সমাজ, সংস্কৃতি ও মননশীলতার যুগান্তকারী বিবর্তন
মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য, কৃষ্ণকুমারী নাটক, গিরীশচন্দ্রের প্রফুল্ল, বঙ্কিমের কৃষ্ণকান্তের উইল গ্রন্থাদিতে অবশ্য শেক্সপিয়রের বিয়োগান্ত নাটকের সুর খুঁজে পাওয়া যায়। সুতরাং পঞ্চদশ শতকের ইতালীয় রেনেসাঁসের আলোকে ঊনবিংশ শতকের বাংলার রেনেসাঁসকে বিচার করা ভুল।
দেশকালে উভয়ের প্রেক্ষাপট ও চরিত্র আলাদা। বাংলার রেনেসাঁস ছিল প্রাচ্যপ্রতীচ্যের সমন্বয়ী আদর্শের মিশ্র ফল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মতে 'দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে'। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যর ভালো গুণ নিয়ে মধ্য পন্থায় নবীন ও প্রবীণ উভয়ের একসঙ্গে পথ চলাই শ্রেয়।
আসল কথা পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির সান্নিধ্যে কলকাতা মহানগরীতেই নবজাগরণের আন্দোলন চলে এবং তা ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। মোহিতলাল মজুমদার যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস সারা ভারতেরই ইতিহাস। পূর্বেই বলা হয়েছে, রেনেসাঁসের মৌলিক অর্থ পুনর্জন্ম লাভ। এর প্রচলিত অর্থ হল জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে নবজাগরণ বা পুনরুজ্জীবনের আন্দোলন। এই আন্দোলন কেবল সাহিত্য ও শিল্পকলার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বিশেষত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রেই প্রসার লাভ করে। নবজাগরণ মানে কেবল পুরাতনের অনুবৃত্তি নয়। পুরাতন বিদ্যা ও ঐতিহ্যের ভিত্তির উপর নতুন আদর্শের প্রতিষ্ঠা-পুরাতন ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন ও পরিবর্তনশীল সামাজিক অবস্থার সামঞ্জস্য সাধন। নবজাগরণের ফলে সমাজে এক নতুন সৃজনী শক্তির স্ফুরণ দেখা দিয়েছিল।
বাংলাদেশে নবজাগরণের সূত্রপাত কখন থেকে তা সঠিকভাবে বলা যায় না। আলোচনার সুবিধার জন্য সাহিত্যের ঐতিহাসিকেরা ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই নবজাগরণের শুভারম্ভ কাল ধরে নিয়েছেন। আমরা দেখি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের পর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা, শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা এবং তার কিছুদিন পরে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি ঘটনার পর শিক্ষিত বাঙালির যে মানস-পরিবর্তন ঘটে তারই প্রতিফলনে বাংলা সাহিত্যে নবযুগের প্রতিষ্ঠা। এবং রামমোহন, ডিরোজিও ও বিদ্যাসাগরের বিস্ময়কর প্রতিভা বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম ও সাহিত্যকে নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়। তবে বাংলার নবজাগরণে শিল্পের দিকটা উপেক্ষিত থাকে-একথা স্বীকার্য। ইউরোপে রেনেসাঁসের যে প্রচন্ড গতিবেগ এবং সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও ভৌগোলিক আবিষ্কারের মধ্যে মানুষের যে সৃষ্টিশীলতা ও নতুনকে আবিষ্কারের উদ্যম ছিল-বাংলার নবজাগরণ সে তুলনায় খুবই ধীর মন্থর গতিতে বিস্তৃতি লাভ করে। এ ছাড়া বাংলার এই রেনেসাঁস নগরকেন্দ্রিক শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পক্ষান্তরে স্যার যদুনাথ সরকারের মতে উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণ ইউরোপীয় রেনেসাঁস অপেক্ষা আরও ব্যাপক, গভীর ও অধিকতর বৈপ্লবিক ছিল। তিনি লিখেছেন-
Liberty কবিতায় শেলি স্বাধীনতার ভাব আন্দোলন সম্পর্কে লিখেছেন- "From city to hamlet thy dawning is cast." কলকাতা মহানগরীতে যে নবজাগরণের ভাবাদর্শে শিক্ষিত যুবকেরা উদ্বুদ্ধ হয় সেই নবজাগরণের আন্দোলন গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েনি। কিন্তু কলকাতা মহানগরীতে তার গতিবেগ ছিল কনস্টান্টিনোপল থেকে আরও তীব্র, গতিশীল ও বৈপ্লবিক।
স্যার যদুনাথ সরকারের মন্তব্যের সমর্থন মিলে রবীন্দ্রনাথের কথায়-
বাংলার নবজাগরণের সুতীব্র বৈপ্লবিক গতিবেগের পরিচয় মেলে শিবনাথ শাস্ত্রী রচিত 'রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ' গ্রন্থে। এই গ্রন্থে তিনি লিখেছেন-
