Breaking

Wednesday, June 17, 2026

বাংলা সাহিত্যের আদি যুগ: চর্যাগীতি পদাবলী

চণ্ডীমঙ্গলকাব্যের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী

ষোড়শ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত মানিক দত্ত, দ্বিজমাধব, মুকুন্দরাম, মুক্তারাম সেন, জয়নারায়ণ সেন, ভবানীশংকর ও আরও অনেকে চণ্ডীমঙ্গল কাব্য রচনা করেন। তাঁদের সকলকে ছাড়িয়ে গেছেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিভাশীল কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী।

ভূমিকা মঙ্গলকাব্যের প্রচলিত কাহিনির মধ্যে তিনি মৌলিক সৃজনীশক্তি ও অভিনব কলানৈপুণ্যের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। দেবতার মহিমাকাহিনি লিখতে বসে তিনি আমাদের চিরপরিচিত এই লৌকিক সংসারে সুখ-দুঃখ হাসি-কান্না বিজড়িত মানব-মানবীর জীবনচিত্রকেই পরম শ্রদ্ধাসহকারে পরিস্ফুট করেছেন। অপরিমেয় মানবরসের শিল্পসৌকর্য সৃষ্টিতে ও মানবতার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি আধুনিক জীবনচেতনার সিংহদ্বারে এসে পৌঁছেছেন।

মুকুন্দরামের আবির্ভাব কাল সম্পর্কে সঠিক কিছু জানা যায় না। কবি যে কাহিনি আত্মপরিচয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন তাতে পরস্পরবিরোধী তথ্যের সন্নিবেশ ঘটেছে। আত্মপরিচয়টি সংক্ষেপে এই-বর্ধমান জেলার দামুন্যা গ্রামে সাতপুরুষের বসবাস ছিল। পিতামহ জগন্নাথ (* এ পর্যন্ত প্রাপ্ত সব পৃথিতে মুকুন্দ চক্রবর্তী-র নাম পাওয়া গেছে। কিন্তু 'মুকুন্দরাম' নামটি বহুল পরিচিত হয়ে গেছে।) মিশ্র, পিতা হৃদয় মিশ্র, মাতার নাম দৈবকী, কবিচন্দ্র দাদা। কবি চন্ডীর স্বপ্নাদেশে কাব্য রচনা করেন। চাষবাষই ছিল কবিদের জীবিকা। দামুন্যার তালুকার গোপীনাথ নন্দীর জমি ভোগ করতেন।

আত্মপরিচয় বেশ শান্তিতেই কবির দিন কাটছিল। এমন সময় দারুণ রাজনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হল। গৌড়বঙ্গ উৎকলের অধিকর্তা সুশাসক মানসিংহের সুবেদারির কালে ডিহিদার অর্থাৎ পরগনার শাসনকর্তা মামুদ শরিফের অত্যাচারে দেশের শান্তি নষ্ট হল। অত্যাচারে গ্রামের লোকেরা সাতপুরুষের ভিটে-মাটি ছেড়ে দেশান্তরী হতে লাগল। কবিও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে নিয়ে পথে বের হলেন। পথে গোপড়িয়া গ্রামের এক পুকুরপাড়ে স্নান সেরে কবি শালুক পোড়া দিয়ে গৃহদেবতার পুজো করলেন। পরিশ্রমে ক্লান্ত ও ক্ষুধা তৃয়ায় কাতর কবি ঘুমিয়ে পড়লেন। আর স্বপ্নে দেবী চণ্ডী তাঁকে কাব্য লিখতে নির্দেশ দিলেন-

'মা কৈল পরম দয়া/দিল চরণের ছায়া/আজ্ঞা দিল রচিতে কবিত্ব।'

স্বপ্নকে দেবীআজ্ঞা বলে শিরোধার্য করে আবার পথ হাঁটতে শুরু করলেন। শেষে মেদিনীপুরের ব্রাহ্মণভূমির জমিদার বাঁকুড়া রায়ের আশ্রয় পেলেন। বাঁকুড়া রায়ের পুত্র রঘুনাথ রায়ের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হলেন কবি-

'সুধন্য বাঁকুড়া রায়/ভাঙ্গিল সকল দায়/শিশুপাঠে কৈলা নিয়োজিত।'

