Breaking

Wednesday, June 17, 2026

ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণ




মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য, কৃষ্ণকুমারী নাটক, গিরীশচন্দ্রের প্রফুল্ল, বঙ্কিমের কৃষ্ণকান্তের উইল গ্রন্থাদিতে অবশ্য শেক্সপিয়রের বিয়োগান্ত নাটকের সুর খুঁজে পাওয়া যায়। সুতরাং পঞ্চদশ শতকের ইতালীয় রেনেসাঁসের আলোকে ঊনবিংশ শতকের বাংলার রেনেসাঁসকে বিচার করা ভুল।

দেশকালে উভয়ের প্রেক্ষাপট ও চরিত্র আলাদা। বাংলার রেনেসাঁস ছিল প্রাচ্যপ্রতীচ্যের সমন্বয়ী আদর্শের মিশ্র ফল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মতে 'দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে'। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যর ভালো গুণ নিয়ে মধ্য পন্থায় নবীন ও প্রবীণ উভয়ের একসঙ্গে পথ চলাই শ্রেয়।

আসল কথা পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির সান্নিধ্যে কলকাতা মহানগরীতেই নবজাগরণের আন্দোলন চলে এবং তা ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। মোহিতলাল মজুমদার যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস সারা ভারতেরই ইতিহাস। পূর্বেই বলা হয়েছে, রেনেসাঁসের মৌলিক অর্থ পুনর্জন্ম লাভ। এর প্রচলিত অর্থ হল জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে নবজাগরণ বা পুনরুজ্জীবনের আন্দোলন। এই আন্দোলন কেবল সাহিত্য ও শিল্পকলার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বিশেষত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রেই প্রসার লাভ করে। নবজাগরণ মানে কেবল পুরাতনের অনুবৃত্তি নয়। পুরাতন বিদ্যা ও ঐতিহ্যের ভিত্তির উপর নতুন আদর্শের প্রতিষ্ঠা-পুরাতন ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন ও পরিবর্তনশীল সামাজিক অবস্থার সামঞ্জস্য সাধন। নবজাগরণের ফলে সমাজে এক নতুন সৃজনী শক্তির স্ফুরণ দেখা দিয়েছিল।

বাংলাদেশে নবজাগরণের সূত্রপাত কখন থেকে তা সঠিকভাবে বলা যায় না। আলোচনার সুবিধার জন্য সাহিত্যের ঐতিহাসিকেরা ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই নবজাগরণের শুভারম্ভ কাল ধরে নিয়েছেন। আমরা দেখি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের পর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা, শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা এবং তার কিছুদিন পরে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি ঘটনার পর শিক্ষিত বাঙালির যে মানস-পরিবর্তন ঘটে তারই প্রতিফলনে বাংলা সাহিত্যে নবযুগের প্রতিষ্ঠা। এবং রামমোহন, ডিরোজিও ও বিদ্যাসাগরের বিস্ময়কর প্রতিভা বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম ও সাহিত্যকে নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়। তবে বাংলার নবজাগরণে শিল্পের দিকটা উপেক্ষিত থাকে-একথা স্বীকার্য। ইউরোপে রেনেসাঁসের যে প্রচন্ড গতিবেগ এবং সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও ভৌগোলিক আবিষ্কারের মধ্যে মানুষের যে সৃষ্টিশীলতা ও নতুনকে আবিষ্কারের উদ্যম ছিল-বাংলার নবজাগরণ সে তুলনায় খুবই ধীর মন্থর গতিতে বিস্তৃতি লাভ করে। এ ছাড়া বাংলার এই রেনেসাঁস নগরকেন্দ্রিক শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পক্ষান্তরে স্যার যদুনাথ সরকারের মতে উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণ ইউরোপীয় রেনেসাঁস অপেক্ষা আরও ব্যাপক, গভীর ও অধিকতর বৈপ্লবিক ছিল। তিনি লিখেছেন-

