Breaking

Friday, June 19, 2026

দুই. রামপ্রসাদ

দুই. রামপ্রসাদ



১. সাধারণ আলোচনা

বাংলাদেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর তৃতীয়পাদে মুসলিম কুশাসনে নানা ভেদাভেদে, রাষ্ট্রিক অত্যাচার, অবিচার ও নির্যাতনে, অভিজাতদের ভোগবিলাসে, ব্যভিচারে, সর্বোপরি বন্যা, মহামারি, দস্যু, তস্কর, ঠগি ও বর্গি হানাদারদের উৎপীড়নে সমাজের সাধারণ মানুষ দারিদ্র্যে আতঙ্কে হতাশায় সাংঘাতিকভাবে বিপর্যস্ত। সমগ্র জাতীয় জীবন তখন আত্মপ্রত্যয়হীন, সংকট ও নৈরাশ্যে মুহ্যমান। সাহিত্য সংস্কৃতিতে জাতির সেই হতাশাক্লিষ্ট পরিচয় সুপরিস্ফুট।

সাহিত্য সংস্কৃতিতে সে সময় জাতির সেই হতাশাক্লিষ্ট পরিচয় তথা পুরাতন ধর্মীয় প্রথা ও অনুশাসনেরই অনুবৃত্তি ঘটেছে। অবশ্য জাতীয় জীবনের এই অধোগতির দিনে বড়ো কবি ও সাধকরা তিমিরহননের বাণী রচনা করেন। তাঁরা জাতিকে জড়তাতামস হতাশা থেকে উত্তরণের জন্য আত্মিক বল, আশ্বাস ও নির্ভরতার ভাবলোক সৃষ্টি করেন। সমকালীন শাক্ত পদাবলি ও বাউলগানে রয়েছে জীবনচর্যার গভীর আশ্বাস ও উন্নত আদর্শের শক্তিমন্ত্র। তাই অষ্টদশ শতাব্দীর শেষার্ধে রচিত শাক্ত পদাবলি ও বাউলগান সমসাময়িক গতানুগতিক সাহিত্যের মধ্যে লক্ষণীয় স্বাতন্ত্র্যে দেদীপ্যমান। আমাদের পাঠ্য শাক্তপদাবলির কবি রামপ্রসাদ।

২. শাক্ত পদাবলির সামাজিক পটভূমি

মধ্যযুগে আখ্যাত কাব্যের পর রচিত হয়েছে শাক্ত পদাবলি। কাব্যোৎকর্ষের দিক থেকে বৈশ্বব সাহিত্যের পরে শাক্ত পদাবলির স্থান।

ভূমিকা শাক্ত কবিরা মাতৃভাবের উপাসক-তাদের পুজোর নাম শক্তিপুজো। শক্তি বলতে শিবের শক্তি অর্থাৎ শিবগৃহিণী দুর্গা। তিনি কখনও চণ্ডী, উমা ও কখনও কালী। বাংলাদেশ প্রাচীনকাল থেকেই তন্ত্রপ্রধান মাতৃকাপুজোর পীঠস্থান। শ্যামা বা কালী আমাদের প্রাচীন দেবতা। তন্ত্রে যে কালীদেবীর আরাধনা করা হয়েছে, তিনি শ্মশানচারিণী, নরকঙ্কালশোভিতা, নৃমুণ্ডমালিনী ও রক্তাপ্লুতা। বৈখুব কবিদের ভক্তিভাবের সংস্পর্শে অষ্টাদা শতকের কবিরা এই শক্তিদেবীকে কোমলে কঠোরে রূপায়িত করলেন। কালী লেলিহজিহ্বা, খণ্ডাখর্পরধারিণী, আবার বরাভয়রূপিণী কল্যাণাত্মিকা বরদাত্রী। কালীকে বাঙালি কবিরা মনের মতো করে গড়ে তুললেন। সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়কারিণী দেবী হয়ে উঠলেন আমাদের মা ও কন্যা।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে মোগল শাসকের ভিত্তি একেবারে শিথিল-জীর্ণদশাপ্রাপ্ত। বিলাসভোগে মত্ত উচ্ছৃঙ্খল নবাবের কুশাসনের ফলে দেশব্যাপী অরাজকতা। দরিদ্র মানুষ কর দিতে না পারলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়- কারাগারের যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। সমসাময়িক সমাজ কেন্দ্রীয় শাসকের দুর্বলতার সুযোগে দেশের ভূস্বামীগণ সাধারণ মানুষের উপর অবিচার, অত্যাচার ও পীড়নের অবাধ কার্য চালিয়ে যাচ্ছে। আর শাসকশ্রেণি ও অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষমতালাভের জন্য হীন ষড়যন্ত্র, হিংসা ও দলাদলির বেপরোয়া কাণ্ড চলছে। সমাজজীবনে বামাচারী তান্ত্রিক ব্যভিচারের বাহা আড়ম্বরপূর্ণ উপাসনা বলিদানপ্রথা-সব মিলিয়ে 'ধর্মস্য গ্লানি' ব্যাপক। তারপর বাংলাদেশে দারুণ বিপর্যয় দেখা দিল বর্গির আক্রমণে। এই আক্রমণে নবাব, রাজা, জমিদার, গ্রামবাসী কেউই নিস্তার পায়নি। তদুপরি ছিল মগ ও বিদেশি পর্তুগিজ জলদস্যুদের নৃশংস অত্যাচার। বৈদেশিক শক্তির অত্যাচারে বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল একেবারে শ্মশানভূমিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

