কৃষ্ণদাস কবিরাজ
কৃষ্ণদাস কবিরাজ চৈতন্যচরিতসাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম চৈতন্যচরিতামৃত। সমগ্র মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে কৃষ্ণদাস কবিরাজের মতো অগাধ মনীষাসম্পন্ন বিরাট প্রতিভাশালী কবিব্যক্তিত্ব বিরল। মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক কবি কৃষ্ণদাস।
ভূমিকা পান্ডিত্য ও মনীষীর দিক থেকে দর্শনশাস্ত্রে তাঁর যে বিপুল পরিমাণে অধিকার ছিল তা সুবিস্তৃত হয়ে আছে চৈতন্যচরিতামৃত কাব্যে। চৈতন্যজীবনকে অবলম্বন করে গৌড়ীয় বৈশ্বব দর্শনের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেছেন কৃষ্ণদাস। সমগ্র গৌড়ীয় বৈশ্ববদর্শনের অন্যতম প্রবক্তা হিসাবে বাংলা সাহিত্যে তিনি অমরত্ব অর্জন করেছেন। বাংলা, উড়িষ্যা ও বৃন্দাবনের ভক্তিধর্ম ও দার্শনিক মতাদর্শকে কবি গভীর নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও পরিশ্রম দিয়ে যথাসাধ্য কাব্যকৌলীন্য দান করেছেন।
আত্মপরিচয় কবির আত্মপরিচয় থেকে জানা যায়-বর্ধমান জেলার কাটোয়ায় নিকটবর্তী ঝামটপুর গ্রামে সুপ্রসিদ্ধ স্বচ্ছল বৈদ্যপরিবারে কবির জন্ম। পিতার নাম ভগীরথ, মাতা সুনন্দা দেবী। কবি ছিলেন নিত্যানন্দের শিষ্য। নিষ্ঠাবান বৈশ্ববভক্তের বাড়িতে মাঝে মাঝে সংকীর্তন হত। বাড়িতে কৃষ্ণমূর্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল। একবার কীর্তনের আসরে নিমন্ত্রিত হলেন নিত্যানন্দের শিষ্য মীনকেতন দাস। নিত্যানন্দশিষ্য মীনকেতনের সঙ্গে কৃষ্ণদাসের ভাই রামদাসের অভ্যর্থনা ব্যাপারে বচসা বাধে। এতে নিত্যানন্দশিষ্য কৃষ্ণদাস খুবই বেদনাবিদ্ধ হন এবং সেদিনকার রাত্রে নিত্যানন্দের স্বপ্নাদেশ পেয়ে প্রৌঢ় কবি বৃন্দাবনে চলে যান। বৃন্দাবনে বৈশ্বব গোস্বামীর সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভক্তিশাস্ত্রাদি অধ্যয়ন করেন。
কৃষ্ণদাস কবিরাজের জন্মকাল ও গ্রন্থরচনাকাল সম্পর্কে পণ্ডিতমহলে বিতর্ক আছে। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কোনো এক সময়ে কবির জন্ম হয় এবং ষোড়শ শতাব্দীর শেষপাদে কিংবা সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে তাঁর কাব্য রচনা সম্পূর্ণ হয়।
কবিকথা 'চৈতন্যচরিতামৃত'- কৃষ্ণদাস কবিরাজের তৃতীয় ও সর্বশেষ গ্রন্থ। এর আগে তিনি সংস্কৃতে দুখানি গ্রন্থ রচনা করেন। প্রৌঢ় বয়সে কৃষ্ণদাস বৃন্দাবনে যান। বৈশ্ববাচার্যগণের নিকট শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন করে যখন তিনি কাব্য রচনায় ব্যাপ্ত হন, তখন বার্ধক্যে নানা রোগে শরীর জীর্ণ। তবুও কবির মন যে কত নবীন ও সতেজ ছিল তার জাজ্বল্যমান স্বাক্ষর রয়েছে চরিতামৃতে। চৈতন্যচরিতসাহিত্যের এটিই সম্পূরক ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ।
