Breaking

Wednesday, June 17, 2026

তিন. চন্ডীদাসের পদাবলি

গোবিন্দদাসের পদাবলি

গোবিন্দদাস চৈতন্যোত্তর পদাবলি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রে ও বৈয়বীয় দর্শনে সুপন্ডিত গোবিন্দদাস বিধিদত্ত কবিপ্রতিভার সাহায্যে ছন্দসংগীতের বাণীশিল্পে যে অপূর্ব সৌন্দর্যের জগৎ সৃষ্টি করেছেন সেক্ষেত্রে তিনি জয়দেব-বিদ্যাপতি-ভারতচন্দ্রের সমগোত্রীয়। কিন্তু কাব্যাদর্শের দিক থেকে তিনি বিদ্যাপতিকে বিশেষভাবে অনুসরণ করেছেন।

ভূমিকা তাই বিদ্যাপতির সঙ্গে তাঁর ভাবগত আত্মীয়তা বেশি। বিদ্যাপতির অনেক খন্ডিত বা অসম্পূর্ণ পদ তিনি সম্পূর্ণ করে 'বিদ্যাপতি গোবিন্দদাস'-যুগ্মভণিতা যোগ করেছেন। বিদ্যাপতির মতোই গোবিন্দদাস অনেক প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী জমিদারের কাছে সম্বর্ধিত হন। বিদ্যাপতি যেমন জয়দেবের কাব্যাদর্শ অনুসরণ করে 'অভিনব জয়দেব' অভিধায় ভূষিত হয়েছেন, গোবিন্দদাস তেমনি বিদ্যাপতির অনুরূপ ভাবাভঙ্গি, ছন্দোলালিত্য ও অলংকারসমৃদ্ধ ভাবের রূপনির্মিতিতে দ্বিতীয় বিদ্যাপতি নামে আখ্যাত। বিদ্যাপতির সঙ্গে গোবিন্দদাসের ভাবসাদৃশ্যের দিকে লক্ষ রেখে সমসাময়িক শ্রীনিবাস আচার্যের শিষ্য বল্লভদাস সপ্রশংস মন্তব্য করেছেন-

'ব্রজের মধুর লীলা যা শুনি দরবে শিলা। গাইলেন কবি বিদ্যাপতি/
তাহা হৈতে নহে ন্যূন গোবিন্দের কবিত্বগুণ/গোবিন্দ দ্বিতীয় বিদ্যাপতি।'

গোবিন্দদাসকে বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য বলা হলেও বৈয়বীয় তত্ত্বের ভাবানুভূতির প্রকাশে জীবনদৃষ্টির গভীরতা, তত্ত্বের রসসৌকর্যসাধন ও মন্ডনকলার শিল্পদ্যোতনায় তিনি বহুস্থলে বিদ্যাপতির থেকেও উচ্চস্তরের কবি। বৃন্দাবনের শ্রীজীব গোস্বামী তাঁকে কবীন্দ্র বলে সম্মানিত করেছিলেন। তদবধি গোবিন্দদাস কবিরাজ নামে খ্যাত।

জীবনী ও কাব্য বৈশিষ্ট্য গোবিন্দদাস ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি কোনো সময়ে কাটোয়ার শ্রীখণ্ডে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। মাতামহ বিখ্যাত পণ্ডিত দামোদর সেন। পিতার নাম চিরঞ্জীব সেন ও মাতা সুনন্দা দেবী। কবিরা জাতিতে বৈদ্য। পিতা চিরঞ্জীব বৈয়ব-ভাবাপন্ন ও শ্রীচৈতন্যের ভক্ত ছিলেন। আদিনিবাস ছিল কুমারনগরে। আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কোনো সময়ে কবির তিরোধান ঘটে। প্রথমে তিনি শাক্ত ছিলেন। পরে বৈশ্বব ধর্মে দীক্ষিত হন। সংস্কৃতিবান পরিবারে তাঁর জন্ম। সংস্কৃত সাহিত্য ও অলংকারশাস্ত্রে তিনি ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। সংস্কৃতে 'সঙ্গীত মাধব' নামে একটি নাটক তিনি রচনা করেন। কিন্তু ব্রজবুলি ভাষায় পদরচনার জন্যই তিনি যশোমন্দিরে চিরস্থায়ী প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত রাগানুগা ভক্তির ঐতিহ্য নিয়েই কাব্যক্ষেত্রে তাঁর আবির্ভাব। গোবিন্দদাস ভক্ত, সাধক ও রূপদক্ষ শিল্পী হিসেবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী কবিখ্যাতির অধিকারী। ভক্তিভাবের নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতা এবং কাব্যিক মনন উৎকর্ষ তাঁকে কালজয়ী কবিত্বের স্বর্ণমুকুট পরিয়ে দিয়েছে। চৈতন্যোত্তর যুগের তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ পদকার।