বাঁকুড়া রায়ের মৃত্যুর পর রঘুনাথ জমিদারিতে বসলেন। তাঁরই অনুরোধে কবি মুকুন্দরাম চন্ডীমঙ্গল কাব্য রচনা করেন এবং রঘুনাথ কবিকে কবিকঙ্কণ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন। মুকুন্দরামের কাব্যের নাম 'অভয়ামঙ্গল'। কবিকঙ্কণ চণ্ডী নামেও এটি অভিহিত।

আবির্ভাব মুকুন্দরামের আত্মজীবনী খুবই গুরুত্বপূর্ণ রচনা। এতে সমকালীন রাষ্ট্রিক ইতিহাস ও বাস্তব সমাজচিত্র এবং কবির ব্যক্তিগত দুঃখ-দুর্দশাময় জীবনের অকৃত্রিম পরিচয় লিপিবদ্ধ। কিন্তু মুশকিল হয়েছে তাঁর আবির্ভাব কাল ও গ্রন্থ রচনার তারিখ নিয়ে। কবি গ্রন্থ রচনার কালজ্ঞাপক যে পরিচয় দিয়েছেন তা বিশ্লেষণ করে পাওয়া যায় ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে-

'শাকে রস রসে বেদ শশাঙ্ক গণিতা। কতদিনে দিলা গীত হরের বণিতা।'

কাব্যরচনার কাল নিয়ে সমস্যা রয়েছে। তবে পণ্ডিতেরা অনুমান করেছেন মুকুন্দরাম ষোড়শ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের বর্তমান ছিলেন। মুকুন্দরামের আত্মপরিচয়ে তৎকালীন দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের বিশ্বস্ত পরিচয় মেলে। রচনাটি সরস ও সাহিত্য গুণান্বিত। চন্ডীমঙ্গল কাব্যের প্রবেশক হিসাবে এটির যথেষ্ট ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে।

কাব্য-বৈশিষ্ট্য মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল কাব্যে 'অম্বিকামঙ্গল', 'গৌরীমঙ্গল' ও 'অভয়ামঙ্গল' নামগুলি পাওয়া যায়, তবে সাহিত্যের আলোচনায় 'অভয়ামঙ্গল'ই অধিক ব্যবহৃত। মুকুন্দরাম পূবর্তন কাহিনিকেই নবতর রূপদান করেন। তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব মানুষের কাহিনির মধ্যে বৈচিত্র্য সৃষ্টি। তৎকালীন সমাজের প্রতি বাস্তব দৃষ্টি নিয়ে অসীম কৌতূহল ও শ্রদ্ধাসহকারে দারিদ্র্য লাঞ্ছিত মানুষের সুখ-দুঃখের জীবনযাত্রার তিনি নিখুঁত ছবি এঁকেছেন। আর এই জীবনের কাহিনি রূপায়ণে তিনি হুবহু বাস্তবকেই সোজাসুজি তুলে ধরোনি, বাস্তবকে কল্পনার অনুভূতিতে রসাশ্রিত করে তুলেছেন।

মানব রস কবির উদার মনোভাবের জন্যই উচ্চনীচ, ভদ্র-অভদ্র, সাধু-ভণ্ড, হিন্দু-মুসলমান সকল শ্রেণির চরিত্রের লীলারস তিনি নিরপেক্ষ সমাজসচেতন শিল্পীর মতো উপলব্ধি করে তাঁদের চরিত্র চিত্রণে প্রয়াসী হন। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের আরোপ ও জীবনরসের প্রাচুর্যে মুকুন্দরাম মধ্যযুগের মাটিতে দাঁড়িয়েও আধুনিক মানবধর্মের প্রবক্তা। কারোর প্রতি তাঁর বিদ্বেষ, ঘৃণা বা কোনো প্রকার অনুদার মনোভাব ছিল না। জীবনরসিক কবি জীবনের রসসৃষ্টিতে সকলকেই সমদৃষ্টিতে গ্রহণ করেছেন। মুসলমানদের বর্ণনা প্রসঙ্গে তাঁদের রীতিনীতি আচার-ব্যবহার ও ধর্মকর্মের নিপুণ বর্ণনা পাওয়া যায়।