বাংলাদেশের ঘরে ঘরে তখন হা-অন্ন, হা-অন্ন চিৎকার। অভাবে অনটনে, রোগে-শোকে মুহ্যমান হয়ে মৃতকল্প, জীবনযাপন করছে সাধারণ বাঙালি। নৈতিক অধঃপতনে সমাজজীবন নির্বাপিত প্রায়। শাক্ত পদাবলিতে সমাজজীবন তার সমস্ত কুরতা, বঞ্চনা, অত্যাচার, উৎ পীড়ন, অভাব-অনটনের বোঝা নিয়ে প্রকটিত হয়ে উঠেছে। এখানে আমরা ডিক্রি, ডিসমিস, কৃষিকাজ, তহবিল তছরূপ, হিসাবখাতা প্রভৃতি বৈষয়িক জীবনের নানা প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হতে দেখি। বহুবিবাহ, বিড়ম্বিত পরিবারের বিমাতার স্নেহহীনতা ও বিমাতৃশাসিত পিতার ঔদাসীন্যেরও খবর পাই। এই ঘোর তমসাঘন দারুণ দুর্দিনের মহাসংকটে শাক্তকবিরা অনন্ত-শক্তিময়ী 'কালভয় হারিণী' বরাভয়দাত্রী জগজ্জননীর শক্তিমন্ত্র উচ্চারণ করলেন। শাক্ত পদাবলিতে কবিরা বাস্তবজীবনের দুর্যোগ, দুঃখদৈন্য, হতাশা ও অবক্ষয়ের বিপরীত এক উজ্জ্বল আধ্যাত্মিক সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেছেন। কবিরা সর্বব্যাপী অবক্ষয় থেকে উত্তরণের সংগীত গাইলেন। জানালেন মাতৃচরণে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণই দুঃখজয়ের শ্রেষ্ঠ উপায়। কালী হলেন কল্যাণবতী বরাভয়দাত্রী মা।

শাক্ত পদাবলির একটি বিশিষ্ট দিক আগমনী ও বিজয়া শীর্ষক গার্হস্থ্য সংগীতগুলি। এর মধ্যে তৎকালীন সমাজজীবনের নিষ্ঠুর এক প্রথার প্রতিফলন ঘটেছে। প্রতিদিনব্যাপী দুর্গোৎসবের সঙ্গে অল্পবয়স্ক বিবাহিত বাঙালি কন্যার তিনদিনের জন্য পিতৃগৃহে আগমনের ব্যাপারটি এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

কৌলীন্যপ্রথা অষ্টাদশ শতকে কৌলীন্য প্রথাদুষ্ট নারীর বাল্যবিবাহ, অসমবিবাহ এবং পুরুষের বহুবিবাহের প্রচলন ছিল বাংলাদেশে। অষ্টমবর্ষীরা কন্যাকে গৌরীদানপ্রধার মধ্যে পড়ে বর্ণহিন্দুর নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের দুর্দশার মধ্যে শোচনীয় জীবনযাপন করতে হত। এই প্রথা বা নিয়মসংস্কার খুবই কঠোর ও নির্মম ছিল।

