Breaking

Wednesday, June 17, 2026

চৈতন্যজীবনীসাহিত্য

চৈতন্যজীবনীসাহিত্য



১. সাধারণ আলোচনা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

মধ্যযুগের ধর্মীয় প্রথানুবর্তী কাহিনি কাব্যের মধ্যে চৈতন্যজীবনীমূলক গ্রন্থগুলি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতীয় সাহিত্যে আগে সংস্কৃত রাজরাজড়াদের স্তাবকতাধর্মী জীবনীসাহিত্য কিছু রচিত হয়েছে। সেইসব গ্রন্থে আর্থসামাজিক জীবনের পরিচয়ও মেলে। কিন্তু রাজকীয় মহিমার গুণগান করতে গিয়ে কবিরা সাধারণ মানুষের দিকে ফিরে তাকাননি। বিশুদ্ধ মানবিক চেতনা থেকে তখন জীবনীসাহিত্য রচনা করার প্রবণতা কবিদের ছিল না। মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের গতানুগতিকতা ভঙ্গ করল চৈতন্যজীবনীসাহিত্য。

প্রথমে সংস্কৃত ভাষায় চৈতন্যজীবনী গ্রন্থ রচিত হয়। মুরারি গুপ্তের শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যচরিতামৃত, কবিকর্ণপুরের মহাকাব্য চৈতন্যচরিতামৃত ও নাটক চৈতন্যন্দ্রোদয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এরপর বাংলাভাষায় চৈতন্যজীবনী গ্রন্থ রচনা করেন কবি বৃন্দাবন দাস, জয়ানন্দ, লোচন দাস ও কৃষ্ণদাস কবিরাজ প্রমুখ কবি। মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের দিব্যভাবসমৃদ্ধ অলৌকিক জীবন নতুন ধরনের সাহিত্যসৃষ্টিতে বিপুল প্রেরণা দিয়েছে। শ্রীচৈতন্য রক্তমাংসের মানুষ হলেও তাঁর বিরাট চারিত্রশক্তি ও সমুচ্চ প্রেমধর্মের আদর্শ প্রবক্তার জন্য জীবিতকালে ভক্তগণ কর্তৃক অবতাররূপে পূজিত হয়েছেন। ভক্তরা 'রাধা-ভাবদ্যুতি সুবলিত তনু কৃষ্ণ স্বরূপম' রূপে শ্রীচৈতন্যকে দেখেছেন। ফলে আমাদের পরিচিত এই সংসারের রক্তমাংসের মানুষের মধ্যে অমর্ত্যলীলামাধুরী প্রত্যক্ষ করে একান্ত অভিভূত হল আপামর জনসাধারণ। আকাশ থেকে তাদের দৃষ্টি ঘরের ছেলের দিকে। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সাহিত্যের ইতিহাসে জীবনবোধের দিকে পরিবর্তন সূচিত করল। কল্পিত কোনো দেবদেবী নয়-এবার মানুষই হল দেবপদবাচ্য।

সাহিত্যের গুরুত্ব মানুষের চরিত্র মহিমা কাব্যে কীর্তিত হল। ঐতিহাসিক ব্যক্তিমানুষ শ্রীচৈতন্যকে কাব্যের অন্তর্ভুক্ত চরিত্র করা হল। এ এক অভিনব বস্তু। কারণ, ব্যক্তির মহিমা তখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের যুগ তখনও আসেনি। অবশ্য চৈতন্যজীবনীসাহিত্য পুরোপুরি আধুনিক লক্ষণাক্রান্ত জীবনীসাহিত্য নয়। কবিরা মহাপ্রভুর মর্ত্যজীবনকথাকে আন্তরিকভাবে অনুসরণ করেছেন বটে, কিন্তু তাঁর ফাঁকে ফাঁকে অতিপ্রাকৃত ঘটনার সন্নিবেশ অলৌকিকতার স্পর্শে ও ভক্তির আতিশয্যে মানবজীবনের স্বরূপ মাঝে মাঝে ঢাকা পড়ে গেছে।

