Breaking

Wednesday, June 17, 2026

শ্রীকৃয়কীর্তন ও বৈয়ব পদাবলীর সংক্ষিপ্ত পরিচয়

শ্রীকৃয়কীর্তন ও বৈয়ব পদাবলীর সংক্ষিপ্ত পরিচয়

এক. শ্রীকৃষ্ণকীর্তন

১. ভূমিকা: রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনি

বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃয়কীর্তন, বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের পদাবলিতে রাধাকৃষ্ণের প্রণয় কাহিনি রয়েছে। রাধা ও কৃয়ের প্রেমকাহিনি নিয়ে রচিত কৃষ্ণলীলা বিষয়ক কাব্য বাঙালির এক বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সম্পদ।

কৃষ্ণলীলার কাহিনি আমরা ভাগবত ও অন্যান্য পুরাণে পাই। হালের 'গাথা সপ্তশতী' গ্রন্থে আমরা রাধার উল্লেখ দেখি। মোট কথা পুরাণের কৃষ্ণচরিত্র লোকজীবনের রসে সিত্ত হয়ে ধীরে ধীরে প্রাকৃত জীবন রসধারার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। শ্রীধরদাসের সদুক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থের অমর প্রবাহ ও শৃঙ্গার প্রবাহ পর্যায়ে আমরা রাধাকৃয় প্রেমলীলার কলাচাতুরীর সঙ্গে পরিচিত হই। রাধাকৃষ্ণের প্রণয় সম্পর্ক সমকালীন সমাজচেতনায় লঘু রসের বিহ্বলতায় নতুন তাৎপর্য লাভ করে। তখন বাংলায় লক্ষ্মণসেনের রাজত্বকাল, রাজা ও তাঁর পৃষ্ঠপোষক কবিগোষ্ঠী সবাই বিলাসব্যসনে মগ্ন ও কামকলাচর্চায় আসক্ত ছিলেন।

জয়দেবের 'গীতগোবিন্দ' কাব্যটির মূল প্রেরণা 'সদুক্তিকর্ণামৃত' গ্রন্থটি। 'গীতগোবিন্দে' বিলাসকলাকুতূহল ও হরিকথাসরসতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। গ্রন্থটি সংস্কৃতে লেখা। কিন্তু বাগুঙ্গি বাংলা ভাষার কাছাকাছি। বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বিদ্যাপতির পদাবলিতে রাধাকৃয়ের প্রণয়কাহিনি প্রাকৃত জীবনরসেই পরিপূর্ণ-যদিও উভয়ের মধ্যে পার্থক্য অনেক। এই দুই কবির রচনায় শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের পূর্বে রাধাকৃষ্ণের যে কাব্যিক পরিমন্ডল সৃষ্টি হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীকালে বৈয়ব কবিদের পথনির্মাতা তাঁরাই। চৈতন্যোত্তর যুগের কবিরা কমবেশি পূর্বসূরিদের দ্বারা প্রভাবিত।

২. শ্রীকৃষ্ণকীর্তন: পুথিবিচার

ভূমিকা চর্যাগীতি পদাবলির পর দীর্ঘ আড়াইশো বছরকাল বাংলা সাহিত্যের নিষ্ফলা যুগ। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ স্বাধীন বাংলার পত্তন করলে সমাজজীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসে। তখন দেশের মানুষ ভাঙাচোরা ছিন্নমূল জীবনের ওপর আবার নতুন করে ঘর বাঁধতে শুরু করল। সেই তুর্কি আক্রমণোত্তর বিধ্বস্ত জীবনের কাহিনি অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস। চর্যাগীতি পদাবলি বাংলা ভাষার আদিমতম নিদর্শন হলেও তার মধ্যে অপভ্রংশের প্রভাব বর্তমান। আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকয়কীর্তনে বাংলাভাষার বিশিষ্ট বারীতি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। চর্যাগীতির পর বাংলা ভাষার যে বিবর্তন ঘটেছে দীর্ঘকাল তার সুস্পস্ট পরিচয় রয়েছে এই কাব্যে। জয়দেবের পরবর্তী রাধাকৃয় বিষয়ক প্রণয়কাহিনির বাংলা কাব্যকর্তা বড়ু চণ্ডীদাস। শ্রীকৃয়কীর্তনে আধ্যাত্মিক আদর্শ অপেক্ষা নরনারীর জৈবিক তৃয়া, কামনা বাসনার লালসাবৃত্তি 'প্রাধান্য পেলেও মানবিক আবেদনের দিক থেকে এই কাব্যটি বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্টতার মূল্য বহন করছে।

