Breaking

Wednesday, June 17, 2026

গোবিন্দদাসের পদাবলি

গোবিন্দদাসের পদাবলি

গোবিন্দদাস চৈতন্যোত্তর পদাবলি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রে ও বৈয়বীয় দর্শনে সুপন্ডিত গোবিন্দদাস বিধিদত্ত কবিপ্রতিভার সাহায্যে ছন্দসংগীতের বাণীশিল্পে যে অপূর্ব সৌন্দর্যের জগৎ সৃষ্টি করেছেন সেক্ষেত্রে তিনি জয়দেব-বিদ্যাপতি-ভারতচন্দ্রের সমগোত্রীয়। কিন্তু কাব্যাদর্শের দিক থেকে তিনি বিদ্যাপতিকে বিশেষভাবে অনুসরণ করেছেন।

ভূমিকা তাই বিদ্যাপতির সঙ্গে তাঁর ভাবগত আত্মীয়তা বেশি। বিদ্যাপতির অনেক খন্ডিত বা অসম্পূর্ণ পদ তিনি সম্পূর্ণ করে 'বিদ্যাপতি গোবিন্দদাস'-যুগ্মভণিতা যোগ করেছেন। বিদ্যাপতির মতোই গোবিন্দদাস অনেক প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী জমিদারের কাছে সম্বর্ধিত হন। বিদ্যাপতির যেমন জয়দেবের কাব্যাদর্শ অনুসরণ করে 'অভিনব জয়দেব' অভিধায় ভূষিত হয়েছেন, গোবিন্দদাস তেমনি বিদ্যাপতির অনুরূপ ভাবাভঙ্গি, ছন্দোলালিত্য ও অলংকারসমৃদ্ধ ভাবের রূপনির্মিতিতে দ্বিতীয় বিদ্যাপতি নামে আখ্যাত। বিদ্যাপতির সঙ্গে গোবিন্দদাসের ভাবসাদৃশ্যের দিকে লক্ষ রেখে সমসাময়িক শ্রীনিবাস আচার্যের শিষ্য বল্লভদাস সপ্রশংস মন্তব্য করেছেন-

'ব্রজের মধুর লীলা যা শুনি দরবে শিলা। গাইলেন কবি বিদ্যাপতি/
তাহা হৈতে নহে ন্যূন গোবিন্দের কবিত্বগুণ/গোবিন্দ দ্বিতীয় বিদ্যাপতি।'

গোবিন্দদাসকে বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য বলা হলেও বৈয়বীয় তত্ত্বের ভাবানুভূতির প্রকাশে জীবনদৃষ্টির গভীরতা, তত্ত্বের রসসৌকর্যসাধন ও মন্ডনকলার শিল্পদ্যোতনায় তিনি বহুস্থলে বিদ্যাপতির থেকেও উচ্চস্তরের কবি। বৃন্দাবনের শ্রীজীব গোস্বামী তাঁকে কবীন্দ্র বলে সম্মানিত করেছিলেন। তদবধি গোবিন্দদাস কবিরাজ নামে খ্যাত।

জীবনী ও কাব্য বৈশিষ্ট্য গোবিন্দদাস ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি কোনো সময়ে কাটোয়ার শ্রীখণ্ডে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। মাতামহ বিখ্যাত পণ্ডিত দামোদর সেন। পিতার নাম চিরঞ্জীব সেন ও মাতা সুনন্দা দেবী। কবিরা জাতিতে বৈদ্য। পিতা চিরঞ্জীব বৈয়ব-ভাবাপন্ন ও শ্রীচৈতন্যের ভক্ত ছিলেন। আদিনিবাস ছিল কুমারনগরে। আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কোনো সময়ে কবির তিরোধান ঘটে। প্রথমে তিনি শাক্ত ছিলেন। পরে বৈশ্বব ধর্মে দীক্ষিত হন। সংস্কৃতিবান পরিবারে তাঁর জন্ম। সংস্কৃত সাহিত্য ও অলংকারশাস্ত্রে তিনি ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। সংস্কৃতে 'সঙ্গীত মাধব' নামে একটি নাটক তিনি রচনা করেন। কিন্তু ব্রজবুলি ভাষায় পদরচনার জন্যই তিনি যশোমন্দিরে চিরস্থায়ী প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত রাগানুগা ভক্তির ঐতিহ্য নিয়েই কাব্যক্ষেত্রে তাঁর আবির্ভাব। গোবিন্দদাস ভক্ত, সাধক ও রূপদক্ষ শিল্পী হিসেবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী কবিখ্যাতির অধিকারী। ভক্তিভাবের নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতা এবং কাব্যিক মনন উৎকর্ষ তাঁকে কালজয়ী কবিত্বের স্বর্ণমুকুট পরিয়ে দিয়েছে। চৈতন্যোত্তর যুগের তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ পদকার।

