বাংলা ভাষা বিকাশের আগে বাঙালি কবিদের সাহিত্যচর্চা
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনায় বাঙালি কবিদের বাংলা ভাষায় রচিত গ্রন্থাবলি আলোচনা করতে হয়। বাঙালি অন্য কোনো ভাষা-সংস্কৃত, প্রাকৃত-অপভ্রংশ বা আধুনিক যুগে ইংরেজি ভাষায় কী লিখেছে তা জানার প্রয়োজন নেই মনে হতে পারে। ভারতীয় ভাষাগুলির উদ্ভব ও বিকাশের ক্ষেত্রে প্রাচীন ভারতীয় আর্য, মধ্যভারতীয় আর্য ও নব্য ভারতীয় আর্য ভাষার প্রধানত তিনটি পর্যায় আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি। এস্থলে বাংলাভাষার উদ্ভবের পূর্বে পূর্ববর্তী ভিন্ন ভাষায় বাঙালির সৃষ্টি প্রতিভা কীভাবে অগ্রসর হয়েছে তা জানা দরকার। কারণ আরম্ভেরও আরম্ভ আছে, প্রদীপ জ্বালাবার আগে সলতে পাকাতে হয়। কোনো সৃষ্টি সম্পূর্ণভাবে আপনাতে আপনি সম্পূর্ণ নয়, তার পূর্বাপর একটা যোগসূত্র থাকে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদিমতম নিদর্শন চর্যাগীতি কবিতাবলি খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে রচিত। মাতৃভাষা জন্মের পূর্বে বাঙালি তৎকাল প্রচলিত প্রাচীন ভারতীয় আর্য ও মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষায় বাঙালি প্রতিভা বিকাশে প্রয়াসী হয়েছে।
চর্যার পূর্বে বাংলাদেশে গুপ্তযুগ থেকে সেনযুগ পর্যন্ত সংস্কৃত ভাষায় স্মৃতিপুরাণ, ন্যায়দর্শন ও ব্যাকরণ অভিধান এবং রাজপ্রশস্তি, দেবস্তৃতি রচিত হয়েছে। এই সময় বাংলাদেশে সংস্কৃত রচনার গৌড়ীরীতি সুপ্রচলিত ছিল। অনুপ্রাসের বাহুল্য, শব্দাড়ম্বর ও ওজঃগুণসমৃদ্ধ বীররস এই রীতির লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। সংস্কৃত শিক্ষার জন্য টোল ও চতুষ্পাঠী বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে। বিদেশি পর্যটকরা বাঙালির সংস্কৃত চর্চায় পান্ডিত্য ও জ্ঞানস্পৃহার প্রশংসা করেছেন।
পালযুগে দর্শন, ব্যাকরণ, অলংকার, জ্যোতিষবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা এবং সামাজিক আচার-সংস্কার বিধিবিধান নিয়ে বহু গ্রন্থ রচিত হয়। গৌড় অভিনন্দ ও অভিনন্দ নামে একাধিক কবির নাম পাওয়া যায়। সন্ধ্যাকর নন্দীর 'রামচরিত' কাব্যটি অভিনব। এতে রাজা রামপাল ও রামচন্দ্রের কাহিনী সার্থক ভাষায় বর্ণিত। 'চণ্ডকৌশিক' নাটক রচয়িতা ক্ষেমীশ্বর ও 'কীচকবধ'-রচয়িতা নীতিবর্মাকে বাঙালি বলা হয়। পাল রাজার সময়ে 'কবীন্দ্রবচন সমুচ্চয়' শীর্ষক সংকলন গ্রন্থ রচিত হয়। এতে একশো এগারোজন কবির পাঁচশো পঁচিশটি শ্লোক সংগৃহীত। বেশির ভাগ শ্লোক আদি-রসাত্মক। গ্রন্থটির প্রথম নাম ছিল 'সুভাষিত রত্নকোশ'। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী 'কবীন্দ্রবচন সমুচ্চয়' নাম রাখেন। এছাড়া শ্রীধর ভট্ট বৈশেষিক দর্শনের ওপর 'ন্যায়কন্দলী' রচনা করেন। ভবদেব ভট্টের 'ছান্দোগ্য কর্মানুষ্ঠান পদ্ধতি', জীমূত বাহনের 'ব্যবহার মৃত্তিকা', 'কালবিবেক' ও 'দায় ভার', চক্রপাণি দত্তের 'চিকিৎসা সংগ্রহ', 'আয়ুর্বেদদীপিকা', 'ভানুমতী', 'শব্দচন্দ্রিকা' ও 'দ্রব্যগুণসংগ্রহ' উল্লেখযোগ্য। গ্রন্থগুলি সামাজিক আচার অনুষ্ঠান, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, আয়ুর্বেদ চিকিৎসা সম্পর্কিত।
