Breaking

Wednesday, June 17, 2026

অনুবাদ কাব্য

মহাভারতের অনুবাদ



ভারতবর্ষের দুটি মহাকাব্য বাল্মীকি রচিত 'রামায়ণ' ও মহামুনি বেদব্যাস রচিত 'মহাভারতম্'। এই দুটি মহাকাব্যের অনুবাদ রয়েছে বাংলা ভাষায়। বাঙালি জীবনে এই দুই মহাকাব্যের প্রভাব অপরিসীম। বাঙালির জীবন গঠনে ও নিয়ন্ত্রণে এই মহাকাব্যের প্রভাব অপরিসীম। রবীন্দ্রনাথের মতে, 'কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও কাশীদাসী মহাভারত বাঙালির মনের অন্নপানের অক্ষয় ভান্ডার হয়ে আছে।'

ভূমিকা মহাকবি বেদব্যাস রচিত সংস্কৃত মহাভারত ভারতবর্ষের জাতীয় জীবনের মহাকাব্য। একটা জাতির সুদীর্ঘকালের ধ্যানধারণাগত জীবনাদর্শ এই কাব্যের বিপুল কলেবরে স্থান পেয়েছে। এই গ্রন্থে ভারতবর্ষের সমাজধর্ম, রাজধর্ম, পারিবারিক আদর্শ, আধ্যাত্মিক আদর্শ, ন্যায়নীতি ও দর্শনতত্ত্ব প্রভৃতি সন্নিবেশিত।

এই গ্রন্থের মূল কাহিনি কুরুপাণ্ডবের জ্ঞাতিবিরোধ ও বিরাট রক্তক্ষয়ী সংগ্রামকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে। মূল কাহিনির সঙ্গে নানা উপকাহিনি সংশ্লিষ্ট। এই কাব্যের নায়ক ভগবান শ্রীকৃয়। তাঁরই নির্দেশ পরামর্শে বিপুল রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। অবশ্য পঞ্চপাণ্ডবকে পাঁচখানি গ্রাম মাত্র দিয়ে শান্তিপূর্ণ মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রচণ্ড অভিমানী ও দাম্ভিক দুর্যোধন বিনাযুদ্ধে সূচ্যগ্র মেদিনী দিতে অস্বীকৃত হওয়ায় আঠারো মহাভারতের আদর্শ দিন ব্যাপী যুদ্ধে কৌরবপক্ষের প্রায় সকলেই নিহত হন। বিজয়ী হন পঞ্চপাণ্ডব। কিন্তু এই ভয়ংকর যুদ্ধের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি দেখে রাজ্যভোগে যুধিষ্ঠিরের বিতৃয়া জাগে এবং তিনি দ্রৌপদীসহ ভায়েদের নিয়ে পরমার্থের সন্ধানে স্বর্গারোহণে যাত্রা করেন। যা হোক, নানা কাহিনির মধ্যে মহাভারতে সেকালের সমাজ, ইতিহাস, রাজতন্ত্র ও মানবচরিত্রের বিবিধ পরিচয় উদ্‌ঘাটিত হয়েছে। আর এই সবকিছুর মধ্যেই মানুষের জীবন সাধনার চিরায়ত আদর্শ পরিস্ফুট। তাই বলা হয়-'যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে'। অর্থাৎ মহাভারতে যা নেই, তা ভারতবর্ষের জনজীবনেও নেই। এককথায় মহাভারতের আদর্শ অনুযায়ী ভারতীয় জীবনধারা প্রবহমান। মহাভারত ভারতবর্ষের জাতীয় জীবনেরই ছন্দোসংগীত-একটা ট্র্যাডিশন বা ঐতিহ্য।