অবশ্য ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বাংলার নবজাগরণ বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ১৮০১-১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নবজাগরণের প্রাণচাঞ্চল্য তীব্র আকার ধারণ করে এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। নবজাগরণের প্রবল গতিবেগ ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের পরে বহু পরিমাণে সংহত হয়। শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয়ের উক্তি যথার্থ যে, কুড়ি বছরের মধ্যে প্রাচীন ও নবীনের সংঘর্ষণ ও ঘোর সামাজিক বিপ্লবের সূচনা ঘটে। এই সময়ের মধ্যে রামমোহন, ডিরোজিও ও ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী, বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, কালীপ্রসন্ন সিংহ, প্যারীচাঁদ মিত্র এবং আরও অনেকে ধর্মসংস্কার, সমাজসংস্কার, শিক্ষাসংস্কার, রাজনীতি প্রভৃতি বিষয়ে প্রবল আন্দোলন সৃষ্টি করেন। ইতালির নবজাগরণ অপেক্ষা তা ছিল আরও তীব্র ও বৈপ্লবিক। পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইউরোপের রেনেসাঁসের পর বাংলায় নবজাগরণ ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দীতে। প্রায় চারশো বছরের ব্যবধানে ইউরোপে সভ্যতার বিপুল অগ্রগতি ও বিকাশ ঘটেছে। ইউরোপের চিত্তদূত হিসেবে ভারতে আসে ইংরেজ। ইংরেজ শাসনকে কেন্দ্র করে পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষার সান্নিধ্যে বাংলার নবজাগরণ ইতালির নবজাগরণ থেকেও অধিক ক্রিয়াশীল ছিল-স্যার যদুনাথ সরকারের এই মন্তব্য অত্যুক্তি নয়। বাংলার নবজাগরণের অন্যতম ফসল বাংলা সাহিত্যের দ্রুত বিকাশ। কাব্য, নাটক, কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধ-সাহিত্যের সব শাখাকেই নবজাগরণ নব নব উন্মেষশালিতায় সমৃদ্ধ করে তোলে। সবদিক থেকে বিচারে নবজাগরণ ছিল বিপুল আলোড়নের যুগ। প্রাচীন ও নবীনের, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভাবসংঘাতের সমুদ্রমন্থনে অজাগর গরজে সমুদ্রতরঙ্গ উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। আর সেই মন্থনে লক্ষ্মীদেবী সুধাভাণ্ড হাতে নিয়ে আবির্ভূত হন। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির সান্নিধ্যে দীর্ঘ অর্ধ-শতাব্দীব্যাপী প্রাচ্য সংস্কৃতির পুনর্জন্ম, বিবর্তন ও বিকাশ চলছিল।
নবজাগরণ বাংলাদেশে কেবল পাশ্চাত্যের অনুকরণ ছিল না। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সান্নিধ্যে বাঙালির মানসমুক্তি ঘটে এবং ভাবসংঘাতের ফলে তার বিপুল আলোড়ন-বিক্ষোভ চলে দীর্ঘকাল। শেষে পাশ্চাত্যকে প্রাচ্য ভাবে ভাবিত করেই ভাব সংস্থিতি ঘটে।
২. বাংলার সমাজ জীবনে নবজাগরণের প্রভাব
বাংলার নবজাগরণের মূলগত আদর্শ ছিল যুক্তি, বুদ্ধি, সাম্য, মৈত্রী ও মানবতা। মানবতা বলতে নারী ও পুরুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধের উজ্জীবন, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা ও ঐহিক কল্যাণ। নারী ও পুরুষ আপাতদৃষ্টিতে একটু ভিন্ন প্রকৃতির হলেও উভয়েই রক্তমাংসের সত্তা-হৃদয়, মন ও বুদ্ধির সম-অধিকারী। তাঁদের প্রাণ-মন-আত্মার স্বাভাবিক ধর্ম, মনঃপ্রবৃত্তির সুষ্ঠুভাবে বিকাশ ও চরিতার্থতার নামই মানবতা। সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা ও ব্যক্তির বিকাশ উভয়েরই কাম্য। পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষার সান্নিধ্যে এসে ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের নেতারা উপলব্ধি করেন যে, দেশের সামন্ততান্ত্রিক অচলায়তন দেশের অবনতির মূল কারণ। মূঢ়তা ও সংস্কারাচ্ছন্নতায় এবং নারীপুরুষের বৈষম্য ও নানাপ্রকার ভেদাভেদে দেশের প্রাণশক্তি অচল অসাড়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-
যে জাতি জীবনহারা অচল অসাড়,
পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।'
সতীদাহ নামে প্রাণঘাতী নিষ্ঠুর প্রথা বহু আগে থেকে সমাজে প্রচলিত ছিল। এই প্রথা অনুসারে হিন্দুসমাজে মৃত স্বামীর সঙ্গে চিতায় বিধবা পত্নীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হত। লোকের অন্ধবিশ্বাস ছিল যে, এতে পরলোকে সতী নারী স্বামীর সাহচর্য পাবে। সম্রাট আকবর এই প্রথার বিরোধী ছিলেন। জাহাঙ্গীর সহমরণের বিরুদ্ধে রাজবিধি তৈরি করেন। কিন্তু কিছু ফল হয়নি। এ স্থলে মনে রাখা দরকার যে, মুসলিম প্রশাসনের অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার শৈথিল্যে নীতিভ্রষ্ট ব্যক্তিরা কুমারী নারীদের উপর অত্যাচার করত। বোধ হয় সেজন্য স্মার্ত রঘুনন্দন সতীদাহ সমর্থন করেন। তারপর উচ্চবর্ণের মধ্যে সতীদাহ প্রবল হয়ে ওঠে।