বিত্তহীন পিতামাতার পক্ষে উপযুক্ত পাত্রের হাতে কন্যা সম্প্রদান করা সম্ভবপর হত না। আট নয় বছরের কন্যাকে বাঙালি পিতামাতা বাধ্য হয়ে অপাত্র অর্থাৎ প্রৌঢ়, বৃদ্ধ ও কপর্দকবিহীন দারিদ্র্যগ্রস্ত ব্যক্তির হাতে সঁপে দিতে বাধ্য হতেন। সোনার পুতলি কন্যাকে বৃদ্ধ ঘরে সতিনের সঙ্গে ঘর সংসার করতে হত। এইরূপ অল্পবয়স্ক কন্যাকে সম্বল সংগতিহীন বৃদ্ধ পাত্রের হাতে ছেড়ে দিয়ে মন্দভাগ্য মাতা নীরবে অশ্রুপাত করতেন। দারুণ উৎকণ্ঠা ও মনোবেদনায় তার দিন কাটত। নিয়ম ছিল বৎসরান্তে দুর্গাপুজোর সময় তিনি দিনের জন্য বাপের বাড়িতে কন্যাকে নিয়ে আসতে হবে। সারাবছর কন্যার জন্য মায়ের ব্যাকুল প্রতীক্ষা ও ব্যথাকাতর মনোভাবটি উচ্ছলিত হয়ে উঠেছে 'আগমনি' ও 'বিজয়া' শীর্ষক সংগীত। এই অংশে বাঙালি পরিবারের জীবনের একটি অন্তরঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়। কবিদের কল্পনায় মেনকা হয়েছেন বাৎসল্যময়ী গৃহজননী, মহেশ্বর জামাতা ও জগজ্জননী উমা ঘরের মেয়ে。

নেশাখোর কপর্দকহীন শ্মশানবিহারী কৃদ্ধ শিবের সঙ্গে উমার বিয়ে দিয়ে মা মেনকার উৎ কণ্ঠা ব্যাকুলতা ও দুশ্চিন্তার শেষ নেই। কেঁদে স্বামীকে বলেন-

যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী উমা বুঝি আমার কেঁদেছে。
উমার যতেক বসনভূষণ ভোলা সব বুঝি বেচে খেয়েছে।

উপসংহার শাক্ত পদাবলিতে আমরা দেখি ভিখিরি শিবের সঙ্গে উমার বিয়ে হয়েছে। সতিনের সঙ্গে উমা ঘর করে। মাঝে মাঝে উমাকে স্বপ্নে দেখে দারুণ উৎকণ্ঠায় অধীর হয়ে উঠেন মেনকা। দেখতে দেখতে শারদীয়া সপ্তমী তিথি সমাগত হয়। পুরবাসীর মুখে কন্যার আগমনবার্তা শুনতে পান, দুচোখে আনন্দের বান ডেকে যায়। সপ্তমী তিথিতে মিলনের রাগিণী বেজে ওঠে-তিন দিন মা ও মেয়ের মিলনে বেশ আনন্দে কাটে। নবমীর রাতে জননীর অন্তর বিচ্ছেদ বেদনায় ভারাক্রান্ত যায়। নবমীনিশি পোহালে কন্যাকে বিদায় দিতে হবে। মায়ের প্রাণ দুঃসহ বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। মায়ের ব্যাকুল প্রার্থনা- 'ওরে নবমী নিশি না হইওরে অবসান।' নবমী নিশির অবসান ঘটে-আসে রাক্ষসী বিজয়া। উমা স্বামীগৃহে চলে যায়। পুনরায় মেনকার হৃদয় বেদনায় ভরে যায়। তাই শাস্ত পদাবলির বিজয়া গান বৈশ্বব কবির অশ্রুগ গম্ভীর মাথুর সংগীতের মতো। অষ্টাদশ শতাব্দীতে যত বাঙালি মেনকা কন্যার জন্য কেঁদে কেঁদে চোখের জলে গৃহের প্রাঙ্গণ ভাসিয়ে দিয়েছেন-তাদের অশ্রুর প্রবাহে রসসিক্ত এই 'আগমনি' ও 'বিজয়া'র গানগুলি।

৩. রামপ্রসাদ সেন:

