দুই. বিদ্যাপতির পদাবলি
১. সাধারণ আলোচনা
ভূমিকা বৈয়ব পদাবলি সাহিত্যের অন্যতম প্রতিভাবান কবি বিদ্যাপতি। বিদ্যাপতির জন্মস্থান মিথিলা। বাংলার মাটিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেননি। বাংলা ভাষায় তিনি এক পঙক্তিও লেখেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাঙালি তাঁর কবিপ্রতিভাকে অকুণ্ঠ স্বীকৃতি জানিয়েছে। ভিন্ন রাজ্যের ভিন্ন ভাষার কবিকে নিজের মাতৃভাষার কবি হিসাবে গ্রহণ করার যথেষ্ট কারণ আছে। শুধু বৈয়ব মহাজনেরা নয়, সাধারণ বাঙালি পাঠকও তাঁকে আপন ঘরের প্রিয়তম মনের মানুষ হিসাবে বরণ করে নিয়েছে। বাঙালির হৃদয়রাজ্যে তিনি চিরন্তন প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তাঁর রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলি বাঙালির প্রাণের প্রিয় সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে। স্বয়ং মহাপ্রভু বিদ্যাপতির পদাবলি আস্বাদন করে পরম আনন্দ লাভ করতেন:
কর্ণামৃত শ্রীগীতগোবিন্দ।
স্বরূপ রামানন্দ সনে
মহাপ্রভু রাত্রিদিনে
গান শুনে পরম আনন্দ।
প্রাচীনকালে বাংলাদেশের সঙ্গে মিথিলার নিবিড় সাংস্কৃতিক ঐক্য ছিল। বাংলার ভৌগোলিক সীমা তখন বহুদূর বিস্তৃত। বাংলা ও মিথিলা সংস্কৃত চর্চার প্রধান কেন্দ্র বা পীঠস্থান ছিল। দুই প্রদেশের ছাত্ররা দুই প্রদেশে যাতায়াত করত। এর ফলেই বাঙালি ও মিথিলাবাসীদের মধ্যে একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। বিদ্যাপতি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত মিথিলাবাসীর উপেক্ষার পাত্র ছিলেন। বাঙালি কর্তৃক বিদ্যাপতির পদাবলি সমাদৃত হলেই মিথিলাবাসীর দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় বিদ্যাপতির প্রতি।
বংশ-পরিচয় চৈতন্যপূর্ব যুগে বিদ্যাপতি মিথিলার মধুবনি মহকুমার অন্তর্গত বিসফী গ্রামের এক সংস্কৃতিবান ব্রাহ্মণ পণ্ডিত পরিবারে খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকের শেষভাগে জন্মগ্রহণ করেন। পঞ্চদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত তিনি বর্তমান ছিলেন। পিতার নাম গণপতি ঠাকুর। ঠাকুর সম্ভবত কৌলিক উপাধি। পূর্বপুরুষের মতো বিদ্যাপতিও বিচিত্রবিদ্যার অধিকারী ছিলেন। গীতগোবিন্দ, অমরুশতক, ঋতুসংহার, আর্যাসপ্তশতী, শৃংগারতিলক ও গাথা সপ্তশতী প্রভৃতি একাধিক সংস্কৃত ও প্রাকৃত গ্রন্থের প্রভাব তাঁর রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলিতে লক্ষ করা যায়। রাজ্যশাসন সম্পর্কেও তাঁর প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি মিথিলার রাজসভায় কামেশ্বর রাজবংশের কীর্তিসিংহ থেকে দেবসিংহ, বীরসিংহ ও ভৈরবসিংহের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। পাণ্ডিত্য ও কবিত্বে তিনি মিথিলাবাসীর প্রভূত শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। পদাবলির ধ্বনিসৌন্দর্য, পদলালিত্য ও কাব্য মাধুর্যের জন্য তিনি 'মৈথিল কোকিল' নামে অভিহিত।
