যিকরা রাঙামাটির পথ দিয়ে যাত্রা করলেন। মানবজীবনের সুখদুঃখ আনন্দবেদনার কাহিনি তরঙ্গিত হল। বাংলা সাহিত্যে বিপুলা পৃথিবীর জীবনসংগীত কলরবমুখরিত হয়ে উঠল। সাহিত্যের রূপ ও রীতিতে বৈচিত্র্য সাধিত হল। পূর্বে ছন্দই ছিল সাহিত্যের বাহন। দীর্ঘ সাড়ে আটশো বছর ধরে বাংলা সাহিত্যে কবিতা ছিল ভাবের বাহন। নবজাগরণের যুগে মুদ্রাযন্ত্র আবিষ্কৃত হল। সৃষ্টি হল গদ্য। গদ্য চিন্তা ও মননের বাহন হল। নাটক, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচিত হল। অল্প সময়ে বহু গ্রন্থ প্রকাশের সুযোগ করে দিল মুদ্রাযন্ত্র। মধ্যযুগ ছিল মন্ত্রের যুগ-দৈববিশ্বাসের যুগ। আধুনিক যুগ নিয়ে এল যন্ত্র, ভূগোল, ইতিহাস, বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও স্বদেশভাবনা। আধুনিক যুগের সাহিত্য নানা বিষয়বস্তুতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠল। নাট্যসাহিত্য রচিত হওয়ায় অভিনয় কলা নাট্যমঞ্চে বাংলা সাহিত্যে নতুন মাত্রা এনে দিল। গদ্য সৃষ্টি হওয়ায় পূর্বের ভাবের সাহিত্য ও আবেগের সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত হল মননশীল বুদ্ধিপ্রধান গদ্যসাহিত্য। আধুনিক যুগ সৃষ্টি করল কথাসাহিত্য ও নাট্যসাহিত্য। ছন্দপ্রধান কাব্যসাহিত্যও নতুন নতুন ছন্দের আঙ্গিকে এবং ভাবের বৈচিত্র্যে ও শৈল্পিক রূপরীতিতে সমৃদ্ধ হল।

পলাশি যুদ্ধের অর্ধশতাব্দীর মধ্যেই বাংলার আর্থসামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অভূতপূর্ব পরিবর্তন শুরু হয়। বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতি থেকে মধ্যযুগের অবসান ঘটতে থাকে। ইউরোপের ঝোড়ো হাওয়া আমাদের রুদ্ধ নিকেতনে প্রবল আঘাত হানে। জানালা দরজা সব খুলে যায়। বাঙালি মুক্ত বাতায়নপথে দেখতে পায় দিগন্ত প্রসারিত জীবনের পটভূমি। সংকীর্ণ জীবনের ক্ষুদ্র পরিধি থেকে বৃহত্তর মুক্ত জীবনের লীলাভূমিতে বিচরণের জন্য পথিক মনের অভিযাত্রিক নেশা বাঙালিকে ঘরছাড়া করে। নতুনকে জানার জন্য, নতুনকে বরণ করার জন্য তার চিত্ত উদ্বেলিত উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। বাঙালির জীবনে ও সাহিত্যে নবযুগের সূত্রপাত ঘটে। পাশ্চাত্য সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার ফলে বাংলা সাহিত্যের উপর আধুনিক মনন ও অনুভূতির প্রভাব পড়তে থাকে। বাংলা সাহিত্যে তখন আধুনিকতার অগ্রগতি দ্রুতবেগে সাধিত হয়।

মুসলমান আমলের বাংলা সাহিত্যের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখা যায় যে, অবাধে অন্যায় করবার অধিকারই যে ঐশ্বর্যের লক্ষণ এই বিশ্বাসটা কলুষিত করেছে তখনকার দেবচরিত্র-কল্পনাকে।

তখনকার দিনে যেমন অত্যাচারের দ্বারা প্রবল ব্যক্তি আপন শাসন পাকা করে তুলত, তেমনি করে অন্যায়ের বিভীষিকায় দেবদেবীর প্রতিপত্তি আমরা কল্পনা করেছি। সেই নিষ্ঠুর বলের হারজিতেই তাদের শ্রেষ্ঠতা-অশ্রেষ্ঠতার প্রমাণ হত। ধর্মের নিয়ম মেনে চলবে সাধারণ মানুষ, সেই নিয়মকে লঙ্ঘন করবার দুর্দম অধিকার অসাধারণের। ইউরোপের সংস্রব একদিকে আমাদের সামনে এনেছে বিশ্বপ্রকৃতিতে কার্যকারণবিধির সার্বভৌমিকতা; আর একদিকে ন্যায়-অন্যায়ের সেই বিশুদ্ধ আদর্শ যা কোনো শাস্ত্রবাক্যের নির্দেশে, কোনো চিরপ্রচলিত প্রথার সীমাবেষ্টনে, কোনো বিশেষ শ্রেণির বিশেষ বিধিতে খণ্ডিত হতে পারে না।

পৌরাণিক দেববিশ্বাস, অন্ধ সংস্কার-এ নিষ্ক্রিয়তা ঔদাসীন্য পরিহার করে এবার বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার যাত্রা শুরু হল। মানবমহিমায় বিশ্বাস ও মানবতাবোধ এই যুগের প্রধান লক্ষণ। মানুষ দেবতার হাতের ক্রীড়নক নয়; মানুষের সুখ আছে, দুঃখ আছে, ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে, মহিমাবোধ আছে, মানুষই দেবতা গড়ে। তাই দেবতাকে মানবিক আদর্শে শ্রদ্ধেয় ও পূজনীয় হতে হবে-এরূপ গভীর বিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয়ের ভাবভাবনায় নবযুগের সাহিত্যে মানুষের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হল। জীবনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগের ফলে বৃহৎ বিচিত্র জীবনলীলার জগৎ গড়ে উঠল বাংলা সাহিত্যে। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে বিচিত্ররূপিণী প্রকৃতিও সাহিত্যে বর্ণাঢ্য হয়ে উঠল।