লর্ড মিন্টো ১৮১৩ সালে এক সার্কুলারে ঘোষণা করেন যে, বলপ্রয়োগে কোনো অনিচ্ছুক নারীকে সহমৃতা করা যাবে না। গর্ভবতী নারী ও অভিভাবকহীন শিশুসন্তানের জননীকেও সহমৃতা নিষিদ্ধ করা হয়। কোনো সতীদাহের ঘটনায় নিকটবর্তী পুলিশ ফাঁড়িতে শীঘ্র সংবাদ জানাতে বলা হয়। ১৮১৭ সালের সেপ্টেম্বরে সহমরণকে নরহত্যার পর্যায়ভুক্ত করে শান্তির নির্দেশ দেওয়া নখ। তা সত্ত্বেও সতীদাহ নিবারণে ধুরন্ধর সমাজপতিরা নিরস্ত থাকেননি।
সতীদাহ নিবারণের জন্য ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে নভেম্বর মাসে সহমরণ বিষয়ে 'প্রবর্তক নিবর্তকের সংবাদ' এবং ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে 'সহমরণ বিষয়ে প্রবর্তক নিবর্তকের দ্বিতীয় সংবাদ' রচনায় প্রমাণ করেন যে, স্মৃতিশাস্ত্রে বিধবাদের সংযমী জীবনযাপনের কথা বলা হয়েছে। সহমরণের কোনো প্রস্তাব নেই। মানবতাবোধ ও শাস্ত্রমতে সতীদাহ নিন্দনীয়। এ কাজ নরহত্যা ছাড়া আর কিছু নয়। ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে 'সংবাদ কৌমুদী' পত্রিকার মাধ্যমে সতীদাহ নিবারণের সপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে প্রয়াসী হন। এই বর্বর প্রথা অবসানের জন্য তিনি মানুষের বুদ্ধি, কাণ্ডজ্ঞান ও মানবতার কাছে আবেদন করেন। এ ব্যাপারে সরকারের কাছেও বহু আবেদনপত্র পাঠান। রামমোহনের আন্দোলনের বিরুদ্ধে রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে রক্ষণশীল হিন্দুদের প্রতিবাদও সমান্তরালে প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা ডিসেম্বর ১৭ নং রেগুলেশন দ্বারা লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সতীদাহ নিষিদ্ধ করেন। সতীদাহ নিবারণে রামমোহনের সংগ্রাম সেকালের বিচারে এক গুরুত্বপূর্ণ, সাহসিক, ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এবং নারীসমাজের পক্ষে খুবই কল্যাণকর। এছাড়া রামমোহন স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার, অসবর্ণ বিবাহ, বিধবাবিবাহ প্রভৃতির পক্ষে এবং জাতিভেদ, বাল্যবিবাহ, কৌলীন্যপ্রথা ও পুরুষের বহু বিবাহের বিপক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি হিন্দু আইন সংশোধন করে নারীদের পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভের জন্যও ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে একটি পুস্তিকা রচনা করে বলিষ্ঠ মন্তব্য রাখেন। গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন, কন্যাসন্তানের হত্যা প্রভৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। বেন্টিঙ্ক গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন নিষিদ্ধ করেন。
রামমোহনের অনুগামী হিন্দু কলেজের অধ্যাপক ডিরোজিওর শিষ্যবৃন্দ গুরুর অনুপ্রেরণায় হিন্দু সমাজের রক্ষণশীলতা, গতানুগতিকতা, বর্বর কুপ্রথা, পৌত্তলিকতা, জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক ব্যবহার, নারী নির্যাতন, দাসপ্রথা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ এবং সমাজের আরও বহু কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ইয়ং বেঙ্গল দেখিয়ে দেয় কতকগুলি অসার পচনশীল প্রথাকে আঁকড়ে ধরে হিন্দু সমাজ অবক্ষয়ের অতলে তলিয়ে যেতে বসেছে। তবে তারা স্বাধীন চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিচর্চার নামে মদ্যপান, গোমাংস ভক্ষণ ও পৈতে ছিড়ে ফেলা প্রভৃতি উচ্ছৃঙ্খলতাকে বহুস্থলে প্রশ্রয় দেন। ইয়ং বেঙ্গলের অন্যতম নেতা রাধানাথ শিকদারের ভ্রান্ত ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, 'গোমাংস' না খেলে জাতির মঙ্গল নেই। অধিক গোমাংস খেয়ে চর্মরোগে তাঁর মৃত্যু হয়। সে যা হোক, ডিরোজিও এবং তাঁর শিষ্যবৃন্দ সমাজ থেকে অন্ধ আচার-অনুষ্ঠান, কুপ্রথা, কুসংস্কার ও অজ্ঞানতা দূর করার জন্য বদ্ধপরিকর ছিলেন। স্বাধীন যুক্তি ও চিন্তাবহির্ভূত কোনো জিনিসকে তাঁরা ব্যবহারযোগ্য মনে করেননি। তবে গঠনকর্ম অপেক্ষা ধ্বংসসাধনের দিকে তাঁদের সর্বশক্তি নিয়োজিত হয়েছিল। ত্রুটি সত্ত্বেও একথা স্বীকার্য যে, ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর কার্যকলাপের মাধ্যমে জাতির জড়তা দূর হয়ে মুক্ত জীবনাদর্শ বিস্তৃতির পথ অনেকটা প্রশস্ত হয়ে যায়। নানা আচার ও কুসংস্কারগ্রস্ত সমাজে তাঁরা ছিলেন বন্ধনহীন চঞ্চল উদ্দাম জীবনের উপাসক। ঐতিহাসিক দিক থেকে এর গুরুত্ব অবশ্য স্বীকার্য।