আত্মপরিচয় শাক্ত পদাবলির আদি ও শ্রেষ্ঠ কবি রামপ্রসাদ সেন। অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে আনুমানিক ১৭২০-২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি চব্বিশ পরগনার হালিশহরের কুমারহট্ট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে তিনি দেহত্যাগ করেন। রামপ্রসাদের পূর্বপুরুষ খুব প্রতিষ্ঠাসম্পন্ন ছিলেন। পরে তাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। কবি তাঁর পিতার দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান। রামপ্রসাদ দুই পুত্র ও দুই কন্যার জনক।

কাব্য-বৈশিষ্ট্য কবি কালীমায়ের ভক্ত ছিলেন। কলকাতার এক ধনী জমিদারের সেরেস্তায় মহুরিগিরি করায় সময় খাতায়- 'আমায় দে মা তবিলদারী, আমি নেমকহারাম নই মা শঙ্করী'- গানটি লিখে বিত্তমান প্রভুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জমিদার এতে খুবই সন্তুষ্ট হয়ে কবিকে তাঁর সাধনার পথে ব্যাপৃত থাকার জন্য মাসিক বৃত্তির অবস্থা করে দেন। গুণগ্রাহী রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও আরও কয়েকজন ভূস্বামী নির্লোভ কবিকে জমিজমা ও বৃত্তি দিয়ে তাঁর সাধনা ও কাব্যচর্চার সুযোগ করে দেন। কাব্য-বৈশিষ্ট্য রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে সভাসদ্রুপে পেতে চেয়েছিলেন। কবি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তবুও তিনি রামপ্রসাদকে 'কবিরঞ্জন' উপাধিতে ভূষিত করেন। এতেই প্রমাণিত হয় কবির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা কত গভীর ছিল। রামপ্রসাদ 'বিদ্যাসুন্দর' ও 'কৃষ্ণকীর্তন' প্রভৃতি কাব্য লিখেছিলেন, কিন্তু তাঁর অসামান্য সাহিত্যকীর্তি ভক্তিরসোজ্জ্বল শ্যামাসংগীতগুলি।

রামপ্রসাদের শ্যামাসংগীতের সংখ্যা প্রায় তিন শতাধিক। গানগুলির মধ্যে আগমনি ও বিজয়া, শ্যামাজননীর বিরাটত্বের স্বরূপ, নানাধরনের নীতিকথা ও তন্ত্রসাধনার প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। সাধন-বিষয়ক পদে নানা উপমা রূপকের সাহায্যে সাধনভজনের কথা অভিবাস্ত। সহজ ভাষায়, সরল সুরে ও চলিতভাষার ছন্দে এবং প্রাণঢালা আবেগে গানগুলি অতুলনীয়। রামপ্রসাদ তাঁর সংগীতগুলিতে মানুষের শান্তি, স্বস্তি ও নির্ভরতার এক আশ্চর্য জগৎ গড়ে তুলেছেন।

রামপ্রসাদ ভক্ত ও সাধক ছিলেন বলে মহাশক্তিরূপিণী আরাধ্য কালীমায়ের সঙ্গে তাঁর মাতাপুত্রের আন্তরিক ভক্তি ও সহজ স্নেহ ভালোবাসা ও মান অভিমানের মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বিশ্বজননীকে তিনি ঘরের মায়ের আসনে বসিয়ে মৃৎপ্রদীপ জ্বালিয়ে ভক্তি-অর্ঘ্য নিবেদন করেছেন। রামপ্রসাদী সংগীতে শিশুসুলভ আবদার অভিযোগ ও তিরস্কারের বিচিত্রভাব ব্যঞ্চিত হয়ে উঠেছে।

ধর্মীয় উদারতা রমাপ্রসাদের গানের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। রামপ্রসাদের শ্যামা মা ব্রহ্মময়ী সর্বঘটে। তিনি সাম্প্রদায়িক ধর্মবিদ্বেষের মূলে কুঠারাঘাত করে শাস্ত্রীয় পুজো ও পুজোর উপকরণের তুচ্ছতার দিকটি সহজ ভাষায় সকলের কাছে তুলে ধরলেন। বাহ্য আড়ম্বর-সর্বস্ব পুজোপদ্ধতির অন্তঃসারশূন্যতা ও ভক্তিভাবের গভীরতা তাঁর গানে অনবদ্য ভাষায় প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে। রামপ্রসাদ বললেন, শ্রেষ্ঠ পুজোয় জাঁকজমকের অহংকার নয় অন্তরের ভক্তিই আসল নির্মাল্য, ষড়রিপুগুলিই বলিদানের বস্তু।-