ভাষা, ছন্দ, অলংকার, চিত্র ও সংগীতের সুষম মিলনে ব্রজবুলিতে লেখা তাঁর কবিতাগুলি সৃজনশীলতার অভিনব শিল্পসামগ্রীতে পরিণত হয়েছে। গোবিন্দদাসের কবিপ্রকৃতি অলংকারশাস্ত্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় তাঁর কবিতাবলি সংস্কৃতভাষার সুললিত মাধুর্য ও ক্লাসিক সংহতির সুমহান গাম্ভীর্যে দীপ্যমান। গোবিন্দদাস গৌরলীলা ও রাধাকৃষ্ণলীলার পূর্বরাগ, অভিসার, মান, কলহান্তরিতা, বাসকসজ্জা, বিপ্রলব্ধা, খণ্ডিতা ও মাথুর প্রভৃতি বিভিন্ন পর্যায়ের পদকর্তা। তাঁর গৌরাঙ্গবিষয়ক পদ সমগ্র বৈয়ব সাহিত্যে ভক্তিতন্ময়তার একক নিদর্শন। একজন রূপদক্ষ শিল্পীর ভাবের গূঢ়তা ও গাঢ়তা, আলংকারিক শিল্পনৈপুণ্য, চিত্র ও সংগীতধর্মিতা এস্থলে অসাধারণ কাব্যগৌরবে উজ্জ্বল। দিব্যভাবচঞ্চল মহাপ্রভুর অন্তর্জীবনের নিখুঁত লীলাচিত্র গোবিন্দদাস দক্ষ সচেতন শিল্পীর মতো ধীরস্থির তুলির টানে অতীব বর্ণাঢ্য ও সুস্পষ্ট করে তুলেছেন-

'নীরদ নয়নে নীর ঘন সিন্ধনে/পুলক মুকুল অবলম্বছেদ মকরন্দ বিন্দু বিন্দু চুয়অবিকশিত ভাবকদম্ব।'

শ্রীচৈতন্যের মানবিক ও অতিলৌকিক রূপ, মহাপ্রভুর শান্তপুণ্য করুণাঘন দিব্যজীবন ও তাঁর প্রেমাদর্শ রূপে রসে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে উত্ত কবিতায়। অন্য একটি কবিতায়-

'জয় শচী নন্দন বে/ত্রিভুবন মন্ডন কলিযুগ কাল/ভুজগ ভয় খন্ডন রে।।'

রসসৃজন-শক্তির গুণে শ্রীচৈতন্যের চরিত্রটি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। গোবিন্দদাস মহাপ্রভুকে প্রত্যক্ষ করেননি। কিন্তু সুর ও ছন্দের মেলবন্ধনে শ্রীচৈতন্য এখানে পরিপূর্ণ প্রাণসংযুক্ত ও লাবণ্যরসে উদ্‌ভাসিত।

রূপানুরাগের পদে রাধার অলৌকিক সৌন্দর্য বর্ণনায় ভক্তি ও রূপের মধ্যে নিবিড় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছেন গোবিন্দদাস। ভাষার ঐশ্বর্য ও অলংকৃতি, ছন্দের ঝংকার, ভাবের গভীরতা ও গাম্ভীর্যে তাঁর কবিতা সৌন্দর্যের অমরাবতী তৈরি করেছে। পূর্বরাগ পর্যায়ের একটি পদে রাধার সৌন্দর্যে বিভোর কৃষ্ণ বলছেন-