পুথি আবিষ্কার ১৯১৬ সালে শ্রীযুক্ত বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বৎবল্লভ বাঁকুড়া জেলার কাঁকিলা গ্রাম থেকে এই গ্রন্থের পুথিটি আবিষ্কার করেন। গ্রন্থটির বিষয়বস্তু রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলা। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁরই সম্পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে পুথিটি প্রকাশিত হয়।

কবি পরিচয় পুথিটির প্রথম, মধ্য ও শেষের দিকের কয়েকটি পৃষ্ঠা পাওয়া যায়নি। ফলে কাব্যের নাম ও কবি-পরিচিত অজ্ঞাত থেকে গেছে। বিষয়বস্তু কৃয়লীলা বলেই আবিষ্কারক নাম দেন 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন'। কিন্তু পুথির মধ্যে ১০৮৯ বাংলা সনে লেখা একটা চিরকুট পাওয়া গেছে। তাতে এই কাব্যকে 'শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ব' (অর্থাৎ 'শ্রীকৃয় সন্দর্ভ') বলা হয়েছে। এ নিয়ে পণ্ডিতমহলে মতানৈক্য রয়েছে। অনেকের মতে চিরকুটের লিখনটি শ্রীজীব গোস্বামীর 'শ্রীকৃয়সন্দর্ভ' হতে পারে। যা হোক, আবিষ্কারকের দেওয়া 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' নামই বহুল প্রচারিত ও সর্বাধিক পরিচিত।

বড়ু চণ্ডীদাস ভণিতায় নিজেকে বাসুলীদেবীর পূজারি বলে পরিচয় দিয়েছেন:

'বাসলীচরণ শিরে বন্দিআ/গাইল বড়ু চণ্ডীদাস।।'

এছাড়া, চণ্ডীদাস, অনন্ত বড়ু চণ্ডীদাস-এর উল্লেখ গ্রন্থমধ্যে পাওয়া যায়। বোধহয় ছন্দের মাত্রাসমতা রক্ষার জন্যই এরূপ ঘটেছে।

বাঁকুড়া জেলার ছাতনা গ্রামে কবির বাসস্থান ছিল। কাব্যে বিভিন্ন রাগরাগিণী ও সংস্কৃত শ্লোকের দৃষ্টান্ত ও পৌরাণিক কাহিনির প্রেক্ষাপট থেকে একথা নিশ্চিত বলা চলে যে কবি বিদগ্ধ সংস্কৃত পণ্ডিত ছিলেন।

রচনাকাল লিপি বিচারক পন্ডিতরা চতুর্দশ ও ষোড়শ শতকে এটি রচিত বলে অভিমত দিয়েছেন। বিষয়বস্তুর দিক থেকে গ্রন্থটিকে চৈতন্যপূর্ব যুগের রচনা বলে নিঃসন্দেহে ধরা যায়। চৈতন্যপ্রভাবিত বৈয়বভাবাদর্শ ও রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলা থেকে এ কাব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। শ্রীকৃয়কীর্তনের রচনার কাল ও তারিখ না জানা গেলেও গ্রন্থটি শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবের (১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দ) পূর্ববর্তী কোনো সময়ের রচনা।

৩. কাহিনি সংক্ষেপ

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য রাধাকৃষ্ণের প্রণয়কাহিনি নিয়ে রচিত, সর্বমোট তেরোটি খণ্ডে বিন্যস্ত। শেষ অংশের নাম 'রাধাবিরহ'। শেষের অংশটি খণ্ডনামাত্মক নয় বলে অনেকে একে প্রক্ষিপ্ত মনে করেন। বিষয়বস্তু ও ভাষা বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে 'রাধাবিরহ' মূল গ্রন্থের স্বভাব সংগতি বিচ্যুত নয়।

