নব জাগরণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
বাঙালির সমাজে ও সাহিত্যে তার প্রভাব
১. নবজাগরণ ও বাংলা সাহিত্যে নবযুগ
ইউরোপের আধুনিক যুগের ইতিহাসে রেনেসাঁস বা নবজাগরণ অধ্যায়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইতালি ভাষার 'রিনাসিমেনতো' শব্দটি ফরাসি ভাষায় রেনেসাঁস নামে অভিহিত। এর বাংলা প্রতিশব্দ পুনর্জন্ম। কিন্তু ব্যাপকার্থে এটি নবজাগরণ নামে প্রচলিত। জন্মের পর কোনোকিছু স্থির অনড় থাকে না- তার বিবর্তন ও বিকাশ ঘটে। এক ঐতিহাসিক কারণে পঞ্চদশ শতকে ইউরোপের চিত্ত পূর্বের চিরাভ্যস্ত আচার অনুশাসনের বন্ধন থেকে মুক্তিলাভ করে এবং সর্বত্র সেই জন্মান্তরের প্রাণচেতনার বিচিত্রমুখী বিকাশ ঘটে।
ইতিহাসের নতুন ঘটনা কখন কীভাবে আরম্ভ হয় এবং তার গতিপ্রকৃতির স্বরূপ আগে থেকে জানা যায় না। বিশেষ কোনো ঘটনার ঝঞ্ঝাঘাতে মাঝে-মধ্যে ঘড়ির সময়ের কাঁটা বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়। তখন মনে হয় চলমান সভ্যতা বুঝি এবার থমকে দাঁড়াবে। কিন্তু অচিরে বন্ধ কাঁটা দ্বিগুণ বেগে চলতে শুরু করে। তার চলার ছন্দে ছন্দে চারদিকে বিবিধ জ্যোতি বিকীর্ণ হয়।
ইতালির রেনেসাঁস ছিল নগরকেন্দ্রিক। মধ্য ইতালির রোম ও উত্তর ইতালির ফ্লোরেন্স, পিসা, ভেনিস, মিলান, জেনোয়া প্রভৃতি শহরে নবজাগরণ প্রবল ঢেউ তোলে। তবে ইতালির নামকরা শহর আর্নো নদীতীরে ব্যাবসাবাণিজ্যে সমৃদ্ধ প্রজাতান্ত্রিক ফ্লোরেন্স শহরে নবজাগরণের ভাবাবেগ খুবই তীব্র ছিল। বলতে গেলে ফ্লোরেন্স ছিল নবজাগরণের মূল কেন্দ্র। এখানকার অধিবাসীর। ছিল স্বাধীনতাপ্রিয়, শিক্ষানুরাগী ও শিল্পরসিক। দুই বিত্তশালী বণিক কসিমো ও মেডিসি ছিলেন সাহিত্য ও শিল্পের অনুরাগী।
ফ্লোরেন্সে মনীষার দীপাবলি পজ্জ্বলিত হল। সেই আলোকের ঝর্ণাধারায় পরিস্নাত হল ভেনিস, মিলান ও রোমের অন্যান্য নগর। মানবিকবিদ্যার চর্চা শুরু হল। মানুষই সব কিছুর মানদণ্ড এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেল। ইহজীবনকে বুচিসম্মত ও সর্বাঙ্গসুন্দর করে তোলার জন্য সর্বাধিক উদ্যোগ দেখা দিল। নরনারীর প্রেম মিলন বিরহ দুঃখ বেদনা নিয়ে সাহিত্য রচিত হল। মানব-মানবীর বিচিত্র অনুভূতি ও শরী সংস্থান নিয়ে স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রশিল্প গড়ে উঠল। প্রাচীন পুঁথির অনুসন্ধান, গবেষণা ও অনুবাদের কাজ শুরু হল। ছাপাখানা আবিষ্কারে অল্পসময়ে অভিধান, ভাষাতত্ত্ব, রাজনীতি, ভ্রমণ, ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিতা, সংস্কৃতি ও হাস্যরসাত্মক নানা বিষয়ের বই বেরোল। গ্রন্থাগারে গ্রন্থ সংরক্ষিত হল। নবজাগরণের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল ফ্রান্স, ইংলন্ড, স্পেন, পর্তুগাল, ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ড প্রভৃতি ইউরোপের দেশে দেশে। ইতালির দান্তে (১২৬৫-১৩২১), পেত্রার্কা (১৩০৪-১৩৭৪), বোকাচ্চিও (১৩১৩-১৩৭৫), মেকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭), ইংলন্ডের চসার (১৩৪০-১৪০০), ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬), এডমন্ড স্পেন্সার (১৫৫২-১৫৯৯), উইলিয়ম শেক্সপিয়ার (১৫৬৪-১৬১৬), নেদারল্যান্ডের ইরাসমাস (১৪৬৯-১৫৩৬), স্পেনের সার্ভেন্টিস (১৫৪৭-১৬১৬), ফ্রান্সের ফ্রাঙ্কোয়া রেবলো (১৪৯০-১৫৫৩) বিচিত্র বিষয়ের গ্রন্থে মর্ত্যের মানব-মানবীর প্রেম ভালোবাসা, মিলন বিরহের কাহিনি তুলে ধরলেন।