কলকাতায় এ সময় মদ্যপান, বেশ্যাসক্তি, লাম্পট্য প্রভৃতি ব্যভিচার অনাচারের স্রোত বাবু-সমাজে প্রবল ছিল। অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এই দোষে নৈতিক অধঃপতনে কলঙ্কিত ছিল। ১৮৬৪ সালে প্যারীচরণ সরকার কলকাতায় সুরাপান নিবারণের জন্য একটি সমিতি গঠন করেন। রাজনারায়ণ বসু মেদিনীপুরে সুরাপান নিবারণী সভা স্থাপন করেন। রাধাকান্ত দেব, ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও বিদ্যাসাগর মদ্যপানের অত্যন্ত বিরোধী ছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অক্ষয়কুমার দত্ত পরিমিত সুরাপান করতেন।
ব্রাহ্মসমাজ বিশেষ করে কেশবচন্দ্র সেন সমাজ-সংস্কারে বিশেষভাবে ব্রতী হন। তিনি নব্য ব্রাহ্মদের সহায়তায় পুরুষের বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ ও জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন চালান। কেশবচন্দ্র সেন সর্বভারতীয় সমাজ-সংস্কারক হিসেবে পরিচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে ব্রাহ্মত্ম-সমাজ অসবর্ণ বিবাহ, বিধবাবিবাহ, স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার, সমাজসেবা, পর্দাপ্রথা বর্জন প্রভৃতি বিভিন্ন সমাজসংস্কারমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করে। ১৮৭২ সালে ভারতীয় বিবাহ আইন পাশ হয়। অসবর্ণ বিবাহ আইনসিদ্ধ হয়। বিবাহে পাত্রপাত্রীর বয়স যথাক্রমে আঠারো ও ষোলো বছর আবশ্যিক হয়। বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হয়। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ বৈধ ঘোষিত হয়। পৌত্তলিকতা ও জাতিভেদ ত্যাগ করা হয়। কেশবচন্দ্র 'সুলভ সমাচার' নামে সুলভ মূল্যের পত্রিকা বের করে সমাজ-সংস্কারের আদর্শ সর্বসাধারণের মধ্যে প্রচার করেন। 'মদ না গরল' এক পয়সা দামের পত্রিকার দ্বারা শ্রমিকদের মধ্যে সুরাপান বন্ধের প্রচার চালান। ব্রাহ্মসমাজের আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এদের সমাজ-সংস্কারের ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে হিন্দুসমাজ বহুলাংশে রক্ষণশীলতা ও গোঁড়ামি পরিত্যাগ করে। ব্রাহ্মসমাজের নারীমুক্তির আদর্শ হিন্দুনারীদের প্রভাবিত করে।
১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে এক রেগুলেশনে দাসপ্রথা ও দাসের ক্রয়বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়। চৈত্র মাসে গাজন ও চড়ক পুজো উপলক্ষে ভক্তদের বড়শি বিঁধিয়ে বাঁশে বেঁধে অমানবিক ঘোরানো প্রথা ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে নিষিদ্ধ করা হয়।
রামমোহনের আন্দোলনে সতীদাহ আইনে নিষিদ্ধ হয়। বিধবা নারীরা স্বামীর চিতায় জীবন্ত দগ্ধ হওয়া থেকে নিষ্কৃতি পেল। কিন্তু বিধবাদের সমস্যা জটিল হয়ে উঠল সমাজে। নারীকে স্বভাবধর্মের চরিতার্থতা এবং সুষ্ঠু ও সুস্থভাবে জীবন উপভোগ থেকে ভিন্ন ধরনের লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হল। বিধবাদের আহারে বিধিনিষেধ কড়া করা হল। বারব্রত করে শুদ্ধাচারী জীবন কাটাতে বাধ্য করা হল। এর মধ্যে নিষ্ঠুর নিরম্বু অনাহারের একাদশী পালন অন্যতম। আর গোপনে তথাকথিত সম্ভ্রান্ত প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিরা বিধবা যুবতীদের সঙ্গে অবৈধ ক্রিয়াকলাপে লিপ্ত হল। সমাজের অভ্যন্ততে চলল নানা অনাচার ও ভ্রুণ হত্যা হত্যাদি পাপক্রিয়া। বিধবা নারীকে সমাজপতিরা দেবীর আসনে বসিয়ে তাদের হৃদয়কে বিশুষ্ক করে তুলল। প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষ বিদ্যাসাগর তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করে বিধবা নারীদের মুক্তি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বিধবা-বিবাহ সমাজে চালু করার জন্য তিনি দিন বদলের পালায় বৈপ্লবিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন।
৩. বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণের প্রভাব
পূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি বাংলার নবজাগরণের বৈশিষ্ট্য হল বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তিনির্ভর বাস্তবজীবনের প্রাধান্য। জীবনের সর্বক্ষেত্রে যুক্তি ও বুদ্ধির প্রতিষ্ঠা, বিজ্ঞানচেতনায় জীবনকে পরিশুদ্ধ করা এবং মৃত্তিকাতলচারী মানুষের হাসি অশ্রু কল্লোলিত জীবনের প্রতি অসীম কৌতূহল ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, মানবজীবনের অপার বিস্ময় উপলব্ধি এবং মানুষ ও মনুষ্যত্বকে মহিমান্বিত মূল্য দেওয়ার অনুপ্রেরণা ও এষণা। ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের আদর্শে উদ্বুদ্ধ সাহিত্যিকরা এই নব্যতন্ত্রকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে। তবে এই নবজাগরণগত নতুন জীবনচেতনা হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো একদিনে আবির্ভূত হয়নি। ঐতিহাসিক দিক থেকে পলাশি যুদ্ধের পরেই বাঙালি নতুন জীবনবোধে উদ্বুদ্ধ হয়। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দী থেকেই তার প্রস্তুতিপর্ব বলা যেতে পারে। ওই সময় বিদেশি বণিকরা ভারতে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য প্রবেশ করে। ইউরোপে তখন পঞ্চদশ শতাব্দীর নবজাগরণের বিস্তৃতি ঘটেছে। জাহাজে পণ্যদ্রব্য আমদানির সঙ্গে সঙ্গে বণিকরা ইউরোপীয় ভাবধারাও বহন করে আনে। বিদেশি বণিকদের সান্নিধ্যে এসে বাঙালির মনোজীবনেও পরিবর্তন সাধিত হতে থাকে। তারপর পলাশি যুদ্ধের পর বাংলায় ব্রিটিশ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় প্রবল ইংরেজ তার তেজ বিকীর্ণ করল। সাহিত্যে আনন্দ ও দুঃখবেদনা-নির্ভর মানুষের হাসি-অশ্রু-কল্লোলিত বিচিত্র জীবনকথা লীলায়িত ও কল্লোলিত হয়ে উঠল। বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ পূর্বের যাত্রা, কথকতা, সংকীর্তন, রামায়ণ-মহাভারত, বৈষ্ণব সাহিত্যের কাহিনি-আশ্রিত কবিগানের কথা বলেছেন। তারপর বাংলার নবজাগরণে বাংলা সাহিত্যের যুগান্তর - সাধিত হল।
আরম্ভেরও যেমন আরম্ভ থাকে, তেমনই বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূত্রপাতের পূর্বে অস্পষ্ট নীহারিকাপুঞ্জের মতো একটা পূর্বপরিমণ্ডল বা প্রেক্ষাপট ছিল। সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার স্বরূপ আভাসিত হতে থাকে। কাশীরাম দাসের পর রচিত রামায়ণ-মহাভারতের অনুবাদে লঘুতরল ভঙ্গিতে ভক্তির কৌতুককাহিনি বর্ণিত হয়েছে। জগৎরামের রামায়ণে দেবভত্তিতে অনীহা প্রকাশ পেয়েছে এবং উদ্ভট গল্পের অবতারণা ঘটেছে। রামানন্দ যতি জগন্নাথ দেবের দারুমূর্তিকে নীরস প্রাণহীন বলে জগন্নাথ পুজোর ব্যর্থতার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। রাধাকৃষ্ণ মিশ্র মঙ্গলকাব্যের দেবীর স্বপ্নাদেশকে ব্যঙ্গ করেছেন। সপ্তদশ শতাব্দীর মুসলমান কবিদের রচনায় মানব-মানবীর প্রণয়কাহিনী স্থান পেয়েছে। ভারতচন্দ্র দেবদেবীর মাহাত্ম্যের উপর ব্যঙ্গের ধূলি নিক্ষেপ করে দেবতার ভণ্ডামি ও স্বেচ্ছাচারিতার মুখোশ খুলে দিয়েছেন। তাঁর কাব্যে প্রাধান্য পেয়েছে নতুন জাগ্রত মানুষ- 'আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে'। অষ্টাদশ শতাব্দীর রামপ্রসাদ ও কমলাকান্ত প্রমুখ শাক্ত পদকর্তাদের রচনায় সমকালীন রাষ্ট্রিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে। শিব বাঙালি ভিখারী স্বামী। মেনকা ও উমা দৈবীসত্তা ছাড়িয়ে মাটির ঘরের স্নেহপ্রেম ও বাৎসল্যের মা ও মেয়ে হয়ে উঠেছেন। শাক্তপদাবলিতে জাতপাতের ঊর্ধ্বে মানবমহিমা কীর্তিত হয়েছে। গঙ্গারাম দত্ত সমসাময়িক ইতিহাস ও যুগচেতনানির্ভর বাস্তব জীবননিষ্ঠা ও মানবিক প্রেরণায় মহারাষ্ট্রপুরাণ বা ভাস্করপরাভব কাব্য রচনা করেছেন। ময়মনসিংহগীতিকা, পূর্ববঙ্গগীতিকায় নরনারীর মুক্তপ্রেম উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে।
পাশ্চাত্য বণিকদের আগমনে এবং যুগধর্মের প্রভাবে সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর ধর্মকেন্দ্রিক দেবপ্রভাবপুষ্ট বাংলা সাহিত্যে মানবিক জীবনচেতনার যে ভাবভাবনা প্রকাশ পেতে থাকে তা পলাশিযুদ্ধের পর আরও ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে। পুরোদমে বাংলা সাহিত্যে ঋতু পরিবর্তন শুরু হয়। চার দেয়ালের সংকীর্ণ গণ্ডি ভেঙে বাঙালি বেরিয়ে এল মুক্ত নীলাকাশতলে। তার দৃষ্টি সম্প্রসারিত হল দিগন্তে-দিগন্তের পারে। সাতসমুদ্রের পারে ইউরোপ-আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি কত দেশ রয়েছে। সেখানকার মানুষের কত বিচিত্র জীবন, ভাষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির কত ঐশ্বর্যে ভরা। বাঙালি জীবনমুখী সৃষ্টিপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হল। বাঙালির ভাবকল্পনা ঊর্ধ্বমুখী হল না-সাহিত্যিকরা রাঙামাটির পথ দিয়ে যাত্রা করলেন। মানবজীবনের সুখদুঃখ আনন্দবেদনার কাহিনি তরঙ্গিত হল। বাংলা সাহিত্যে বিপুলা পৃথিবীর জীবনসংগীত কলরবমুখরিত হয়ে উঠল। সাহিত্যের রূপ ও রীতিতে বৈচিত্র্য সাধিত হল। পূর্বে ছন্দই ছিল সাহিত্যের বাহন। দীর্ঘ সাড়ে আটশো বছর ধরে বাংলা সাহিত্যে কবিতা ছিল ভাবের বাহন। নবজাগরণের যুগে মুদ্রাযন্ত্র আবিষ্কৃত হল। সৃষ্টি হল গদ্য। গদ্য চিন্তা ও মননের বাহন