পটভূমি পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে পাঠান সুলতান হোসেন শাহের রাজত্বকাল ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত। তিনি হাবশি দৌরাত্ম্য থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। শাসক ও সামরিক নৃপতি হিসাবে তাঁর বিশেষ পারদর্শিতা ছিল। সর্বোপরি তিনি ছিলেন বিদ্যোৎসাহী ও সংস্কৃতির অনুরাগী। তাঁর দরবারে হিন্দু কর্মচারীরা যথাযোগ্য মর্যাদায় নিযুক্ত হন। তাঁর উৎসাহে অভিজ্ঞ কবিরা সংস্কৃত মহাভারতের অণুবাদ কর্মে ব্রতী হন।

মহাভারতের বাংলা অনুবাদের ফলে ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে আপামর বাঙালি জনসাধারণের নিবিড় যোগ সাধিত হয়েছে। এতে বাঙালির জীবনচর্যায় মহাভারতীয় আদর্শ যেমন বিশেষভাবে প্রভাবিত-তেমনি বাংলা সাহিত্যের ধারায় অনুবাদকর্ম বাংলাভাষাকে যথেষ্ট শক্তি দিয়েছে, পরিপুষ্টি দান করেছে, বাংলাসাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি ঘটিয়েছে।

কবীন্দ্র পরমেশ্বর

বাংলা ভাষায় সংস্কৃত মহাভারতের আদি অনুবাদক হিসাবে গৌরবের অধিকারী কবীন্দ্র পরমেশ্বর। এই গ্রন্থ রচনার সময়ে বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন স্বনামখ্যাত হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯)। এই মুসলমান নৃপতি বাংলা সাহিত্যের প্রধান উৎসাহদাতা ছিলেন।

হোসেন শাহের প্রধান সেনাপতি (লম্বর) পরাগল খাঁ চট্টগ্রাম অভিযানে প্রেরিত হন। তিনি চট্টগ্রামকে হোসেন শাহের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে সেখানকার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তি ও শৃঙ্খলা সুপ্রতিষ্ঠিত হলে তিনি অন্যান্য কার্যে মনোনিবেশ করেন। হোসেন শাহের মতো বিদ্যোৎসাহী ছিলেন পরাগল। মুসলমান তুর্কি হলেও হিন্দুর সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল। পরাগল খাঁর সভাপতি ছিলেন কবীন্দ্র পরমেশ্বর।

কবীন্দ্র হচ্ছে পরমেশ্বরের উপাধি। সম্ভবত এই উপাধি পরাগল খাঁ-ই দিয়ে থাকবেন। পরাগল খাঁর নির্দেশেই পরমেশ্বর মহাভারতের অনুবাদ করেন। অনুমান করা যেতে পারে যে, মহাভারতে বিবদমান রাজশক্তির যুদ্ধবিগ্রহ, ব্যুহনির্মাণ, সৈনাপত্যকৌশল, কূট ষড়যন্ত্র ও মানবিক ঘাতপ্রতিঘাত তুর্কি শাসককে অকৃষ্ট করে। মহাভারতের আনুপূর্বিক ঘটনা সংক্ষেপে শোনার জন্য পরমেশ্বরকে নির্দেশ দেন অত্যন্ত সংক্ষেপে অনুবাদ করতে, যাতে তিনি একদিনের মধ্যেই সমগ্র মহাভারত শুনতে পারেন। বোধহয় শাসনকার্যে অতিশয় ব্যস্ত পরাগল খাঁর বিস্তৃত মহাভারত কাহিনি শোনার অবসর ছিল কাম। যাইহোক, নির্দেশমতো পরমেশ্বর অতি সংক্ষেপে মহাভারতের মূল ঘটনা বিবৃত করেন। পরাগল খাঁ নির্দেশে মহাভারত পাঁচালি রচিত হয়েছিল বলে পরমেশ্বরের অনুবাদ 'পরাগলী মহাভারত' নামে পরিচিত। আসলে গ্রন্থটির নাম 'পাণ্ডববিজয়।'

ষোড়শ শতকের প্রথমদিকে তাঁর রচনা সমাপ্ত হয়। কবীন্দ্র পরমেশ্বর তাঁর মহাভারতে হোসেন শাহকে কৃয়ের অবতার বলে বর্ণনা করেছেন-