নবজাগরণ স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও শিল্পকলায় যুগান্তর সাধন করল। চার্চের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে শিল্প হয়ে উঠল জীবনমুখী, বাস্তব ও বিচিত্র অনুভূতিতে প্রাণবন্ত। লিওনার্দো দা ভিস্তির (১৪৫২-১৫১৯) মোনালিসা, লাস্টসাপার, পিয়েটা (মেরির কোলে মৃত যিশু); মাইকেল এঞ্জেলোর (১৪৭৫-১৫৬৮) মাতা মেরি, যিশু ও ডেভিড প্রস্তর মূর্তি, চিত্রশিল্প লাস্টজাজমেন্ট এবং রাফায়েলের (১৪৮৩-১৫২০) ম্যাডোনা (মা মেরির কোলে যিশু) বিখ্যাত। বিজ্ঞানে ইংলন্ডের রোজার বেকন (১২১৪-১২৯৪), ফ্রান্সিস বেকন, পোলান্ডের কোপারনিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩), ইতালির গ্যালিলিও (১৫৬৪-১৬৪২) এবং মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারে গুটেনবার্গ (১৪০০-১৪৬৮) উল্লেখযোগ্য। এঁরা প্রাকৃতিক ঘটনাবলি, জাগতিক বিষয়, শারীরিক সংস্থান ও মহাকাশের রহস্য সন্ধানে নানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অনেক অজানা তথ্য আবিষ্কার করে পূর্বের ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দিলেন। এভাবে ইতালির রেনেসাঁস বা নবজাগরণের তরঙ্গোচ্ছ্বাস সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে মানুষকে মধ্যযুগের অন্ধকার থেকে আলোর জগতে পৌঁছে দিল।
পূর্বেই বলা হয়েছে, ইউরোপে নবজাগরণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মানবতাবাদ। ঈশ্বরের মহিমা কীর্তন বা পারলৌকিক জীবন নয়, স্থান পেল সর্বতোভাবে মানুষের পার্থিব জীবন। মানুষের সুখ-দুঃখ, ভয়-ভাবনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সমস্যা, বেদনা, ভালোবাসা ইত্যাদি বিশেষ গুরুত্ব পেল। পূর্বে গ্রিক দার্শনিক পিথাগোরাস বলেছিলেন, মানুষই সব কিছুর মানদণ্ড। সবার উপরে মানষ সত্য তার উপরে নেই। মানুষের অনন্ত শক্তি ও সম্ভাবনা শাছে। চিন্তা, কর্ম, আবিষ্কার ও সৃজনী শক্তিতে ইহজীবনকে বুচিসম্মতভাবে ভোগ করা যায়।
যুক্তি, বুদ্ধি, মানবতা ও বিজ্ঞান চর্চা, অজানাকে জানার আগ্রহ, প্রকৃতির রহস্য উদ্ভাবনায় চিন্তা, বিশ্বের চতুর্দিকে নিজেকে ব্যাপ্ত করে দিয়ে যুক্তি দিয়ে সমস্ত কিছুকে গ্রহণ করার প্রবণতাই হল নবজাগরণ। প্রাচীনকে বর্জন করে নয়, প্রাচীন ও অন্যান্য সব কিছুকে যুক্তি ও মুক্ত মন নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে তার সারবত্তা গ্রহণ করতে হবে। নবজাগরণে যুক্তিবাদী আধুনিক মানুষ অন্ধ-কুসংস্কার ও সংকীর্ণ ধর্মচেতনার আচার, অনুশাসন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলেন। ভাষা, সাহিত্য, ব্যাকরণ, ন্যায়, দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও শিল্পের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হল। মানুষ উপলব্ধি করল, মানুষকে মূল্য দিয়ে মানুষকে ভালোবেসে নিজের অনন্ত শক্তির স্বরূপ জানা যায়। মানুষের চেষ্টায় নতুনভাবে সমাজ গড়া যায় এবং পাহাড় ডিঙিয়ে জঙ্গল পেরিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নতুন দেশ ও সেখানকার মানুষ, অনেক অজানা জীব ও অপরিচিত তবুর পরিচয় পাওয়া যায়। ব্যাবসা-বাণিজ্যে জীবনের সমৃদ্ধি ঘটে। নবজাগরণে মানুষ এভাবে মানবতাবাদী হয়ে উঠল। রেনেসাঁসের প্রভাবে সারা ইউরোপে শুধু সাংস্কৃতিক পুনর্জন্ম নয়, সামগ্রিক ও সর্বাঙ্গীণ জীবনে নতুনত্ব সৃষ্টি হল।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণের স্বরূপ আলোচনার পূর্বে পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইতালির নবজাগরণের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য আলোচনার প্রয়োজন ছিল। কারণ বাংলার নবজাগরণের আলোচনায় ইতালির নবজাগরণের প্রসঙ্গ অনিবার্য। কনস্টান্টিনোপলের পতনের পর গ্রিক-রোমান পন্ডিতদের ইতালি আগমনে নবজাগরণ শুরু হয়। তেমনি পাশ্চাত্য জাতির সান্নিধ্যে এসেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণ শুরু হয়। এই নবজাগরণের সঙ্গে বাংলা তথা ভারতে আধুনিক যুগের শুরু এবং বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার নিবিড় সংযোগ রয়েছে।
নির্দিষ্ট কোনো তারিখ দিনক্ষণ ধরে নবজাগরণের কার্যকলাপ শুরু হয়নি। অনেক আগে থেকে তার প্রস্তুতি চলতে থাকে। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে ব্যাবসা-বাণিজ্যের জন্য ইউরোপীয় বণিকরা ভারতে প্রবেশ করে। তখন থেকে ইউরোপীয় জাতির সান্নিধ্যে ভাবতে পাশ্চাত্য ভাবধারার অনুপ্রবেশ। তারপর প্রতিযোগিতায় ইংরেজ বণিকরা প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
তখন ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। বলতে গেলে মোগল মহিমার শ্মশান-শয্যা রচিত হয়ে গেছে। ভারতের সর্বত্র ব্যাপক অরাজকতা। ঐক্যবদ্ধ মোগল সাম্রাজ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত। এই বিচ্ছিন্নতা ধর্ম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তখন স্বভাবতই দেশের অগ্রগতি বিপর্যস্ত হয়। কোনো দেশের সংস্কৃতি যখন চলৎশক্তিরহিত হয়ে যায়, তখন সে দেশের মানুষের জীবনে নেমে আসে অজ্ঞতার অন্ধকার। অন্ধ কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও বুদ্ধিহীন আচার-সর্বস্বতায় আবদ্ধ হয়ে ভারতীয় জীবন সংকীর্ণ, খণ্ড, ক্ষুদ্র, নির্জীব ও পঙ্গু হয়ে পড়ে। দীর্ঘকাল এই তামসিকতার ছায়াতলে তন্দ্রাচ্ছন্ন জীবনযাপন করার ফলে ভারতীয় মন থেকে বুদ্ধিবৃত্তি বিলুপ্ত হয়ে যায়। মোগল যুগের শেষদিকে ভারতীয় জীবন যখন রুদ্ধ, অগ্রগতিহীন হয়ে পড়েছিল, তখন এদেশে বিশেষত বাংলাদেশে ব্রিটিশ প্রাধান্য স্থাপিত হওয়ায় ক্রমে ক্রমে পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তার হতে থাকে। ফলে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে আমাদের সংস্কৃতির