জন্মখণ্ডে কৃয়জন্মের ভাগবতী ঘটনা সন্নিবেশিত। কংসের অত্যাচার থেকে ধরিত্রীর দুঃখমোচন ও মানুষের মুক্তির জন্য ভগবান নারায়ণের কৃয়রূপে দেবকীর গর্ভে জন্ম। আর কৃষ্ণের সহচরীরূপে মর্ত্যলীলার জন্য রাধারূপে জন্মগ্রহণ করলেন বৈকুণ্ঠের লক্ষ্মীদেবী। নপুংসক আইহনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হল। এই পৌরাণিক কাহিনি দিয়ে গ্রন্থের আরম্ভ হলেও জন্মখণ্ডে লৌকিক জীবনের প্রাধান্য বেশি। তাম্বুলখণ্ডে যৌবনবতী রাধার রূপলাবণ্যে শ্রীকৃয় বিমুগ্ধ, আত্মহারা। রাধাকে দেখাশোনার জন্য আইহন রাধার মায়ের পিসি বড়াইকে নিযুক্ত করে। তারই মাধ্যমে কৃয় পান-সন্দেশ উপহার দিয়ে রাধার কাছে প্রণয় নিবেদন করলে রাধা দারুণ ক্রোধে বড়াইকে ভর্ৎসনা করে। কৃয় তখন নতুন ফন্দি আঁটে। রাধা মথুরার হাটে দধি বিক্রি করে। হাটের কর দিতে না পারায় কৃয় তার দেহ ও যৌবন দাবি করেন। সেই সময় বড়াই এসে কৃষ্ণের সপক্ষে ওকালতি করলে অনেক তর্কবিতর্ক বাদবিতণ্ডার পর নিরূপায় রাধা বাধ্য হয়ে শ্রীকৃষ্ণের নিকট নিজেকে সমর্পণ করেন। এই হল দানখণ্ডের বিষয়বস্তু। নৌকাখন্ডে রাধাকে ধরার জন্য কৃয় খেয়াঘাটে মাঝি সেজে খেয়াতরিতে মাঝনদীতে ভয় দেখিয়ে রাধার সঙ্গে জল-বিহারে মিলিত হন। এখন থেকে রাধা কিছুটা কৃয়মুখী। ভারখণ্ডে মিলন সম্পর্কে তর্কবিতর্ক। এইখানে এই খণ্ডের সমাপ্তি। পুথি খণ্ডিত বলে আর কিছু নেই। এরপর ছত্রখণ্ডে মথুরার পথে রৌদ্রের উত্তাপ থেকে রাধাকে রক্ষা করার জন্য কৃয় মিলনের প্রতিশ্রুতি পেয়ে তার মাথায় ছাতা ধরেছেন। পুথি খণ্ডিত বলে এই খন্ডের আর পরের ব্যাপার জানা যায়নি। বৃন্দাবন খণ্ডে কৃষ্ণ রাধার মধুকুঞ্জে মিলিত হন। এই খন্ডে ভাগবতের রাসলীলার প্রভাব পড়েছে। বস্ত্রহরণ খণ্ডে রাধা ও সখীরা বস্ত্র রেখে যমুনায় স্নান করতে নামে। কৃয় রাধার বস্ত্র এবং অন্যান্য সখীর বস্ত্র হরণ করে কদম্ব গাছে ওঠে। রাধার কাকুতিমিনতিতে কৃয় বস্তু দেয়। কালীয়দমন খণ্ডে কালীদহে কালীয় নাগ দমন-কৃষ্ণের জলকেলি ও গোপীদের বস্ত্রহরণ কাহিনি বর্ণিত। হারখণ্ডে কৃষ্ণ রাধার হার চুরি করেন। রাধার কাছে এই বৃত্তান্ত শুনে মা যশোদা এই কুকীর্তির জন্য পুত্রকে তিরস্কার করেন। বাণখণ্ডে কৃয় রাধার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে মদন বাণে রাধাকে মূর্ছিত করেন। বড়াইর তিরস্কারে কৃষ্ণ রাধাকে বাঁচিয়ে তোলেন। বংশীখণ্ডে কৃষ্ণের বাঁশির মধুর সুর রাধার প্রাণমন কেড়ে নেয়। কৃষ্ণপ্রেমে পাগলিনি রাধা পথে বেরিয়ে পড়েন। কৃয় দূরে সরে যান। বড়াইর নির্দেশে রাধা নিদ্রিত কৃষ্ণের বাঁশী চুরি করেন। অনেক বাদানুবাদের পর রাধা কৃয়র বাঁশি ফিরিয়ে দেন। সর্বশেষে 'রাধাবিরহ'। বৃন্দাবনে মিলনের - পর কৃষ্ণ রাধাকে ছেড়ে মথুরায় চলে যান। রাধা জেগে কৃয় অদর্শনে হাহাকার করে ওঠেন। রাধার অনুরোধে বড়াই মথুরায় কৃষ্ণের সাক্ষাৎ পায়। রাধার অনন্ত বিরহ যন্ত্রণার কথা শুনেও কৃয় ফিরে এলেন না বৃন্দাবনে। এখানেই কাহিনি বিচ্ছিন্ন। আর বাকি অংশ পাওয়া যায়নি। কাহিনির অসমাপ্ত অবস্থায় কাব্যটির সমাপ্তি ঘটেছে।