ভাষা, ছন্দ, অলংকার, চিত্র ও সংগীতের সুষম মিলনে ব্রজবুলিতে লেখা তাঁর কবিতাগুলি সৃজনশীলতার অভিনব শিল্পসামগ্রীতে পরিণত হয়েছে। গোবিন্দদাসের কবিপ্রকৃতি অলংকারশাস্ত্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় তাঁর কবিতাবলি সংস্কৃতভাষার সুললিত মাধুর্য ও ক্লাসিক সংহতির সুমহান গাম্ভীর্যে দীপ্যমান। গোবিন্দদাস গৌরলীলা ও রাধাকৃষ্ণলীলার পূর্বরাগ, অভিসার, মান, কলহান্তরিতা, বাসকসজ্জা, বিপ্রলব্ধা, খণ্ডিতা ও মাথুর প্রভৃতি বিভিন্ন পর্যায়ের পদকর্তা। তাঁর গৌরাঙ্গবিষয়ক পদ সমগ্র বৈয়ব সাহিত্যে ভক্তিতন্ময়তার একক নিদর্শন। একজন রূপদক্ষ শিল্পীর ভাবের গূঢ়তা ও গাঢ়তা, আলংকারিক শিল্পনৈপুণ্য, চিত্র ও সংগীতধর্মিতা এস্থলে অসাধারণ কাব্যগৌরবে উজ্জ্বল। দিব্যভাবচঞ্চল মহাপ্রভুর অন্তর্জীবনের নিখুঁত লীলাচিত্র গোবিন্দদাস দক্ষ সচেতন শিল্পীর মতো ধীরস্থির তুলির টানে অতীব বর্ণাঢ্য ও সুস্পষ্ট করে তুলেছেন-

'নীরদ নয়নে নীর ঘন সিন্ধনে/পুলক মুকুল অবলম্বছেদ মকরন্দ বিন্দু বিন্দু চুয়অবিকশিত ভাবকদম্ব।'

শ্রীচৈতন্যের মানবিক ও অতিলৌকিক রূপ, মহাপ্রভুর শান্তপুণ্য করুণাঘন দিব্যজীবন ও তাঁর প্রেমাদর্শ রূপে রসে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে উত্ত কবিতায়। অন্য একটি কবিতায়-

'জয় শচী নন্দন বে/ত্রিভুবন মন্ডন কলিযুগ কাল/ভুজগ ভয় খন্ডন রে।।'

রসসৃজন-শক্তির গুণে শ্রীচৈতন্যের চরিত্রটি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। গোবিন্দদাস মহাপ্রভুকে প্রত্যক্ষ করেননি। কিন্তু সুর ও ছন্দের মেলবন্ধনে শ্রীচৈতন্য এখানে পরিপূর্ণ প্রাণসংযুক্ত ও লাবণ্যরসে উদ্‌ভাসিত।

রূপানুরাগের পদে রাধার অলৌকিক সৌন্দর্য বর্ণনায় ভক্তি ও রূপের মধ্যে নিবিড় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছেন গোবিন্দদাস। ভাষার ঐশ্বর্য ও অলংকৃতি, ছন্দের ঝংকার, ভাবের গভীরতা ও গাম্ভীর্যে তাঁর কবিতা সৌন্দর্যের অমরাবতী তৈরি করেছে। পূর্বরাগ পর্যায়ের একটি পদে রাধার সৌন্দর্যে বিভোর কৃষ্ণ বলছেন-

যাঁহা যাঁহা নিকসয়ে তনু তনু জ্যোতি। তাঁহা তাঁহা বিজুরী চমকময় হোতি।।
যাঁহা যাঁহা অরুণ চরণে চল চলই। তাঁহা তাঁহা থলকমলদল খলই।।
যাঁহা যাঁহা হেরিয়ে মধুরিম হাস। তাঁহা তাঁহা কুন্দ-কুসুম পরকাশ।

কবির বর্ণনানৈপুণ্যে এখানে শ্রীরাধিকা অপার্থিব সৌন্দর্য লাবণ্যের ভাবপ্রতিমারূপে উদ্ভাসিত। ভাবের ঋজুতা বা দৃঢ় পিনদ্ধ শিল্পরূপে কবিতাটি অনন্য।

গোবিন্দদাসের কবিপ্রতিভা উত্তজা শিখর স্পর্শ করেছে অভিসারের পদ রচনায়। এক্ষেত্রে সমালোচকেরা গোবিন্দদাসকে কবিসম্রাট, রাজাধিরাজ বলে অভিহিত করেছেন। অভিসারের অর্থ হল-'প্রিয়ের মিলন আশে কুঞ্জেতে গমন/সংকেত পূর্বক অভিসারের লক্ষণ।।' রাধা কুলবতী নারী-গৃহস্থ ঘরের বধূ। পরপুরুষ শ্রীকৃষ্ণের জন্য সবার অলক্ষ্যে নিশীথ রাত্রে তাঁকে অভিসারে বেরোতে হবে। কুলখোয়ানো তাঁর অভিসার যাত্রা। এই পথে সাপ, ঝড়, বৃষ্টি, কাঁটা, অন্ধকার সবকিছুকে তুচ্ছ করে তাঁকে অগ্রসর হতে হবে। অভিসারের জন্য নিজেকে উপযোগী করে তুলতে রাধা স্বগৃহে রাত জেগে দুস্তর পথযাত্রার সাধনায় রত। অভিসারের যাত্রাপথে যেসব সম্ভাব্য বিপদবাধা দেখা দিতে পারে সে সমস্ত উত্তরণের চেষ্টায় রাধা প্রস্তুত হচ্ছেন-

কণ্টক গাড়ি কমল সম পদতল মন্ত্রীর চীরহি ঝাঁপি
গাগরি বারি ঢালি করি পিছল চলতহি অঙ্গুরি চাপি।।
করযুগে নয়ন মুদি চলু ভামিনী তিমির পয়ানক আশে।
করকঙ্কণপণ ফণিমুখ বন্ধন শিখই ভুজগ গুরু পাশে।