'কলিকালে হল যেন কৃষ্ণ অবতার।'

মহাভারতের মূল কাহিনি অনুসরণে পরমেশ্বরের গ্রন্থ অতি সংক্ষিপ্ত অনুবাদ। তত্ত্বকথা মুসলমান সেনাপতির মনোরঞ্জন করতে পারবে না ভেবে পরমেশ্বর শুধু কাহিনিটি অনুসরণ করেছেন। প্রতিভার বিশেষ কোনো নিদর্শন নেই। তবে ঐতিহাসিক দিক থেকে পরমেশ্বরের গুরুত্ব স্বীকার্য। পরমেশ্বর মহাভারতের আদি অনুবাদক। তাঁর রচনা অকিঞ্চিৎকর হলেও মহাভারত অনুবাদের প্রাথমিক দিগ্দর্শনি। তাছাড়া সুদূর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসে পরমেশ্বর পূর্বসূরিদের কোনো আদর্শ পাননি। পথিকৃৎ হিসাবে তিনি নিজ ক্ষমতাবলে ভাষাপথ তৈরি করে মহাভারতের কাহিনিকে পয়ার ত্রিপদী ছন্দবন্ধে গ্রথিত করলেন। রাজসভার কবি হয়েও পরমেশ্বর কাব্যে নাগরিক বৈদগ্ধ্য ও চমক সৃষ্টির দিকে নজর দেননি। কাব্যে ফারসি শব্দের ব্যবহারও নেই। মূলানুগ তৎসম শব্দের প্রয়োগ বেশি। এদিক দিয়ে তার সংক্ষিপ্ত রচনা প্রশংসার যোগ্য।

কবীন্দ্রের রচনা শিল্পগুণসমৃদ্ধ না হলেও প্রাঞ্জল ও অলংকৃত, সাবলীল ও সুখপাঠ্য। শ্রীকৃষ্ণের রূপবর্ণনাত্মক একটি দৃষ্টান্ত এই-

'পরিধান পীতবাস কুসুম বসন।নর মেঘ শ্যাম অঙ্গ কমললোচন।।
মেঘের বিদ্যুৎ তুল্য হসিত মুখেতে। শংখচক্রগদাপদ্ম এ চারি করেতে।।'
আখ্যান বর্ণনায় নাটকীয়তা ও চিত্ররূপ সৃষ্টি কবীন্দ্রের রচনার লক্ষণীয় বিষয়। তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে রচনার সুযোগ পাননি বলে কবিপ্রতিভার সম্যক পরিচয় এই কাব্যে নেই।

আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন 'সঞ্জয়' নামে এক কবিকে মহাভারতের প্রথম অনুবাদক বলেছেন। ড. সুকুমার সেন উক্ত সঞ্জয়ের অস্তিত্ব স্বীকার করেননি। তাঁর মতে সঞ্জয় কোনো অনুবাদকের নাম নয়। সঞ্জয় ভারত অর্থে সংস্কৃত বৈশম্পায়ন ভারত। আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন কথিত সঞ্জয় সম্পর্কে সঠিক তথ্য না পাওয়ার জন্য কবীন্দ্রই মহাভারতের প্রথম অনুবাদক হিসাবে স্বীকৃত।

শ্রীকর নন্দী

ভূমিকা কবীন্দ্র পরমেশ্বরের সমসাময়িক ও চট্টগ্রামের অধিবাসী শ্রীকর নন্দী বা শ্রীকরণ নন্দী মহাভারতের দ্বিতীয় অনুবাদক। তিনি জৈমিনী ঋষি রচিত মহাভারতের অশ্বমেধ পর্বের বাংলা অনুবাদ করেন। তখন পরাগল খাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর পুত্র ছুটি খাঁ বা ছোটো খাঁ চট্টগ্রামের শাসনকর্তা।