পদাবলি ছাড়াও বিদ্যাপতি কীর্তিলতা, কীর্তিপতাকা, দানবাক্যাবলি ও দুর্গা ভক্তিতরঙ্গিণী প্রভৃতি বিচিত্র বিষয়ক গ্রন্থ মৈথিলি ও অবহট্ট ভাষার রচনা করেন। কিন্তু বিচিত্রমুখী প্রতিভাধর বিদ্যাপতির প্রভাব বিদ্যাপতির মৌলিকতার স্বাক্ষর সুচিহ্নিত হয়ে আছে রাধাকৃয় বিষয়ক পদগুলিতে। রাধাকৃয় বিষয়ক পদাবলিতে জীবনানুভূতির স্বচ্ছন্দ প্রবাহ ও প্রেমভাবনার বিচিত্র তরঙ্গ লীলায়িত হয়ে উঠেছে।
২. বিদ্যাপতির বৈয়ব পদাবলি
জীবনরসিক কবি অলংকার শাস্ত্রে সুপণ্ডিত জীবনরসরসিক ছিলেন যৌবনের কবি, প্রেমের কবি। বয়ঃসন্ধি থেকে শুরু করে মিলনবিরহ পর্যন্ত প্রণয়লীলায় রাধার চরিত্রচিত্রণে প্রগাঢ় জীবন-অভিজ্ঞতা, নিপুণ মনস্তত্ত্বজ্ঞান ও অসামান্য শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় তিনি দিয়েছেন।
বহুশাস্ত্রজ্ঞ রাধার দৈহিক রূপলাবণ্য, মাধুর্য ও প্রেমানুভূতির বিচিত্র দিককে তিনি শব্দ, ছন্দ, অলংকার ও চিত্রকল্পে ভাস্কর্যশিল্পের মর্যাদা দান করেছেন। বহুভাষাবিদ্ ও সর্বোপরি সর্বভারতীয় কাব্য ঐতিহ্যের সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত কবি বিদ্যাপতি রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলার ইন্দ্রিয়জ দেহভাবনাকে মার্জিত ভাষাভঙ্গিতে, নিপুণ অলংকার প্রয়োগে, কল্পনার ব্যাপকতায় অপূর্বভাবে রসসৌন্দর্যমণ্ডিত করে তুলেছেন। শব্দের ঝংকার ও সাবলীলতায়, ছন্দের ধ্বনি-সুষমায় ও অলংকারের দ্যুতিতে বিদ্যাপতি প্রথম শ্রেণির কবি।
বিদ্যাপতি চৈতন্যপূর্বযুগের কবি। তাই স্বভাবতই তাঁর পদাবলিতে অপার্থিব প্রেমলীলার স্বর্গীয় দ্যুতি নেই। এই ধূলিমাটির সংসারের রক্তমাংসের নরনারীর প্রণয়-কথাই তাঁর কাব্যের প্রধান উপজীব্য বস্তু। তাই বিদ্যাপতির বেশির ভাগ পদে লৌকিক সংসারের প্রণয়াসক্ত নরনারীর মিলন-বিরহের আর্তি ফুটে উঠেছে। জীবনসমুদ্রের তটে বসে তিনি তরঙ্গলীলার সৌন্দর্য নিরীক্ষণ করেছেন এবং সেই সৌন্দর্যে তিনি বিমুগ্ধ-বিভোর। তাঁর নায়িকা রাধার মধ্যে দেহজ কামনার আর্তি ও মিলন-বিরহের উচ্ছলতা ফুটে উঠেছে। বিদ্যাপতির রাধা বৃন্দাবনের রাধিকা নয়-আমাদের এই লৌকিক সংসারের ছলাকলাপূর্ণ এক রসরঙ্গময়ী যুবতি রমণী।