"It was truly a Renaissance wider, deeper and more revolutionary than that of Europe after the fall of Constantinople."
স্যার যদুনাথ সরকারের এই উক্তি কলকাতা মহানগরীকে কেন্দ্র করে এবং তা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। বিপিনচন্দ্র পালের 'নবযুগের বাংলা' ও শিবনাথ শাস্ত্রীর 'রামতনুলাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ' গ্রন্থটি পড়লে জানা যাবে যদুনাথ সরকারের মন্তব্য যথার্থ। নবজাগরণের ভাববিপ্লব কলকাতা মহানগরীর বাইরে গ্রামাঞ্চলে পরিব্যাপ্ত হয়নি। সে সুযোগও ছিল না-কারণ গ্রামাঞ্চলের মানুষের মন পড়েছিল মধ্যযুগে। মফস্বল অঞ্চলে তখন শিক্ষাদীক্ষার প্রসার ঘটেনি। তা ছাড়া চিন্তাভাবনা ও কোনো প্রকার আন্দোলন কবি শেলির মতে নগর থেকেই গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

Liberty কবিতায় শেলি স্বাধীনতার ভাব আন্দোলন সম্পর্কে লিখেছেন- "From city to hamlet thy dawning is cast." কলকাতা মহানগরীতে যে নবজাগরণের ভাবাদর্শে শিক্ষিত যুবকেরা উদ্বুদ্ধ হয় সেই নবজাগরণের আন্দোলন গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েনি। কিন্তু কলকাতা মহানগরীতে তার গতিবেগ ছিল কনস্টান্টিনোপল থেকে আরও তীব্র, গতিশীল ও বৈপ্লবিক।

স্যার যদুনাথ সরকারের মন্তব্যের সমর্থন মিলে রবীন্দ্রনাথের কথায়-

"আমার বিশ্বাস, ইউরোপীয় সংস্কৃতি সর্বপ্রথমে বাংলাদেশের অন্তঃকরণ গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল, নানা দিক থেকে বিচলিত করেছিল তার মন। মুক্তির বেগ লাগল তার জীবনে, তার মননশক্তি জাগরিত হয়ে উঠল পূর্বযুগের অজগর নিদ্রা থেকে। বুদ্ধির সর্বজনীনতা, দৃষ্টির সর্বব্যাপকতা, সর্বমানবের পরিপ্রেক্ষণিকায় মানবত্বের উপলব্ধি বাংলাদেশেই রামমোহন রায়ের মতো মহামনীষীদের চিত্তে অপূর্ব প্রভাবে অকস্মাৎ আবির্ভূত হল। আচার ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় বন্ধনের মুক্তি বাংলাদেশেই সর্বপ্রথম উদ্যত হয়ে উঠেছিল, অতি অল্পকালের মধ্যে চলৎশক্তিমতী হয়ে উঠল বাংলা ভাষা, তার আড়ষ্টতা ঘুচে গেল নবযৌবন সঞ্চারে, সাহিত্য দেখা দিতে লাগল অভূতপূর্ব সফলতার আশা বহন করে, পৃথিবীর আদিযুগে যেমন দ্বীপ উঠেছিল সমুদ্রগর্ভ থেকে নব নব প্রাণের অন্নদায়িনী ভূমি আশ্রয় করে।"

বাংলার নবজাগরণের সুতীব্র বৈপ্লবিক গতিবেগের পরিচয় মেলে শিবনাথ শাস্ত্রী রচিত 'রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ' গ্রন্থে। এই গ্রন্থে তিনি লিখেছেন-

"১৮২৫ হইতে ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিংশতি বর্ষকে বঙ্গের নবযুগের জন্মকাল বলিয়া গণ্য করা যাইতে পারে। এই কালের মধ্যে কী রাজনীতি, কী সমাজনীতি, কী শিক্ষাবিভাগ, সকল দিকেই নবযুগের প্রবর্তন হইয়াছিল।"