সেনযুগে ব্রাহ্মণ্য আদর্শপুষ্ট সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের অনুশীলন বেড়ে যায়। সেনযুগে বৈদিক যাগযজ্ঞ ও ক্রিয়ানুষ্ঠান খুব সমারোহে চলত। বল্লাল সেনের গুরু অনিরুদ্ধ 'হারলতা' ও 'পিতৃদয়িত' শীর্ষক দুটি গ্রন্থে হিন্দুদের নিত্যকর্ম ও নানা অনুষ্ঠানের আলোচনা করেন। বল্লাল সেন সুলেখক ছিলেন। 'ব্রতসাগর', 'আচারবাসর', 'প্রতিষ্ঠাসাগর' ও 'অদ্ভুতসাগর' নামক পাঁচটি গ্রন্থে ঝড়, ভূমিকম্প, গ্রহনক্ষত্রের অবস্থান ও শুভাশুভ লক্ষণ পর্যালোচনা করেন। পণ্ডিত ও সুলেখক হলায়ুধ 'ব্রাহ্মণ-সর্বস্ব', 'মীমাংসা-সর্বস্ব', 'বৈশ্বব-সর্বস্ব', 'শৈব-সর্বস্ব' ও 'পণ্ডিত-সর্বস্ব' গ্রন্থে হিন্দুদের বৈদিক ক্রিয়াকর্ম ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করতে প্রয়াসী হন। এ সময় বন্দ্যঘটীয় সর্বানন্দ 'টীকা-সর্বস্ব' গ্রন্থে অমরকোশের টীকাগ্রন্থ রচনা করেন। পুরুষোত্তম নামধারী দুজন সমসাময়িক বৌদ্ধ লেখক 'ব্যাকরণ' ও বৌদ্ধ বিষয়ক কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, লক্ষণ সেনের মহাসামন্ত বটুকদাশের পুত্র শ্রীধরদাশের 'সদুক্তি কর্ণামৃত' গ্রন্থটি। এতে চারশো পঁচাশি জন কবির দুহাজার তিনশো সত্তরটি কবিতা সংকলিত। কবিতাগুলিতে দেবতা, প্রেম-প্রকৃতি, রাজারাজড়ার স্মৃতি, বৃক্ষ লতাপাতা, পশুপক্ষী, দেশকাল ও কবিপ্রসঙ্গ প্রভৃতি বিচিত্র বিষয় স্থান পেয়েছে।
রাজা লক্ষণ সেনের সভা অলংকৃত করতেন উমাপতি ধর, গোবর্ধন আচার্য, শরণ, ধোয়ী ও কবি জয়দেব। এঁরা পঞ্চরত্ন নামে খ্যাত। উমাপতি ধর বাক্যবিন্যাসে সুপটু ছিলেন। লক্ষণ সেনের পিতামহ বিজয় সেনের দেওপাড়া প্রশস্তি তাঁর রচনা। শরণ দুর্বোধ্য দুরূহ পদ রচনায় পারদর্শী ছিলেন। গোবর্ধন আচার্য প্রেম ও শৃঙ্গার রসাত্মক সাতশো সংস্কৃত শ্লোকের 'আর্যাসপ্তশতী' গ্রন্থ রচনা করেন। ধোয়ী 'পবনদূত' ও 'সত্যভামাকৃষ্ণ সংবাদ' নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। দ্বিতীয়টি পাওয়া যায় নি। 'পবনদূত' কালিদাসের মেঘদূত কাব্যের অনুসরণে লেখা। কাব্যের নায়ক রাজা লক্ষণ সেন, নায়িকা গন্ধর্ব কন্যা কুবলয়বতী। কাব্যটি আদিরসাত্মক ও যৌন-শৈথিল্যের পরিচয়বাহী। লক্ষণ সেনের সভাকবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জয়দেব 'গীতগোবিন্দ' কাব্য রচনা করেন। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা এই কাব্যে প্রাকৃত ও অপ্রাকৃত জীবনাদর্শের সমন্বয়ে নতুন ঐতিহ্য লাভ করেছে। পরবর্তী প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ওপর এই কাব্যের প্রভাব অপরিসীম। জয়দেবের সংস্কৃত ভাষায় বাংলা ভাষার বাগুঙ্গি উকিঝুঁকি মেরেছে। যেমন-
সংস্কৃত সাহিত্যের পাশাপাশি বাঙালি প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষায় গ্রন্থ রচনায় ব্রতী হন। তবে বেশির ভাগ গ্রন্থ বাংলার বাইরে রচিত। চতুর্দশ শতকে রচিত 'প্রাকৃত পৈজাল' নামক ছন্দবিষয়ক গ্রন্থের একাধিক শ্লোক বাঙালি কবির রচনা বলে অনুমিত। বাঙালি জীবনের ভোগবিলাসের চিত্র একটি কবিতায় মেলে-
-অর্থাৎ আঁকাড়া চালের ভাত, মৌরলা মাছের তরকারি, গাওয়া ঘি, দুধ ও নালচে শাক প্রিয়া স্ত্রী কলাপাতায় পরিবেশন করছে, পুন্যবান স্বামী খাচ্ছে।