কবির অঙ্কিত প্রত্যেকটি চরিত্র জীবন্ত ও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। গ্রামবাংলার সমাজ ও সর্বশ্রেণির মানুষ তাঁর কাব্যে ভিড় করে এসেছে। নীচ জাতি থেকে শুরু করে ঠগ, ভন্ড, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বৈদ্য, দাসী, স্বর্ণকার ও দরিদ্র ব্যাধ প্রভৃতি বিচিত্র ব্যাপক বাঙালি জীবনের রূপকার। কবির অঙ্কিত ধূর্ত বেনে মুরারিশীল, প্রবঞ্চক ভাঁড় দত্ত, স্বার্থপরায়ণ দুর্বলা দাসী প্রভৃতি চরিত্র একান্তভাবে এই ধূলা মাটি সংসারের মানুষ। স্থূলবুদ্ধি অশিক্ষিত ও অমার্জিত কিন্তু সরল মনের অধিকারী কাব্যের নায়ক কালকেতুর ব্যাধসুলভ বা স্বভাবসুলভ চরিত্রটি খুবই জীবন্ত। প্রকৃতিগত সারল্য, বিশ্বাসপ্রবণতা, বীরত্ব, ক্রোধ, ভীরুতা ও সন্ধিগ্ধচিত্ততা প্রভৃতি বিচিত্র গুণের সমাবেশে কালকেতুকে কবি আকৃতি প্রকৃতিতে স্বাভাবিকতা বজায় রেখে অখন্ড ব্যাধচরিত্রের সামগ্রিকতায় একান্ত বাস্তবানুগ ও জীবন্ত করে গড়ে তুলেছেন। তার স্ত্রী ফুল্লরা যথার্থ পতিভক্তিপরায়ণা কর্মঠ ও পরিশ্রমী ব্যাধপত্নী। সে বুদ্ধিমতী ও বাক্চাতুর্যে অতুলনীয়। মধ্যযুগের শ্রমজীবী নারীর সাধারণ বৈশিষ্ট্য নিয়ে ফুল্লরা ফুটে উঠেছে। ভাঁড়ু দত্ত এক অসাধারণ ঈর্ষাপরায়ণ শঠ ব্যক্তি। শাঠ্যবৃত্তিতে খল স্বভাবে ও বাক্চাতুর্যে সে অদ্বিতীয়। জুয়াচোর ভাঁড়ুদত্তের বেশভূষা, বাক্চাতুর্য ধূর্তামি, স্বার্থপরতা ও নিলজ্জতা কবি দক্ষ শিল্পীর মতো ফুটিয়ে তুলেছেন।

মুকুন্দরামের মুরারি শীল এক অভিনব সৃষ্টি। এই চরিত্রটি মুকুন্দরামের পূর্বে রচিত হয়নি। এটি মুকুন্দয়ামের মৌলিক সৃষ্টি। উপস্থিত বুদ্ধি, ধূর্ততা ও বানৈপুণ্যে সে অদ্বিতীয়। কালকেতু দেবীপ্রদত্ত সোনার আংটিটি ধূর্ত প্রবঞ্চক বেনে মুরারি শীলের কাছে বিক্রি করতে গেলে সে নামমাত্র মূল্যে সেটা আত্মসাৎ করতে চায়। মুরারি জানে কালকেতু রাস্তাঘাটে কোথায় কুড়িয়ে পেয়েছে আংটিটি। সোনার জিনিস সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা নেই। কাজেই অশিক্ষিত ও স্বর্ণঅনভিজ্ঞ কালকেতুকে সোনার জিনিসকে পিতল বললে কিছু মনে করবে না। সে বলে আংটিটি পিতলের, তার মূল্য যৎসামান্য।-

'সোনারূপে নহে বাপা এ বেঙ্গা পিতল।/ঘসিয়া মাজিয়া বাপু কর‍্যাছ উজ্জ্বল।।'