অবশ্য ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বাংলার নবজাগরণ বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ১৮০১-১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নবজাগরণের প্রাণচাঞ্চল্য তীব্র আকার ধারণ করে এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। নবজাগরণের প্রবল গতিবেগ ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের পরে বহু পরিমাণে সংহত হয়। শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয়ের উক্তি যথার্থ যে, কুড়ি বছরের মধ্যে প্রাচীন ও নবীনের সংঘর্ষণ ও ঘোর সামাজিক বিপ্লবের সূচনা ঘটে। এই সময়ের মধ্যে রামমোহন, ডিরোজিও ও ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী, বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, কালীপ্রসন্ন সিংহ, প্যারীচাঁদ মিত্র এবং আরও অনেকে ধর্মসংস্কার, সমাজসংস্কার, শিক্ষাসংস্কার, রাজনীতি প্রভৃতি বিষয়ে প্রবল আন্দোলন সৃষ্টি করেন। ইতালির নবজাগরণ অপেক্ষা তা ছিল আরও তীব্র ও বৈপ্লবিক। পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইউরোপের রেনেসাঁসের পর বাংলায় নবজাগরণ ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দীতে। প্রায় চারশো বছরের ব্যবধানে ইউরোপে সভ্যতার বিপুল অগ্রগতি ও বিকাশ ঘটেছে। ইউরোপের চিত্তদূত হিসেবে ভারতে আসে ইংরেজ। ইংরেজ শাসনকে কেন্দ্র করে পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষার সান্নিধ্যে বাংলার নবজাগরণ ইতালির নবজাগরণ থেকেও অধিক ক্রিয়াশীল ছিল-স্যার যদুনাথ সরকারের এই মন্তব্য অত্যুক্তি নয়। বাংলার নবজাগরণের অন্যতম ফসল বাংলা সাহিত্যের দ্রুত বিকাশ। কাব্য, নাটক, কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধ-সাহিত্যের সব শাখাকেই নবজাগরণ নব নব উন্মেষশালিতায় সমৃদ্ধ করে তোলে। সবদিক থেকে বিচারে নবজাগরণ ছিল বিপুল আলোড়নের যুগ। প্রাচীন ও নবীনের, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভাবসংঘাতের সমুদ্রমন্থনে অজাগর গরজে সমুদ্রতরঙ্গ উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। আর সেই মন্থনে লক্ষ্মীদেবী সুধাভাণ্ড হাতে নিয়ে আবির্ভূত হন। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির সান্নিধ্যে দীর্ঘ অর্ধ-শতাব্দীব্যাপী প্রাচ্য সংস্কৃতির পুনর্জন্ম, বিবর্তন ও বিকাশ চলছিল।

নবজাগরণ বাংলাদেশে কেবল পাশ্চাত্যের অনুকরণ ছিল না। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সান্নিধ্যে বাঙালির মানসমুক্তি ঘটে এবং ভাবসংঘাতের ফলে তার বিপুল আলোড়ন-বিক্ষোভ চলে দীর্ঘকাল। শেষে পাশ্চাত্যকে প্রাচ্য ভাবে ভাবিত করেই ভাব সংস্থিতি ঘটে।

২. বাংলার সমাজ জীবনে নবজাগরণের প্রভাব

বাংলার নবজাগরণের মূলগত আদর্শ ছিল যুক্তি, বুদ্ধি, সাম্য, মৈত্রী ও মানবতা। মানবতা বলতে নারী ও পুরুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধের উজ্জীবন, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা ও ঐহিক কল্যাণ। নারী ও পুরুষ আপাতদৃষ্টিতে একটু ভিন্ন প্রকৃতির হলেও উভয়েই রক্তমাংসের সত্তা-হৃদয়, মন ও বুদ্ধির সম-অধিকারী। তাঁদের প্রাণ-মন-আত্মার স্বাভাবিক ধর্ম, মনঃপ্রবৃত্তির সুষ্ঠুভাবে বিকাশ ও চরিতার্থতার নামই মানবতা। সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা ও ব্যক্তির বিকাশ উভয়েরই কাম্য। পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষার সান্নিধ্যে এসে ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের নেতারা উপলব্ধি করেন যে, দেশের সামন্ততান্ত্রিক অচলায়তন দেশের অবনতির মূল কারণ। মূঢ়তা ও সংস্কারাচ্ছন্নতায় এবং নারীপুরুষের বৈষম্য ও নানাপ্রকার ভেদাভেদে দেশের প্রাণশক্তি অচল অসাড়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-

'যে নদী হারায়ে স্রোত, চলিতে না পারে, অজস্র শৈবাল দাম বাঁধে আসি তারে。
যে জাতি জীবনহারা অচল অসাড়,
পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।'