কিন্তু চৈতন্যজীবনের নানা প্রসঙ্গ বর্ণনায় মানবধর্মের বলিষ্ঠ স্বীকৃতিতে চৈতন্যভক্ত কবিরা বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতার পথে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছেন। চৈতনাজীবনী-সাহিত্যে শ্রীচৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষদের শ্রীহট্ট ছেড়ে বাংলার নবদ্বীপ আগমন, শ্রীচৈতন্যের জন্ম, বাল্যলীলা ও বিবাহ, শ্রীচৈতন্যপার্ষদদের জীবনকথা, হিন্দুসমাজের অবস্থা, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, বৈশ্বব সমাজের ইতিহাস, প্রচার ও মৃত্যুকাহিনি স্থান পেয়েছে। কিছুটা অলৌকিকতা ও অতিরঞ্জন দোষ থাকলেও ইতিহাস, দর্শন ও কাব্যরসের অপূর্ব সমন্বয়ে চৈতন্যচরিতসাহিত্য মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। বাংলায় বৃন্দাবন দাস, জয়ানন্দ মিশ্র, লোচন দাস ও কৃষ্ণদাস কবিরাজ চৈতন্যজীবনীকাব্য রচনা করেন। আমরা নীচে দুটি জীবনীকাব্যের আলোচনা করেছি。

২. কবি বৃন্দাবনদাস

ভূমিকা বৃন্দাবনদাস বাংলা ভাষায় প্রথম চৈতন্য জীবনীবিষয়ক কাব্য রচনার পথিকৃৎ। পরবর্তী কবিরা বৃন্দাবনদাসের চৈতন্য ভাগবতের কথা পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। বৃন্দাবনদাস নবদ্বীপের শ্রীবাসের ভ্রাতুষ্পুত্রী নারায়ণী দেবীর পুত্র ছিলেন। গ্রন্থমধ্যে আত্মপরিচয় না থাকায় বৃন্দাবনদাসের জীবনতথ্য সম্পর্কে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ বর্তমান। কবির পিতার নাম জানা যায়নি। জন্ম সম্পর্কেও নানা গালগল্প প্রচলিত। গবেষকদের মতে আনুমানিক ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে কবির জন্ম। ১৫৪৮ খ্রিস্টাব্দে চৈতন্যভাগবত রচিত হয়। সে যা হোক, মহাপ্রভুর সাক্ষাৎলাভের সৌভাগ্য বৃন্দাবনদাসের ঘটেনি। সম্ভবত মহাপ্রভুর নীলাচল বাসকালে কবির জন্ম হয়। কবি তাই আপেক্ষ করে বলেছেন-

'হইল পাপিষ্ঠ জন্ম নহিল তখনে।/ হইয়াও বন্বিত সে মুখ দরশনে।।'

কবির নিবাস ছিল বর্ধমান জেলার দেনুড় গ্রামে। কবি চিরকুমার ছিলেন। সম্ভবত বর্ধমানে থেকেই তিনি এই সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক কাব্যটি রচনা করেন। কাব্য রচনার সময় মহাপ্রভুর পারিষদগণের মধ্যে অনেকে জীবিত ছিলেন। চৈতন্যজীবনের অনেক উপকরণ তিনি তাঁদের কাছ থেকেই সংগ্রহ করেন। শ্রীমদ্ভাগবতে কৃষ্ণলীলার সমধর্মী বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যলীলা।