৪. কাহিনি বিচার

রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের উপজীব্য। সুপন্ডিত বড়ু চণ্ডীদাস কাব্যের কাঠামো নির্মাণে গীতগোবিন্দ, বিরুপুরাণ ও ভাগবতাদির কাহিনির কিছু কিছু অংশ অনুসরণ করেছেন। পৌরাণিক আদর্শ ও লৌকিক জীবনরসের সংমিশ্রণে এই কাব্য বৈশিষ্ট্যদ্যোতক। শ্রীকৃয়কীর্তনে আধ্যাত্মিক মহিমা নেই-স্থূল অমার্জিত গ্রাম্য বুচির উৎকট প্রকাশ ঘটেছে। তবে গ্রন্থটি কৃষ্ণকথা প্রচারের একটি ঐতিহাসিক স্তরকে সুচিহ্নিত করে রেখেছে। বাংলা ভাষায় রচিত রাধাকৃয় বিষয়ক প্রথম কাব্য শ্রীকৃয়কীর্তন- এটাই মধ্যযুগের আদি রচনা। এর রচয়িতা বড়ু চন্ডীদাস মনেপ্রাণে একজন খাঁটি বাঙালি কবি। তিনি জীবনরসিক কবি। কল্পনায় কিছু লৌকিক রং লেগেছে এবং রঙ্গলীলার প্রভাব পড়েছে। স্থূলতা বা গ্রাম্যতা অনেকটা রয়েছে এই প্রেমকাহিনির মধ্যে-তার জন্য সমকালীন সমাজজীবনই দায়ী। তুর্কি আক্রমণোত্তর নীতিভ্রষ্ট ভোগকামনাতুর উচ্ছল উচ্ছৃঙ্খল জীবনের কাহিনি এতে রূপায়িত। তবে কবি সমস্ত নৈতিক সংস্কারের ঊর্ধ্বে যে মুক্ত জীবনদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন- তা আধুনিক জীবনচেতনার সগোত্র।

৫. চরিত্র বিচার

রাধা, কৃয় ও বড়াই-এই তিনটি চরিত্রের উক্তিপ্রত্যুক্তি বা সংলাপের মাধ্যমে কাব্যটি গড়ে উঠেছে। এই তিনটি চরিত্র নিজ নিজ ব্যক্তিবৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। প্রত্যেকটি চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বের তীব্রতা, সংঘাত, বৈচিত্র্য ও উত্থানপতন বাস্তবানুগ ও নাট্যধর্মগুণান্বিত।

