বাংলা সাহিত্যে চৈতন্যদেব সাধারণ আলোচনা
সাহিত্য জিনিসটি হচ্ছে সমাজজীবন সম্পর্কিত অভিজ্ঞতার কল্পনাসৃষ্ট ফসল। সুতরাং সমাজজীবনের রীতি-নীতি ও জীবনধর্ম অনুযায়ী কবি সাহিত্যিকের প্রকৃতি নির্ধারিত হয়। শ্রীচৈতন্যের পবিত্র জীবন ও বাণীর স্পর্শে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হল। বাঙালির সামাজিক জীবনে ভাবমূলক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হল- সেই নব প্রবুদ্ধ জীবনচেতনা বাংলা সাহিত্যের পালাবদল ঘটাল। পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে বাংলা সাহিত্যের উপর শ্রীচৈতন্যের প্রভাব অপরিসীম। শ্রীচৈতন্যদেব নিজে একখানাও গ্রন্থ রচনা করেননি। কিন্তু বাংলাসাহিত্যে তাঁর প্রভাব নানাভাবে সক্রিয়।
চৈতন্যোত্তর পদাবলি বৈশ্বব ভাবের বিকাশ চৈতন্যজীবনের আলোকে পদাবলি সাহিত্য আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত হল। রাধা ও কৃষ্ণ জীবাত্ম পরমাত্মার প্রতীকে পরিণত হলেন। চৈতন্য প্রবর্তিত বৈশ্ববধর্মের মূল কথা রাগাণুগা ভক্তি এবং ভক্ত ভগবানের সঙ্গে মধুর প্রেমের সম্পর্ক। তাই চৈতন্যের ধর্ম প্রেম ও ভক্তির বিশিষ্ট এক দর্শন। চৈতন্য পরবর্তীকালের কবিরা সেই বৈঘ্নবধর্মে দীক্ষিত হয়ে পার্থিব নরনারীর প্রেমকে আধ্যাত্মিক মহিমায় উন্নীত করলেন। শ্রীচৈতন্যদেব নিজের জীবনচর্চা ও ধর্মসাধনার মধ্যে দিয়ে বৈষ্ণুবীয় ভক্তিভাব বা রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার তাৎপর্যকে পরিস্ফুট করেন। তিনি ছিলেন রাধাকৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ-অন্তরঙ্গে কৃষ্ণ ও বহিরঙ্গে রাধা। পদকর্তা নরহরি সরকার লিখেছেন-
মধুর বৃন্দা বিপিন মাধুরী প্রবেশ চাতুরী সার।/ বিরজ যুবতী ভকতি শকতি হইতে কার।'
গৌরচন্দ্রিকা ও অন্যান্য রচনা রাধাকৃষ্মের বৃন্দাবনলীলার ধর্মীয় ব্যাখ্যা মহাপ্রভুর জীবনে একান্ত সহজরূপে প্রতিভাত হয়ে উঠেছিল বলেই পরবর্তীকালের বৈশ্ববভক্ত কবিরা প্রতিভা বিকাশের পথ খুঁজে পেয়েছেন। প্রায় তিন শতাব্দী কাল জুড়ে বৈশ্বব সাহিত্যের পরিপুষ্টি ও পরিণতি ঘটেছে। চৈতন্যোত্তর পদাবলি বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছে রাধাভাবের রাগানুগা ভক্তির দ্বারা। এছাড়া চৈতন্যজীবনী নিয়ে গড়ে উঠল গৌরচন্দ্র বিষয়ক গীতিকবিতা। মানবচরিত্র সাহিত্যে প্রাধান্য গেল। কিন্তু সেইসব কবিতার মধ্যে 'গৌরচন্দ্রিকা' নামক কবিতাগুলির প্রকৃতি স্বতন্ত্র। রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পালাকীর্তনের পূর্বে রাধা ও কৃষ্ণভাবের পরিপূরক বা রসোদ্বোধক যেসব গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদ গীত হয়-তাই গৌরচন্দ্রিকা।
চৈতন্যজীবনীকাব্য মহাপ্রভুর সমগ্র জীবনকে কেন্দ্র করে চৈতন্য-সমকালীন ও চৈতন্যোত্তরকালের কবিরা চৈতন্যজীবনীকাব্য রচনা করেন। বৃন্দাবনদাসের চৈতন্য ভাগবত, জয়ানন্দ ও লোচনদাসের চৈতন্যমঙ্গল এবং কক্ষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত উৎকৃষ্ট চৈতন্যজীবনীকাব্য। তখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের যুগ আসেনি। তবুও কবিরা সমকালীন মহাপুরুষের জীবন-আলেখ্য চিত্রণে যত্নবান হয়েছেন।
শাক্তপদাবলি ও বাউল অনুবাদ সাহিত্যে চৈতন্যদেবের প্রভাবও কম নয়। কাশীধাম দাশ বৈশ্বব ভক্ত ছিলেন। তাঁর কাব্যে বৈশ্বব ভাবধারা বিশেষভাবে প্রতিভাত। রামায়ণ ও ভাগবতের পরিবেশ, চরিত্র ও কাব্যরসের উপর চৈতন্য ভক্তিভাবের প্রভাবও যথেষ্ট। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর শাক্তপদাবলি ও বাউল সংগীতে অনাবিল ভক্তিরসের উৎসার ঘটেছে, তার উপর মহাপ্রভুর ভক্তিভাবের প্রভাবও যথেষ্ট। সপ্তদশ শতাব্দীর মুসলমান কবিরাও বৈশ্বব লোকসাহিত্য ভাবাপন্ন ছিলেন। তাঁরা রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক অনেক গান লিখেছেন। শাক্তপদাবলি ও বাউল লোকসংগীতে রাধাকৃষ্ণের কাহিনি স্থান পেল।
মহাপ্রভুর সর্বব্যাপী অসামান্য প্রভাবে বাংলাসাহিত্যের নানা শাখা বিচিত্র বিষয়বস্তু, ভাবসম্পদ ও শিল্পকলায় সমৃদ্ধিশালী হয়ে উঠল।


No comments:
Post a Comment