ছুটি খাঁ পিতার মতো সুদক্ষ শাসক, বিদ্যোৎসাহী ও কাব্যানুরাগী ছিলেন। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি সভাকবি শ্রীকর নন্দীকে মহাভারত অনুবাদ করতে অনুরোধ করেন। যুদ্ধবিগ্রহপূর্ণ বীররসের কাহিনি মুসলমান সেনাপতির মনোরঞ্জন করতে সমর্থ হবে। এই ভেবে কবি জৈমিনী মহাভারতের অশ্বমেধ পর্ব অনুবাদ করেন। ছুটি খাঁর নির্দেশে রচিত বলে শ্রীকরের অনূদিত গ্রন্থকে 'ছুটিখানি মহাভারত' বলা হয়। শ্রীকর নন্দী যখন মহাভারতের অনুবাদ করেন, তখন গৌড়েশ্বর ছিলেন হোসেন শাহের পুত্র নুসরৎ শাহ (১৫১৯-১৫৩২)। সুতরাং বলা যেতে পারে তিনি ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অশ্বমেধপর্ব অনুবাদ করেন। জৈমিনী মহাভারতের প্রসঙ্গে শ্রীকর নন্দী লিখেছেন-

'শুনিব ভারত-পোথা অতি পুণ্য কথা। /মহামুনি জৈমিনীর পুরাণ-সংহিতা।।
অশ্বমেধ কথা শুনি প্রসন্ন হৃদয়। সভাখণ্ডে আদেশিল খান মহাশয়।।'

কাব্য-বৈশিষ্ট্য শ্রীকর নন্দীর অনুবাদ বিশেষত মূলানুগ, যদিও কিছুটা সংক্ষিপ্ত। যৌবনাশ্ব, অনুশাল্ব, নীলধ্বজ, জনা, প্রমীলা, বহুবাহন, অধ্বজ, চন্দ্রহাস, হংসধ্বজ, চণ্ডিকা, সুরথ প্রভৃতি উপাখ্যান কবি সুন্দর করে বর্ণনা করেছেন।

শুধু অশ্বমেধ পর্ব রচনা করেছিলেন বলে শ্রীকর নন্দীর রচনায় স্বাধীনতার সুযোগ ঘটেছে। তাছাড়া পরমেশ্বর অপেক্ষা এঁর কবিত্ব শক্তি কিছু পরিমাণে বেশি ছিল। রচনাশক্তি সহজ ও পাণ্ডিত্যবর্জিত। শব্দযোজনায়ও যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। রচনায় স্বভাবকবিসুলভলঘুকৌতুক বা তরল চটুল হাস্যপরিহাস সৃষ্ট এবং ভাষার বক্রতা যথেষ্ট। এতে রচনার স্বাদ বৃদ্ধি পেয়েছে। অবশ্য এই রঙ্গব্যঙ্গের আদর্শ জৈমিনী ভারতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শ্রীকর নন্দী সেখান থেকে অনুপ্রেরণা পেলেও রচনায় নিজস্বতার যথেষ্ট স্বাক্ষর রেখেছেন। অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়ার সঙ্গে ভীমের যাবার কথা উঠলে শ্রীকৃয় বললেন যে ভীমের মতো শূলোদর পেটুক লোককে গুরুত্বপূর্ণ কাজে পাঠানো সংগত নয়। তখন ভীম ক্রোধান্বিত হয়ে ব্যঙ্গের সুরে কৃয়কে জবাব দেন-

'তোহার উদরে যত বৈসে ত্রিভুজবন। আত্মার উদরে কত অন্নব্যঞ্জন।। তুমি শূলোদর নহে, আমি শূলোদর।'

কাশীরাম দাস

ভূমিকা সপ্তদশ শতাব্দীতে মহাভারতের সর্বপেক্ষা বিখ্যাত ও সর্বশ্রেষ্ঠ অনুবাদক কবি কাশীরাম দাস। এই কবির মহাভারতের কাছে অন্যান্য অনুবাদগুলি নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। দুরূহ সংস্কৃত ভাষা থেকে মহাভারতের রসস্রোত বাংলা ভাষায় প্রবাহিত করে কাশীরাম দাস আপামর বাঙালি জনসাধারণের অশেষ কল্যাণ সাধন করেছেন। বাঙালির জাতীয় জীবনে তাঁর মহাভারত অক্ষয় বটবৃক্ষের মতো চিরস্থায়ী প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কৃত্তিবাসি রামায়ণের মতো ধনীর রাজপ্রসাদ থেকে আরম্ভ করে দরিদ্রের পর্ণকুটির পর্যন্ত কাশীদাসি মহাভারতের সমান কদর।