আদি, মধ্য ও অন্ত্য-এই তিনটি লীলাপর্বে গ্রন্থটি বিভক্ত। প্রত্যেকটি লীলা আবার কয়েকটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত। আদিলীলায় বৈশ্ববীয় দর্শন, চৈতন্যাবতারের প্রয়োজনীয়তা, অদ্বৈত নিত্যানন্দের সঙ্গে মহাপ্রভুর পরিচয়, শ্রীচৈতন্যের বাল্যলীলা কৈশোর ও সন্ন্যাস বর্ণিত। আদিলীলায় কৃষ্ণদাস ভক্তিনম্রচিত্তে বৃন্দাবনদাসকে অনুসরণ করে আগের বিস্তৃত কাহিনি সংক্ষিপ্ত করেছেন। বৃন্দাবন যেখানে সংক্ষিপ্ত, কৃষ্ণদাসের হাতে তা কিছুটা বিস্তৃত। আদিলীলাই চৈতন্যচরিতামৃতের প্রধান অংশ। শ্রীমদ্ভাগবত, গীতা, ব্রহ্মসংহিতা প্রভৃতি নানা শাস্ত্র-সমুদ্রে ডুব দিয়ে উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে গৌড়ীয় বৈঘ্নবধর্মের প্রতিষ্ঠাভূমি তৈরি করলেন এবং জোর দিয়ে বললেন-
কৃষ্ণদাস কবিরাজ চৈতন্যদর্শন বর্ণনা করার সঙ্গে সঙ্গে সমকালীন বাংলার আর্থ-সামাজিক অবস্থার সামগ্রিক একটা আলেখ্য চিত্রিত করেছেন। হিন্দু-মুসলমান বিরোধ সত্ত্বেও তখন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলনের সূচনা হয়েছে। দর্জি জীবিকা মুসলমানদের একচেটিয়া ছিল। ব্রাহ্মণপন্ডিতরা মুসলমান দর্জির সাহায্য নিত। জিনিসপত্রের দাম বেশ সস্তা ছিল। বৈশ্ববদের খাদ্য ছিল নিরামিষ। নানা ধরনের খাদ্যদ্রব্য তৈরি করা হত। তবে শাক্ত ও বৈশ্ববদের মধ্যে প্রবল বিরোধ ছিল।
মধ্যলীলায় আছে, সন্ন্যাস গ্রহণের পর মহাপ্রভুর নীলাচলে অবস্থান পর্যন্ত ছয় বছরের জীবনকাহিনি। এর মধ্যে রাঢ়দেশ ভ্রমণ, নীলাচলে গমন, সার্বভৌমকে স্বমতে আনয়ন, দাক্ষিণাত্যে নানাতীর্থ পর্যটক, রায় রামানন্দের সঙ্গে সাধ্যসাধনতত্ত্ব আলোচনা, বৃন্দাবন যাত্রা, প্রয়াগে রূপ গোস্বামী ও বারাণসীতে সনাতন গোস্বামীকে ধর্মশিক্ষা প্রদান, রূপ গোস্বামীকে বৃন্দাবনে প্রেরণ ইত্যাদি ঘটনা লিপিবদ্ধ। অন্ত্যলীলায় শ্রীচৈতন্যের শেষ আঠারো বছরের জীবনের বিস্তৃত পরিচয় আছে। এই অংশে মহাপ্রভুর কৃষ্ণপ্রেমে উন্মাদ বাহ্যজ্ঞানহীন ঊর্ধ্বভাব বিভোর অবস্থার স্বরূপ ও কারণ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে।
কৃষ্ণদাস কবিরাজ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একজন শক্তিমান কবি। নীরস তত্ত্বদর্শনকে তিনি কবিতার অন্তর্ভুক্ত করে রসাশ্রিত করে তুলেছেন। কৃষ্ণদাসের কবিতায় গীতিমূর্ছনা নেই। কিন্তু গীতিমূর্ছনাই কবিত্বের একমাত্র মাপকাঠি নয়। দুরূহ, জটিল তত্ত্বকথা কৃষ্ণদাসের হাতে একান্ত সরল সহজ ও ঋজু হয়ে দাঁড়িয়েছে। অচিন্ত্যভেদাভেদতত্ত্ব, সাধ্যসাধনতত্ত্ব, রাগানুগাভক্তি, প্রেমবিলাস বির্বত, সখীসাধনা ও রাধাকৃষ্ণ প্রভৃতি জটিল ধর্মতত্ত্বকে কৃষ্ণদাস এক একটা উপমা, সুভাষিত শব্দচয়ন ও ছন্দের ব্যবহারে এবং ঋজু বর্ণনাগুণে সহজবোধ্য করে তুলেছেন। রাধাকৃষ্মতত্ত্বের বর্ণনায় অবিচ্ছেদ্য রাধাকৃষ্ণের যুগলতত্ত্বের স্বরূপ খুব সহজ সুন্দর হয়েছে।
কাম ও প্রেমের পার্থক্য বিচারে-
জীব ও ঈশ্বরের পার্থক্য বুঝাতে গিয়ে তিনি লিখেছেন-


No comments:
Post a Comment