আধুনিক যুগের সাহিত্যে মানবতার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠা ঘটল। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য প্রখর জাতীয়তাবোধ, গভীর স্বদেশচেতনা। বাঙালির মধ্যে স্বদেশপ্রেম সঞ্চারিত হওয়ায় একদিকে যেমন রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক স্বাধীনতার স্পৃহা জাগল, তেমনি প্রাচীন ঐতিহ্যের গৌরবময় অধ্যায় তুলে ধরে বাঙালি একটা স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠার চেষ্টায় ব্রতী হল। ঈশ্বরগুপ্ত, রামমোহন, ভবানীচরণ, রঙ্গলাল, হেম-মধু-নবীন ও বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ মনীষী জাতীয়তাবোধের বাণী ও আদর্শ সাহিত্যে তুলে ধরলেন। এ ব্যাপারে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, রাজনারায়ণ বসু, নবগোপাল মিত্র প্রমুখের চেষ্টা ও ব্রাহ্মসমাজের আন্দোলন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বিজ্ঞানবুদ্ধি ও যুক্তিনির্ভরতা এ যুগের সাহিত্যের আর একটি বিশিষ্ট লক্ষণ। মানুষ অন্ধবিশ্বাসে কিংবা প্রবলের অত্যাচারের ভয়ে কোনো কিছু মেনে নেবে না। যুক্তির কষ্টিপাথরে সবকিছুর সত্যমিথ্যা যাচাই করে নেবে-এই ধরনের মনোভাব কবিসাহিত্যিকদের মনোজীবনে বলিষ্ঠভাবে স্থান পায়। এর ফলে ধর্ম, সমাজসংস্কার ও শিক্ষামূলক বহু রচনায় বাংলাসাহিত্য সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। একদিকে যেমন প্রবন্ধ রচিত হয়, তেমনি কথাসাহিত্যে জীবনের অন্তর্ভেদী রহস্য ধরা পড়ে, অপরদিকে নাট্যসাহিত্যেরও বিকাশ শুরু হয়। অন্ধসংস্কারের জগদ্দল পাথর সমাজজীবন থেকে অপসারিত করার প্রণোদনায় যে প্রবল জীবন-জিজ্ঞাসা জাগে তারই প্রতিফলন ঘটে আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্যে।

আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম বাহন হল গদ্যরচনা। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বাহন ছিল ছন্দ। দীর্ঘ সাড়ে আটশো বছর ধরে বাংলা সাহিত্যে কবিতার একাধিপত্য। কবিরা ভূর্জপত্রে তাঁদের কল্পনাকে সৃষ্টিরূপ দিতেন। তা ছিল সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য। লিপিকররা পুঁথি নকল করে সীমিতসংখ্যায় তা রসিকদের মধ্যে বিতরণ করতেন। তাই প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের প্রচার ছিল খুবই সীমিত। আধুনিক যুগে মুদ্রাযন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ায় রচনা প্রকাশের ও প্রচারের বিরাট সুবিধা এল। পূর্বেকার সাহিত্য ছিল ভাবভাবনায় আবেগাপ্লুত। আগে ছিল মন্ত্রের যুগ। অন্ধবিশ্বাসের যুগ। এখন এল যন্ত্রের যুগ, গদ্যের যুগ, চিন্তামননের যুগ।

গদ্য বাংলা সাহিত্যে যুক্তি, বুদ্ধি, চিন্তা ও মনন মননশীলতা প্রবল বেগ সঞ্চারিত করল। পদ্যাশ্রিত প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ছিল ধীর স্থির শ্লথগতিসম্পন্ন। এখন বাংলা সাহিত্যে উদ্দাম গতি ও তারুণ্যের নির্বাধ শক্তি এল। বাংলা গদ্য ঊনবিংশ শতাব্দীর কথাসাহিত্য, নাটক ও প্রবন্ধে ভাষা দান করল। গদ্যভাষা বাঙালির চিন্তাধারাকে তীক্ষ্ণ ও গভীর করে তুলল।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে নাট্যসংস্থার প্রতিষ্ঠা ও নাটকাভিনয় বাংলা সাহিত্যেব এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে। নাট্যকার বার্নার্ড শ লিখেছেন-"The stage is as much important as the auditorium." উনবিংশ শতাব্দীতে মঞ্চাশ্রয়ী নাটকাভিনয়ের ফলে সাধারণ মানুষ নাটকের মাধ্যমে রসাস্বাদনের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি বিশেষভাবে অনুরাগী হয়ে ওঠে। সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মমূলক বহু নাটক রচনা করে নাট্যকাররা জনচিত্তকে স্বাদেশিক ভাবভাবনার উচ্চাদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়াসী হন।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের আসর থেকে প্রাচীন দেবদেবীরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে একেবারে বিদায় নিলেন তা নয়। কবিসাহিত্যিক নাট্যকাররা দেবদেবীদের নতুন আলোকে বিচার করলেন। পুরাতনের মধ্যে নতুন আদর্শ আরোপ করে পুরাতনকে তাঁরা সঞ্জীবিত ও তাৎপর্যমণ্ডিত করে তুললেন। মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, গিরিশচন্দ্র এঁদের অধিকাংশ রচনার বিষয়বস্তু পৌরাণিক দেবদেবী। দেবদেবীর কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তাঁদের চরিত্র অঙ্কন করতে গিয়ে লেখকরা আধুনিক চিন্তাচেতনা জ্ঞানবিজ্ঞানের নিরিখে তাঁদের নতুন রূপে গড়ে তুলেছেন। দেবদেবীরা আমাদের কুটির-প্রাঙ্গণে আমাদের পরমাত্মীয় মানুষ হয়ে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। মানবিক আদর্শে দেবদেবীরা ধূলির তিলক মাথায় পরেছেন। দেবত্ব ও মানবত্বের পার্থক্য ও ব্যবধান ঘুচে গেছে। আধুনিক চিন্তাচেতনার আলোকে দেবত্ব সম্পর্কে আমাদের মোহমুক্তি ঘটেছে। আমাদের মাটি-মায়ের কোলেই স্বর্গ জন্ম নিয়েছে।- 'স্বর্গ আমার জন্ম নিল মাটি মায়ের কোলে'।