ঘরের বাইরে দ্বার রুদ্ধ। অবিরাম প্রবল বেগে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তা কর্দমাক্ত পিচ্ছিল। চারদিক ঘোর অন্ধকারে লিপ্ত। প্রচণ্ড শব্দে ঘন ঘন বজ্রপাত হচ্ছে। সখীরা রাধাকে সতর্কবাণী শোনাল-এই ভয়ংকর দুর্যোগে অভিসারে বেরোলে প্রেমের জন্য তাঁর জীবননাশ অনিবার্য। কিন্তু প্রিয়ের জন্য শ্রেয়ের জন্য যে জীবন উৎসর্গ করেছে তাঁর কাছে প্রকৃতির বাধা কিছুই নয়-মৃত্যুও নিতান্ত তুচ্ছ। কুলমর্যাদার কপাট যে লঙ্ঘন করেছে তার কাছে 'তাহে কাঠ কি বাধা'। ভয়ংকর দুর্যোগকে উপেক্ষা করে রাধা অভিসারে যাবেনই। কারণ-

'কোটি কুসুম শর বরিখয়ে যদুবর তাহে কি জলদ জল লাগি।
প্রেম দহন দহ যাহ হৃদয় সহ তাহে কি বজরক আগি।।'
দুর্যোগের রাত্রিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অনেক বাধা ও কষ্ট অতিক্রম করে রাধা শ্রীকৃত্রের সঙ্গে মিলিত হলেন। কিন্তু সেই মিলন আনন্দের নয়। শ্রীরাধিকার পথযাত্রা বন্ধ হয়েছে বটে, কিন্তু মনের গতি থামেনি। পথ আগমনের দুঃখবার্তা তিনি বলে চলেছেন। অভিসারের প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রবল প্রাণশক্তি ও অবিশ্রান্তভাবে পথ হেঁটে চলা। গোবিন্দদাসের অভিসারের পদ এই চলমানতা ভাববৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ। প্রেমের জন্য অভিসারে কঠিন দুঃখের কথা রাধা শ্রীকৃয়কে শোনাচ্ছে- 'পথ আগম কথা/কত না কহিব হে/যদি হয় মুখ লাখেলাখ।'

শ্রীকৃষ্ণের জন্য রাধার যে প্রেমসাধনা তা অনন্তের অমৃতলাভের জন্য। অনন্ত বলেই সেই প্রেমের অভিসারের বিরতি নেই। পরমকে পেতে হলে দুঃখের মধ্য দিয়ে ত্যাগের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। পরমের সাধনা সত্য লাভের কঠিন সাধনা। কবে পরমের সাক্ষাৎলাভঘটবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। তবুও সেই অনন্তের জন্য 'কত রাত্রি অন্ধকারে চলেছে মানবযাত্রী যুগ হতে যুগান্তর পানে'。

গোবিন্দদাসের অভিসার পদের শিল্পরীতি বৈশিষ্ট্যদ্যোতক। অলংকার সজ্জায়, শব্দচিত্রে, ধ্বনিঝংকারে, অনুভূতির তীক্ষ্মতায়, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বহির্দ্বন্দ্বের আরোপে, চিত্রধর্মে ও নাটকীয়তায় পদগুলি উচ্চশ্রেণির গীতিকবিতার উৎকর্ষ লাভ করেছে। অভিসারের সাধনা বাস্তব জীবনের দুঃখকষ্টের ব্যাপার বলেই সেখানে নাটকীয়তা প্রচুর।

গোবিন্দদাস বৈয়ব পদাবলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হলেও কিছু কিছু তাঁর ত্রুটি-বিচ্যুতিও লক্ষণীয়। অনেক কবিতায় অলংকার ভারস্বরূপ হওয়ায় তাঁর কবিতার প্রাণপ্রবাহ ব্যাহত হয়েছে। অলঙ্কার যেখানে কবিকল্পনারই অঙ্গীভূত, তখন শিল্প-সৌন্দর্যের পরাকাষ্ঠা ঘটেছে। যেমন-

শরদ চন্দ পবন মন্দ বিপিনে করল কুসুম-গন্ধ
ফুল্ল মল্লী মালতী যুথী মত্ত মধুপ ভোরনি।
হেরত রাতি ঐছন ভাতি শ্যাম মোহন মদনে মাতি
মুরলী-গান পঞ্চম তান কুলবর্তী চিত চোরনি।

শারদ প্রকৃতির রম্য পরিবেশ সমস্ত বনভূমি কুসুমের বাসে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। প্রস্ফুটিত মল্লিকা মালতী যূথী। পুষ্পে পুষ্পে ভ্রমরের গুঞ্জন মোহন-মুরতি শ্রীকৃষ্ণের চিত্ত প্রেমোন্মত্ত। পঞ্চমতানে তিনি বাঁশি বাজাচ্ছেন। গীতঝংকার, ছন্দের চারুত্ব ও অনুপ্রাসের শ্রুতিমাধুর্যে কবিতাটি চমৎকার শিল্পকৃতির নিদর্শন। প্রকৃতির বস্তুচিত্রটি অলংকার ও হৃদয়ানুভূতির সার্থক সমাবেশে রসোত্তীর্ণ।

বিরহের পদ রচনায় গোবিন্দদাস সার্থকতা অর্জন করতে পারেননি। এর কারণ সমালোচকের মতে গোবিন্দদাস বেদনার কবি নন, আরাধনার কবি। কিন্তু মনে রাখা দরকার বিরহই বৈয়ব কবিতার মূল শক্তি। কেননা বিরহবোধেই প্রেমের যথার্থ উপলব্ধি। গোবিন্দদাস বিরহের পদ রচনায় সেই উপলব্ধিতে পৌঁছাতে পারেননি। কিন্তু তিনি সাধক ও বড়ো কবি বলে তাঁর অন্যান্য কবিতা রসোত্তীর্ণ।