কাব্য-ভাবনা কাশীরামকৃত আত্মপরিচয় থেকে জানা যায়, বর্তমানের ইন্দ্রাণী পরগনার সিঙ্গি বা সিন্ধিগ্রামে তাঁর জন্ম। পিতার নাম কমলাকান্ত। জাতিতে কায়স্থ। তিনি মেদিনীপুর জেলার অসিগড়ের জমিদার বাড়িতে থেকে পাঠশালায় শিক্ষকতা করতেন। সেখানে কথক ও পন্ডিতদের মহাভারতের গল্প শুনে কাশীরাম সমগ্র মহাভারত সরল প্রাঞ্জল বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন। কাব্য রচনা শুরু হয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং কবি আদি সভা, বন ও বিরাটপর্বের কিছুটা অনুবাদ করে লোকান্তরিত হন-

'আদিসভা বন বিরাটের কতদূর। ইহা রচি কাশীদাস গেলা স্বর্গপুর।।'

কিন্তু সমগ্র মহাভারতটি কাশীরামের নামে সুপ্রচলিত। কবির পরিবারের সকলেই অল্পবিস্তর কবিপ্রতিভার অধিকারী ছিলেন। পন্ডিতদের মতে বাকি পর্বগুলি কবির তিরোধানের পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র ও ভ্রাতুষ্পুত্র দুজনে কাব্যটি সমাপ্ত করেন।

কাশীরাম দাসের মহাভারত ব্যাপক জনপ্রিয়তার ফলে বহুল প্রচারিত হয়েছিল। তাই মূল রচনায় ভাষায় অনেক পরিবর্তন ও বিষয়বস্তুতে অনেক প্রক্ষেপ ঘটেছে। কাশীরাম সংস্কৃত ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তাই তাঁর রচনা সংস্কৃত প্রভাবিত। অর্থাৎ অনেক তৎসম শব্দ কবি ব্যবহার করেছেন। সমগ্র মহাভারত সাবলীল গতি হারায়নি। কারণ কাশীদাসি মহাভারত হুবহু আক্ষরিক অনুবাদ নয়, ভাবানুসারী অনুবাদ। এতে নানা পুরাণ, উপপুরাণের আখ্যান স্থান পেয়েছে। কবিকল্পনার মৌলিকতাও যথেষ্ট।

কায়স্থ পরিবার বংশানুক্রমে বৈয়বধর্মে দীক্ষিত ছিলেন। চৈতন্যোত্তর যুগের প্রেমভক্তিরস কবিজীবনে প্রভাব বিস্তার করেছিল। অর্জুনের রূপসৌন্দর্য বর্ণনায় এই বীর নায়ক তাই নবঘন কান্তি শ্যামের মোহনমুরতিতে রূপান্তরিত-

'অনুপম অনুশ্যাম নীলোৎপল আভা। মুখরুচি কত শুচি করিয়াছে শোভা।।'

কাশীরামের মহাভারত ঘটনাবিন্যাসে, নাটকীয়তায়, সরস উক্তি প্রত্যুক্তিতেও হাস্যরস পরিবেশনে চিত্তাকর্ষী। সর্বোপরি ব্যাসদেবের কাহিনিতে কাশীরাম লোকশিক্ষার জন্য পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক আদর্শকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

কাশীদাসি মহাভারতের চরিত্রগুলি বাঙালির চরিত্র-বৈশিষ্ট্য, জীবনচর্যা ও ধ্যানধারণায় বাঙালির সমধর্মী। শিল্পরীতিতে কাশীরাম দাসের প্রতিভার মৌলিকতার স্বাক্ষর মেলে। কৃষ্ণের বিশ্বরূপ বর্ণনায় ক্লাসিক সমুন্নতি সাধিত হয়েছে সংস্কৃত শব্দের দ্যোতনায়-