কাব্য পরিচয় কবি মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের অবতার রূপেই বর্ণনা করেছেন। মহাপ্রভুর লীলাপ্রচারের উদ্দেশ্যে বইটি লিখিত বলে এতে কিছু অলৌকিক কাহিনি স্থান পেয়েছে। অনেকের মতে পূর্বে এই গ্রন্থের নাম ছিল 'চৈতন্যমঙ্গল'। ভাগবতের অনুসরণে লেখা বলে বৃন্দাবনের গোস্বামীরা এর নাম দেন চৈতন্যভাগবত। বাংলায় বৈশ্বব সমাজে এই চৈতন্যভাগবত অধিকতর জনপ্রিয় কাব্য। প্রাঞ্জল ভাষায় স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ ও ভক্তিভাবুকতার সঙ্গে গ্রন্থটি লিখিত। প্রসাদগুণে ও কবিত্বের স্পর্শে চৈতন্যভাগবত এক সুললিত সুপাঠ্য গ্রন্থ। বৈশ্বব ভক্তগণ বৃন্দাবনদাসকে চৈতন্যলীলার ব্যাস আখ্যা দেন।

চৈতন্যভাগবত আদি, মধ্য ও অন্ত্য খণ্ডে বিভক্ত। আদি খণ্ডে পনেরোটি অধ্যায়ে চৈতন্যের জন্ম, বাল্যলীলা, বিবাহ, বিদ্যাশিক্ষা, পিতৃপিণ্ড দানের জন্য গয়াগমন, ঈশ্বরপুরীর নিকট দীক্ষালাভ ও স্বদেশে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত ঘটনা বিবৃত। মধ্যখণ্ডের ছাব্বিশটি অধ্যায়ে নবদ্বীপে হরিনাম সংকীর্তনে বিভোর বিহ্বল লীলাবৈচিত্র্য, কাজি দলন ও সন্ন্যাস গ্রহণের বর্ণনা রয়েছে। অন্ত্যখন্ডের দশটি অধ্যায়ে নীলাচল বাসের কাহিনি মুখ্যত স্থান পেয়েছে। শ্রীচৈতন্যের অন্তিম পর্যায়ের জীবনকাহিনি এর মধ্যে খুবই অসম্পূর্ণ বিক্ষিপ্ত ও অসংলগ্ন। সে যা হোক, আগেই বলা হয়েছে বৃন্দাবনদাস চৈতন্যলীলার প্রত্যক্ষ দ্রষ্টা নন। সুতরাং তাঁর কাব্যের উৎস সমকালীন রচিত গ্রন্থাদি ও বিশেষ করে চৈতন্যপার্ষদ নিত্যানন্দ ও অদ্বৈত আচার্য কথিত কাহিনি। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস যেমন মহাভারতের আদিকবি- তেমনি বৃন্দাবনদাস বাংলা ভাষায় চৈতন্যজীবনীগ্রন্থের আদি ও অন্যতম কবি।

কাহিনি গ্রন্থন, রচনা-সৌকর্য, তথ্যপরিবেশন, কবিত্ব, দর্শন ও ইতিহাসের সমন্বয়ে তাঁর কাব্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। শ্রীমদ্ভাগবতের কৃষ্ণের পৌরাণিক মহিমার ভাগবতী চরিত্রধর্মের সাদৃশ্যে বৃন্দাবনদাস মহাপ্রভুকে কলিযুগে পৃথিবীর পাপ মোচনের জন্য অবতীর্ণ নারায়ণের নবরূপী অবতার রূপেই প্রত্যক্ষ করেছেন। ফলে তাঁর কবিদৃষ্টিতে এই মহাপুরুষ মানবিকতা অধ্যাত্মিকতার যুগ্ম আদর্শের জীবন্ত বিগ্রহে পরিণত। তাই বৃন্দাবনের কাব্যে ভক্তিরসের সঙ্গে সঙ্গে জীবনরসের স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক অভিব্যক্তি ঘটেছে।