হল। নাটক, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচিত হল। অল্প সময়ে বহু গ্রন্থ প্রকাশের সুযোগ করে দিল মুদ্রাযন্ত্র। মধ্যযুগ ছিল মন্ত্রের যুগ-দৈববিশ্বাসের যুগ। আধুনিক যুগ নিয়ে এল যন্ত্র, ভূগোল, ইতিহাস, বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও স্বদেশভাবনা। আধুনিক যুগের সাহিত্য নানা বিষয়বস্তুতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠল। নাট্যসাহিত্য রচিত হওয়ায় অভিনয় কলা নাট্যমঞ্চে বাংলা সাহিত্যে নতুন মাত্রা এনে দিল। গদ্য সৃষ্টি হওয়ায় পূর্বের ভাবের সাহিত্য ও আবেগের সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত হল মননশীল বুদ্ধিপ্রধান গদ্যসাহিত্য। আধুনিক যুগ সৃষ্টি করল কথাসাহিত্য ও নাট্যসাহিত্য। ছন্দপ্রধান কাব্যসাহিত্যও নতুন নতুন ছন্দের আঙ্গিকে এবং ভাবের বৈচিত্র্যে ও শৈল্পিক রূপরীতিতে সমৃদ্ধ হল।
পলাশি যুদ্ধের অর্ধশতাব্দীর মধ্যেই বাংলার আর্থসামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অভূতপূর্ব পরিবর্তন শুরু হয়। বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতি থেকে মধ্যযুগের অবসান ঘটতে থাকে। ইউরোপের ঝোড়ো হাওয়া আমাদের রুদ্ধ নিকেতনে প্রবল আঘাত হানে। জানালা দরজা সব খুলে যায়। বাঙালি মুক্ত বাতায়নপথে দেখতে পায় দিগন্ত প্রসারিত জীবনের পটভূমি। সংকীর্ণ জীবনের ক্ষুদ্র পরিধি থেকে বৃহত্তর মুক্ত জীবনের লীলাভূমিতে বিচরণের জন্য পথিক মনের অভিযাত্রিক নেশা বাঙালিকে ঘরছাড়া করে। নতুনকে জানার জন্য, নতুনকে বরণ করার জন্য তার চিত্ত উদ্বেলিত উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। বাঙালির জীবনে ও সাহিত্যে নবযুগের সূত্রপাত ঘটে। পাশ্চাত্য সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার ফলে বাংলা সাহিত্যের উপর আধুনিক মনন ও অনুভূতির প্রভাব পড়তে থাকে। বাংলা সাহিত্যে তখন আধুনিকতার অগ্রগতি দ্রুতবেগে সাধিত হয়।
মুসলমান আমলের বাংলা সাহিত্যের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখা যায় যে, অবাধে অন্যায় করবার অধিকারই যে ঐশ্বর্যের লক্ষণ এই বিশ্বাসটা কলুষিত করেছে তখনকার দেবচরিত্র-কল্পনাকে।
পৌরাণিক দেববিশ্বাস, অন্ধ সংস্কার-এ নিষ্ক্রিয়তা ঔদাসীন্য পরিহার করে এবার বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার যাত্রা শুরু হল। মানবমহিমায় বিশ্বাস ও মানবতাবোধ এই যুগের প্রধান লক্ষণ। মানুষ দেবতার হাতের ক্রীড়নক নয়; মানুষের সুখ আছে, দুঃখ আছে, ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে, মহিমাবোধ আছে, মানুষই দেবতা গড়ে। তাই দেবতাকে মানবিক আদর্শে শ্রদ্ধেয় ও পূজনীয় হতে হবে-এরূপ গভীর বিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয়ের ভাবভাবনায় নবযুগের সাহিত্যে মানুষের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হল। জীবনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগের ফলে বৃহৎ বিচিত্র জীবনলীলার জগৎ গড়ে উঠল বাংলা সাহিত্যে। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে বিচিত্ররূপিণী প্রকৃতিও সাহিত্যে বর্ণাঢ্য হয়ে উঠল।
বিজ্ঞানবুদ্ধি ও যুক্তিনির্ভরতা এ যুগের সাহিত্যের আর একটি বিশিষ্ট লক্ষণ। মানুষ অন্ধবিশ্বাসে কিংবা প্রবলের অত্যাচারের ভয়ে কোনো কিছু মেনে নেবে না। যুক্তির কষ্টিপাথরে সবকিছুর সত্যমিথ্যা যাচাই করে নেবে-এই ধরনের মনোভাব কবিসাহিত্যিকদের মনোজীবনে বলিষ্ঠভাবে স্থান পায়। এর ফলে ধর্ম, সমাজসংস্কার ও শিক্ষামূলক বহু রচনায় বাংলাসাহিত্য সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। একদিকে যেমন প্রবন্ধ রচিত হয়, তেমনি কথাসাহিত্যে জীবনের অন্তর্ভেদী রহস্য ধরা পড়ে, অপরদিকে নাট্যসাহিত্যেরও বিকাশ শুরু হয়। অন্ধসংস্কারের জগদ্দল পাথর সমাজজীবন থেকে অপসারিত করার প্রণোদনায় যে প্রবল জীবন-জিজ্ঞাসা জাগে তারই প্রতিফলন ঘটে আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্যে।
আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম বাহন হল গদ্যরচনা। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বাহন ছিল ছন্দ। দীর্ঘ সাড়ে আটশো বছর ধরে বাংলা সাহিত্যে কবিতার একাধিপত্য। কবিরা ভূর্জপত্রে তাঁদের কল্পনাকে সৃষ্টিরূপ দিতেন। তা ছিল সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য। লিপিকররা পুঁথি নকল করে সীমিতসংখ্যায় তা রসিকদের মধ্যে বিতরণ করতেন। তাই প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের প্রচার ছিল খুবই সীমিত। আধুনিক যুগে মুদ্রাযন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ায় রচনা প্রকাশের ও প্রচারের বিরাট সুবিধা এল। পূর্বেকার সাহিত্য ছিল ভাবভাবনায় আবেগাপ্লুত। আগে ছিল মন্ত্রের যুগ। অন্ধবিশ্বাসের যুগ। এখন এল যন্ত্রের যুগ, গদ্যের যুগ, চিন্তামননের যুগ।