রাধার বিবর্তন বয়ঃসন্ধি ও পূর্বরাগের পদে রাধা লীলাচপল 'ভুবিন্যাসে অভিজ্ঞ', যৌবনসুচতুর ও কলাবতী। কবি বিদ্যাপতি একজন শ্রেষ্ঠ মনোবিদের দৃষ্টিতে কৈশোর-যৌবন-সন্ধিগতা তন্বী রাধার নতুন ভাবসংকট মনোরহস্যের অপূর্ব শিল্পলোক সৃষ্টি করেছেন। কৈশোর গেল, যৌবন এল। রাধার চিত্ত দ্বন্দ্বে আলোড়িত। কখন রাধা কেশ বাঁধে, কখন খুলে ফেলে। কী চায় সে নিজেই জানে না। ভাস্কর্য-শিল্পীর মতো বিদ্যাপতি রাধার কৈশোর অবস্থা থেকে নবযৌবনবতীতে পরিণত হওয়ার লীলাবৈচিত্র্যের রূপমূর্তি নির্মাণ করেছেন। বিদ্যাপতির রাধাপ্রেমের স্বরূপ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন-
রাধার দৈহিক পরিবর্তনের সঙ্গে তার মানসিক পরিবর্তন- ভীতিবিহ্বল চাপল্য, যৌবনের উত্তাপ, কৈশোর যৌবনের দ্বন্দ্ব বিদ্যাপতির লেখনীতে বর্ণাঢ্য শিল্পসৌন্দর্য লাভ করেছে।
বিদ্যাপতিকে সুখের কবি বলা হয়। কিন্তু সেই সুখও মিলন বিরহের এক অনির্বচনীয় অনুভূতি। পূর্বরাগের পর অভিসার, অভিসারের পর মিলন। কত মধুযামিনী মিলনে কেটে যায়। কিন্তু সেই মিলনেও তৃপ্তি নেই-
এখানেই মিলনে আনন্দ পরিতৃপ্তির মধ্যে অপরিতৃপ্তির অপার্থিব ব্যঞ্জনা ফুটে উঠেছে। বিদ্যাপতি মিলনে বর্ণনায় উৎকৃষ্ট কাব্যকলার নিদর্শন রেখেছেন।
বিরহ মিলনের পর বিরহ। বিরহের পদ রচনায় বিদ্যাপতির দক্ষতা আরও গভীর। মিলনে প্রেমের সব সংশয় ও সন্দেহ দূর হয়ে গেছে। তখন রাধার অন্তর থেকে উচ্ছল আনন্দ বেরিয়ে আসে- "সেই কোকিল অব/লাখ লাখ ডাকউ/লাখ উদয় করু চন্দা।" মিলনে রাধার যে আনন্দ চাঞ্চল্য-বিরহে তারই ব্যথা দ্বিগুণতর হয়ে ওঠে। না পাওয়ার থেকে পেয়ে হারানোর যন্ত্রণা আরও ব্যাপক ও গভীর। কর্তব্যের আহ্বানে কৃয় মথুরা চলে যান। বৃন্দাবনের মিলনকুঞ্জে নেমে আসে শূন্যতা। রাধার দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে। এই বিরহ বেদনা তীব্র ও নিখিল ব্যাপ্ত-
বিরহের তীব্রতা ও শূন্যতাবোধের হাহাকারে যন্ত্রণাদগ্ধ রাধার জ্যোতির্ময়ী মূর্তি ফুটে উঠেছে 'মাথুর' পদে। শ্রীকৃয় আজ দূরদেশে। রাধার হৃদয়- 'পিয়া বিনে পাঁজর ঝাঁঝর ভেলা'। বিরহের রাধার তীব্র আর্তিকে বর্ষা প্রকৃতির সঙ্গে একাকার করে বিদ্যাপতি তাঁর হৃদয় যন্ত্রণাকে রসঘন করে তুলে নিঃসীম শূন্যতায় পরিব্যাপ্ত করে দিয়েছেন-সমস্ত পৃথিবী জুড়ে ঘোর দুর্যোগ, ব্যতিপাত, বজ্রপাত, মেঘগর্জন-বিদ্যুৎচমক। এই ভরা বর্ষায় রাধা গৃহে একাকী। রাধার হৃদয় বিরহে দীর্ণ বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে- "মত্ত দাদুরী ডাকে ডাহুকী/ফাটি যাওত ছাতিয়া।" বিরহের যন্ত্রণায় রাধা শীর্ণকায়া হয়ে ওঠেন। তখন তাঁর হৃদয় থেকে আক্ষেপ ধ্বনিত হয়-
