ভাগবতের অনুবাদ: মালাধর বসুর শ্রীকৃষ্ণবিজয়
কবি কৃত্তিবাসের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভাগবত পুরাণের অনুবাদ করে সাহিত্যকে পরিবর্ধিত ও সমৃদ্ধ করে গেছেন মালাধর বসু।
সংস্কৃত সাহিত্যে আঠারোখানি পুরাণ ও ছত্রিশটি উপপুরাণের মধ্যে ভাগবত পুরাণই ভারতবর্ষে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। শুধু ভারতবর্ষের আঞ্চলিক ভাষা নয়-ইউরোপেও এই পুরাণ সর্বপ্রথম অনূদিত হয় ও জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বারোটি স্কন্দে বিভক্তস্ত ভাগবতে শ্রীকৃয়ের জীবনমাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। মূলত এই ভাগবতী আদর্শকে কেন্দ্র করেই ভারতবর্ষের ধর্ম ও দার্শনিক চিন্তার বিচিত্রমুখী বিকাশ ঘটেছে। মালাধর বসু ভাগবতের শুধু দশম ও একাদশ স্কন্দের সূত্র অবলম্বন করে কাব্য রচনা করেন।
কবি মালাধরের জীবন সম্পর্কে কিছু বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। কেদারনাথ ভক্তিবিনোদ কবির জন্মস্থান কুলীন গ্রামে গিয়ে কিছু কুলপরিচয় সংগ্রহ করেন। তাছাড়া মালাধর বসু গ্রন্থের আরম্ভে ও পরিসমাপ্তিতে কিছুটা আত্মপরিচয় দিয়েছেন।
গ্রন্থরচনার সন তারিখ সম্পর্কে কবি এরূপ উল্লেখ করেছেন-
অর্থাৎ পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে কাব্যরচনা শেষ হয়। সুতরাং বলা যায় কুলীন গ্রামের কায়স্থ পরিবারে কবির জন্ম। গ্রন্থোৎপত্তি সম্পর্কে কবির বক্তব্য স্বপ্নে ব্যাসদেবের আদেশ পেয়ে তিনি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর কবিত্বশক্তিতে প্রীত হয়ে গৌড়েশ্বর তাঁকে গুণরাজ খান উপাধিতে ভূষিত করেন-
কেদারনাথ ভক্তিবিনোদ মহাশয় এই শ্লোকটির কথা জানিয়েছেন। এটি প্রক্ষিপ্ত বলেই অনেকে মনে করেন। কারণ আজ পর্যন্ত কোনো পুথিতেই এর উল্লেখ নেই। মালাধর কথিত এই গৌড়েশ্বর রুকনুদ্দিন বরবকশাহ ও শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ প্রমুখ।
কবিকৃত বংশ-পরিচয় থেকে জানা যায়-বর্ধমান জেলার কুলীনগ্রামে বিখ্যাত কায়স্থ পরিবারে কবির জন্ম। পিতার নাম ভগীরথ, মাতার নাম ইন্দুমতী। মালাধারের পুত্র সত্যরাজ খান (অপর নাম রামানন্দ বসু) শ্রীচৈতন্যের ভক্ত ও পার্ষদ ছিলেন। সব দিক বিচার করে মোটামুটিভাবে বলা চলে মালাধর বসু পঞ্চদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের লোক ছিলেন।
কলিকালে পাপচিত্ত হব সব নর। পাঁচালির রসে লোক হইব বিস্তর।।
গাহিতে গাহিতে লোক পাইব নিস্তার। শুনিয়া নিষ্পাপ হব সকল সংসার।।'
মালাধর বসুর শ্রীকৃয়বিজয়, শ্রীকৃয়বিক্রম, গোবিন্দবিজয় ও গোবিন্দমঙ্গল নামেও অভিহিত। শ্রীকৃষ্ণের মহিমা বা কীর্তিকথা অর্থাৎ তাঁর বীরত্বের দিক বর্ণিত হয়েছে বলে কাব্যের এই নামকরণ। 'বিজয়' বা 'মঙ্গল'-দুটোই সমার্থক। গৌরবকৃতির ব্যঞ্জনাবাহী।