গদ্য বাংলা সাহিত্যে যুক্তি, বুদ্ধি, চিন্তা ও মনন মননশীলতা প্রবল বেগ সঞ্চারিত করল। পদ্যাশ্রিত প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ছিল ধীর স্থির শ্লথগতিসম্পন্ন। এখন বাংলা সাহিত্যে উদ্দাম গতি ও তারুণ্যের নির্বাধ শক্তি এল। বাংলা গদ্য ঊনবিংশ শতাব্দীর কথাসাহিত্য, নাটক ও প্রবন্ধে ভাষা দান করল। গদ্যভাষা বাঙালির চিন্তাধারাকে তীক্ষ্ণ ও গভীর করে তুলল।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে নাট্যসংস্থার প্রতিষ্ঠা ও নাটকাভিনয় বাংলা সাহিত্যেব এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে। নাট্যকার বার্নার্ড শ লিখেছেন-"The stage is as much important as the auditorium." উনবিংশ শতাব্দীতে মঞ্চাশ্রয়ী নাটকাভিনয়ের ফলে সাধারণ মানুষ নাটকের মাধ্যমে রসাস্বাদনের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি বিশেষভাবে অনুরাগী হয়ে ওঠে। সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মমূলক বহু নাটক রচনা করে নাট্যকাররা জনচিত্তকে স্বাদেশিক ভাবভাবনার উচ্চাদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়াসী হন।
পাশ্চাত্য সভ্যতার সংশ্রবে এসে বাঙালির মনের আগল ঘুচে গেছে, তার চিত্তমুক্তি ঘটেছে। পশ্চিম সমুদ্র থেকে ঝোড়ো হাওয়া এসে আমাদের অচলায়তনিক জীবনের রুদ্ধদ্বার ভেঙে দিল। বাঙালি নীল আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকাল, সামনে দেখল বিশাল দিগন্ত। আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্যে বিশাল বিশ্বের ছায়া পড়ল, খাঁচার পাখি অসীম নীলাকাশে পাখা মেলে দিল। আর অন্ধকারে বসে থাকা নয়, 'আলো আনো, আলো আনো, ছিন্ন কর কৃষ্ণ আচ্ছাদন দৃষ্টির সম্মুখ হতে'। চাই 'More light, more space'। এই বিপুল জাগ্রত জীবনচেতনা থেকে বাংলা সাহিত্য জীবনের বিচিত্র কল্লোলে কলমন্দ্রমুখরিত হল। এত আলো, এত গান, এত প্রাণ পূর্বেকার বাংলা সাহিত্যে ছিল বায়। এবার জীবনের বিশাল দিগন্ত বাংলা সাহিত্যে বিচিত্র বর্ণসুষমায় আলোকিত উজ্জ্বলিত হয়ে উঠল। সাহিত্যের সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় জীবনের নানাপ্রকার সম্পর্ক স্থাপিত হল। একদিকে সাহিত্যে বিশুদ্ধ রসানন্দ স্থান পেল, সাহিত্য হয়ে উঠল আনন্দনিস্যন্দী। অন্যদিকে নানাপ্রকার চিন্তা ও মননে বাঙালির জীবনধারা নতুনভাবে গড়ে উঠল। ইউরোপীয় রেনেসাঁস বা নবজাগরণের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি উনবিংশ শতকের বাঙালি জীবনে ও বাংলা সাহিত্যে বিকশিত হয়ে উঠল। তাই বাংলার নবজাগরণের সঙ্গে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশের নিবিড় যোগ রয়েছে।
বাংলার নবজাগরণে সমন্বয়বাদী আদর্শ স্থান পায়। প্রাচীন যুগের যা কিছু শ্রেষ্ঠ, তার সঙ্গে প্রতীচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ জিনিসগুলিকে সমন্বয়ের দ্বারা বাংলা তথা সারা ভারতের অগ্রগতির পথনির্দেশ ছিল এই সমন্বয়বাদী ভাবধারার বৈশিষ্ট্য। এই সমন্বয়বাদের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন ভারতপথিক রামমোহন রায়, বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ। রবীন্দ্রনাথের সাধনায় এই সমন্বয়বাদী চিন্তাদর্শের ব্যাপক প্রসার ঘটে। রবীন্দ্রনাথ সর্বদা মধ্যপন্থাকে শ্রেষ্ঠ মনে করেছেন। 'দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে'...এই ছিল তাঁর আদর্শ।
বাংলার নবজাগরণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য জাতীয়তাবাদের উন্মেষ। আধুনিক বাংলা সাহিত্য জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়। সমাজ-সংস্কার ও ধর্ম আন্দোলনের ফলে নতুন বাংলা তথা নতুন ভারতের জন্ম হয়। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের মধ্যে সেই বাংলার নবজাগরণে বিপুল গতিবেগ সংহত হয়ে আছে।
বাংলার নবজাগরণের সঙ্গে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে ইংরেজ শাসন শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিপুল পরিবর্তন ঘটিয়ে জীবনযাত্রার প্রগতির পথ উন্মুক্ত করে দেয়। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু কলেজ স্থাপিত হয়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দেশে পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষার নতুন হাওয়া বইল। প্রাচীন আমলের শিক্ষার উপর ছেদ পড়ল। প্রাচীনের সঙ্গে নবীনের সংঘর্ষে প্রাচীন ঐতিহ্যের অনেক কিছু বর্জিত হল-নব্যবঙ্গের সংস্কৃতি জয়যুক্ত হল।