পাশ্চাত্য সভ্যতার সংশ্রবে এসে বাঙালির মনের আগল ঘুচে গেছে, তার চিত্তমুক্তি ঘটেছে। পশ্চিম সমুদ্র থেকে ঝোড়ো হাওয়া এসে আমাদের অচলায়তনিক জীবনের রুদ্ধদ্বার ভেঙে দিল। বাঙালি নীল আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকাল, সামনে দেখল বিশাল দিগন্ত। আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্যে বিশাল বিশ্বের ছায়া পড়ল, খাঁচার পাখি অসীম নীলাকাশে পাখা মেলে দিল। আর অন্ধকারে বসে থাকা নয়, 'আলো আনো, আলো আনো, ছিন্ন কর কৃষ্ণ আচ্ছাদন দৃষ্টির সম্মুখ হতে'। চাই 'More light, more space'। এই বিপুল জাগ্রত জীবনচেতনা থেকে বাংলা সাহিত্য জীবনের বিচিত্র কল্লোলে কলমন্দ্রমুখরিত হল। এত আলো, এত গান, এত প্রাণ পূর্বেকার বাংলা সাহিত্যে ছিল বায়। এবার জীবনের বিশাল দিগন্ত বাংলা সাহিত্যে বিচিত্র বর্ণসুষমায় আলোকিত উজ্জ্বলিত হয়ে উঠল। সাহিত্যের সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় জীবনের নানাপ্রকার সম্পর্ক স্থাপিত হল। একদিকে সাহিত্যে বিশুদ্ধ রসানন্দ স্থান পেল, সাহিত্য হয়ে উঠল আনন্দনিস্যন্দী। অন্যদিকে নানাপ্রকার চিন্তা ও মননে বাঙালির জীবনধারা নতুনভাবে গড়ে উঠল। ইউরোপীয় রেনেসাঁস বা নবজাগরণের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি উনবিংশ শতকের বাঙালি জীবনে ও বাংলা সাহিত্যে বিকশিত হয়ে উঠল। তাই বাংলার নবজাগরণের সঙ্গে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশের নিবিড় যোগ রয়েছে।

বাংলার নবজাগরণে সমন্বয়বাদী আদর্শ স্থান পায়। প্রাচীন যুগের যা কিছু শ্রেষ্ঠ, তার সঙ্গে প্রতীচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ জিনিসগুলিকে সমন্বয়ের দ্বারা বাংলা তথা সারা ভারতের অগ্রগতির পথনির্দেশ ছিল এই সমন্বয়বাদী ভাবধারার বৈশিষ্ট্য। এই সমন্বয়বাদের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন ভারতপথিক রামমোহন রায়, বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ। রবীন্দ্রনাথের সাধনায় এই সমন্বয়বাদী চিন্তাদর্শের ব্যাপক প্রসার ঘটে। রবীন্দ্রনাথ সর্বদা মধ্যপন্থাকে শ্রেষ্ঠ মনে করেছেন। 'দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে'...এই ছিল তাঁর আদর্শ।

বাংলার নবজাগরণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য জাতীয়তাবাদের উন্মেষ। আধুনিক বাংলা সাহিত্য জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়। সমাজ-সংস্কার ও ধর্ম আন্দোলনের ফলে নতুন বাংলা তথা নতুন ভারতের জন্ম হয়। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের মধ্যে সেই বাংলার নবজাগরণে বিপুল গতিবেগ সংহত হয়ে আছে।

বাংলার নবজাগরণের সঙ্গে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে ইংরেজ শাসন শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিপুল পরিবর্তন ঘটিয়ে জীবনযাত্রার প্রগতির পথ উন্মুক্ত করে দেয়। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু কলেজ স্থাপিত হয়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দেশে পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষার নতুন হাওয়া বইল। প্রাচীন আমলের শিক্ষার উপর ছেদ পড়ল। প্রাচীনের সঙ্গে নবীনের সংঘর্ষে প্রাচীন ঐতিহ্যের অনেক কিছু বর্জিত হল-নব্যবঙ্গের সংস্কৃতি জয়যুক্ত হল।

আধুনিক শিক্ষাদীক্ষায় দীক্ষিত হওয়ার ফলে বাঙালির সমাজজীবন দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকল। সমগ্র বাংলাদেশ নানা চিন্তায়, তর্কে-বিতর্কে ও আন্দোলনে আলোড়িত হল। ব্যক্তির চিন্তায়, সামাজিক রীতিনীতিতে, রাজনৈতিক আদর্শে ও শিক্ষা পদ্ধতিতে যে পরিবর্তন এল তা সমাজের পরিকাঠামোটিকে অনেকখানি পরিবর্তন করল। ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক অতি নিবিড়, ব্যক্তিমনের সঙ্গে সমাজের নতুন ভাবনা বাংলা সাহিত্যে যুগান্তর সৃষ্টি করল।

প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাঙালির মন ছিল বিচারবিমুখ ও সংস্কারগ্রস্ত। বাঙালি প্রাচীন প্রথা ও শাস্ত্রের বিধিবিধানকে অপরিবর্তনীয় ধ্রুব সত্য বলে জ্ঞান করেছিল। জীবনে ও সাহিত্যে তারা দেবতার একাধিপত্যকে নির্বি "ব স্বীকার করে নিয়েছিলেন। পাশ্চাত্য শিক্ষা-দীক্ষা আমাদের এই সংস্কারাচ্ছন্ন, দৈবনির্ভরশীল ও প্রথাশাসিত ভীরু জীবনের উপর প্রচন্ড আঘাত হানল। এর ফলে বাঙালির বিবেকবুদ্ধি ও চিৎপ্রকর্ষ জাগ্রত হল। সাহিত্যিকেরা সমাজজীবনের কুসংস্কার ও নৈতিক কদাচার দূর করতে বদ্ধপরিকর হলেন। স্বাধীন চিন্তা বুদ্ধিবৃত্তিকে আশ্রয় করে সমাজে তাঁরা নবযুগ প্রবর্তনে প্রয়াসী হলেন।