চার. জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাসের পদাবলি

১. সাধারণ আলোচনা

ভূমিকা মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের বিবর্তন ও বিকাশের ইতিহাসে বৈয়ব পদাবলি বাঙালির সর্বোত্তম সাহিত্যকীর্তি বললে অত্যুক্তি হয় না। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের পর বৈয়ব পদাবলি সাহিত্যের বিকাশ ঘটে শত ধারায়। মানবহৃদয়ের অতিসূক্ষ্ম অনুভূতি ও প্রবল উৎকণ্ঠা, প্রগাঢ় সৌন্দর্যানুভূতি ও সুকোমল প্রেমমাধুর্য, অতীন্দ্রিয় জীবনবোধ ও বিস্ময় বিমুগ্ধ ভাববিহ্বল রোমান্টিক জীবনচেতনা অমূল্য রসসৌকর্যে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে。

মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য গৌড়ীয় বৈয়বধর্মের ভাব-প্রবক্তা। ভক্ত ও ভগবানের সম্পর্ক নরনারীর হৃদয়ের প্রেম ভালোবাসার অভিন্নতা সম্পর্কে স্থাপিত হয়। বৈয়ব মতে রাধা জীবাত্মা, কৃর হলেন পরমাত্মা। রাধাকৃষ্ণের প্রেম তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে বা বিশুদ্ধ মতে মর্তবাসী মানব-মানবীর প্রেম নয়। এটা জীবাত্মা পরমাত্মার অপ্রাকৃত বৃন্দাবনলীলা। বৈয়বপদকর্তাদের পদাবলি বৈকুণ্ঠের জন্য। কিন্তু কৃষ্ণপ্রেমমুগ্ধা শ্রীরাধিকার অশ্রু ছলছল যে জীবনচিত্র কবিরা এঁকেছিলেন-নিশ্চয়ই তা এই মর্তনারীর বিরহ ছলছল আঁখির প্রতি দৃষ্টিপাত করে। রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছেন, শুধু বৈকুণ্ঠের তরে বৈয়বের গান নয়, যদিও লক্ষ্য বৈকুণ্ঠ। বৈয়ব কবিরা বৈয়বতত্ত্বে দীক্ষিত হয়েও মর্তজীবনের মাধুর্যকে অস্বীকার করেননি। মর্তমানবীর মান অভিমান মিলন বিরহই রাধিকার তত্ত্বকথায় রূপান্তরিত হয়েছে।

বৈয়বধর্মে দীক্ষিত বৈয়ব পদকাররা অন্তরের সমস্ত সৌন্দর্য মাধুর্য উজাড় করে দিয়ে সৌন্দর্যঘন শ্রীরাধিকার তিলোত্তমামূর্তি অঙ্কন করেছেন। মধ্যযুগের বৈয়ব কবিদের হৃদপদ্ম বিকশিত অনুভূতির অপরূপ সৌন্দর্যপ্রতিমা শ্রীরাধিকা। প্রাচীন পুরাণাদি ও অন্যান্য গ্রন্থে খণ্ড খন্ড কবিতায় রাধার বিচ্ছিন্ন কিছু কিছু পরিচয় মেলে। তারপর বৈয়ব কবিদের হৃদয় সমুদ্রে স্নাত হয়ে সেই রাধার পূর্ণাবয়ব নতুন এক সৌন্দর্যমূর্তি গড়ে উঠেছে। বৈয়ব কবিরা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে রাধাকে রূপলাবণ্যময়ী করে তুলেছেন। যুগ যুগ ধরে মানুষের রূপ সৌন্দর্যের প্রতি যে প্রবল অনুরাগ ও অদম্য আকর্ষণ, প্রেমের জন্য যে সুতীব্র ব্যাকুলতা-শ্রীরাধিকা সেই চিরকালীন মনুষ্য-হৃদয়ের সমস্ত সৌন্দর্যপ্রিয়তা ও প্রেমপিপাসার পুঞ্জীভূত মূর্তি। বৈয়ব কবিদের শ্রীরাধিকা বৈয়বীয় তত্ত্ব ও মানবীয় রসের এক উজ্জ্বলতম নায়িকা।

বৈয়ব পদাবলি সাহিত্য মুক্ত জীবনের জয়গানে মুখরিত। প্রেম স্বাধীন ও সর্ববন্ধনমুক্ত। এটি জীবনের শ্রেয়োবোধের দ্যোতনাবাহী। তাই যে অনুবাদ সাহিত্য ও মঙ্গলকাব্য সমাজের রীতিনীতির পথ ধরে চলেছিল, বৈয়ব সাহিত্য সেখানে একটা বিরাট ব্যতিক্রম। বৈয়বসাহিত্য রাজসভা থেকে মুক্তি লাভ করে জনপথবাহী হয়ে মধ্যযুগের প্রথানুবর্তী জীবনচেতনার মধ্যে পালাবদলের সূচনা ঘটিয়েছে। এ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উক্তি প্রণিধানযোগ্য যে বৈয়বকাব্যই আমাদের দেশের সাহিত্যকে প্রথম রাজসভার সংকীর্ণ আশ্রয় থেকে বৃহৎভাবে জনসমাজের মধ্যে সম্প্রসারিত করেছে।