এছাড়া বৃন্দাবনদাসের 'চৈতন্যভাগবত' সমাজচেতনার জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত। এতে বাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও লৌকিক ইতিহাসের আলেখ্য চিত্রিত। নবদ্বীপের সমৃদ্ধি, বিদ্যাচর্চা, অন্ধ সংস্কার, নানা জাতি ও পেশার লোক, লোকাচার, ধর্মাচার, আমোদপ্রমোদ, উৎসব-অনুষ্ঠান, খাদ্য, অলংকার, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক ও মুসলমান শাসকবৃন্দ কর্তৃক হিন্দু উৎপীড়নের কথা ইত্যাদির উল্লেখে তিনি সমকালীন বাংলার অনেক নিখুঁত চিত্র অঙ্কন করেছেন। তবে তিনি দুঃখিত যে নবদ্বীপবাসী কুসংস্কার লোকাচার ধর্মাচারের আড়ম্বরে জীবনের সত্যস্বরূপের চর্চা সম্পূর্ণ ভুলে গেছে। তাঁরা মনসাপুজো, বাশূলিপুজো ও যক্ষপুজো করে মদ্য মাংস নানা উপচারে। রাতভর মঙ্গলচণ্ডীর গীত চলে। কারও বাড়িতে কৃষ্ণপুজো হয় না। সবাই ভক্তিধর্ম বিবর্জিত।

মুসলমানরা, চৈতন্য আবির্ভাবে সমাজব্যবস্থায় যে নবজাগরণের সূত্রপাত হয়, তাকে সর্বশক্তি দিয়ে চিহ্নিত করতে বদ্ধপরিকর হয়। অন্যদিকে বৈশ্বব-বিদ্বেষী মুসলমানদের অত্যাচার, নিষ্পেষণ ও লুণ্ঠন প্রাধান্য পায়। কাজী সাহেবের প্রাসঙ্গিক উক্তি বৃন্দাবনদাস উল্লেখ করেছেন-

'মোরে লঙ্ঘি হিন্দুয়ানি করে। তবে জাতি নিমু আজি সবার নগরে।।'

অবৈশ্বব সম্প্রদায়ও শ্রীচৈতন্যের উপর দারুণ ক্রুদ্ধ হন-

'শ্রীবাস বামনায় এই নদীয়া হৈতে/ঘর ভাঙ্গি কালি নিয়া ফেলাইমু স্রোতে।'

বৃন্দাবনদাস সমকালীন হিন্দুর বর্ণবৈষম্য ও মুসলমান রাজন্যবর্গের নিষ্ঠুরতা নিপুণভাবে তুলে ধরে ইতিহাস-নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন। এসবের ঊর্ধ্বে 'চৈতন্যভাগবত' গ্রন্থটিকে বৃন্দাবনদাস ভাগবতী মাহাত্ম্যে উন্নীত করেছেন। চৈতন্যদেব ও নিত্যানন্দ দুজনে কৃষ্ণ ও বলরামের অবতার রূপেই চিত্রিত। চৈতন্যভাগবতের সর্বত্র শ্রীচৈতন্যের ভুবনমনমোহিনী রূপমাধুর্য উচ্ছলিত। প্রগাঢ় ভক্তিভাবুকতা সহজ কবিত্ব গ্রন্থটিকে পরম আস্বাদের বস্তু করে তুলেছে। তাই কৃন্মদাস কবিরাজ লিখেছেন- 'চৈতন্যলীলার ব্যাস বৃন্দাবনদাস।' তা সত্ত্বেও এই মূল্যবান গ্রন্থটি অল্পস্বল্প ত্রুটিযুক্ত। প্রথমত এই গ্রন্থ অসম্পূর্ণ, ঘটনার ক্রম সর্বত্র রক্ষিত হয়নি। অলৌকিক ঘটনার প্রচুর সমাবেশ ঘটায় বাস্তবতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। বিশেষ করে বৌদ্ধবিদ্বেষ পীড়াদায়ক এই সামান্য ত্রুটিবিচ্যুতি বাদ দিলে উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও ছন্দের ললিত প্রয়োগে এবং গীতিকাব্যের সুরমাধুর্যে চৈতন্যভাগবত একটি উৎকৃষ্ট কাব্যগ্রন্থ। সর্বোপরি ষোড়শ শতাব্দীর সমাজজীবন ও বৈশ্বব সম্প্রদায়ের নানাবিধ তথ্যের সমাবেশে কাব্যটির মূল্য অপরিসীম।

No comments:

Post a Comment