কিন্তু যখন দেখল কালকেতু আংটিটি অন্যত্র বিক্রয় করতে উদ্যত, তখন সে সব কথাকেই পরিহাস করে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করল- 'এতক্ষণে পরিহাস কৈলু ভাইপোরে'। মুরারির পত্নীও স্বামীর শাঠ্যের যোগ্য সহচরীরূপে জীবন্ত। ভাঁড় ও মুরারি দুজনেই শঠতায় সমাজের কলঙ্ক। রবীন্দ্রনাথের মতে মুকুন্দরামের সহানুভূতির সংস্পর্শে ভাঁড় দত্ত তার সমস্ত অনাবশ্যক বাহুল্য বর্জন করে একটি সমগ্র রসের মূর্তিতে প্রতিভাব হয়েছে। মুকুন্দরামের সব চরিত্র সম্পর্কে এ কথা প্রযোজ্য। ধনপতি, লহনা, খুল্লনা প্রভৃতি সুখেদুঃখে জয়পরাজয়ে ঈর্শায় কুটিলতায় পরম আকর্ষণীয় রসবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

পশুপ্রকৃতি মুকুন্দরামের সহানুভূতি ছিল অতিশয় ব্যাপক। পশুপ্রকৃতির মধ্যে মানবীয় ভাবের আরোপ করে মুক ইতর প্রাণীর মর্মবেদনাকে রস-সমৃদ্ধ করে তুলেছেন। কালকেতুর আক্রমণে বিপর্যন্ত ও ভয়ার্ত বনের পশুরা দেবী চণ্ডীর নিকট আত্মরক্ষার্থে করুণা প্রার্থনা জানায়। ভালুক বলে- 'উই চোরা খাই পশু নামেতে ভালুক/নেউগী চৌধুরী নই না করি তালুক।।' হস্তিনীর বিলাপও করুণ বেদনায় হৃদয়স্পর্শী হয়ে উঠেছে। হাতির বিরাট দেহ, বিরাট আকার-তার পক্ষে কালকেতুর দৃষ্টি এড়িয়ে বনে লুকিয়ে থাকা সম্ভব নয়। তার পুত্র কমললোচন কালকেতুর হাতে মারা গেছে।

হস্তিনী কেঁদে বলে-

'বড় নাম বড় গ্রাম বড় কলেবর।/ লুকাইতে স্থান নাই বীরের গোচর।/
পলাইয়া কোথা যাই কোথা গেলে তরি।/ আপনার দত্ত দুটা আপনার অরি।।'

আদি বীর বরাহ জানায় সে কাউকে হিংসা করে না। মুথা ঘাস খেয়ে জীবনযাপন করে। তবুও কালকেতু তার স্বামী, পুত্র, ননদ, ভাসুর সবাইকে মেরে ফেলেছে। নানাপ্রকার হরিণ, ধুলায় লুটিয়ে কেঁদে বলে-

'কেন হেন জন্ম বিধি কেন পাপ বংশে/হরিণ ভুবন বৈরী আপনার মাংসে।'

রসসৃষ্টি কবি প্রতিভার চূড়ান্ত উদ্‌ঘাটিত হয়েছে করুণ রসসৃষ্টিতে। মানবজীবনের দুঃখদুর্দশার কাহিনি তাঁর কাব্যে নিবিড় রসসৌকর্য তৈরি করেছে। তাই বলে তিনি দুঃখবাদী বা Pessimistic কবি নন। তিনি দুঃখ বর্ণনার কবি। জীবনের প্রতি তাঁর কোনো নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, ছিল স্নিগ্ধ প্রশান্ত মমত্ববোধ। কবি নিজে অনেক দুঃখ পেয়েছেন এবং বিপুল বাঙালি সমাজের শোচনীয় দুঃখকষ্টের সঙ্গে তাঁর আন্তরিক যোগ সাধিত হয়েছিল। কিন্তু ব্যঙ্গবিদ্রুপে 'তির্যক দৃষ্টিতে' স্মিত কৌতুকে তিনি জীবনের সমস্ত দুঃখবেদনা হতাশার ঊর্ধ্বে আনন্দলোকে বিচরণ করেছেন। তাঁর কাব্যে দুঃখের বর্ণনা আছে, তার থেকে বড়ো কথা আছে দুঃখ অতিক্রমণের আনন্দ সংগীত।