এছাড়া হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও প্রবোধচন্দ্র বাগচি আবিষ্কৃত দোহাকোশে বাঙালির সাধন ভজনের গূঢ় ইঙ্গিত রয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় বাংলা ভাষা জন্মের পূর্বে বাঙালির প্রতিভা বিচিত্র দিকে তার স্বাক্ষর রেখেছে। ক্ষেত্র আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। মাতৃভাষা জন্মের পরই বাঙালির ভাবভাবনা ও চিৎপ্রকর্ষ সাবলীল গতি বাতাসে প্রবাহিত হয়ে চলল।
২. বাংলা গোড়াপত্তন
ভূমিকা
বাংলার সংস্কৃত চর্চা
বাংলা সাহিত্যের উৎপত্তির পূর্বে খ্রিস্টীয় পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত বাঙালি কাব্য সাহিত্যে নয়, ধর্মশাস্ত্র, দর্শন, ব্যাকরণ, অলংকার জ্যোতিষবিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র ও সামাজিক বিষয়ে সংস্কৃতে সৃষ্টিপ্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। খ্রিস্টীয় যষ্ঠ শতক থেকেই সংস্কৃতের প্রভাব কমতে থাকে এবং প্রাকৃত ভাষার চর্চা শুরু হয়。
প্রাকৃত চর্চা
প্রাকৃতের পর অপভ্রংশ ভাষাই সমগ্র উত্তর ভারতের সাহিত্যের ভাষা হয়ে ওঠে। পাল রাজবংশের রাজত্বকালে বাংলাদেশে অপভ্রংশ ভাষার গীতি ও গাথা রচিত হয়। কবি হালের 'গাথা সপ্তশতী', পিঙ্গলাচার্যের 'প্রাকৃতপৈঙ্গল' ও কৃষ্ণাচার্যের 'দোঁহাকোশ'- অপভ্রংশ রচনার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। এই অপভ্রংশের বিবর্তিত রূপের মধ্য দিয়েই বাংলা ভাষার উদ্ভব সম্পূর্ণ হয়। 'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়' দশম শতাব্দীর রচনা বলেই অনুমিত হয়েছে-সুতরাং এই শতককেই বাংলা সাহিত্যের গোড়াপত্তনের যুগ বলে ধরা যেতে পারে。
আদিযুগের রচনা অভিমত
আদিযুগে বাংলা রচনা বলে আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর 'বঙ্গভাষা ও সাহিত্য' গ্রন্থের 'হিন্দু বৌদ্ধযুগ' নামাঙ্কিত অধ্যায়ে শূন্যপুরাণ, মানিক চন্দ্রের গান, নাথগীতিকা, ডাক ও খনার বচন প্রভৃতিকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২৮0 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ফেলেছেন। অনেকে নাথগীতিকাকে চর্যার আগের রচনা মনে করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নাথ কাহিনি যে শতকে প্রচলিত থাক না, তার লেখ্যরূপ সপ্তদশ শতকের পূর্বে নয়。
রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণের রচনাকাল সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু বলা যায় না। উত্ত গ্রন্থের ভাষার মধ্যে আধুনিকতার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। শূন্যপুরাণের 'নিরঞ্জনের রশ্মি' অংশটি পঞ্চদশ শতাব্দীর কাহিনি নিয়ে লেখা। তাই শূন্য পুরাণের রচনাকাল ষোড়শ শতকের পূর্বের নয়। তবে গোড়ার দিকে ছড়াগুলি লোকমুখে আগে প্রচলিত থাকতে পারে。
ডাক ও খনার বচনকে সাহিত্য বলা যায় সাংস্কৃতিক। সমাজজীবনের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে এগুলির আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। আচার্য দীনেশচন্দ্র সেনের অভিমত-এগুলি অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর সাহিত্যকর্মের নিদর্শন বলে মানা যায় না。
দ্বাদশ শতাব্দীতে (১২২৯-৩০ খ্রি) মহারাষ্ট্রের চালুক্যরাজ সোমেশ্বরের নির্দেশে 'মানসোল্লাস' বা অভিলাষার্থ চিন্তামণি রচিত হয়। এই গ্রন্থের 'গীতবিনোদ' অংশে রাধাকৃয় গোপীলীলা বিষয়ক ও দশাবতার স্তোত্রের কিছু কিছু অংশ বাংলায় রচিত বলে আচার্য সুনীতিকুমার জানিয়েছেন। রচনাগুলি চর্যাগীতির সমসাময়িক রচনা বলা যেতে পারে। কিন্তু এই বিক্ষিপ্ত সামান্য রচনাকে বাংলা সাহিত্যের তালিকাভুক্ত করা যায় না, বাংলা ভাষার জন্মক্ষণের কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন পরিচয় হিসাবে ধরা যেতে পারে。