আত্মপরিচয় ভাগবতের দশমস্কন্দে কৃষ্ণের জন্ম থেকে দ্বারকালীলা পর্যন্ত শান্ত জীবনকাহিনি এবং একাদশ স্কন্দে যদুবংশ ধ্বংস, কৃয়ের দেহত্যাগ ও উদ্ধবের কথোপকথনের মাধ্যমে জ্ঞান কর্ম ভক্তি ও মুক্তির নানা তত্ত্বকথা স্থান পেয়েছে। মালাধর ভাগবতের এইসব ভগ্নাংশকে বাদ দিয়ে কেবল কাহিনি অংশটুকু গ্রহণ করেছেন। আসল কথা, কৃয়ের জন্ম থেকে দেহত্যাগ পর্যন্ত কৃয়লীলার সামগ্রিক জীবনী মালাধর জনচিতের উপযোগী করে রচনা করেন। তাই শ্রীকৃয়বিজয় ভাগবতের আক্ষরিক অনুবাদ নয়। মালাধর নিজের স্বাধীন কল্পনানুসারে এই কার্য রচনা করেন। শ্রীকৃয়চরিত্রকে বৈচিত্র্যদান করার জন্য ভাগবত-বহির্ভূত নানা কাহিনিকে প্রয়োজনমতো গ্রহণ করেন। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে পণ্ডিত মালাধর মহাভারতের সভাপর্ব, হরিবংশ ও বিয়পুরাণ, লিঙ্গপুরাণ ও যোগশাস্ত্র থেকেও অংশবিশেষ কাহিনি নিয়েছেন। তাই সব মিলিয়ে শ্রীকৃয়বিজয় একটি মৌলিক স্বতন্ত্র কাব্য হয়ে উঠেছে। কাব্যটি তিনটি পর্বে বিভক্ত।
কাহিনি বিন্যাস আদ্যকাহিনি বা বৃন্দাবনলীলায় বসুদেব ও কংসের ভগিনী দেবকীর বিবাহ, দেবকীর অষ্টমগর্ভে কৃয়ের জন্ম, নন্দালয়ে কৃয়ের লালনপালন, ইন্দ্রযজ্ঞ নিষেধ, রাস অনুষ্ঠান, কংস কর্তৃক, কৃয়বধের মন্ত্রণা ও কৃয় বলরামের মথুরা গমন স্থান পেয়েছে। মধ্য কাহিনি বা মথুরালীলায় কংসবধ থেকে দ্বারকা গমন পর্যন্ত কাহিনি। অন্ত্যকাহিনি বা দ্বারকালীলায় কৃষ্ণের রুক্মিণী হরণ, সত্যভামার সঙ্গে কৃয়ের বিবাহ, ঊষার সঙ্গে অনিরুদ্ধের বিবাহ, জরাসন্ধ বধ, সুভদ্রাহরণ, দ্বারকাপুরী ধ্বংস ও কৃয়ের দেহত্যাগ প্রভৃতি স্থান পেয়েছে।
পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে মালাধর শ্রীকৃয়ের ঐশ্বর্যরূপকে বাংলাভাষায় তুলে ধরতে প্রয়াসী হন। কৃয়ের ঐশ্বর্যরূপ বর্ণনায় মালাধরই পথিকৃৎ। বিষয়বস্তুর এই নতুনত্বই তাঁর কাব্যের উপজীব্য বস্তু আর তারই প্রেক্ষাপটে অনুগ বিষয়াদির বর্ণনায় কোথাও কোথাও মালাধরের স্বতঃস্ফূর্ত কল্পনাশক্তি গীতিমূর্ছনায় রসমণ্ডিত হয়ে উঠেছে। মূল ভাগবতের তুলনায় মালাধর বসু অধিকমাত্রায় জীবনসচেতন ও সৌন্দর্যপিয়াসী। তাই তাঁর বর্ণনায় পূর্বতন বিষয় স্বচ্ছন্দ সাবলীল ও আলংকারিক সুষমায় প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে।