নবমূল্যায়নের চেষ্টা চলে। এই ভাবপরিমণ্ডলকে ইউরোপের নবজাগরণের সঙ্গে তুলনা করে বাংলার নবজাগরণ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ নিয়ে তর্কবিতর্কের অন্ত নেই। অনেকের মতে ইতালির নবজাগরণ এত প্রবল ও সৃষ্টিধর্মী ছিল যে শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, সংগীত প্রভৃতি জ্ঞানবিজ্ঞান সর্বক্ষেত্রে তার ব্যাপক আত্মপ্রকাশ ও বিস্তৃতি ঘটেছিল। তুলনাগত বিচারে আমাদের নবজাগরণ অনেকটা ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত। ভিন্ন মতে, ইতালির নবজাগরণ থেকে আমাদের নব জাগরণের গতিবেগ আরও প্রবল ছিল। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য বিদ্যার অনুশীলনের ফলে ধীরে ধীরে আমাদের জড়ত্ব ও অন্ধতা দূর হতে থাকে। শিক্ষা, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি-জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে ও সর্বস্তরে নবজাগরণের গতিবেগ প্রবল আন্দোলনের ঢেউ তোলে। এর ফলে জাতি তার আপন সংস্কৃতির আদর্শ ও ঐতিহ্যগত চিন্তাচেতনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। এই নবলব্ধ চেতনার আলোকে একটা আত্মবিস্মৃত জাতি তার আত্মশক্তির পরিচয় পেয়ে আত্ম-মর্যাদাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। তখন সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একান্ত উদ্গ্রীব হয়। সাহিত্য ও শিল্প রচনায় তার প্রকাশ ঘটতে থাকে। এই আত্মমর্যাদাবোধই নবযুগের বা নবজাগরণের ভিত্তি।
ঐতিহাসিক দিক থেকে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন ক্লাইভের পলাশির যুদ্ধজয় বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পলাশির যুদ্ধ ভারতের ইতিহাসে এক নবযুগের সূচনা করে। ওই দিনটিতে বাঙালি যে মধ্যযুগীয় তমসাবৃত স্থবির জীবন পরিত্যাগ করে আধুনিক জীবনের সিংহদ্বারে উপনীত হয়। বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ডরূপে দেখা দিল। প্রবল ইংরেজ তার তেজ বিকীর্ণ করল। পোহাল শর্বরী। উদিল রবিচ্ছবি। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের ভাষায়-
পলাশি যুদ্ধের পর বাংলাদেশে প্রায় অর্ধ-শতাব্দীব্যাপী নবজাগরণের প্রস্তুতিপর্ব এবং উনবিংশ শতাব্দীর আরম্ভ থেকে চিন্তার ক্ষেত্রে তার ব্যাপক প্রসার। কলকাতা মাদ্রাসা স্থাপিত হয় ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে। যদিও এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এমন সব লোক তৈরি করা, যারা ইংরেজকে নিজেদের আইন বুঝিয়ে দেবে, তবুও জাতীয় চেতনা জাগাতে এই প্রতিষ্ঠান কম সাহায্য করেনি। দেশের প্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পুরাতত্ত্ব চর্চার উদ্দেশ্যে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত হয় এশিয়াটিক সোসাইটি। সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে। ব্যাপটিস্ট মিশনারি উইলিয়াম কেরী কলকাতায় পদার্পণ করেন ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। যদিও কলেজ সৃষ্টির পিছনে ইংরেজ শাসকের মুখ্য অভিপ্রায় ছিল এদেশের সমস্ত আচার-ব্যবহার, আইনকানুন সম্পূর্ণভাবে জেনে নিয়ে ইংরেজ শাসন কায়েম করা, তবুও এর অন্য শুভফল ঘটেছিল। প্রাচ্য-সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে ওঠে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ।