যাঁহা যাঁহা নিকসয়ে তনু তনু জ্যোতি। তাঁহা তাঁহা বিজুরী চমকময় হোতি।।
যাঁহা যাঁহা অরুণ চরণে চল চলই। তাঁহা তাঁহা থলকমলদল খলই।।
যাঁহা যাঁহা হেরিয়ে মধুরিম হাস। তাঁহা তাঁহা কুন্দ-কুসুম পরকাশ।

কবির বর্ণনানৈপুণ্যে এখানে শ্রীরাধিকা অপার্থিব সৌন্দর্য লাবণ্যের ভাবপ্রতিমারূপে উদ্ভাসিত। ভাবের ঋজুতা বা দৃঢ় পিনদ্ধ শিল্পরূপে কবিতাটি অনন্য।

গোবিন্দদাসের কবিপ্রতিভা উত্তজা শিখর স্পর্শ করেছে অভিসারের পদ রচনায়। এক্ষেত্রে সমালোচকেরা গোবিন্দদাসকে কবিসম্রাট, রাজাধিরাজ বলে অভিহিত করেছেন। অভিসারের অর্থ হল-'প্রিয়ের মিলন আশে কুঞ্জেতে গমন/সংকেত পূর্বক অভিসারের লক্ষণ।।' রাধা কুলবতী নারী-গৃহস্থ ঘরের বধূ। পরপুরুষ শ্রীকৃষ্ণের জন্য সবার অলক্ষ্যে নিশীথ রাত্রে তাঁকে অভিসারে বেরোতে হবে। কুলখোয়ানো তাঁর অভিসার যাত্রা। এই পথে সাপ, ঝড়, বৃষ্টি, কাঁটা, অন্ধকার সবকিছুকে তুচ্ছ করে তাঁকে অগ্রসর হতে হবে। অভিসারের জন্য নিজেকে উপযোগী করে তুলতে রাধা স্বগৃহে রাত জেগে দুস্তর পথযাত্রার সাধনায় রত। অভিসারের যাত্রাপথে যেসব সম্ভাব্য বিপদবাধা দেখা দিতে পারে সে সমস্ত উত্তরণের চেষ্টায় রাধা প্রস্তুত হচ্ছেন-

কণ্টক গাড়ি কমল সম পদতল মন্ত্রীর চীরহি ঝাঁপি
গাগরি বারি ঢালি করি পিছল চলতহি অঙ্গুরি চাপি।।
করযুগে নয়ন মুদি চলু ভামিনী তিমির পয়ানক আশে।
করকঙ্কণপণ ফণিমুখ বন্ধন শিখই ভুজগ গুরু পাশে।

ঘরের বাইরে দ্বার রুদ্ধ। অবিরাম প্রবল বেগে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তা কর্দমাক্ত পিচ্ছিল। চারদিক ঘোর অন্ধকারে লিপ্ত। প্রচণ্ড শব্দে ঘন ঘন বজ্রপাত হচ্ছে। সখীরা রাধাকে সতর্কবাণী শোনাল-এই ভয়ংকর দুর্যোগে অভিসারে বেরোলে প্রেমের জন্য তাঁর জীবননাশ অনিবার্য। কিন্তু প্রিয়ের জন্য শ্রেয়ের জন্য যে জীবন উৎসর্গ করেছে তাঁর কাছে প্রকৃতির বাধা কিছুই নয়-মৃত্যুও নিতান্ত তুচ্ছ। কুলমর্যাদার কপাট যে লঙ্ঘন করেছে তার কাছে 'তাহে কাঠ কি বাধা'। ভয়ংকর দুর্যোগকে উপেক্ষা করে রাধা অভিসারে যাবেনই। কারণ-

'কোটি কুসুম শর বরিখয়ে যদুবর তাহে কি জলদ জল লাগি।
প্রেম দহন দহ যাহ হৃদয় সহ তাহে কি বজরক আগি।।'
দুর্যোগের রাত্রিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অনেক বাধা ও কষ্ট অতিক্রম করে রাধা শ্রীকৃত্রের সঙ্গে মিলিত হলেন। কিন্তু সেই মিলন আনন্দের নয়। শ্রীরাধিকার পথযাত্রা বন্ধ হয়েছে বটে, কিন্তু মনের গতি থামেনি। পথ আগমনের দুঃখবার্তা তিনি বলে চলেছেন। অভিসারের প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রবল প্রাণশক্তি ও অবিশ্রান্তভাবে পথ হেঁটে চলা। গোবিন্দদাসের অভিসারের পদ এই চলমানতা ভাববৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ। প্রেমের জন্য অভিসারে কঠিন দুঃখের কথা রাধা শ্রীকৃয়কে শোনাচ্ছে- 'পথ আগম কথা/কত না কহিব হে/যদি হয় মুখ লাখেলাখ।'