সিদ্ধান্ত
বাংলা ভাষার প্রাচীন রূপের পরিচয় রয়েছে ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত 'শেখা শুভোদয়' গ্রন্থের একটি প্রেমগীতিতে। এই গ্রন্থে রাম পালের মৃত্যু ও বিজয় সেনের রাজ্যপ্রাপ্তির বিষয়টি সন্নিবেশিত। আচার্য সুনীতিকুমারের মতে বাংলা ভাষায় এই প্রেমগীতিটি দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে রচিত。
মোটকথা, দ্বাদশ শতাব্দীতেই বাঙালির প্রতিভা বাংলা ভাষাকেই আশ্রয় করে সাহিত্য সাধনায় ব্রতী হয়। দ্বাদশ শতকেই বাংলা সাহিত্যের গোড়াপত্তন ঘটে। তুর্কি আক্রমণে বাঙালির রচিত সাহিত্যসম্ভার অনেক নষ্ট হয়ে গেছে, তা মনে করা অযৌক্তিক নয়। বাংলার প্রাচীন সাহিত্য সম্ভার যে-কোনো উপায়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন বাঙালিরা। তার প্রমাণ নেপাল রাজদরবারে আবিষ্কৃত চর্যাগীতি ও অন্যান্য রচনা। হয়তো ভবিষ্যতে কোনো প্রাচীন বাংলা সাহিত্য আবিষ্কৃত হতে পারে। যতদিন তা না হয়, চর্যাগীতিকেই বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসাবে আমরা গ্রহণ করব。
৩. বাংলা সাহিত্যের যুগ বিভাগ
ভূমিকা
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাগীতি পদাবলী। এর আবিষ্কারক পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে গ্রন্থটি তাঁরই সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। তারপর ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিতগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে চর্যার রচনাকাল দশ শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যেই হওয়া স্বাভাবিক। যা হোক, বাংলা সাহিত্যের গোড়াপত্তন ঘটেছে চর্যাগীতি থেকেই। অতঃপর হাজার বছর ধরে বাংলা সাহিত্যের ক্রমবিবর্তন ঘটেছে নানা শাখায় ও উপশাখায়。
সাহিত্যের ঐতিহাসিকেরা বাংলা সাহিত্যের ধারাকে কয়েকটি যুগে বিন্যস্ত করেছেন。
চর্যাগীতিকে নিয়ে বাঙালির যে সাহিত্য সাধনা তা আদিযুগের অন্তর্ভুক্ত। খ্রিস্টীয় দশম শতক থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মপ্রচারকদের দ্বারা চর্যাগীতির পদগুলি রচিত ও প্রচারিত হয়। আদিযুগের আর কোনো সাহিত্যিক নিদর্শন পাওয়া যায়নি। ত্রয়োদশ শতকের প্রথমে তুর্কি আক্রমণে দেশব্যাপী অরাজকতা ও ঘোরতর বিশৃংখল ও বিপন্ন অবস্থার জন্য বাংলা ভাষায় কোনো সাহিত্য রচিত হয়নি। কিংবা কিছু রচিত হয়ে থাকলেও বিপুল ধ্বংসের কবতে তা নষ্ট হয়ে গেছে।
তুর্কি আক্রমণের পর প্রায় আড়াইশো বছর কাল বাংলা সাহিত্যের কোনো নিদর্শন মেলেনি। এই সময়ে সাহিত্য প্রায় নিষ্ফলা বলেই একে 'অন্ধকার যুগ' নামে অভিহিত করা হয়েছে। চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রিক ঝড়-ঝাপ্টা ও দুর্যোগের পর সামাজিক জীবন একটু সুস্থির হওয়ায় সাহিত্যের মরা গাঙে আবার সৃষ্টির বান ডেকে যায়। এই সময় রাজারাজড়াদের পৃষ্ঠপোষকতায় সাহিত্য রচনার কাজ শুরু হয়। ত্রয়োদশ শতক থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত সমগ্র মুসলমান রাজত্বের যে