রেনেসাঁস বা নবজাগরণের কথা বঙ্কিমচন্দ্র 'বিবিধ প্রবন্ধে'র বাঙালির ইতিহাস প্রবন্ধে কবি বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য, রঘুনাথ, গদাধর, রঘুনন্দন প্রভৃতি ধর্মবেত্তা, কবি ও মনীষীদের আবির্ভাবে পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাংলার রেনেসাঁসের কথা বলেছেন-
বঙ্কিমচন্দ্র পঞ্চদশ শতকের বাংলাকে রেনেসাঁসের বাংলা বলেছেন এবং হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বাংলাকে মেডিচির ফ্লোরেন্স নামে অভিহিত করেছেন। কেশবচন্দ্র সেন 'নবজাগরিত' শব্দ ব্যবহার করেছেন। বিপিনচন্দ্র পাল তাঁর 'নবযুগের বাংলা' গ্রন্থে ইতালি ও বাংলার রেনেসাঁসের আলোচনা প্রসঙ্গে রাজা রামমোহন রায়কে পুরোধা বলেছেন। পরবর্তীকালে স্যার যদুনাথ সরকার, অন্নদাশঙ্কর রায়, সুশোভন সরকার, অশোক মিত্র ও অমলেশ ত্রিপাঠী বাংলার নবজাগরণকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছেন। এঁদের মধ্যে অনেকের মতে বাংলার নবজাগরণ ইতালির থেকে শ্লথগতি ও খুবই সীমাবদ্ধ ছিল。
অর্থসম্পদ ও বাণিজ্যের দিক থেকেও কলকাতায় ফ্লোরেন্সের মতো ব্যাপক পশমের বাণিজ্য ও মেডিচি (Medici) পরিবারের বিশাল ব্যাঙ্ক ব্যাবসা ছিল কুল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদার সম্প্রদায় কৃষকের কাছ থেকে শোষিত অর্থে ধনশালী হয়ে কলকাতায় বসবাস করেন। তাঁরাই ছিলেন বাংলার নবজাগরণের পৃষ্ঠপোষক। ফ্লোরেন্সের বুর্জোয়া শ্রেণির সঙ্গে এই সামন্ত জমিদারশ্রেণিকে তুলনা করা যায় না। ব্রিটিশের বাণিজ্যের সহযোগী বেনিয়ান বা কর্ণওয়ালিসের ভূমি সংস্কারের ফলে জমিদার বা সরকারি চাকুরির দ্বারা ধনশালী মধ্যবিত্তের পক্ষে মহান শিল্প এবং সাহিত্যের সমঝদারি ও পৃষ্ঠপোষকতা করা অসম্ভব ছিল। কোনো মহান শিল্প সৃষ্টির দিকে তাঁদের মানসিকতা ছিল না। কলকাতার বাবুরা কিছু ইতালীয় মার্বেলের তৈরি নিকৃষ্ট ভাস্কর্যকে তাঁদের উদ্যানে স্থাপন করে নিম্নরুচির পরিচয় দেন এবং তাঁরা তৃতীয় শ্রেণির নগ্ন নারীচিত্র নিয়ে স্থূল ইন্দ্রিয় বিলাসে মশগুল থাকতেন।
সাম্প্রতিক ঐতিহাসিকদের মতে বাংলার নবজাগরণের বেশির ভাগ নায়ক ছিলেন সরকারি কর্মচারী। বিদ্যাসাগর ছিলেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ, রাজনারায়ণ ছিলেন প্রধান শিক্ষক, রঙ্গলাল, বঙ্কিমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। একমাত্র ব্যতিক্রমী ঠাকুর পরিবার বাণিজ্যে লক্ষ্মীলাভ করেন। সুতরাং এঁদের মধ্যে ফ্লোরেন্সের বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিচ্ছায়া খোঁজা নিষ্ফল। এঁরা ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার ছাড়া আর কোনো বলিষ্ঠ শিল্প-সাহিত্যকর্মের উদ্যোগ নিতে সক্ষম ছিলেন না।

No comments:
Post a Comment