মালাধর বসুর 'শ্রীকৃষ্ণবিজয়' গ্রন্থের লক্ষ্য কৃয়মাহাত্ম্য প্রচার হলেও কবির ভাবকল্পনা আশ্চর্যভাবে সমকালীন সামাজিক জীবনকে অনুসরণ করেছে। কৃয়মাহাত্ম্য সমকালীন জীবনরসের সংমিশ্রণে প্রত্যক্ষ ও সজীব। যুগচেতনা ও সমাজচেতনার প্রতি মালাধরের অকৃত্রিম আনুগত্য এবং বাঙালিজীবন ও পরিবেশের প্রতি অনুরাগ তাঁর কাব্যকে মাধুর্যমন্ডিত করে রেখেছে। বৃন্দাবন, মথুরা / দ্বারকার চিত্র অঙ্কনের মধ্যে বাঙালি মনোভাব ও বাংলার নিসর্গ প্রকৃতি শিল্পপ্রমূর্তি লাভ করেছে। আমলকী, নারকেল, বাসক, তাল, তমাল, অশ্বত্থ, কামরাঙা, জলপাই ও সুপারি প্রভৃতি বৃক্ষ এবং মালতী, পদ্ম, কনকচাঁপা, টগর ও কুমুদ ইত্যাদি পুষ্পের বর্ণনায় পল্লবঘন ছায়াসুশীতল এবং সৌরভপূর্ণ লাবণ্যময়ী বাংলাদেশের কথাই রসঘন হয়ে উঠেছে। বর্ণনা প্রসঙ্গে বাঙালির অন্নব্যঞ্জন এবং বিভিন্ন প্রথা ও আচার-অনুষ্ঠানের কথাও এসে পড়েছে। শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলায় বাঙালি বালকের জীবনলীলার পরিচয় সুস্পষ্ট সেখানে মা যশোদা বাঙালি বালকের মা হয়ে উঠেছেন।
রচনা-বৈশিষ্ট্য মৌলিক কল্পনায় মালাধর নিঃসন্দেহে একজন শক্তিধর কবি। ভাগবতকে নিজস্ব সৃষ্টির নব রূপায়ণে, সহজ সরল রচনারীতি ও উপাখ্যান মাধুর্যে-বিশেষত তুর্কি আক্রমণোত্তর ধর্মসংকটের বা. সা. ই. পরিচয়-সময় বাংলাদেশে পৌরাণিক চেতনাশ্রয়ী শ্রীকৃয়চরিত্রের আদর্শ স্থাপনে মালাধরের শ্রীকৃয়বিজয় মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক তাৎপর্যময় অবদান। এ স্খলে মনে রাখা দরকার যে শ্রীকৃয়বিজয়ের ভক্তিবাদ বৈয়বীয় রাগাণুগা ভক্তি নয়। শাস্ত্রীয় বৈধী ভক্তিতেই তাঁর আস্থা। কৃয় প্রসঙ্গে মালাধর বসু লিখেছেন-
কলি ঘোর তিমির/ করিতে বিমোচনে।।
হেন কথা শুনিবারে। না করিহ হেলা。
ভবসিন্ধু তরিবারে। এই মাত্র ভেলা।।'
তা সত্ত্বেও ভাগবত ও কৃয়লীলা সম্পর্কে বৈয়বদের প্রথম প্রেমভক্তি সঞ্চারিত হয় এই কাব্যের মাধ্যমে। শ্রীকৃয়বিজয় কাব্য বৈয়ব ধর্মের ইতিহাসে এক অমূল্য সংযোজন। 'চৈতন্যচরিতামৃত' গ্রন্থে পাওয়া যায়-
তাহা এক বাক্যে আছে মোর প্রেমময়।।
নন্দের নন্দন কৃয় মোর প্রাণনাথ。
এই বাক্যে বিকাইনু মোর বংশের হাথ।।
'নন্দের নন্দন কৃয় মোর প্রাণনাথ'- শ্রীকৃষ্ণবিজয়ের এই অংশটিকে বিচ্ছিন্নভাবে গ্রহণ করে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য ভাববিহ্বল হয়ে পড়লেন। যদিও মালাধরের ভক্তি বৈধীভক্তি, স্বরূপত রাগাণুগা ভক্তি নয়, তবুও কৃয়প্রেমভক্তির যে মহিমময় রূপ শ্রীচৈতন্যের জীবনে মূর্ত হয়ে উঠেছিল তারই আভাস রয়েছে শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্যে। কৃষ্ণের ঐশ্বর্য বা বীরত্বের বর্ণনা মালাধরের কাব্যে প্রতিপাদ্য বিষয় হলেও সর্বধর্ম সমন্বয়ের রসব্যঞ্জনায় কবি কালান্তরের ভিত্তিভূমি রচনা করেছেন। কবি লিখেছেন-
ভূত হিংসা যেই করে সেই আমার বৈরী।/ অহিংসা পরম ধর্ম থাকহ আচরি।।'


No comments:
Post a Comment