বৈয়ব পদাবলি সাহিত্যকে চৈতন্যপূর্ব ও চৈতন্যোত্তর দুই পর্যায়ে ভাগ করা যায়। চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পূর্বে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলাকে উপজীব্য করে সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষায় খন্ড খন্ড কিছু কবিতা রচিত হতে দেখা যায়। তারপর জয়দেবই প্রথম সরল সংস্কৃত ভাষায় সুললিত কান্ত কোমল পদে 'গীতগোবিন্দম্' কাব্যে রাধাকৃষ্ণের কাহিনিকে রূপ দেন। বাংলাভাষায় বড়ু চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাস রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক কাহিনির রচয়িতা। গীতসাহিত্যে চৈতন্যপূর্ব যুগের এঁরা শ্রেষ্ঠ কবি। এ স্থলে বলা দরকার যে চৈতন্যপূর্ব যুগের কবিদের ব্যক্তিগত ধর্মচেতনা ও কাব্যাদর্শ এক ছিল না। সাম্প্রদায়িক ধর্মপ্রভাবমুক্ত কবিরা মানব-মানবীর প্রেমের স্বচ্ছন্দ বিকাশ লক্ষ করেছেন রাধাকৃষ্ণের প্রেমের মধ্যে। তাঁদের রচিত পদাবলি মূলত মানবীয় রসে পরিপূর্ণ। ভক্তি যদি বা কোথাও থাকে তা তাঁদের উপলব্ধির বস্তু। কিন্তু চৈতন্য-পরবর্তীকালের পদাবলি সাহিত্য স্বরূপত ভিন্ন। মহাপ্রভু যে ভক্তিধর্ম প্রচার করেছিলেন তাতে রাধাকৃয় তত্ত্বের আদর্শ ব্যাখ্যাই প্রধান হয়ে উঠেছিল। পদকার লিখেছেন-

'গৌরাঙ্গ নহিত কি মেনে হইত কেমনে ধরিত দে রাধার মহিমা প্রেমরস সীমা জগতে জানাত কে।।।
মধুর বৃন্দা বিপিন-মাধুরী-প্রবেশ চাতুরী সার।/ বরজ-যুবতী-ভাবের ভকতি শকতি হইত কার।।'

বাস্তবিকই মহাপ্রভু তাঁর ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে রাধাকৃয়ের অপ্রাকৃত প্রণয়লীলাকে সর্বজনবোধ্য-সহজরূপে প্রকাশ করেন। মানবীয় প্রণয়রীতির মাধ্যমে বৈয়বপদাবলির স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ ঘটায় সাধারণ পাঠক নায়ক-নায়িকার বিরহমিলনের আর্তি ও আনন্দ সহজে উপলব্ধি করতে পারে। আবার বৈয়বের গান ভক্তের ভক্তিপিপাসার্ত অন্তরকে ঐশ্বরিক অনুভূতিতে পরিতৃপ্ত করে।

পদাবলি সাহিত্যের পূর্ণবিকাশ ঘটেছে মহাপ্রভুর আবির্ভাবের পর। মহাপ্রভুর সমকাল থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত পদাবলি সাহিত্যের কূলপ্লাবী সৃষ্টিধারা প্রবাহিত। চৈতন্যোত্তর পদাবলি প্রধানত তিনটি ধারার মুক্ত ত্রিবেণি-রাধাকৃয়লীলা, শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা ও গৌরাঙ্গবিষয়ক পদ। চৈতন্যোত্তর পদাবলি সাহিত্যের কবিরা স্বাধীন ভাবকল্পনা অনুযায়ী কবিতা রচনা করেননি। চৈতন্য প্রবর্তিত বৈয়ব ভাব ও জীবনদর্শন এ সময়ের পদাবলি সাহিত্যকে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত করেছে। কবিরা সবাই সাধক - বৈয়বধর্মে দীক্ষিত হয়েই ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে তাঁদের কবিপ্রতিভার বিকাশ ঘটেছে। এ যুগের পদাবলিতে সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় চেতনার স্বাতন্ত্র্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

চৈতন্য আবির্ভাবের পর বৈয়বপদাবলিতে নতুন বিষয়ের সংযোজন গৌরাঙ্গ-বিষয়ক পদ। শ্রীগৌরাঙ্গের রহস্যময় মর্তলীলা নিয়ে বহু কবিতা রচিত হয়েছে। এর কারণ হল, গৌড়ীয় বৈয়বাচার্যদের চোখে মহাপ্রভু রাধাকৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ। অন্তরঙ্গে তিনি কৃষ্ণ, বহিরঙ্গে রাধা। রাধাভাবের জীবন্তমূর্তি শ্রীচৈতন্য শ্রীরাধিকার মতোই কৃষ্ণের জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছিলেন। রাধাপ্রেম যে কী বস্তু তিনিই সকলকে তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কৃয়সমর্পিত প্রাণ সেই মহাপুরুষের বাল্য, কৈশোর ও ভাবময় জীবনের বিচিত্র দিক নিয়ে পদকাররা গীতিমাধুর্যের অপূর্ব রসলোক সৃষ্টি করেছেন।