এ নব যৌবন বিরহে গোঙায়ব/কি করব সো পিয়া-লেছে।"
উপসংহার বিদ্যাপতির পদাবলির বিষয়বৈচিত্র্য শুধু তাঁর কাব্যবৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করেনি। পরন্তু তাঁর মানবিক চেতনার স্পর্শে সকল বিষয় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সুখদুঃখ, আনন্দ বিষাদ, মিলনবিরহ ও মান-অভিমানের এমন লীলায়িত জীবনছন্দ সমকালীন কাব্যে ঝংকৃত হয়নি বললে চলে। রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাপতিকে সুখের কবি, আনন্দের কবি, যৌবনের কবি হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু একথা বিদ্যাপতি সম্পর্কে অংশত খাটে। আসলে বিদ্যাপতি জীবনের সামগ্রিকতার কবি-বিচিত্র লীলারস উপলব্ধির কবি। বিদ্যাপতি বহিরিন্দ্রিয়ের অনুগামী হয়েও ইন্দ্রিয়াতীত। বঙ্কিমচন্দ্র যথার্থই বলেছেন- 'বিদ্যাপতির কবিতা দূরগামিনী বেগবতী তরঙ্গ সংকুলা নদী।' এবং বিরহের পদে 'বিদ্যাপতির কবিতা রুদ্রাক্ষ মালা।'
প্রার্থনা 'প্রার্থনা' বিষয়ক তিনটি পদেও বিদ্যাপতির কৃতিত্ব সমধিক। বিদ্যাপতির ভক্তিভাবুকতা ও ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক আকুতি সুস্মিত কাব্যরূপ লাভ করেছে। বৈয়বধর্মে দীক্ষা না নিয়ে, বৈয়বীয় জীবনচর্যা ও সাধনভজনের রীতিনীতি না মেনেও অনুভূতির প্রগাঢ়তা ও সত্যোপলব্ধির গভীরতায় তিনি বৈয়বোত্তম এক পরম মহন্ত।
আদি-অন্যদিক নাথ কহায়সি/অবতারণ-ভার তোহারা।'
বিদ্যাপতি মানবিক জীবনরসের কবি হলেও তাঁর রচনায় আধ্যাত্মিক উত্তরণও ঘটেছে। যে মর্তগৃহে মানুষের জন্ম ও সুখদুঃখ মিলনবিরহের লীলা চলছে তাকে কবি পরিহার করেন নি। পরন্তু এই মানবজীবনের লীলাভূমিতে বিচরণ করেই তিনি ঊর্ধ্বায়িত জীবনসত্যের সন্ধান করেছেন। ড. শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এ সম্পর্কে যথার্থ মন্তব্য করেছে- 'কল্পনার বিশাল বিশ্বব্যাপী অসীমকালে প্রসারিত রহস্যভেদকারী পরিধির সঙ্গে কীর্তনের সৌন্দর্যভোগে অপরিতৃপ্তি ও শেলির আদর্শ সন্ধানে ঊর্ধ্বাভিযান পিয়াসি হৃদয়াবেগ যেন নিবিড় একাত্মতায় যুক্ত হইয়াছে।'
৩. বিদ্যাপতি ও ব্রজবুলি ভাষা
ভূমিকা বিদ্যাপতির পদাবলির কাব্যভাষার নাম ব্রজবুলি। তিনি ব্রজবুলি ভাষায় পদ রচনা করেছিলেন কিনা এ সম্পর্কে পণ্ডিতেরা স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি। অনেকের মতে বিদ্যাপতি মাতৃভাষা মৈথিলি ভাষায় মূল পদাবলি রচনা করেছিলেন। পরে তাঁর পদ ব্রজবুলিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তাঁর পদাবলি বাংলা, আসাম ও উড়িষ্যায় প্রচলিত হলে তাতে আঞ্চলিক ভাষা প্রবেশ করে। ফলে একটা কৃত্রিম কাব্যভাষা তৈরি হয়। ড. সুকুমার সেন লিখেছেন, ষোড়শ শতাব্দীতে আসামে 'ব্রজবলী' শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে আধুনিক কালে ঈশ্বর গুপ্তই প্রথম 'ব্রজবুলি' শব্দটি ব্যবহার করেন। কিন্তু বাংলাদেশে কাব্যরসিকদের মুখে মুখে মধ্যযুগ থেকেই ব্রজবুলি শব্দটি প্রচলিত। তখন থেকেই বাঙালি বিশ্বাস করতেন বৃন্দাবনের রাধা, কৃষ্ণ ও সখীরা এই ভাষায় কথা বলতেন। তাই এর নাম ব্রজবুলি অর্থাৎ ব্রজের বুলি বা ভাষা।
ব্রজবুলি মিশ্রভাষা বর্তমানে বৃন্দাবনের স্থানীয় জনসাধারণ যে ভাষায় কথা বলেন তার নাম ব্রজবুলি নয় ব্রজভাখা বা ব্রজভাষা। এই ভাষা একটি জীবন্ত লৌকিক ভাষা। এটা পশ্চিমা হিন্দিরই একটি শাখা। কিন্তু ব্রজবুলি কথ্য ভাষা নয়। ব্রজবুলিতে কেউ কোনোদিন কথা বলেনি। আর ব্রজবুলির সঙ্গে ব্রজভাষার কোনো সাদৃশ্য বা মিল নেই। আসলে ব্রজবুলি একটি মিশ্র কৃত্রিম কাব্যভাষা। ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তনেই এর উদ্ভব ঘটেছে। ব্রজবুলি ভাষার ভিত্তি মৈথিলি ভাষা। এই মৈথিলি ভাষার জন্ম মাগধী অপভ্রংশ থেকে। মিথিলা এককালে নব্য ন্যায়শাস্ত্র চর্চার পীঠস্থান ছিল। বাংলাদেশ থেকে অনেক ছাত্র ন্যায়শাস্ত্র শিক্ষার জন্য মিথিলায় যেত। বিদ্যা সমাপনান্তে তাঁরা বিদ্যাপতির পদ মুখে মুখে বহন করে আনত। কালক্রমে বাঙালির মুখে পড়ে সেই মৈথিলি ভাষার অনেক রূপান্তর ঘটে। মৈথিলি ও বাংলা ভাষার সংমিশ্রণে কৃত্রিম ও মিশ্র ব্রজবুলি ভাষার উৎপত্তি। এভাবে আসামে মৈথিলি ভাষার সঙ্গে অসমীয়া ভাষার সংমিশ্রণে অসমীয়া ব্রজবুলি ভাষার সৃস্টি। ওড়িয়া ব্রজবুলি সম্পর্কে এই একই কথা।
ব্রজবুলি ভাষার শ্রুতিমাধুর্য অতুলনীয়। ব্রজবুলি ললিত কোমল মধুর বলেই প্রেমানুভূতির মিলন বিরহ ভাব প্রকাশের অন্যতম বাহন। ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তনে ইতিহাসের সক্রিয় প্রবর্তনায় এর সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। যা স্বাভাবিক নয়, যা কৃত্রিম তার আয়ু ফুরিয়ে যেতে বেশি সময় লাগে না। এক বিশেষ ভাবগত পরিমণ্ডলের মধ্যেই ব্রজবুলি উদ্ভব ও বিস্তার ঘটেছে। বিদ্যাপতির অনুকরণে সার্থক ব্রজবুলির পদ রচনা করেছেন গোবিন্দ দাস, জ্ঞান দাস ও বলরাম দাস প্রমুখ কবিবৃন্দ। আধুনিক কালে ঈশ্বর গুপ্ত ও রবীন্দ্রনাথ ব্রজবুলিতে পদ রচনায় প্রয়াসী হন। কিন্তু এঁদের ব্রজবুলি ভাষা বৈশ্বব সাহিত্যের ব্রজবুলির মতো সুললিত নয়। রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছেন- 'বাঁশরি বাজাতে চাই, বাঁশরি বাজিল কই?'

No comments:
Post a Comment