জাতির এই মানস পরিবর্তন আধুনিক বাংলা সাহিত্যে নতুনত্বের সঞ্চার করল। বহিরঙ্গের রূপ ও অন্তরঙ্গের ভাব উভয় দিক থেকে বাংলা সাহিত্যের জন্মান্তর রূপান্তর ঘটল। সাহিতো নতুন শক্তি ও সৌন্দর্য ফুটে উঠল। লগ্নি তব্য বিষয় এই যে, প্রাচীন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মানবিকতার মহিমা স্বীকৃত হয়নি, স্বাদেশিকতা বা জাতীয়তার প্রতিফলন ঘটেনি। ইতিহাস-চেতনার কোনো স্পন্দন তাতে নেই। লৌকিক ধর্মের অনুসৃতি, পুচ্ছগ্রাহিতা বা গতানুগতিক কাহিনির অনুবর্তন, দেবকর্তৃত্ব, অলৌকিকতা, পল্লবগ্রাহিতা, বাস্তব জীবনের সুখদুঃখের প্রতি ঔদাসীন্য আমাদের প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যের বিশিষ্ট লক্ষণ। ইউরোপীয় ভাবচিন্তার সংস্পর্শে এসে নবজাগ্রত জীবনবোধের ফলে আধুনিক সাহিত্য আকৃতি ও প্রকৃতিতে সম্পূর্ণ বদলে গেল। এ যুগের সাহিত্যে মানুষ প্রতিষ্ঠা লাভকরল, ধর্মীয় প্রভাব ধীরে ধীরে মুছে গেল, মানবীয় সুখদুঃখ আনন্দবেদনার কথা উচ্চারিত হল। জীবনের রক্তরাগে সাহিত্য সঞ্জীবিত হল। বাঙালি জাতির বহু কামনা-বাসনা সাহিত্যে বাণীরূপ পেল।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্য ছিল পদ্যবাহিত। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে গদ্য সসম্মানে পদ্যের পাশাপাশি স্থান করে নিল। প্রকাশিত হল সাময়িকপত্র, রচিত হল প্রবন্ধ-উপন্যাস-গল্প-নাটক। লেখা হল পাশ্চাত্যরীতির মহাকাব্য আর গীতিকবিতা। ছন্দ ও ভাষাভঙ্গিতে নতুনতর ভাবের প্রকাশক্ষমতা এল। কাব্যসাহিত্যে প্রধানত মধুসূদনের ও গদ্যসাহিত্যে বঙ্কিমের সারস্বত প্রতিভাকে আশ্রয় করেই আধুনিকতার পদক্ষেপ ঘটল। কাব্যে নাটকে গীতিকবিতায় ছন্দে ও ভাষায় মধুসূদন পুরাতনকে বর্জন করে নতুন জীবনাদর্শে নিজের সৃষ্টিকে উজ্জ্বল করে তুললেন। বঙ্কিমচন্দ্র সৃষ্টি করলেন প্রাণবান গদ্য। উপন্যাস, সমালোচনা ও প্রবন্ধাদি তাঁর বিস্ময়কর সৃষ্টি-ক্ষমতার স্বাক্ষর বহন করে এলেন বিহারীলাল চক্রবর্তী। হৃদয়রাজ্যের গোপন গভীর কথাটি তাঁর রচনায় উচ্ছ্বসিত হল। রবীন্দ্রনাথ সেই পথের পথিক হয়ে মানুষের অতিসূক্ষ্ম উৎকণ্ঠা ও সূক্ষ্মতর ইন্দ্রিয়ানুভূতির ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করলেন।

তারপরে এলেন শরৎচন্দ্র। কথাসাহিত্যে নতুন একটি ধারার প্রবর্তন করলেন। অফুরন্ত দরদ ও সংবেদনশীলতায় তিনি নরনারীর সম্পর্কের নতুন মূল্যায়ন করেলন। আধুনিক সাহিত্যের দিকপাল হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, গিরিশচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল, ক্ষীরোদপ্রসাদ, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রমুখ প্রতিভাধর সাহিত্যিক অসামান্য প্রতিভার পরিচয় রেখে গেছেন। রবীন্দ্র-সমকালীন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, মোহিতলাল মজুমদার, জীবনানন্দ দাশ, নজরুল ইসলাম, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ লেখক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে অসামান্য গৌরবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সাহিত্যে অতি আধুনিক লেখকদের পদচারণার ক্ষেত্রটি আরও প্রশস্ত; বাস্তব জীবনের সার্থক রূপায়ণে সমাজের আনাচে-কানাচে বসবাসকারী আদিবাসী নরনারী, শ্রমিক, কৃষক, হাজি, ডোম, মুচি ও মেথর প্রভৃতি তথাকথিত নিম্নশ্রেণি মানুষের নিগূঢ় জীবনকথায় এঁদের রচনা বিচিত্র সুন্দর হয়ে উঠেছে। এঁরা যে বাণীর জগৎ তৈরি করেছেন ভারতীয় সাহিত্যে তার তুলনা নেই। এঁদের রচনায় বিচিত্র বর্ণে রূপে রসে উন্মোচিত হয়েছে জীবনরহস্যের নব নব দিগন্ত!

Wednesday, June 17, 2026

June 17, 2026

ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণ




মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য, কৃষ্ণকুমারী নাটক, গিরীশচন্দ্রের প্রফুল্ল, বঙ্কিমের কৃষ্ণকান্তের উইল গ্রন্থাদিতে অবশ্য শেক্সপিয়রের বিয়োগান্ত নাটকের সুর খুঁজে পাওয়া যায়। সুতরাং পঞ্চদশ শতকের ইতালীয় রেনেসাঁসের আলোকে ঊনবিংশ শতকের বাংলার রেনেসাঁসকে বিচার করা ভুল।

দেশকালে উভয়ের প্রেক্ষাপট ও চরিত্র আলাদা। বাংলার রেনেসাঁস ছিল প্রাচ্যপ্রতীচ্যের সমন্বয়ী আদর্শের মিশ্র ফল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মতে 'দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে'। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যর ভালো গুণ নিয়ে মধ্য পন্থায় নবীন ও প্রবীণ উভয়ের একসঙ্গে পথ চলাই শ্রেয়।