রাধা বিশেষ করে রাধা চরিত্রের ক্রমবিবর্তন ও তার পরিণতিতে বড়ু চণ্ডীদাস প্রথম শ্রেণির শিল্পীপ্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। রাধা চরিত্রটি খুবই মানবিক ও জীবন্ত। সে অপরূপ লাবণ্যময়ী। কিন্তু ভাগ্যদোষে নপুংসক আইহনের স্ত্রী। এর জন্য তার অন্তরের বেদনা স্বাভাবিক। কিন্তু সমাজ-সংস্কারের রীতিনীতিকে সে মেনে নিয়েছে। কুলবধূ হিসাবেই সে দুধ, দধি বিক্রি করতে মথুরার হাটে যায়। শ্রীকৃষ্ণের সান্নিধ্যে এসে এই নারী ক্রমেই প্রেমময়ী হয়ে উঠে। শ্রীকৃয় প্রেম নিবেদন করে কুলবধূ রাধা তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। অনেক রাগ বিরাগের পরে দুজনের মিলন ঘটে। এভাবে আত্মস্বাতন্ত্র্যময়ী রাধার ক্রমবিবর্তন ও বিকাশ ঘটে। কংসবধের জন্য কৃয় তাঁকে বন্দাবনে ছেড়ে মথুরায় চলে গেলে অসীম বিরহবেদনায় রাধার যে আর্তি ফুটে উঠল তার মধ্যে বড়ু চণ্ডীদাস সকল নিয়ম-সংস্কার বিধি-বিধানের ঊর্ধ্বে মুক্ত ও শাশ্বত প্রেমকে জয়যুক্ত করেছেন।

শ্রীকৃয় শ্রীকৃয়কীর্তন কাব্যের নায়ক শ্রীকৃয়। কিন্তু কৃষ্ণের মধ্যে চারিত্রিক সমুন্নতি ও নায়কোচিত ঔদার্যের অভাব। কৃষ্ণের প্রতি কবি যথোচিত উদারতা প্রদর্শন করেননি। সেজন্যই শ্রীকৃয় পূর্ণাঙ্গ চরিত্র হিসাবে গড়ে ওঠেনি। সে বিচ্ছিন্ন কতকগুলি চিত্রের নায়ক হিসেবে কাব্যে উপস্থিত হয়েছে। শ্রীকৃয়কে নিতান্ত ভোগলোলুপ কামজর্জর কুটিল চরিত্রের গ্রাম্য লম্পট ব্যক্তি হিসাবেই গণ্য করা চলে। তবে কাব্যের শেষের দিকে কৃষ্ণচরিত্র কিছুটা মহত্ত্ব-ব্যঞ্ছিত।

বড়াই বড়াই কুট্টনী জাতীয় চরিত্র। সংস্কৃত সাহিত্যে নায়ক-নায়িকার মধ্যে মিলন সাধনের জন্য দৌত্যকর্মে নিযুক্ত এরূপ চরিত্রের সাক্ষাৎ মেলে। বড়াই রাধার মায়ের পিসি। তার বয়স অনেক। নাকের মাঝখানটা বসা। গাল তোবড়ানো, গালের হাড় উঁচু, বিকট দাঁত, উটের ন্যায় ঠোঁট, কথাবার্তা কাপট্যপূর্ণ। বড়াইর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হল- 'বিকট দন্ত কপট বাণী।' এই বড়াই রাধাকৃয় মিলনে দৌত্যগিরি করেছে। এর পিছনে তার কোনো স্বার্থচিন্তা ও কুমতলব ছিল মোহ। কয় বৈকুণ্ঠের বিষু, আর রাধা স্বয়ং লক্ষ্মীদেবী-এই সত্য জেনেই বড়াই সমাজ-নিষিদ্ধ প্রেমের ব্যাপারে সহায়তা করেছে। বড়াই স্নেহশীলা ও পরিহাসনিপুণা, আমাদের একান্ত পরিচিত গ্রাম্য মাতামহী রূপেই চিত্রিত। তাঁর কথাবার্তা, কাজকর্ম সমস্তই চরিত্রগত স্বভাবধর্মানুসারী। নারীর সুকোমল হৃদয়বৃত্তিকে তিনি বিসর্জন দেননি। বড়াইর জন্যই রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমের বিকাশ ও চরিত্র দুটির পরিপূর্ণতা ঘটেছে।