সময়সীমা তাকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'মধ্যযুগ' নামে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মধ্যযুগ থেকেই বাংলা সাহিত্যে সৃষ্টির অফুরন্ত ফসল ফলেছে। বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃয়কীর্তনকে এই যুগের প্রথম পাদে রচিত বলে ধরা হয়েছে। সমকালীন যুগে অনুবাদ সাহিত্য রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবত, মনসামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল ও ধর্মমঙ্গল এবং বৈশ্বব পদাবলীর রচনাকার্য চলে। পদাবলী ধারার শাক্তপদাবলীর রচনাকাল সপ্তদশ শতক থেকে। ষোড়শ শতাব্দীতে যে যুগন্ধর মহামানবকে লাভ করে নবজাগৃতির আলোকে বাংলাদেশ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে-সেই মহাবতারের নাম শ্রীচৈতন্যদেব। এঁর অসামান্য চরিত্রের প্রভাবেও ধর্ম আন্দোলনে বাঙালির সমাজ, রাষ্ট্র, ঐতিহ্য ও মানসিকতার বিরাট পরিবর্তন ঘটে। মধ্যযুগের প্রায় সমস্ত ধারার সাহিত্য চৈতন্য-প্রভাবে বিবর্তন ও বিকাশের পথ দিয়ে বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করে।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যকে আবার চার ভাগে চিহ্নিত করা যেতে পারে:
| যুগের নাম | বৈশিষ্ট্য ও রচনাবলি |
|---|---|
| (১) চৈতন্য-পূর্ব যুগ | এর মধ্যে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, অনুবাদ সাহিত্য ও মনসামঙ্গল কাব্য পড়ে। |
| (২) চৈতন্য যুগ | চণ্ডীমঙ্গল কাব্য ও বৈয়বপদাবলী এই পর্বের বিশিষ্ট রচনা। |
| (৩) চৈতন্যোত্তর যুগ | মনসামঙ্গল কাব্য, চণ্ডীমঙ্গল কাব্য, শিবায়ন, ধর্মমঙ্গল কাব্য, নাথ সাহিত্য, রামায়ণ মহাভারতের অনুবাদ ও মুসলমান কবিদের প্রণয়মূলক উপাখ্যান প্রভৃতির মধ্যে বাঙালি প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর লিপিবদ্ধ। |
| (৪) যুগসন্ধি | শিবায়ন ও ধর্মমঙ্গল কাব্য, অন্নদামঙ্গল, শাক্ত পদাবলী, বাউল ও গাথাসাহিত্য এই সবই লেখা হয়েছে। যুগসন্ধিকালে পুরাতন ও নতুন জীবনাদর্শের সমন্বয়ের পরিচয় পাওয়া যায় বাংলা রচনায়। দীর্ঘকাল বাংলা সাহিত্যে যেসব ধর্ম ও দেবতার একাধিপত্য ছিল তা এই সময়ে হ্রাস পেতে থাকে। সাহিত্যে দৈবীচেতনার স্থলে মানব মহিমার প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। |
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে এদেশে ইংরেজ বণিকদের আগমন ঘটে। ধীরে ধীরে ইংরেজ জাতির আধিপত্য ও শাসনাধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পাশ্চাত্য শিক্ষা-দীক্ষার প্রভাবে বাংলাদেশে আধুনিক যুগ শুরু হয় এবং বাংলা সাহিত্যে ঋতু-পরিবর্তন ঘটে। বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকারের মতে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ থেকেই আধুনিক যুগ শুরু হয়-প্রাচীন যুগের অবসান ঘটে:
আধুনিক যুগ কবে থেকে শুরু তা নির্দিষ্ট তারিখ ও দিনক্ষণ হিসেবে নির্দিস্ট করে বলা যায় না। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দকেই মোটামুটিভাবে যুগান্তরের কাল হিসেবে ধরা হয়। এই সময়টাকে ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার রেনেসাঁস বা নবজাগরণের যুগ বলা হয়। (এ সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ 'ক' পর্যায়ে আলোচিত বাংলার নবজাগরণ আলোচনা দেখ)। নবজাগরণ বলতে পূর্বের থেকে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি-মানুষের সার্বিক জাগরণ-বিচিত্র দিকে চিন্তাভাবনা ও সৃষ্টির বিকাশ এবং অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায় বহমান কর্মধারা। মূলত ঈশ্বর গুপ্তের সময় থেকেই বাংলা সাহিত্যে মানবতন্ত্রী জীবনাদর্শের প্রতিষ্ঠা হওয়ায় আধুনিকতার সূত্রপাত হয় এবং সাহিত্য অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃতের প্রভাব থেকে মুক্তিলাভ করে। মানুষই সেখানে প্রধান স্থান পায়। এ সময় বাংলা সাহিত্যে গদ্যের প্রচলন শুরু হয়। মন্ত্রের যুগ শেষ হয়ে গেল, এল যন্ত্রের যুগ। বস্তুত, এই সময়েই মুদ্রাযন্ত্রের আবিষ্কার আপামর জনসাধারণের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। বাংলা গদ্যের সূচনা এই সময় থেকেই। ফলে নাটক, মহাকাব্য, গীতিকাব্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও ছোটোগল্প প্রভৃতি বিচিত্রমুখী বিকাশের মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্য নানা দিকে সম্প্রসারিত হয় এবং রূপ রসে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
এই আধুনিক যুগের অন্যতম গদ্যশিল্পী রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ও প্রমথ চৌধুরী। কাব্যসাহিত্যে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, মধুসূদন দত্ত, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন ও বিহারীলাল চক্রবর্তীর নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। নাট্যসাহিত্যে মনোমোহন ঘোষ, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ অসামান্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। এই আধুনিক যুগেরই বিচিত্রমুখী ও বহুপথগামী এক বিস্ময়কর প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গদ্য, পদ্য ও নাটক সাহিত্যের সব শাখাকেই তিনি তাঁর নব নব উন্মেষশালিনী প্রতিভার দ্বারা সমৃদ্ধ করেছেন। রবীন্দ্রসমকালীন যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, মোহিতলাল মজুমদার, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ বসু, বনফুল, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নৃপেন্দ্রকৃয় চট্টোপাধ্যায়, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, শিবরাম চক্রবর্তী, সৈয়দ মুজতবা আলি প্রমুখ বিদগ্ধ লেখক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে অসামান্য গৌরবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
সাম্প্রতিককালের শক্তিধর লেখকেরা নিরলসভাবে সাহিত্যসাধনায় ব্যাপৃত আছেন। তাঁদের রচনায় বিচিত্র বর্ণে রূপে রসে জীবন-রহস্যের নবনব দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। এ সময়কার বিশিষ্ট কবি ঔপনাস্যিক ও ছোটোগল্পকারদের মধ্যে অন্যতম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিমল মিত্র, বিমল কর, রমাপদ চৌধুরি, আশাপূর্ণা দেবী, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, দিব্যেন্দু পালিত, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, সত্যজিৎ রায়, বুদ্ধদেব গুহ, প্রফুল্ল রায়, মহাশ্বেতা দেবী এবং অতি আধুনিকদের মধ্যে সুচিত্রা

No comments:
Post a Comment