গৌরাঙ্গবিষয়ক পদগুলি দুই পর্যায়ে বিভক্ত। এক, বিশুদ্ধ গৌরাঙ্গবিষয়ক পদ-এগুলি গৌরাঙ্গ জীবনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। দুই, গৌরচন্দ্রিকা। সেই সমস্ত গৌরাঙ্গবিষয়ক পদই গৌরচন্দ্রিকা- যেগুলির ভাবের পরিপূরক রাধাকৃষ্ণবিষয়ক পদ রয়েছে। চৈতন্য-সমসাময়িক কীর্তনীয়া সমাজে এই ধারণা গড়ে উঠেছিল যে রাধাকৃষ্ণের প্রেমকে সাধারণ শ্রোতারা মানব-মানবীর প্রেমের ব্যাপার বলে গ্রহণ করতে পারে। তাই শ্রোতাদের চিত্তকে আধ্যাত্মিক চেতনায় পূর্বাহ্নে উদ্বুদ্ধ করার জন্য রাধাকৃয়বিষয়ক পদ গান করার পূর্বে তাঁরা গৌরাঙ্গবিষয়ক পদ গান করতেন। রাধাকৃয়ের বৃন্দাবন লীলার সঙ্গে মিল রেখে যেসব গৌরাঙ্গবিষয়ক পদ গান করা হয় তাই গৌরচন্দ্রিকা। এর উদ্দেশ্য ছিল শ্রোতার চিত্তকে লৌকিক প্রেমের ভাবানুভূতি থেকে ভগবপ্রেমে উন্নীত করা।

চৈতন্য আবির্ভাবের পর রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা নিয়ে অজস্র কবিতা রচিত হয়েছে। প্রেক্ষাপট হচ্ছে দ্বাপর যুগের-বৃন্দাবন, নায়ক কিশোর কৃয়, নায়িকা কিশোরী রাধিকা। দার্শনিক চিন্তাচেতনা কবিদের বিশেষভাবে প্রভাবিত করলেও বিষয়বস্তু নায়ক-নায়িকার প্রেম ও অতীত জীবনলীলা হওয়ায় রোমান্টিক কল্পনার ব্যাপকতা ও মানবীয় জীবনরস বৈয়বপদাবলিকে অসামান্য কাব্যকৌলীন্য দান করেছে। রবীন্দ্রনাথের এস্থলে বক্তব্য বিশেষ প্রণিধানযোগ্য-

'বৈয়ব কবিদের পদাবলি বসন্তকালের অপর্যাপ্ত পুষ্পমঞ্জরীর মতো। যেমন তাহার ভাবের সৌরভ তেমনি তাহার গঠনের সৌন্দর্য।'

বৈয়ব কবিরা মহৎ এক ধর্মীয় আদর্শে দীক্ষিত হওয়ায় মহাজন নামে অভিহিত। তাঁদের রচিত কবিতা মহাজন পদাবলি। আবার বৈয়ব কবিতা জীবনেরই পদাবলি। বিরহতাপিত চিরপ্রেমিকার অশ্রুধারার মধ্যে স্বর্গলোকের আনন্দসুধা ঝরে পড়েছে। চৈতন্যপূর্ব যুগের কবিদের মধ্যে অন্যতম জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস।

২. কবি জ্ঞানদাস

আত্মপরিচয় জ্ঞানদাস: চৈতন্যপরবর্তী কালের একজন সুবিখ্যাত বৈয়ব পদকর্তা। বৈয়ব পদাবলি সাহিত্যে বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস-এই চারজন কবিই প্রতিনিধি-স্থানীয় কবি ও নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। জ্ঞানদাসের জীবন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বর্ধমান জেলার কাটোয়ার নিকটে কাঁঙ্গড়া বা কাঁদড়া গ্রামের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে আনুমানিক ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম হয়। ইনি নিত্যানন্দের পত্নী জাহ্নবী দেবীর নিকট বৈয়বধর্মে দীক্ষিত হন। নিত্যানন্দের তিরোধানের কিছুদিন পরে তিনি জাহ্নবী দেবীর সঙ্গে বৃন্দাবনে তীর্থ করতে যান। বৃন্দাবনে জ্ঞানদাস শ্রীজীব, রঘুনাথ দাস, গোপালভট্ট ও কৃষ্ণদাস কবিরাজ প্রমুখ বিখ্যাত বৈয়বাচার্যদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন। জ্ঞানদাস, নরোত্তম দাস আয়োজিত খেতুরির কবি সম্মেলনে যোগ দেন। সেই অনুষ্ঠানে গোবিন্দদাস কবিরাজ ও বলরাম দাসের সঙ্গে তাঁর - পরিচয় হয়। এর বেশি কিছু তাঁর সম্পর্কে জানা যায়নি। কবি চিরকুমার ছিলেন। জ্ঞানদাসের ভণিতায় প্রায় চারশত পদ পাওয়া গেছে। মনে হয় অল্প প্রতিভাশালী কবিরা জ্ঞানদাসের নামে তাঁদের কবিতা অনেক চালিয়ে দিয়েছেন।

কাব্যবৈশিষ্ট্য জ্ঞানদাস বৈয়বভক্ত কবি। তাঁকে চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য বলা হয়। চণ্ডীদাসের মতোই জ্ঞানদাসের পদে প্রকাশরীতির সরলতা ও ভাবের গভীরতা লক্ষ করা যায়। জ্ঞানদাস বাংলা ও ব্রজবুলি উভয় ভাষাতেই কবিতা রচনা করেছেন। তবে বাংলা ভাষায় রচিত কবিতাতেই তাঁর প্রতিভার উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। ব্রজবুলির পদে কবি বিদ্যাপতিকে আক্ষরিকভাবে অনুসরণ করায় সেগুলি কাব্যসৌন্দর্যের গৌরব অর্জন করতে পারেনি। বাংলা ভাষায় রচিত কবিতাবলিতে ভাবের সরলতা ও অনুভূতির গভীরতা অলংকার-বিরল সহজ ভাষায় অনবদ্য শিল্পমণ্ডিত হয়ে উঠেছে। জ্ঞানদাসের কবিপ্রতিভার স্বকীয়তা বাংলা ভাষার পদে দীপ্যমান।