৬. শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে সামাজিকতা

বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কৃয়লীলা বিষয়ক কাব্য। এই কাব্যের কথাবস্তুর সামান্যই পুরাণ থেকে গৃহীত। অধিকাংশ কাহিনি পুরাণ-বহির্ভূত। দেশে প্রচলিত রাধাকৃষ্ণের কাহিনি এবং সমসাময়িক যুগের সমাজচিত্র কবির কল্পনা জাগ্রত করেছে বেশি।

দেশে তখন শ্রীরামচন্দ্রের পুজো প্রচলিত ছিল। শুভ কোনো কাজ আরম্ভ করার আগে তাঁর বন্দনা করা হত। মেয়েরা মনস্কামনা সিদ্ধির আশায় চণ্ডী দেবীর পুজো করত। বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল। শুভকাজ আরম্ভ করার পূর্বে শুভ তিথি, বার, ক্ষণ বিচার করা হত। বারাণসীতে গিয়ে লোকেরা পাপের প্রায়শ্চিত্ত করত। গলায় কলশি বেঁধে জলে ডুবে, আগুনে ঝাঁপ দিয়ে, বিষ খেয়ে কিংবা গলায় পাথর বেঁধে জলাশয়ে ডুবে আত্মহত্যার রীতি ছিল। সংসারে আসক্তিহীন নারী মাথা মুড়িয়ে যোগিনী সেজে নানা স্থানে ও তীর্থে ঘুরে বেড়াত। জন্মান্তর, কর্মফল ও অদৃষ্ট প্রভৃতিতে সে যুগের বাঙালির গভীর আস্থা ছিল। মন্ত্রেতন্ত্রে লোকের গভীর বিশ্বাস ছিল। যাত্রাকালে হাঁচি ও টিকটিকির শব্দ বিঘ্নাদির পূর্বসূচনা বলে ধরা হত। এছাড়া শূন্য কলশি কাঁখে নিয়ে মেয়েদের জল আনতে যাওয়া, দক্ষিণদিকে শৃগালের গমন, শুষ্কডালে উপবিষ্ট কাকের ডাক, নরকপাল নিয়ে যোগিনীর ভিক্ষা প্রার্থনা প্রভৃতি ছিল অশুভের সংকেতবাহী। নারীহত্যা করা সমাজে অত্যন্ত নিন্দনীয় ও গর্হিত ছিল। নারীহত্যা এমনই পাপজনক যে 'শতেক ব্রহ্মবধ নহে যার তুল'। নারীহন্তারককে কেউ ঘৃণায় স্পর্শ করত না। নারীহত্যাকারী ব্যক্তির সাতপুরুষ অধঃপতিত থাকবে-এরূপ লোকবিশ্বাস প্রচলিত ছিল। অবস্থাপন্ন গৃহস্থের বধূরা বিবিধ অলংকার পরিধান করত। প্রসাধন ও পোশাক পরিচ্ছদ ছিল জৌলুসপূর্ণ। শ্রীকৃয়কীর্তনে সোনা, হিরা, মণিমাণিক্য, মুক্তা, গজমতি প্রভৃতির উল্লেখ এত বেশি যে লোকের আর্থিক অবস্থা সচ্ছল না হলে কবির পক্ষে এরূপ বর্ণনা সম্ভব হত না। সাধারণ বেচাকেনা, লেনদেন কড়ির দ্বারা নির্বাহ হত। হাটে পণ্যবিক্রয়কারীকে শুল্ক দিতে হত। যাতায়াতের জন্য বর্ষাকালে নদীতে নৌকা চলাচল করত। মাঝিকে পারাপারের জন্য শুল্ক দিতে হত। রাজার কাছে গিয়ে ঘাট ইজারা দেবার ব্যবস্থা ছিল। পথঘাট তেমন নিরাপদ ছিল না। দস্যুতস্করের উপদ্রব ছিল। শ্রীকৃয়কীর্তনের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, শূদ্র ছাড়া বৈদ্য, বণিক, সাপুড়ে, নাপিত, কুম্ভকার, তেলি, মাঝি প্রভৃতি বৃত্তিধারী জাতির উল্লেখ রয়েছে। শ্রীকৃয়কীর্তনে এই সব বর্ণনা থেকে তৎকালীন সামাজিক অবস্থার মোটামুটি একটা ধারণা করা যায়।