করুণরসের সঙ্গে সঙ্গে রঙ্গব্যঙ্গ হাস্যরস সৃষ্টিতে মুকুন্দরাম মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে উজ্জ্বল আলোকস্তম্ভের মতো বিরাজমান। তিনি ছিলেন একজন বড়ো হিউমারিস্ট (Humourist)। শিবপার্বতীর বিবাহে, কালকেতুর ভোজনের তালিকায়, গুজরাট নগর পত্তনে মুসলমান ব্রাহ্মণদের বর্ণনায় ও সর্বোপরি ভাঁড় দত্তের কাহিনি সৃষ্টিতে মুকুন্দরাম অনাবিল হাস্যরস উজাড় করে দিয়েছেন। এতে কোথাও ব্যঙ্গের জ্বালা বা জীবনের তিক্ততা প্রকাশ পায়নি। সর্বত্রই রয়েছে এক প্রসন্নতা সজীবতা। কালকেতুর ভোজনে, শিবের দারিদ্র্য, মুরারির শঠতা, ধনপতির লালসা ও ভাঁড়ুর নির্লজ্জতার মধ্যে হাস্যরসের নির্মল স্রোত প্রবাহিত।

ফুল্লরার বারোমাসের দুঃখ বর্ণনা করতে গিয়ে মুকুন্দরাম তাঁর কবিপ্রতিভাবে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিয়েছেন। কালকেতু ফুল্লরার দুঃখদুর্দশার মধ্যে মধ্যযুগের মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনকথাই জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

'মাংসের পসরা লইয়া ফিরি দ্বারা দ্বারে / কিছু খুদ গুঁড়া পাই উদর না ভরে।।'
কিংবা 'দুঃখ কর অবধান, দুঃখ কর অবধান/আমানি খাবার গর্ত দেখ বিদ্যমান'।

ফুল্লরার বারোমাসের দুঃখবর্ণনায় বাংলার ঋতুচক্র মানুষের দারিদ্র দুর্দশার সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়ে জীবন্তরূপ লাভ করেছে।

উপসংহার মুকুন্দরামের ভাষা ও রচনারীতি পূর্বের কবিদের থেকে অনেক মার্জিত ও অলংকারসমৃদ্ধ। বর্ণনার প্রাঞ্জলতায়, উপমা ও চিত্রকল্প ব্যবহারে, লোকিক আবহ সৃষ্টিতে তিনি যথেষ্ট শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন। মঙ্গলকাব্যের সীমাবদ্ধ আবেষ্টনীর অনেক ঊর্ধ্বে মানবজীবনের স্বচ্ছন্দ লীলাভূমিতে বিচরণ করেন। তিনি সীমাবদ্ধ কালকে পেরিয়ে চিরকালীন মানুষের জীবনধর্ম উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন। সামাজিক মানুষের সংঘাত বিক্ষুব্ধ জীবনের বাস্তব কাহিনি রূপায়ণে তিনি যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত চরিত্রগুলি তুলে ধরেছেন- তাতেই তাঁর কবিপ্রতিভা ঔপন্যাসিকের সমধর্মী হয়ে আধুনিক জীবন-চেতনার সগোত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুকুন্দরামের কাব্যে মনুষ্য জীবনই দেবতার ঊর্ধ্বে প্রাধান্য পেয়েছে এবং অলৌকিক আখ্যানবস্তু নামমাত্রই ক্ষীণ সংযোগ রক্ষা করে অপ্রধান হয়ে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে ড. শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় যথার্থই বলেছেন যে, মুকুন্দরামের কবিকঙ্কণ চন্ডীতে স্ফুটোজ্জ্বল বাস্তবচিত্রে, দক্ষ চরিত্রাঙ্কণে, কুশল ঘটনাসন্নিবেশ ও সর্বোপরি অখ্যায়িকা ও চরিত্রের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম ও জীবন্ত সম্বন্ধ স্থাপনে আমারা ভবিষ্যৎকালের উপন্যাসের বেশ সুস্পষ্ট পূর্বাভাস পেয়ে থাকি। দক্ষ ঔপন্যাসিকের অধিকাংশ গুণই তাঁর মধ্যে বর্তমান ছিল। এযুগে জন্মগ্রহণ করলে তিনি যে কবি না হয়ে একজন ঔপন্যাসিক হতেন, তাতে সন্দেহ নেই।

No comments:

Post a Comment