সহজ প্রকাশভঙ্গি ও ভাবগভীরতার দিক থেকে চন্ডীদাসের সঙ্গে জ্ঞানদাসের সাদৃশ্য বর্তমান। কিন্তু চণ্ডীদাসের মতো রহস্যঘন অতীন্দ্রিয় অনুভূতির দ্যোতনা জ্ঞানদাসের কবিতায় নেই। জ্ঞানদাস আধ্যাত্মিক ভাবানুভূতির সঙ্গে মানবিক চেতনার আশ্চর্য সমন্বয়সাধন করেছেন।

তিনি মিষ্টিক ও রোমান্টিক কবি। তাঁর কবিতা রূপ ও অরূপের সংগমতীর্থ। প্রেমের অতল অসীম রহস্য, চিরন্তন অতৃপ্তি বোধ, মিলনের ব্যাকুলতা, বিরহের মর্মান্তিক দাহ ও স্বপ্নচারিতায় মিলনের আনন্দ ও নিবিড় প্রশান্তি প্রভৃতি প্রেমের বিচিত্র লীলা তাঁর পদগুলিতে অপূর্ব শিল্পসৌকর্য লাভ করেছে। শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা, নৌকাবিলাস ও দানখণ্ড প্রভৃতি বিষয়েও তিনি কবিতা লিখেছেন। কিন্তু তাঁর কবিপ্রতিভা পূর্বরাগ, আক্ষেপানুরাগ, মান, নিবেদন, রসোদ্গার, মিলন, বিরহ ও মুরলী শিক্ষা বিষয়ক পদগুলিতে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে গৌরব দ্যুতিময়। নায়ক-নায়িকার রূপ বর্ণনা, প্রেমাবেগের তীব্র জ্বালা ও আর্তি, রূপবিভোরতা ও মিলন ব্যাকুলতাকে জ্ঞানদাস অনায়াসেই শিল্পশ্রীমণ্ডিত করে তুলেছেন। ভাব ও রূপের যুগলমূর্তি গঠনে তিনি অসামান্য কৃতিত্বের অধিকারী।

শ্রীগৌরাঙ্গবিষয়ক পদে জ্ঞানদাস গৌরাঙ্গদেবের রাধাভাবভাবিত একাত্মবোধ এবং কৃয়বিরহজনিত তাঁর ধৈর্যহারা চিত্তের দিব্যভাবমণ্ডিত শ্রীমূর্তি চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছেন।

জ্ঞানদাস জন্ম-রোমান্টিক কবি। তিনি ভক্তিভাবকে রোমান্টিকতার স্পর্শে লৌকিক রসব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত করে তুলেছেন। রোমান্টিক কবিকল্পনার বৈশিষ্ট্য প্রাণাবেগের তীব্র উচ্ছ্বাস, স্বপ্নমেদুরতা ও অগাধ বিস্ময়বোধ। কৃয়ের নয়নমনোহর রূপমাধুর্যে মুগ্ধ ও প্রেমে আকুলা রাধার অন্তর্ভাবনার সুন্দর চিত্র তুলে ধরেছেন কবি। শ্রীরাধিকা কত দিনই না কালো কালিন্দী নদীতীরে জল আনতে গেছেন। আজ কিন্তু শ্রীকৃয়কে দেখে ঘরে ফিরতে আর পথই শেষ হয় না-

রূপের পাথারে আঁখি ডুবি সে রহিল।
যৌবনের বনে মন হারাইয়া গেল।।
ঘর যাইতে পথ মোর হৈল অফুরান।
অন্তরে বিদরে হিয়া কি জানি কি করে প্রাণ।।

শ্রীরাধার জীবনে আজ সব ওলট-পালট হয়ে গেল। সমস্ত পথটাই যে কৃষ্ণ নামাঙ্কিত হয়ে গেছে। রূপের গোলকধাঁধায় পথভ্রষ্ট শ্রীরাধিকা। তাঁর জাতি কুলশীল মান সমস্তই আজ জলাঞ্জলি হয়ে গেল। শ্রীরাধিকা 'কুলবতী সতী হৈয়া দু-কুলে দিলু দুখ।' শ্রীরাধিকার এই সমাজ-বিগর্হিত অবৈধ প্রেমভাবনার চিরন্তন মুক্তপ্রেমের রোমান্টিক ভাবব্যঞ্জনা স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি লাভ করেছে। রোমান্টিকতার সঙ্গে প্রকৃতির একটা নিগূঢ় সম্পর্ক থাকে। বর্ষণমুখর শ্রাবণ রজনির নির্জন পরিবেশে শ্রীরাধিকার চিত্ত রোমান্টিক ভাবাবেশে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্বপ্নের ঘোরে শ্রীকৃত্রের সঙ্গে তাঁর মধুর মিলন সাধিত হয়। স্বপ্নসমাগম তৃষ্টা রাধার একটি পদ ভাবমাধুর্যে অতুলনীয়-