আসল কথা পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির সান্নিধ্যে কলকাতা মহানগরীতেই নবজাগরণের আন্দোলন চলে এবং তা ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। মোহিতলাল মজুমদার যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস সারা ভারতেরই ইতিহাস। পূর্বেই বলা হয়েছে, রেনেসাঁসের মৌলিক অর্থ পুনর্জন্ম লাভ। এর প্রচলিত অর্থ হল জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে নবজাগরণ বা পুনরুজ্জীবনের আন্দোলন। এই আন্দোলন কেবল সাহিত্য ও শিল্পকলার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বিশেষত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রেই প্রসার লাভ করে। নবজাগরণ মানে কেবল পুরাতনের অনুবৃত্তি নয়। পুরাতন বিদ্যা ও ঐতিহ্যের ভিত্তির উপর নতুন আদর্শের প্রতিষ্ঠা-পুরাতন ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন ও পরিবর্তনশীল সামাজিক অবস্থার সামঞ্জস্য সাধন। নবজাগরণের ফলে সমাজে এক নতুন সৃজনী শক্তির স্ফুরণ দেখা দিয়েছিল।

বাংলাদেশে নবজাগরণের সূত্রপাত কখন থেকে তা সঠিকভাবে বলা যায় না। আলোচনার সুবিধার জন্য সাহিত্যের ঐতিহাসিকেরা ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই নবজাগরণের শুভারম্ভ কাল ধরে নিয়েছেন। আমরা দেখি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের পর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা, শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা এবং তার কিছুদিন পরে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি ঘটনার পর শিক্ষিত বাঙালির যে মানস-পরিবর্তন ঘটে তারই প্রতিফলনে বাংলা সাহিত্যে নবযুগের প্রতিষ্ঠা। এবং রামমোহন, ডিরোজিও ও বিদ্যাসাগরের বিস্ময়কর প্রতিভা বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম ও সাহিত্যকে নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়। তবে বাংলার নবজাগরণে শিল্পের দিকটা উপেক্ষিত থাকে-একথা স্বীকার্য। ইউরোপে রেনেসাঁসের যে প্রচন্ড গতিবেগ এবং সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও ভৌগোলিক আবিষ্কারের মধ্যে মানুষের যে সৃষ্টিশীলতা ও নতুনকে আবিষ্কারের উদ্যম ছিল-বাংলার নবজাগরণ সে তুলনায় খুবই ধীর মন্থর গতিতে বিস্তৃতি লাভ করে। এ ছাড়া বাংলার এই রেনেসাঁস নগরকেন্দ্রিক শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পক্ষান্তরে স্যার যদুনাথ সরকারের মতে উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণ ইউরোপীয় রেনেসাঁস অপেক্ষা আরও ব্যাপক, গভীর ও অধিকতর বৈপ্লবিক ছিল। তিনি লিখেছেন-

"It was truly a Renaissance wider, deeper and more revolutionary than that of Europe after the fall of Constantinople."
স্যার যদুনাথ সরকারের এই উক্তি কলকাতা মহানগরীকে কেন্দ্র করে এবং তা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। বিপিনচন্দ্র পালের 'নবযুগের বাংলা' ও শিবনাথ শাস্ত্রীর 'রামতনুলাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ' গ্রন্থটি পড়লে জানা যাবে যদুনাথ সরকারের মন্তব্য যথার্থ। নবজাগরণের ভাববিপ্লব কলকাতা মহানগরীর বাইরে গ্রামাঞ্চলে পরিব্যাপ্ত হয়নি। সে সুযোগও ছিল না-কারণ গ্রামাঞ্চলের মানুষের মন পড়েছিল মধ্যযুগে। মফস্বল অঞ্চলে তখন শিক্ষাদীক্ষার প্রসার ঘটেনি। তা ছাড়া চিন্তাভাবনা ও কোনো প্রকার আন্দোলন কবি শেলির মতে নগর থেকেই গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

Liberty কবিতায় শেলি স্বাধীনতার ভাব আন্দোলন সম্পর্কে লিখেছেন- "From city to hamlet thy dawning is cast." কলকাতা মহানগরীতে যে নবজাগরণের ভাবাদর্শে শিক্ষিত যুবকেরা উদ্বুদ্ধ হয় সেই নবজাগরণের আন্দোলন গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েনি। কিন্তু কলকাতা মহানগরীতে তার গতিবেগ ছিল কনস্টান্টিনোপল থেকে আরও তীব্র, গতিশীল ও বৈপ্লবিক।

স্যার যদুনাথ সরকারের মন্তব্যের সমর্থন মিলে রবীন্দ্রনাথের কথায়-

"আমার বিশ্বাস, ইউরোপীয় সংস্কৃতি সর্বপ্রথমে বাংলাদেশের অন্তঃকরণ গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল, নানা দিক থেকে বিচলিত করেছিল তার মন। মুক্তির বেগ লাগল তার জীবনে, তার মননশক্তি জাগরিত হয়ে উঠল পূর্বযুগের অজগর নিদ্রা থেকে। বুদ্ধির সর্বজনীনতা, দৃষ্টির সর্বব্যাপকতা, সর্বমানবের পরিপ্রেক্ষণিকায় মানবত্বের উপলব্ধি বাংলাদেশেই রামমোহন রায়ের মতো মহামনীষীদের চিত্তে অপূর্ব প্রভাবে অকস্মাৎ আবির্ভূত হল। আচার ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় বন্ধনের মুক্তি বাংলাদেশেই সর্বপ্রথম উদ্যত হয়ে উঠেছিল, অতি অল্পকালের মধ্যে চলৎশক্তিমতী হয়ে উঠল বাংলা ভাষা, তার আড়ষ্টতা ঘুচে গেল নবযৌবন সঞ্চারে, সাহিত্য দেখা দিতে লাগল অভূতপূর্ব সফলতার আশা বহন করে, পৃথিবীর আদিযুগে যেমন দ্বীপ উঠেছিল সমুদ্রগর্ভ থেকে নব নব প্রাণের অন্নদায়িনী ভূমি আশ্রয় করে।"

বাংলার নবজাগরণের সুতীব্র বৈপ্লবিক গতিবেগের পরিচয় মেলে শিবনাথ শাস্ত্রী রচিত 'রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ' গ্রন্থে। এই গ্রন্থে তিনি লিখেছেন-