শ্রীকৃষ্ণের জন্য রাধার যে প্রেমসাধনা তা অনন্তের অমৃতলাভের জন্য। অনন্ত বলেই সেই প্রেমের অভিসারের বিরতি নেই। পরমকে পেতে হলে দুঃখের মধ্য দিয়ে ত্যাগের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। পরমের সাধনা সত্য লাভের কঠিন সাধনা। কবে পরমের সাক্ষাৎলাভঘটবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। তবুও সেই অনন্তের জন্য 'কত রাত্রি অন্ধকারে চলেছে মানবযাত্রী যুগ হতে যুগান্তর পানে'。

গোবিন্দদাসের অভিসার পদের শিল্পরীতি বৈশিষ্ট্যদ্যোতক। অলংকার সজ্জায়, শব্দচিত্রে, ধ্বনিঝংকারে, অনুভূতির তীক্ষ্মতায়, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বহির্দ্বন্দ্বের আরোপে, চিত্রধর্মে ও নাটকীয়তায় পদগুলি উচ্চশ্রেণির গীতিকবিতার উৎকর্ষ লাভ করেছে। অভিসারের সাধনা বাস্তব জীবনের দুঃখকষ্টের ব্যাপার বলেই সেখানে নাটকীয়তা প্রচুর।

গোবিন্দদাস বৈয়ব পদাবলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হলেও কিছু কিছু তাঁর ত্রুটি-বিচ্যুতিও লক্ষণীয়। অনেক কবিতায় অলংকার ভারস্বরূপ হওয়ায় তাঁর কবিতার প্রাণপ্রবাহ ব্যাহত হয়েছে। অলঙ্কার যেখানে কবিকল্পনারই অঙ্গীভূত, তখন শিল্প-সৌন্দর্যের পরাকাষ্ঠা ঘটেছে। যেমন-

শরদ চন্দ পবন মন্দ বিপিনে করল কুসুম-গন্ধ
ফুল্ল মল্লী মালতী যুথী মত্ত মধুপ ভোরনি।
হেরত রাতি ঐছন ভাতি শ্যাম মোহন মদনে মাতি
মুরলী-গান পঞ্চম তান কুলবর্তী চিত চোরনি।

শারদ প্রকৃতির রম্য পরিবেশ সমস্ত বনভূমি কুসুমের বাসে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। প্রস্ফুটিত মল্লিকা মালতী যূথী। পুষ্পে পুষ্পে ভ্রমরের গুঞ্জন মোহন-মুরতি শ্রীকৃষ্ণের চিত্ত প্রেমোন্মত্ত। পঞ্চমতানে তিনি বাঁশি বাজাচ্ছেন। গীতঝংকার, ছন্দের চারুত্ব ও অনুপ্রাসের শ্রুতিমাধুর্যে কবিতাটি চমৎকার শিল্পকৃতির নিদর্শন। প্রকৃতির বস্তুচিত্রটি অলংকার ও হৃদয়ানুভূতির সার্থক সমাবেশে রসোত্তীর্ণ।

বিরহের পদ রচনায় গোবিন্দদাস সার্থকতা অর্জন করতে পারেননি। এর কারণ সমালোচকের মতে গোবিন্দদাস বেদনার কবি নন, আরাধনার কবি। কিন্তু মনে রাখা দরকার বিরহই বৈয়ব কবিতার মূল শক্তি। কেননা বিরহবোধেই প্রেমের যথার্থ উপলব্ধি। গোবিন্দদাস বিরহের পদ রচনায় সেই উপলব্ধিতে পৌঁছাতে পারেননি। কিন্তু তিনি সাধক ও বড়ো কবি বলে তাঁর অন্যান্য কবিতা রসোত্তীর্ণ।

No comments:

Post a Comment