তুমি, লুকিয়ে তাকে করবে পূজা জানবে নারে জগজ্জনে。
তুমি মনোময় প্রতিমা গড়ি বসাও হৃদি পদ্মাসনে।।
তুমি ভক্তি সুধা খাইয়ে তারে তৃপ্তি কর আপন মনে।। তুমি মনোময় মাণিক্য জ্বেলে দাও না জ্বলুক রাত্রি দিনে。
তুমি জয় কালী বলে দাও করতালি, বলি দাও যড় রিপুগণে।

কালীমায়ের বন্দনার প্রসঙ্গে অনেক নীতিকথাও প্রচার করেছেন রামপ্রসাদ। যেমন-

১. ডুব দেরে মন কালী বলে, হৃদি রত্নাকরের অগাধ জ্বলে。
কামাদি ছয় রিপু আছে আহার লোভে সদাই চলে。
তুমি বিবেক হলদী গায়ে মেখে নাও-ছোঁবে চিহ্নিত তার গন্ধ পেলে।

২. যদি মোহ গর্তে টেনে নেয়/ধৈর্য খোঁটা ধরে রাখ。

রামপ্রসাদ সারা জীবনে অনেক দুঃখ পেয়েছিলেন- 'মিঠার লোভে তিত মুখে সারা দিনটা গেল।' কিন্তু দুঃখকে তিনি আমল দেননি। নীলকণ্ঠের মতো বিষ পান করে তিনি অমৃতের সাধনা করে গেছেন- 'দেখ সুখ পেয়ে লোক গর্ব করে, আমি করি দুঃখের বড়াই।' তাই জীবনযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত পর্যুদস্ত মানুষের নিকট রামপ্রসাদের গান পরম সান্তনায় আশ্রয়স্থল।

রামপ্রসাদের গানে সমকালীন সমাজের সুখদুঃখ, নিপীড়ন ধর্মান্ধতা ও দরিদ্রের ক্রন্দন ও রূপক উপমা প্রয়োগে বিপুল গ্রাম্যচিত্র ভিড় করে এসেছে। মানব জমিন, কলুর বলদ, ডিক্রিজারি, সংসার বাজার, চাষির চাষ-প্রভৃতি বাগভাষার প্রয়োগে সুখদুঃখে ভরা বাঙালির চারপাশের পরিচিত জীবন ও গ্রাম্য পরিবেশ উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছে। এককথায় আমাদের নিত্যপরিচিত সংসারজীবনের লীলাবৈচিত্র্য থেকেই তাঁর কাব্যের মন্দাকিনী ধারা প্রবাহিত।

বর্ণগন্ধময় এই জগতে ভগবানের লীলারস আস্বাদন করতে করতে রামপ্রসাদ পরম শান্তির কোলে চিরবৈরাগ্য লাভ করতে চেয়েছেন-

'প্রসাদ বলে থাকো বসে ভবার্ণকে ভাসিয়ে ভেলা。
যখন আসবে জোয়ার উড়িয়ে যাবে, ভাঁটিয়ে যাবে ভাঁটার বেলা।।

আগমনি ও বিজয়ার গানেও রামপ্রসাদের কৃতিত্ব সমধিক। মেনকার অন্তর্ভাবনার মধ্যে তিনি চিরকালের বাৎসল্যময়ী কন্যাগতপ্রাণা জননীর স্নেহমূর্তি চিত্রিত করেছেন। মা মেনকা স্বামীকে বলেছেন-

গিরি, এবার উমা এলে আর উমা পাঠাব না。
বলে বলবে লোকে মন্দ, কারো কথা শুনব না।
কালী ও কৃষ্ণের অভিন্নাত্মক কল্পনার মধ্যে নানা ধর্মসমন্বয়কে রামপ্রসাদ সহজ সুরে অসামান্য গুরুত্ব দিয়েছেন। 'কালী হলি মা রাসবিহারী নটবর বেশে বৃন্দাবনে', ও 'মন কর না দ্বেষাদ্বেষি'-প্রভৃতি পদগুলি শাক্ত ও বৈশ্ববধর্মের নিগূঢ় ঐক্য ভাবনা তথা উদার মানবধর্মের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জনজীবনের সুখদুঃখে রামপ্রসাদের পদাবলি রসসিক্ত। তিনি সর্বকালের লোককান্ত কবি।

No comments:

Post a Comment