'সহস্রমস্তক শোভে সহস্র নয়ন। সহস্র মুকুট মণি কিরীটি ভূষণ।।'

দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় অর্জুনের লক্ষ্যভেদের যোগ্যতা বোঝাতে গিয়ে কবি অর্জুনের ক্ষাত্রজনোচিত চরিত্রধর্ম ও শারীরিক সৌন্দর্যের বৈশিষ্ট্য অনুপম ভাষায়, অনুপ্রাসের ঝংকারে ও বিবিধ অলংকারের সৌন্দর্যে এক বর্ণদীপ্ত ভাবগাম্ভীর্যের শিল্পমূর্তি গঠন করেছেন।"দেব দ্বিজ মনসিজ জিনিয়া মুরতি। পদ্মপত্র যুগ্মনেত্র পরশয়ে শ্রুতি।। অনুপম তনুশ্যাম নীলোৎপল আভা। মুখ রুচি কত শুচি করিয়াছে শোভা। দেখ চারু যুগ্মভুরু ললাট-প্রসর। কি আনন্দ গতি বন্দ মত্ত কবিবর।। মহাবীর্য যেন সূর্য জলদে আবৃত।।/অগ্নিঅংশু যেন পাংশু জালে আচ্ছাদিত।"

কাশীদাসি মহাভারতে কৃত্তিবাসি রামায়ণের মতো বাঙালিয়ানা নেই। কিন্তু এর মূল্য আলাদা। এই গ্রন্থ কেবল সংস্কৃত না-জানা বাঙালির রসপিপাসা চরিতার্থ করেনি, মানবজীবনের সমুচ্চ আদর্শে কাশীরাম দাস বাঙালির মানস-প্রকৃতিকে সুগঠিত করতে প্রয়াসী হয়েছেন। গল্পরস পরিবেশনের সঙ্গে কবি সামাজিক ও পারিবারিক আদর্শ, ধর্মপ্রাণতা, নৈতিকতা ও ঈশ্বরভক্তির আদর্শ প্রচারে সচেষ্ট হয়েছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে অতিথিসেবা, জীবে দয়া, পরোপকারিতা ও স্বার্থত্যাগের মহিমা প্রচার করে উদার উন্নত মানবধর্মে কবি বাঙালিকে জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার বিপুল শক্তি ও অনুপ্রেরণা জোগায়।

কঠিন সাধনায় কাশীরাম দাস অমৃতসমান মহাভারতের বাণীকে বাঙালির হৃদয়দ্বারে পৌঁছে দিয়েছেন। মহাভারতের অমৃতবাণী বুকে ভরে বাঙালি জীবনের রাঙামাটির পথ দিয়ে অমৃতলোকে যাওয়ার জন অগ্রসর হয়। বাঙালি জনসাধারণের জীবনের 'গীতা' কাশীদাসি মহাভারত। বাঙালির জীবনে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রিক ও সামাজিক দিক থেকে কত পরিবর্তন হয়ে গেল। সভ্যতার রূপ বদল হচ্ছে অনবরত। কিন্তু কাশীরামের মহাভারতের কাব্যরসধারা অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার ন্যায় বাঙালির অন্তর্জীবনে কুলুকুলু নাদে প্রবাহিত। বাংলাদেশের হৃদয় থেকেই কাশীরাম দাসের কাব্যের উদ্ভব। মধুসূদন যথার্থই বলেছেন যে কাশীরাম-'ভারত রসের স্রোত আনিয়াছ তুমি। জুড়াতে গৌড়ের তৃষা সে বিমল জলে।' আর বাঙালি জাতিকে মহাভারতের অমৃতবাণী প্রদানের জন্য- 'হে কাশী কবীশ দলে তুমি পুণ্যবান্।'

No comments:

Post a Comment