আধুনিক শিক্ষাদীক্ষায় দীক্ষিত হওয়ার ফলে বাঙালির সমাজজীবন দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকল। সমগ্র বাংলাদেশ নানা চিন্তায়, তর্কে-বিতর্কে ও আন্দোলনে আলোড়িত হল। ব্যক্তির চিন্তায়, সামাজিক রীতিনীতিতে, রাজনৈতিক আদর্শে ও শিক্ষা পদ্ধতিতে যে পরিবর্তন এল তা সমাজের পরিকাঠামোটিকে অনেকখানি পরিবর্তন করল। ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক অতি নিবিড়, ব্যক্তিমনের সঙ্গে সমাজের নতুন ভাবনা বাংলা সাহিত্যে যুগান্তর সৃষ্টি করল।
জাতির এই মানস পরিবর্তন আধুনিক বাংলা সাহিত্যে নতুনত্বের সঞ্চার করল। বহিরঙ্গের রূপ ও অন্তরঙ্গের ভাব উভয় দিক থেকে বাংলা সাহিত্যের জন্মান্তর রূপান্তর ঘটল। সাহিতো নতুন শক্তি ও সৌন্দর্য ফুটে উঠল। লগ্নি তব্য বিষয় এই যে, প্রাচীন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মানবিকতার মহিমা স্বীকৃত হয়নি, স্বাদেশিকতা বা জাতীয়তার প্রতিফলন ঘটেনি। ইতিহাস-চেতনার কোনো স্পন্দন তাতে নেই। লৌকিক ধর্মের অনুসৃতি, পুচ্ছগ্রাহিতা বা গতানুগতিক কাহিনির অনুবর্তন, দেবকর্তৃত্ব, অলৌকিকতা, পল্লবগ্রাহিতা, বাস্তব জীবনের সুখদুঃখের প্রতি ঔদাসীন্য আমাদের প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যের বিশিষ্ট লক্ষণ। ইউরোপীয় ভাবচিন্তার সংস্পর্শে এসে নবজাগ্রত জীবনবোধের ফলে আধুনিক সাহিত্য আকৃতি ও প্রকৃতিতে সম্পূর্ণ বদলে গেল। এ যুগের সাহিত্যে মানুষ প্রতিষ্ঠা লাভকরল, ধর্মীয় প্রভাব ধীরে ধীরে মুছে গেল, মানবীয় সুখদুঃখ আনন্দবেদনার কথা উচ্চারিত হল। জীবনের রক্তরাগে সাহিত্য সঞ্জীবিত হল। বাঙালি জাতির বহু কামনা-বাসনা সাহিত্যে বাণীরূপ পেল।
প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্য ছিল পদ্যবাহিত। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে গদ্য সসম্মানে পদ্যের পাশাপাশি স্থান করে নিল। প্রকাশিত হল সাময়িকপত্র, রচিত হল প্রবন্ধ-উপন্যাস-গল্প-নাটক। লেখা হল পাশ্চাত্যরীতির মহাকাব্য আর গীতিকবিতা। ছন্দ ও ভাষাভঙ্গিতে নতুনতর ভাবের প্রকাশক্ষমতা এল। কাব্যসাহিত্যে প্রধানত মধুসূদনের ও গদ্যসাহিত্যে বঙ্কিমের সারস্বত প্রতিভাকে আশ্রয় করেই আধুনিকতার পদক্ষেপ ঘটল। কাব্যে নাটকে গীতিকবিতায় ছন্দে ও ভাষায় মধুসূদন পুরাতনকে বর্জন করে নতুন জীবনাদর্শে নিজের সৃষ্টিকে উজ্জ্বল করে তুললেন। বঙ্কিমচন্দ্র সৃষ্টি করলেন প্রাণবান গদ্য। উপন্যাস, সমালোচনা ও প্রবন্ধাদি তাঁর বিস্ময়কর সৃষ্টি-ক্ষমতার স্বাক্ষর বহন করে এলেন বিহারীলাল চক্রবর্তী। হৃদয়রাজ্যের গোপন গভীর কথাটি তাঁর রচনায় উচ্ছ্বসিত হল। রবীন্দ্রনাথ সেই পথের পথিক হয়ে মানুষের অতিসূক্ষ্ম উৎকণ্ঠা ও সূক্ষ্মতর ইন্দ্রিয়ানুভূতির ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করলেন।
তারপরে এলেন শরৎচন্দ্র। কথাসাহিত্যে নতুন একটি ধারার প্রবর্তন করলেন। অফুরন্ত দরদ ও সংবেদনশীলতায় তিনি নরনারীর সম্পর্কের নতুন মূল্যায়ন করেলন। আধুনিক সাহিত্যের দিকপাল হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, গিরিশচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল, ক্ষীরোদপ্রসাদ, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রমুখ প্রতিভাধর সাহিত্যিক অসামান্য প্রতিভার পরিচয় রেখে গেছেন। রবীন্দ্র-সমকালীন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, মোহিতলাল মজুমদার, জীবনানন্দ দাশ, নজরুল ইসলাম, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ লেখক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে অসামান্য গৌরবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সাহিত্যে অতি আধুনিক লেখকদের পদচারণার ক্ষেত্রটি আরও প্রশস্ত; বাস্তব জীবনের সার্থক রূপায়ণে সমাজের আনাচে-কানাচে বসবাসকারী আদিবাসী নরনারী, শ্রমিক, কৃষক, হাজি, ডোম, মুচি ও মেথর প্রভৃতি তথাকথিত নিম্নশ্রেণি মানুষের নিগূঢ় জীবনকথায় এঁদের রচনা বিচিত্র সুন্দর হয়ে উঠেছে। এঁরা যে বাণীর জগৎ তৈরি করেছেন ভারতীয় সাহিত্যে তার তুলনা নেই। এঁদের রচনায় বিচিত্র বর্ণে রূপে রসে উন্মোচিত হয়েছে জীবনরহস্যের নব নব দিগন্ত!


No comments:
Post a Comment