"১৮২৫ হইতে ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিংশতি বর্ষকে বঙ্গের নবযুগের জন্মকাল বলিয়া গণ্য করা যাইতে পারে। এই কালের মধ্যে কী রাজনীতি, কী সমাজনীতি, কী শিক্ষাবিভাগ, সকল দিকেই নবযুগের প্রবর্তন হইয়াছিল।"

অবশ্য ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বাংলার নবজাগরণ বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ১৮০১-১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নবজাগরণের প্রাণচাঞ্চল্য তীব্র আকার ধারণ করে এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। নবজাগরণের প্রবল গতিবেগ ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের পরে বহু পরিমাণে সংহত হয়। শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয়ের উক্তি যথার্থ যে, কুড়ি বছরের মধ্যে প্রাচীন ও নবীনের সংঘর্ষণ ও ঘোর সামাজিক বিপ্লবের সূচনা ঘটে। এই সময়ের মধ্যে রামমোহন, ডিরোজিও ও ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী, বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, কালীপ্রসন্ন সিংহ, প্যারীচাঁদ মিত্র এবং আরও অনেকে ধর্মসংস্কার, সমাজসংস্কার, শিক্ষাসংস্কার, রাজনীতি প্রভৃতি বিষয়ে প্রবল আন্দোলন সৃষ্টি করেন। ইতালির নবজাগরণ অপেক্ষা তা ছিল আরও তীব্র ও বৈপ্লবিক। পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইউরোপের রেনেসাঁসের পর বাংলায় নবজাগরণ ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দীতে। প্রায় চারশো বছরের ব্যবধানে ইউরোপে সভ্যতার বিপুল অগ্রগতি ও বিকাশ ঘটেছে। ইউরোপের চিত্তদূত হিসেবে ভারতে আসে ইংরেজ। ইংরেজ শাসনকে কেন্দ্র করে পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষার সান্নিধ্যে বাংলার নবজাগরণ ইতালির নবজাগরণ থেকেও অধিক ক্রিয়াশীল ছিল-স্যার যদুনাথ সরকারের এই মন্তব্য অত্যুক্তি নয়। বাংলার নবজাগরণের অন্যতম ফসল বাংলা সাহিত্যের দ্রুত বিকাশ। কাব্য, নাটক, কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধ-সাহিত্যের সব শাখাকেই নবজাগরণ নব নব উন্মেষশালিতায় সমৃদ্ধ করে তোলে। সবদিক থেকে বিচারে নবজাগরণ ছিল বিপুল আলোড়নের যুগ। প্রাচীন ও নবীনের, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভাবসংঘাতের সমুদ্রমন্থনে অজাগর গরজে সমুদ্রতরঙ্গ উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। আর সেই মন্থনে লক্ষ্মীদেবী সুধাভাণ্ড হাতে নিয়ে আবির্ভূত হন। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির সান্নিধ্যে দীর্ঘ অর্ধ-শতাব্দীব্যাপী প্রাচ্য সংস্কৃতির পুনর্জন্ম, বিবর্তন ও বিকাশ চলছিল।

নবজাগরণ বাংলাদেশে কেবল পাশ্চাত্যের অনুকরণ ছিল না। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সান্নিধ্যে বাঙালির মানসমুক্তি ঘটে এবং ভাবসংঘাতের ফলে তার বিপুল আলোড়ন-বিক্ষোভ চলে দীর্ঘকাল। শেষে পাশ্চাত্যকে প্রাচ্য ভাবে ভাবিত করেই ভাব সংস্থিতি ঘটে।

২. বাংলার সমাজ জীবনে নবজাগরণের প্রভাব

বাংলার নবজাগরণের মূলগত আদর্শ ছিল যুক্তি, বুদ্ধি, সাম্য, মৈত্রী ও মানবতা। মানবতা বলতে নারী ও পুরুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধের উজ্জীবন, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা ও ঐহিক কল্যাণ। নারী ও পুরুষ আপাতদৃষ্টিতে একটু ভিন্ন প্রকৃতির হলেও উভয়েই রক্তমাংসের সত্তা-হৃদয়, মন ও বুদ্ধির সম-অধিকারী। তাঁদের প্রাণ-মন-আত্মার স্বাভাবিক ধর্ম, মনঃপ্রবৃত্তির সুষ্ঠুভাবে বিকাশ ও চরিতার্থতার নামই মানবতা। সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা ও ব্যক্তির বিকাশ উভয়েরই কাম্য। পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষার সান্নিধ্যে এসে ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের নেতারা উপলব্ধি করেন যে, দেশের সামন্ততান্ত্রিক অচলায়তন দেশের অবনতির মূল কারণ। মূঢ়তা ও সংস্কারাচ্ছন্নতায় এবং নারীপুরুষের বৈষম্য ও নানাপ্রকার ভেদাভেদে দেশের প্রাণশক্তি অচল অসাড়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-

'যে নদী হারায়ে স্রোত, চলিতে না পারে, অজস্র শৈবাল দাম বাঁধে আসি তারে。
যে জাতি জীবনহারা অচল অসাড়,
পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।'

সতীদাহ নামে প্রাণঘাতী নিষ্ঠুর প্রথা বহু আগে থেকে সমাজে প্রচলিত ছিল। এই প্রথা অনুসারে হিন্দুসমাজে মৃত স্বামীর সঙ্গে চিতায় বিধবা পত্নীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হত। লোকের অন্ধবিশ্বাস ছিল যে, এতে পরলোকে সতী নারী স্বামীর সাহচর্য পাবে। সম্রাট আকবর এই প্রথার বিরোধী ছিলেন। জাহাঙ্গীর সহমরণের বিরুদ্ধে রাজবিধি তৈরি করেন। কিন্তু কিছু ফল হয়নি। এ স্থলে মনে রাখা দরকার যে, মুসলিম প্রশাসনের অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার শৈথিল্যে নীতিভ্রষ্ট ব্যক্তিরা কুমারী নারীদের উপর অত্যাচার করত। বোধ হয় সেজন্য স্মার্ত রঘুনন্দন সতীদাহ সমর্থন করেন। তারপর উচ্চবর্ণের মধ্যে সতীদাহ প্রবল হয়ে ওঠে।