সতীদাহ নামে প্রাণঘাতী নিষ্ঠুর প্রথা বহু আগে থেকে সমাজে প্রচলিত ছিল। এই প্রথা অনুসারে হিন্দুসমাজে মৃত স্বামীর সঙ্গে চিতায় বিধবা পত্নীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হত। লোকের অন্ধবিশ্বাস ছিল যে, এতে পরলোকে সতী নারী স্বামীর সাহচর্য পাবে। সম্রাট আকবর এই প্রথার বিরোধী ছিলেন। জাহাঙ্গীর সহমরণের বিরুদ্ধে রাজবিধি তৈরি করেন। কিন্তু কিছু ফল হয়নি। এ স্থলে মনে রাখা দরকার যে, মুসলিম প্রশাসনের অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার শৈথিল্যে নীতিভ্রষ্ট ব্যক্তিরা কুমারী নারীদের উপর অত্যাচার করত। বোধ হয় সেজন্য স্মার্ত রঘুনন্দন সতীদাহ সমর্থন করেন। তারপর উচ্চবর্ণের মধ্যে সতীদাহ প্রবল হয়ে ওঠে।

লর্ড মিন্টো ১৮১৩ সালে এক সার্কুলারে ঘোষণা করেন যে, বলপ্রয়োগে কোনো অনিচ্ছুক নারীকে সহমৃতা করা যাবে না। গর্ভবতী নারী ও অভিভাবকহীন শিশুসন্তানের জননীকেও সহমৃতা নিষিদ্ধ করা হয়। কোনো সতীদাহের ঘটনায় নিকটবর্তী পুলিশ ফাঁড়িতে শীঘ্র সংবাদ জানাতে বলা হয়। ১৮১৭ সালের সেপ্টেম্বরে সহমরণকে নরহত্যার পর্যায়ভুক্ত করে শান্তির নির্দেশ দেওয়া নখ। তা সত্ত্বেও সতীদাহ নিবারণে ধুরন্ধর সমাজপতিরা নিরস্ত থাকেননি।

সমাজদেহ থেকে সতীদাহ সম্পূর্ণ নির্মূল করার জন্য নবজাগরণ যুগের শিক্ষিত সম্প্রদায় বিশেষভাবে সক্রিয় ভূমিকা নেন। রাজা রামমোহন রায় ও দ্বারকানাথ ঠাকুর নেতৃত্ব দেন। রামমোহনের বড়োদাদার স্ত্রী সহমৃতা হন। রামমোহন তখন রংপুরে। রামমোহন এই ঘটনার সতীদাহ নিবারণকল্পে বিশেষ উৎসাহী ও উদ্যোগী হয়ে প্রবল আন্দোলন চালান। রামমোহন সমাজ-সংস্কারের কাজে পথিকৃৎ ছিলেন। হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথার কুফল সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। সমাজ-সংস্কারক হিসেবে প্রথমেই হিন্দু নারীদের দুরবস্থার ওপর তাঁর দৃষ্টি পড়েছিল। নারী আন্দোলনের তিনি পথপ্রদর্শক। তিনি সর্বাধিক কুৎসিত লোকাচার সতীদাহকে ধিক্কার জানিয়ে আন্দোলনে অগ্রণী হন।

সতীদাহ নিবারণের জন্য ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে নভেম্বর মাসে সহমরণ বিষয়ে 'প্রবর্তক নিবর্তকের সংবাদ' এবং ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে 'সহমরণ বিষয়ে প্রবর্তক নিবর্তকের দ্বিতীয় সংবাদ' রচনায় প্রমাণ করেন যে, স্মৃতিশাস্ত্রে বিধবাদের সংযমী জীবনযাপনের কথা বলা হয়েছে। সহমরণের কোনো প্রস্তাব নেই। মানবতাবোধ ও শাস্ত্রমতে সতীদাহ নিন্দনীয়। এ কাজ নরহত্যা ছাড়া আর কিছু নয়। ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে 'সংবাদ কৌমুদী' পত্রিকার মাধ্যমে সতীদাহ নিবারণের সপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে প্রয়াসী হন। এই বর্বর প্রথা অবসানের জন্য তিনি মানুষের বুদ্ধি, কাণ্ডজ্ঞান ও মানবতার কাছে আবেদন করেন। এ ব্যাপারে সরকারের কাছেও বহু আবেদনপত্র পাঠান। রামমোহনের আন্দোলনের বিরুদ্ধে রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে রক্ষণশীল হিন্দুদের প্রতিবাদও সমান্তরালে প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা ডিসেম্বর ১৭ নং রেগুলেশন দ্বারা লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সতীদাহ নিষিদ্ধ করেন। সতীদাহ নিবারণে রামমোহনের সংগ্রাম সেকালের বিচারে এক গুরুত্বপূর্ণ, সাহসিক, ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এবং নারীসমাজের পক্ষে খুবই কল্যাণকর। এছাড়া রামমোহন স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার, অসবর্ণ বিবাহ, বিধবাবিবাহ প্রভৃতির পক্ষে এবং জাতিভেদ, বাল্যবিবাহ, কৌলীন্যপ্রথা ও পুরুষের বহু বিবাহের বিপক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি হিন্দু আইন সংশোধন করে নারীদের পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভের জন্যও ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে একটি পুস্তিকা রচনা করে বলিষ্ঠ মন্তব্য রাখেন। গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন, কন্যাসন্তানের হত্যা প্রভৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। বেন্টিঙ্ক গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন নিষিদ্ধ করেন।