৭. শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের কাব্যমূল্য

শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের কাব্যটি রাধাকৃয়ের প্রণয় ব্যাপার নিয়ে বাংলা ভাষায় রচিত মধ্যযুগের প্রথম কাহিনিকাব্য। রাধা ও কৃষ্ণের ঐতিহ্য নিয়ে যে বিপুল বৈয়ব সাহিত্য গড়ে উঠেছে তারই পথিকৃৎ বড়ু চণ্ডীদাস। অবশ্য বস্তুর পূর্বে জয়দেব রাধাকৃয়লীলা বিষয়ক 'গীতগোবিন্দম্ কাব্য রচনা করেন সরল সংস্কৃত ভাষায়। সেই জয়দেবের কাহিনির অনুগত বাংলা কাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তন।

শ্রীকৃষ্মকীর্তন কাব্যের উৎস পৌরাণিক ভাগবত। তবে সমকালীন লৌকিক জীবনধারা এই কাহিনিকে পরিপুষ্টি দান করেছে। পুরাণের একটি সংক্ষিপ্ত পরিকাঠামোর উপর বড়ু চণ্ডীদাস একটি বৃহৎ লৌকিক কাহিনি কাব্য রচনা করেছেন। পৌরাণিক কাহিনির মধ্যে অনেক প্রচলিত লোককাহিনি এবং কবির নিজস্ব কল্পনা স্থান পেয়েছে। প্রত্যক্ষ প্রাকৃত জীবনচেতনা, মানবতাবাদ, চরিত্র ও চিত্রকল্প সৃষ্টি, কাহিনি গ্রন্থন ও নাটকীয় উপস্থাপনা, ছন্দ ও অলংকার সৃষ্টি এবং ভাষা প্রয়োগের নৈপুণ্যে এই গ্রন্থের কাব্যমূল্য অপরিসীম।

নিসর্গসৌন্দর্য, মিলন ও বিরহবেদনা তথা বিচিত্র অভিব্যক্তিতে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বড়ু চণ্ডীদাসের অসাধারণ কবিত্ব-শক্তির সুন্দর এক নিদর্শন। ড. শশিভূষণ দাশগুপ্তের মতে রাধা, কৃয় ও বড়াই-এই তিনটি চরিত্রের উক্তি ও প্রত্যুক্তির মাধ্যমে কাহিনির অগ্রগতি ঘটেছে এবং সংলাপ ও দ্বন্দ্বসংঘাতময় কাহিনি নাট্যিক শিল্পবৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের নিম্নোদ্ভূত অংশটি পড়লেই ড. দাশগুপ্তের অভিমত যথার্থ বলে মনে হবে।-

"কাহারো বউ তু কাহারো রাণী/কেহ্নে যমুনাত তোলসী পানী। (কৃষ্ণের উত্তি)
বড়ার বৌ মো বড়ার ঝি/আন্তে পানী তুলি তোহ্মাত কি।। (রাধার উক্তি)"