মনের মরম কথা তোমারে কহিয়ে এখা
শুন শুন পরাণের সই।
স্বপনে দেখিলু যে শ্যামল বরণ দে
তাহা বিণু আর কারো নই।
রঙীন শাঙন ঘন ঘন দেয়া গরজন
রিমিঝিমি শবদে বরিষে।
পালতেক শয়ান রঙ্গে বিগলিত চীরঅঙ্গে
নিন্দ যাই মনের হরিষে।।

ঝরঝর শ্রাবণের বারিপাত, মেঘের গর্জন, রাত্রি গভীর, চারদিক বজ্রনিনাদিত। রাধার অন্তরের কামনার ধন শ্রীকৃয় স্বপ্নের রথে চড়ে রাধার কাছে উপস্থিত। শ্রীকৃয় এলেন, রাধাকে সোহাগ করলেন-দুজনের মধুর মিলন সাধিত হল। জ্ঞানদাস প্রেমানুভূতির নিবিড় মনস্তত্ত্বকে রোমান্টিক কল্পনায় দীপ্ত করে তুলেছেন। রবীন্দ্রনাথ উল্লিখিত কবিতাটির চিরন্তন রোমান্টিক ধর্ম সম্পর্কে সুন্দর মন্তব্য করেছেন- 'সে মেয়ে আজ নেই। আছে শাঙন ঘন, আজ সেই স্বপ্ন, আজো সমানই।'

প্রেমের অভিন্নাত্মক ভাবপ্রকাশে জ্ঞানদাস ব্যাখ্যাতীত অনির্বচনীয় রসব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন- 'রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুনে মন ভোর। প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর। হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে। পরাণ পীরিতি লাগি থির নাহি বান্ধে।' আক্ষেপানুরাগের পদে জ্ঞানদাস রাধার প্রণয়ভঙ্গের বেদনার্তিকে সুস্মিত ভাব প্রতীতির মধ্যে স্থিরদীপ্তি দান করেছেন। প্রেমের সুখের জন্য রাধা ঘর তৈরি করলেন। সে ঘর আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গেল-অমিয় সাগরে স্নান করতে নেমে- 'সকলি গরল ভেল।' মেঘের বারি আকাঙ্ক্ষা করতে 'বজর পড়িয়া গেল'। শ্রীকৃষ্ণের প্রেম কঠিন সাধনার বস্তু। এই সাধনার পথে অনেক আঘাত সহ্য করতে হয়- 'জ্ঞানদাস কছে/কানুর পিরীতি/মরণ অধিক ভেল।' অনুরাগের পদ রচনায় জ্ঞানদাসের কবিব্যক্তিত্ব সর্বাধিক স্ফূর্তিলাভ করেছে। কৃষ্ণের প্রতি তীব্র অনুযোগ রাধা প্রকাশ করেন মধুর স্বরে- 'অন্যের আছয়ে অনেক জনা/আমার কেবল তুমি।'

রাধার জীবনের সুখদুঃখ ইহকালের পরম সঙ্গী শ্রীকৃয়। তাই জ্ঞানদাসের রাধা আঘাতের মধ্যে আনন্দ পায়, অন্ধকারে উজ্জ্বল আলোর সন্ধান পায়।- 'দেখিয়া যতেক লোক করে উপহাস/চাঁদের উদয়ে যেন তিমির বিনাশ'। আর গুরুজনেরা গঞ্জনা করলে- 'গুরু গরবিত যতেক গঞ্জে/মণি যেন জ্বলে তিমির পুঞ্জে।' জ্ঞানদাস দুঃখবোধের কবি। কিন্তু তাঁর দুঃখবোধের মধ্যে অন্তর্লীন হয়ে আছে এক অনাবিল আনন্দ। জ্ঞানদাসের রাধা মিলনে দয়িতের সঙ্গসুখ পান না। এই অবস্থা মর্মান্তিক- 'একলি মন্দিরে শুতলি সুন্দরি কোরহি শ্যামর চান্দ/তবহু কাকর পরশ না ভেল এ বড়ি মরমক ধন্দ।।'

কবি জ্ঞানদাস ভক্ত ও সাধকরূপে বন্দাবনে রাধা কৃষ্ণের মধ্যে চিরন্তন মানব-মানবীর ব্যর্থপ্রেমের হতাশা বেদনাকে প্রত্যক্ষ করে বিরহযন্ত্রণাদগ্ধ প্রেমের অলকাপুরী নির্মাণ করেছেন। সেদিক থেকে জ্ঞানদাস একই সঙ্গে বৈয়বসাধক সৌন্দর্যরসিক ও চিরায়ত মানবরসের কবি। রাধাকৃষ্ণের প্রেমকে বৈয়বীয় তত্ত্বের দিক থেকে গ্রহণ করলেও সৌন্দর্যরসিক জীবনপ্রেমিক জ্ঞানদাস সেই অলৌকিক প্রেমভাবনাকে লোকায়ত জীবনের রহস্য ছন্দিত করে তুলেছেন। তাই জ্ঞানদাসের কবিতা সর্বকালের রসমর্যাদায় উন্নীত। প্রকাশভঙ্গির মাধুর্যে, ভাবের গভীরতা ও রসানুভূতির তীব্রতায়, মনস্তত্ত্বের নৈপুণ্যে ও সৌন্দর্যের ব্যঞ্জনা সৃষ্টিতে জ্ঞানদাসের কবিতা গীতিকবিতার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। জ্ঞানদাস চিরকালের রসিক পাঠকের প্রিয়তম কবি।

No comments:

Post a Comment