লর্ড মিন্টো ১৮১৩ সালে এক সার্কুলারে ঘোষণা করেন যে, বলপ্রয়োগে কোনো অনিচ্ছুক নারীকে সহমৃতা করা যাবে না। গর্ভবতী নারী ও অভিভাবকহীন শিশুসন্তানের জননীকেও সহমৃতা নিষিদ্ধ করা হয়। কোনো সতীদাহের ঘটনায় নিকটবর্তী পুলিশ ফাঁড়িতে শীঘ্র সংবাদ জানাতে বলা হয়। ১৮১৭ সালের সেপ্টেম্বরে সহমরণকে নরহত্যার পর্যায়ভুক্ত করে শান্তির নির্দেশ দেওয়া নখ। তা সত্ত্বেও সতীদাহ নিবারণে ধুরন্ধর সমাজপতিরা নিরস্ত থাকেননি।

সমাজদেহ থেকে সতীদাহ সম্পূর্ণ নির্মূল করার জন্য নবজাগরণ যুগের শিক্ষিত সম্প্রদায় বিশেষভাবে সক্রিয় ভূমিকা নেন। রাজা রামমোহন রায় ও দ্বারকানাথ ঠাকুর নেতৃত্ব দেন। রামমোহনের বড়োদাদার স্ত্রী সহমৃতা হন। রামমোহন তখন রংপুরে। রামমোহন এই ঘটনার সতীদাহ নিবারণকল্পে বিশেষ উৎসাহী ও উদ্যোগী হয়ে প্রবল আন্দোলন চালান। রামমোহন সমাজ-সংস্কারের কাজে পথিকৃৎ ছিলেন। হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথার কুফল সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। সমাজ-সংস্কারক হিসেবে প্রথমেই হিন্দু নারীদের দুরবস্থার ওপর তাঁর দৃষ্টি পড়েছিল। নারী আন্দোলনের তিনি পথপ্রদর্শক। তিনি সর্বাধিক কুৎসিত লোকাচার সতীদাহকে ধিক্কার জানিয়ে আন্দোলনে অগ্রণী হন।

সতীদাহ নিবারণের জন্য ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে নভেম্বর মাসে সহমরণ বিষয়ে 'প্রবর্তক নিবর্তকের সংবাদ' এবং ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে 'সহমরণ বিষয়ে প্রবর্তক নিবর্তকের দ্বিতীয় সংবাদ' রচনায় প্রমাণ করেন যে, স্মৃতিশাস্ত্রে বিধবাদের সংযমী জীবনযাপনের কথা বলা হয়েছে। সহমরণের কোনো প্রস্তাব নেই। মানবতাবোধ ও শাস্ত্রমতে সতীদাহ নিন্দনীয়। এ কাজ নরহত্যা ছাড়া আর কিছু নয়। ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে 'সংবাদ কৌমুদী' পত্রিকার মাধ্যমে সতীদাহ নিবারণের সপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে প্রয়াসী হন। এই বর্বর প্রথা অবসানের জন্য তিনি মানুষের বুদ্ধি, কাণ্ডজ্ঞান ও মানবতার কাছে আবেদন করেন। এ ব্যাপারে সরকারের কাছেও বহু আবেদনপত্র পাঠান। রামমোহনের আন্দোলনের বিরুদ্ধে রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে রক্ষণশীল হিন্দুদের প্রতিবাদও সমান্তরালে প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা ডিসেম্বর ১৭ নং রেগুলেশন দ্বারা লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সতীদাহ নিষিদ্ধ করেন। সতীদাহ নিবারণে রামমোহনের সংগ্রাম সেকালের বিচারে এক গুরুত্বপূর্ণ, সাহসিক, ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এবং নারীসমাজের পক্ষে খুবই কল্যাণকর। এছাড়া রামমোহন স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার, অসবর্ণ বিবাহ, বিধবাবিবাহ প্রভৃতির পক্ষে এবং জাতিভেদ, বাল্যবিবাহ, কৌলীন্যপ্রথা ও পুরুষের বহু বিবাহের বিপক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি হিন্দু আইন সংশোধন করে নারীদের পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভের জন্যও ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে একটি পুস্তিকা রচনা করে বলিষ্ঠ মন্তব্য রাখেন। গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন, কন্যাসন্তানের হত্যা প্রভৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। বেন্টিঙ্ক গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন নিষিদ্ধ করেন।

রামমোহনের অনুগামী হিন্দু কলেজের অধ্যাপক ডিরোজিওর শিষ্যবৃন্দ গুরুর অনুপ্রেরণায় হিন্দু সমাজের রক্ষণশীলতা, গতানুগতিকতা, বর্বর কুপ্রথা, পৌত্তলিকতা, জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক ব্যবহার, নারী নির্যাতন, দাসপ্রথা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ এবং সমাজের আরও বহু কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ইয়ং বেঙ্গল দেখিয়ে দেয় কতকগুলি অসার পচনশীল প্রথাকে আঁকড়ে ধরে হিন্দু সমাজ অবক্ষয়ের অতলে তলিয়ে যেতে বসেছে। তবে তারা স্বাধীন চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিচর্চার নামে মদ্যপান, গোমাংস ভক্ষণ ও পৈতে ছিড়ে ফেলা প্রভৃতি উচ্ছৃঙ্খলতাকে বহুস্থলে প্রশ্রয় দেন। ইয়ং বেঙ্গলের অন্যতম নেতা রাধানাথ শিকদারের ভ্রান্ত ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, 'গোমাংস' না খেলে জাতির মঙ্গল নেই। অধিক গোমাংস খেয়ে চর্মরোগে তাঁর মৃত্যু হয়। সে যা হোক, ডিরোজিও এবং তাঁর শিষ্যবৃন্দ সমাজ থেকে অন্ধ আচার-অনুষ্ঠান, কুপ্রথা, কুসংস্কার ও অজ্ঞানতা দূর করার জন্য বদ্ধপরিকর ছিলেন। স্বাধীন যুক্তি ও চিন্তাবহির্ভূত কোনো জিনিসকে তাঁরা ব্যবহারযোগ্য মনে করেননি। তবে গঠনকর্ম অপেক্ষা ধ্বংসসাধনের দিকে তাঁদের সর্বশক্তি নিয়োজিত হয়েছিল। ত্রুটি সত্ত্বেও একথা স্বীকার্য যে, ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর কার্যকলাপের মাধ্যমে জাতির জড়তা দূর হয়ে মুক্ত জীবনাদর্শ বিস্তৃতির পথ অনেকটা প্রশস্ত হয়ে যায়। নানা আচার ও কুসংস্কারগ্রস্ত সমাজে তাঁরা ছিলেন বন্ধনহীন চঞ্চল উদ্দাম জীবনের উপাসক। ঐতিহাসিক দিক থেকে এর গুরুত্ব অবশ্য স্বীকার্য।