রাধা, কৃষ্ণ ও বড়াই-বহুস্থলে এই তিনটি চরিত্রের উক্তি-প্রত্যুক্তি বা পারস্পরিক সংলাপ বিনিময়ের মধ্যে উৎকৃষ্ট নাট্যধর্মের ব্যঞ্জনা মেলে। নাটকের প্রধান গুণ-বাস্তবধর্মিতা ও দ্বন্দ্বসংঘাত। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে নায়ক-নায়িকার দ্বন্দ্বকলহ, মন ও মেজাজের উত্তাপ-প্রথমে দৃঢ় অসম্মতি ও শেষে আত্মনিবেদনের ব্যাকুলতা প্রভৃতির মধ্য দিয়ে বড়ু চণ্ডীদাসের মানবপ্রকৃতি সম্পর্কে গভীর অভিজ্ঞতার পরিচয় মেলে। সেই নাট্যরীতির সমালোচনা করে অনেকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে ঝুমুর জাতীয় লৌকিক নাট্যরীতির প্রাচীনতম নিদর্শন বলেছেন। তাছাড়া নানা স্থানে বিভিন্ন প্রসঙ্গে গীতিকাব্যের ভাবোচ্ছাস কাব্যটিকে অসামান্য শিল্প-মর্যাদায় ভূষিত করেছে। বংশীখণ্ডে কৃষ্ণের বাঁশীর মধুর সুর শুনে রাধার যে আকুলি-বিকুলি অবস্থা-তার মধ্যে রাধার বিরহজনোচিত ভাবোচ্ছাস ও আত্মসমর্পণের আকুতি অনবদ্য সুষমা লাভ করেছে।

কেনা বাঁশী বাএ বড়াই কালিনী নষ্ট কূলে। কেনা বাঁশী বাএ বড়াই এ গোঠ গোকুলে।।'

আকুল শরীর মোর বেয়াকুল মন/বাঁশীর শবদেঁ মো আউলাইল রাখন।।'

কেনা বাঁশী বাএ বড়াই সে না কোন জনা/দাসী হআঁ তার পদে নিশিবো আপনা।।'

আখ্যায়িকা গীতিকাব্য ও নাট্যরসের সংমিশ্রণে শ্রীকৃয়কীর্তন এক অভিনব কাহিনি-কাব্য। চরিত্রকার ও কাহিনিকার হিসাবে চন্ডীদাসের কৃতিত্ব প্রশংসার্হ। ধীরে ধীরে তিনি অনভিজ্ঞ ও মুখরা বালিকা রাধিকাকে একের পর এক ঘটনার সাহায্যে বিকশিত করে তুলেছেন।

শ্রীকৃয়কীর্তনে রাধিকা শেষ পর্যন্ত প্রেম-পরিশুদ্ধা ও প্রেমে সমর্পিতা নারী হিসাবে পাঠকের সামনে ধরা দিয়েছেন। বড়ু চণ্ডীদাস রাধাকে বংশীখণ্ড ও বিরহবিরহে কামনাবাসনার ঊর্ধ্বে এক সমুন্নত ভাবসুষমার জগতে পৌঁছে দিয়েছেন। বিরহ অংশে রাধার বিরহমথিত হৃদয়ের যে পরিচয় পাওয়া যায় সেখানে শ্রীকৃয়কীর্তনের রাধা ও বৈশ্বব পদাবলি সাহিত্যের চন্ডীদাসের রাধার সীমারেখার পার্থক্য একেবারে নেই বললে অন্যায় হবে না।

প্রমথনাথ বিশীর মন্তব্য যথার্থ যে, শ্রীকৃয়কীর্তনের যেখানে শেষ, সেখান থেকেই বৈয়ব পদাবলীর রাধার যাত্রা শুরু।

শব্দ প্রয়োগে, ছন্দ সৃষ্টিতে ও অলংকার যোজনায় কবির অভিনবত্ব প্রশংসনীয়। বাংলা ভাষার স্বাভাবিক উচ্চারণ-বৈশিষ্ট্য শ্রীকৃয়কীর্তনে সুস্পষ্টভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। নবজাত বাংলাভাষা বড়ু চণ্ডীদাসের লেখনীতে বেশ সাবলীল, স্বচ্ছন্দগতি ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বিষয়বস্তু, কাহিনিগ্রন্থন, ভাষা, ছন্দ ও অলংকার প্রয়োগের দিক থেকে শ্রীকৃয়কীর্তন যথার্থ রসমূল্য ও শিল্পোৎকর্ষ লাভ করেছে।

No comments:

Post a Comment