রামমোহনের অনুগামী হিন্দু কলেজের অধ্যাপক ডিরোজিওর শিষ্যবৃন্দ গুরুর অনুপ্রেরণায় হিন্দু সমাজের রক্ষণশীলতা, গতানুগতিকতা, বর্বর কুপ্রথা, পৌত্তলিকতা, জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক ব্যবহার, নারী নির্যাতন, দাসপ্রথা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ এবং সমাজের আরও বহু কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ইয়ং বেঙ্গল দেখিয়ে দেয় কতকগুলি অসার পচনশীল প্রথাকে আঁকড়ে ধরে হিন্দু সমাজ অবক্ষয়ের অতলে তলিয়ে যেতে বসেছে। তবে তারা স্বাধীন চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিচর্চার নামে মদ্যপান, গোমাংস ভক্ষণ ও পৈতে ছিড়ে ফেলা প্রভৃতি উচ্ছৃঙ্খলতাকে বহুস্থলে প্রশ্রয় দেন। ইয়ং বেঙ্গলের অন্যতম নেতা রাধানাথ শিকদারের ভ্রান্ত ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, 'গোমাংস' না খেলে জাতির মঙ্গল নেই। অধিক গোমাংস খেয়ে চর্মরোগে তাঁর মৃত্যু হয়। সে যা হোক, ডিরোজিও এবং তাঁর শিষ্যবৃন্দ সমাজ থেকে অন্ধ আচার-অনুষ্ঠান, কুপ্রথা, কুসংস্কার ও অজ্ঞানতা দূর করার জন্য বদ্ধপরিকর ছিলেন। স্বাধীন যুক্তি ও চিন্তাবহির্ভূত কোনো জিনিসকে তাঁরা ব্যবহারযোগ্য মনে করেননি। তবে গঠনকর্ম অপেক্ষা ধ্বংসসাধনের দিকে তাঁদের সর্বশক্তি নিয়োজিত হয়েছিল। ত্রুটি সত্ত্বেও একথা স্বীকার্য যে, ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর কার্যকলাপের মাধ্যমে জাতির জড়তা দূর হয়ে মুক্ত জীবনাদর্শ বিস্তৃতির পথ অনেকটা প্রশস্ত হয়ে যায়। নানা আচার ও কুসংস্কারগ্রস্ত সমাজে তাঁরা ছিলেন বন্ধনহীন চঞ্চল উদ্দাম জীবনের উপাসক। ঐতিহাসিক দিক থেকে এর গুরুত্ব অবশ্য স্বীকার্য।

কলকাতায় এ সময় মদ্যপান, বেশ্যাসক্তি, লাম্পট্য প্রভৃতি ব্যভিচার অনাচারের স্রোত বাবু-সমাজে প্রবল ছিল। অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এই দোষে নৈতিক অধঃপতনে কলঙ্কিত ছিল। ১৮৬৪ সালে প্যারীচরণ সরকার কলকাতায় সুরাপান নিবারণের জন্য একটি সমিতি গঠন করেন। রাজনারায়ণ বসু মেদিনীপুরে সুরাপান নিবারণী সভা স্থাপন করেন। রাধাকান্ত দেব, ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও বিদ্যাসাগর মদ্যপানের অত্যন্ত বিরোধী ছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অক্ষয়কুমার দত্ত পরিমিত সুরাপান করতেন।

ইয়ং বেঙ্গলের 'মদ খাওয়া ও খানা খাওয়া' ছাড়া আর একটি ঘটনা হিন্দুসমাজে প্রবল আন্দোলন তোলে-'গেল গেল হিন্দুয়ানি'। সেটি 'কালীপ্রসাদী হেঙ্গাম' নামে সুপরিচিত। হাটখোলার কালীপ্রসাদ দত্ত 'বিবি আনার' নামক এক পরমাসুন্দরী মুসলিম মহিলাকে উপপত্নী রাখেন। তিনি জাত্যন্তরিত হলে তাঁর সমর্থকরা তাঁকে জাতিতে তোলে। কালীপ্রসাদী হেঙ্গাম ও ইয়ং বেঙ্গলের কার্যকলাপ জাতপাতের বন্ধন শিথিল করে সমাজে পরিবর্তনের ঢেউ তোলে।

ব্রাহ্মসমাজ বিশেষ করে কেশবচন্দ্র সেন সমাজ-সংস্কারে বিশেষভাবে ব্রতী হন। তিনি নব্য ব্রাহ্মদের সহায়তায় পুরুষের বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ ও জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন চালান। কেশবচন্দ্র সেন সর্বভারতীয় সমাজ-সংস্কারক হিসেবে পরিচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে ব্রাহ্মত্ম-সমাজ অসবর্ণ বিবাহ, বিধবাবিবাহ, স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার, সমাজসেবা, পর্দাপ্রথা বর্জন প্রভৃতি বিভিন্ন সমাজসংস্কারমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করে। ১৮৭২ সালে ভারতীয় বিবাহ আইন পাশ হয়। অসবর্ণ বিবাহ আইনসিদ্ধ হয়। বিবাহে পাত্রপাত্রীর বয়স যথাক্রমে আঠারো ও ষোলো বছর আবশ্যিক হয়। বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হয়। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ বৈধ ঘোষিত হয়। পৌত্তলিকতা ও জাতিভেদ ত্যাগ করা হয়। কেশবচন্দ্র 'সুলভ সমাচার' নামে সুলভ মূল্যের পত্রিকা বের করে সমাজ-সংস্কারের আদর্শ সর্বসাধারণের মধ্যে প্রচার করেন। 'মদ না গরল' এক পয়সা দামের পত্রিকার দ্বারা শ্রমিকদের মধ্যে সুরাপান বন্ধের প্রচার চালান। ব্রাহ্মসমাজের আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এদের সমাজ-সংস্কারের ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে হিন্দুসমাজ বহুলাংশে রক্ষণশীলতা ও গোঁড়ামি পরিত্যাগ করে। ব্রাহ্মসমাজের নারীমুক্তির আদর্শ হিন্দুনারীদের প্রভাবিত করে।

১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে এক রেগুলেশনে দাসপ্রথা ও দাসের ক্রয়বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়। চৈত্র মাসে গাজন ও চড়ক পুজো উপলক্ষে ভক্তদের বড়শি বিঁধিয়ে বাঁশে বেঁধে অমানবিক ঘোরানো প্রথা ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে নিষিদ্ধ করা হয়।

রামমোহনের আন্দোলনে সতীদাহ আইনে নিষিদ্ধ হয়। বিধবা নারীরা স্বামীর চিতায় জীবন্ত দগ্ধ হওয়া থেকে নিষ্কৃতি পেল। কিন্তু বিধবাদের সমস্যা জটিল হয়ে উঠল সমাজে। নারীকে স্বভাবধর্মের চরিতার্থতা এবং সুষ্ঠু ও সুস্থভাবে জীবন উপভোগ থেকে ভিন্ন ধরনের লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হল। বিধবাদের আহারে বিধিনিষেধ কড়া করা হল। বারব্রত করে শুদ্ধাচারী জীবন কাটাতে বাধ্য করা হল। এর মধ্যে নিষ্ঠুর নিরম্বু অনাহারের একাদশী পালন অন্যতম। আর গোপনে তথাকথিত সম্ভ্রান্ত প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিরা বিধবা যুবতীদের সঙ্গে অবৈধ ক্রিয়াকলাপে লিপ্ত হল। সমাজের অভ্যন্ততে চলল নানা অনাচার ও ভ্রুণ হত্যা হত্যাদি পাপক্রিয়া। বিধবা নারীকে সমাজপতিরা দেবীর আসনে বসিয়ে তাদের হৃদয়কে বিশুষ্ক করে তুলল। প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষ বিদ্যাসাগর তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করে বিধবা নারীদের মুক্তি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বিধবা-বিবাহ সমাজে চালু করার জন্য তিনি দিন বদলের পালায় বৈপ্লবিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন।

No comments:

Post a Comment