কলকাতায় এ সময় মদ্যপান, বেশ্যাসক্তি, লাম্পট্য প্রভৃতি ব্যভিচার অনাচারের স্রোত বাবু-সমাজে প্রবল ছিল। অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এই দোষে নৈতিক অধঃপতনে কলঙ্কিত ছিল। ১৮৬৪ সালে প্যারীচরণ সরকার কলকাতায় সুরাপান নিবারণের জন্য একটি সমিতি গঠন করেন। রাজনারায়ণ বসু মেদিনীপুরে সুরাপান নিবারণী সভা স্থাপন করেন। রাধাকান্ত দেব, ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও বিদ্যাসাগর মদ্যপানের অত্যন্ত বিরোধী ছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অক্ষয়কুমার দত্ত পরিমিত সুরাপান করতেন।

ইয়ং বেঙ্গলের 'মদ খাওয়া ও খানা খাওয়া' ছাড়া আর একটি ঘটনা হিন্দুসমাজে প্রবল আন্দোলন তোলে-'গেল গেল হিন্দুয়ানি'। সেটি 'কালীপ্রসাদী হেঙ্গাম' নামে সুপরিচিত। হাটখোলার কালীপ্রসাদ দত্ত 'বিবি আনার' নামক এক পরমাসুন্দরী মুসলিম মহিলাকে উপপত্নী রাখেন। তিনি জাত্যন্তরিত হলে তাঁর সমর্থকরা তাঁকে জাতিতে তোলে। কালীপ্রসাদী হেঙ্গাম ও ইয়ং বেঙ্গলের কার্যকলাপ জাতপাতের বন্ধন শিথিল করে সমাজে পরিবর্তনের ঢেউ তোলে।

ব্রাহ্মসমাজ বিশেষ করে কেশবচন্দ্র সেন সমাজ-সংস্কারে বিশেষভাবে ব্রতী হন। তিনি নব্য ব্রাহ্মদের সহায়তায় পুরুষের বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ ও জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন চালান। কেশবচন্দ্র সেন সর্বভারতীয় সমাজ-সংস্কারক হিসেবে পরিচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে ব্রাহ্মত্ম-সমাজ অসবর্ণ বিবাহ, বিধবাবিবাহ, স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার, সমাজসেবা, পর্দাপ্রথা বর্জন প্রভৃতি বিভিন্ন সমাজসংস্কারমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করে। ১৮৭২ সালে ভারতীয় বিবাহ আইন পাশ হয়। অসবর্ণ বিবাহ আইনসিদ্ধ হয়। বিবাহে পাত্রপাত্রীর বয়স যথাক্রমে আঠারো ও ষোলো বছর আবশ্যিক হয়। বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হয়। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ বৈধ ঘোষিত হয়। পৌত্তলিকতা ও জাতিভেদ ত্যাগ করা হয়। কেশবচন্দ্র 'সুলভ সমাচার' নামে সুলভ মূল্যের পত্রিকা বের করে সমাজ-সংস্কারের আদর্শ সর্বসাধারণের মধ্যে প্রচার করেন। 'মদ না গরল' এক পয়সা দামের পত্রিকার দ্বারা শ্রমিকদের মধ্যে সুরাপান বন্ধের প্রচার চালান। ব্রাহ্মসমাজের আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এদের সমাজ-সংস্কারের ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে হিন্দুসমাজ বহুলাংশে রক্ষণশীলতা ও গোঁড়ামি পরিত্যাগ করে। ব্রাহ্মসমাজের নারীমুক্তির আদর্শ হিন্দুনারীদের প্রভাবিত করে।

১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে এক রেগুলেশনে দাসপ্রথা ও দাসের ক্রয়বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়। চৈত্র মাসে গাজন ও চড়ক পুজো উপলক্ষে ভক্তদের বড়শি বিঁধিয়ে বাঁশে বেঁধে অমানবিক ঘোরানো প্রথা ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে নিষিদ্ধ করা হয়।

রামমোহনের আন্দোলনে সতীদাহ আইনে নিষিদ্ধ হয়। বিধবা নারীরা স্বামীর চিতায় জীবন্ত দগ্ধ হওয়া থেকে নিষ্কৃতি পেল। কিন্তু বিধবাদের সমস্যা জটিল হয়ে উঠল সমাজে। নারীকে স্বভাবধর্মের চরিতার্থতা এবং সুষ্ঠু ও সুস্থভাবে জীবন উপভোগ থেকে ভিন্ন ধরনের লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হল। বিধবাদের আহারে বিধিনিষেধ কড়া করা হল। বারব্রত করে শুদ্ধাচারী জীবন কাটাতে বাধ্য করা হল। এর মধ্যে নিষ্ঠুর নিরম্বু অনাহারের একাদশী পালন অন্যতম। আর গোপনে তথাকথিত সম্ভ্রান্ত প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিরা বিধবা যুবতীদের সঙ্গে অবৈধ ক্রিয়াকলাপে লিপ্ত হল। সমাজের অভ্যন্ততে চলল নানা অনাচার ও ভ্রুণ হত্যা হত্যাদি পাপক্রিয়া। বিধবা নারীকে সমাজপতিরা দেবীর আসনে বসিয়ে তাদের হৃদয়কে বিশুষ্ক করে তুলল। প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষ বিদ্যাসাগর তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করে বিধবা নারীদের মুক্তি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বিধবা-বিবাহ সমাজে চালু করার জন্য তিনি দিন বদলের পালায় বৈপ্লবিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন।