Breaking

Wednesday, June 17, 2026

তিন মঙ্গলকাব্যের সংক্ষিপ্ত কাহিনি ও তিন বিশিষ্ট কবি

তিন মঙ্গলকাব্যের সংক্ষিপ্ত কাহিনি ও তিন বিশিষ্ট কবি




১. সাধারণ আলোচনা

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বৃহত্তম শাখা হল আখ্যানমূলক মঙ্গলকাব্য। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতক থেকে শুরু করে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত এর কালপর্ব। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের বহু জ্ঞাত ও অজ্ঞাত, খ্যাত ও স্বল্পখ্যাত কবিরা মনসামঙ্গল, চণ্ডীমণ্ডল, শিবমঙ্গল (শিবায়ণ), ধর্মমঙ্গল ও রায়মঙ্গল প্রভৃতি অজস্র কাব্য রচনা করেছেন। এইসব কাব্যে নানা সাম্প্রদায়িক দেবদেবীর মাহাত্ম্যসূচক কীর্তিকলাপ বর্ণিত হয়েছে। আমাদের পাঠ্য মনসামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল ও ধর্মমঙ্গলের কাহিনি এবং এই তিন কাব্যের তিন বিশিষ্ট কবির প্রতিভার পর্যালোচনা।

২. মনসামঙ্গলের কাহিনি

ভূমিকা মনসামঙ্গল কাব্যে সর্পদেবী মনসার পুজো প্রচলনের কাহিনি সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। মনসা পুজোর সঙ্গে সর্প পুজোর ইতিহাস জড়িত। ভারতবর্ষে প্রাচীনকাল থেকে সর্প পুজো প্রচলিত ছিল। হিন্দুর দেবী দেবীভাগবত, পদ্মপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণাদিতে মনসা সর্পকুলের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ইনি শিবের মানসকন্যা, জরৎকারু মুনির পত্নী, পুত্রের নাম আস্তিক। বৌদ্ধ তন্ত্রসাহিত্যে সর্পদেবতার নাম 'জাঙ্গুলি'। বাংলাদেশে দ্রাবিড় ভাষাভাষী মানুষেরা প্রথম সর্পের পুজো আরম্ভ করে। বাংলাদেশে একাদশ-শতাব্দীর পূর্বের ভাস্কর্যশিল্পে দেবী মনসার চিহ্ন পাওয়া গেছে। ইনি সর্পবিভূষিতা। সর্প পুজোর উদ্ভবের কারণ-অরণ্যসংকুল প্রদেশে বসবাসকারী মানুষের সর্পভয়। ড. নীহাররঞ্জন রায় বলেন সেক্স বা প্রজনন শক্তির প্রতীক হিসাবেও সাপকে গ্রহণ করা হয়েছে।

শিবের মানসকন্যা বলেই সর্পদেবীর নাম মনসা। দক্ষিণ ভারতে দ্রাবিড় জাতির পূজিতা সর্পদেবীর নাম 'মঝাম্মা' বা 'মনোমাঝী'। পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন মনসা নামের উৎপত্তি শাস্ত্রীর মতে মন্থাম্মা থেকেই মনসা নামের উদ্ভব। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য বৌদ্ধসর্পদেবী জাঙ্গুলিকে মনসার ভিত্তি মনে করেন।

মনসা আসলে অন্-আর্য দেবতা। তিনি পরে আর্যদের অর্বাচীন পুরাণে স্থান পেয়েছেন। শিবের সন্তানলাভের বাসনা থেকে মনসার জন্ম। কালীদহে পদ্মপাতার ওপর জন্ম নিলেন শিবের মানসজাত সুন্দরী কন্যা মনসা। পদ্মপাতায় জন্ম বলে তাঁর এক নাম পদ্মা। পত্নী চণ্ডীর ভয়ে তিনি কন্যাকে ঘরে নিয়ে গেলেন না। মনসা পাতালে আশ্রয় নিলেন। তিনি হলেন সর্পকুলের রানি বা অধিষ্ঠাত্রী দেবী। একদিন ফুল তুলতে গিয়ে শিব পরিত্যক্ত কন্যা মনসার পরিচয় পেলেন। মনসাকে কৈলালে নিয়ে এলেন। মনসা সৎমা চণ্ডীর কাছে দিনরাত প্রচুর প্রহার ও নির্যাতন সহ্য করে। একদিন কুদ্ধা চন্ডী মনসার একটা চোখ প্রচণ্ড আঘাতে কানা করে দিলেন। অশান্তি দূর করার জন্য শিব মনসাকে সিজুয়া পর্বতে রেখে এলেন। কন্যার জন্য শিবের চোখ থেকে এক ফোঁটা জল ঝরে পড়ল। সেই জল থেকে জন্ম নিল সহচরী নেতা। শিব জরুৎকারু মুনির সঙ্গে মনসার বিয়ে দেন। কিন্তু বৈরাগী স্বামী হঠাৎ সংসার ত্যাগ করে চলে গেলেন। স্বামী নেই, সংসারে যন্ত্রণা। আর বাড়িতে থাকা যায় না। তখন সহচরী নেতার পরামর্শে মনসা মর্তধামে নিজ পুজো প্রচারের জন্য সচেষ্ট হলেন।

কাহিনী চম্পকনগরের বিত্তশালী ও সর্বজনমান্য বণিক চাঁদসদাগর। মনসা ভাবলেন তাঁকে দিয়ে পুজো করালে অন্যান্য নিম্নশ্রেণির লোকেরা সহজেই মনসার ভক্ত হবে। স্ত্রী সনকা, ছয় পুত্র ও পুত্রবধূ, দাসদাসী নিয়ে চাঁদের বিরাট সুখের সংসার। তিনি একনিষ্ঠ শিবভক্ত। শিবের বরে 'মহাজ্ঞান কবচ' লাভ করেছেন। এর সাহায্যে মৃত ব্যক্তি প্রাণলাভ করে। তাছাড়া বিখ্যাত সংকর ওঝা তাঁর বন্ধু। চাঁদ সাপকে দুচোখে দেখতে পারেন না। হেঁতালের লাঠি দিয়ে সাপ মারেন। চাঁদের কাছ থেকে পুজো আদায় খুবই কঠিন কাজ। জেলে, রাখাল প্রভৃতি সাধারণ মানুস মনসার পুজো করে সুখে আছে জেনে চাঁদবেনের স্ত্রী সনকা গোপনে মনসার ঘট বানিয়ে পুজো করতে লাগলেন। জানতে পেরে পদাঘাতে চাঁদ মনসার ঘট ভেঙে দিলেন। ফলে ক্রুদ্ধ মনসা চাঁদের অনিষ্ট সাধনে ব্রতী হলেন। চাঁদের সুন্দর সুপারি বাগান ধ্বংস হল। মহাজ্ঞানের দ্বারা চাঁদ তা পুনরুদ্ধার করলেন। তখন মনসা কৌশলে শংকর ওঝাকে মেরে ফেলে মোহিনী নারীর বেশে চাঁদের মহাজ্ঞান হরণ করলেন। ভাতে বিষ দিয়ে ছয় পুত্রকে হত্যা করলেন। স্ত্রী ও পুত্রবধূদের কান্নায় হাহাকারে আকাশ ভরে গেল। তবুও চাঁদ এই ভয়ংকর সর্বনাশের মুখে অচল অটল এক পৌরুষমূর্তি-যে হাতে তিনি শিবকে পুজো করেন- সেই হাতে চ্যাংমুড়ি কানি মনসাকে কিছুতেই পুজো দেবেন না। কিছুদিন পরে চাঁদ বাণিজ্য বের হলেন। যাবার সময় সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে বলে গেলেন-'পুত্র হলে নাম থুইও লখিন্দর।'

নদীতে যেতে যেতে কালিদহে মনসার কোপে প্রচণ্ড ঝড় উঠল। সপ্তডিঙা মধুকর ডুবে গেল। চাঁদ জলে হাবুডুবু খেতে লাগলেন। চাঁদ মরে গেলে মনসার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। তিনি চাঁদের সামনে পদ্মফুল ফেলে দিলেন। চাঁদ তা স্পর্শ করলেন না-

'চাঁদ বলে এই পদ্মে মনসার জন্ম/হেন পদ্ম পরশিলৈ অনেক অধর্ম।'

যাহোক, অনেক দুঃখকষ্ট নির্যাতন ভোগ করে চাঁদ দেশে এলেন। ঘরের অবস্থা শোচনীয়। তবুও আশার কথা-সপ্তমপুত্র লখিন্দর বেশ বড়ো হয়ে উঠেছে। উপযুক্ত সময়ে উজানি নগরের সায়বেনের নৃত্যগীত পটীয়সী পরমাসুন্দরী কন্যা বেহুলার সঙ্গে লখিন্দরের বিয়ে হল। চাঁদ আগে থেকে জেনেছিলেন সর্পদংশনে লখিন্দরের মৃত্যু অনিবার্য। তাই সান্তালি পর্বতে এক লোহার নিশ্ছিদ্র বাসর ঘর তৈরি করলেন। ওঝারা এসে সর্প আগমনের প্রতিবন্ধকতায় সচেষ্ট হলেন। সুঃখের বিষয় মনসার নির্দেশে কারিগর বিশ্বকর্মা লোহার বাসরঘরে একটি চুলপ্রমাণ ছিদ্র রেখে দিয়েছিলেন। বাসরঘরে কালীয় নাগের দংশনে লখিন্দর প্রাণ হারাল। চাঁদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। সনকা কাঁদতে কাঁদতে বেহুলাকে কঠিন ভাষায় তিরস্কার করল-

'খন্ড কপালিনী বেহুলা চিরুণী-দাঁতি বিভা দিনে খাইলি পতি না পোহাতে রাতি।।'

সব নিন্দা অপমান সহ্য করে বেহুলা বাসরসাজে স্বামীকে নিয়ে অনির্দেশের পথে গাঙ্গুড়ের জলে কলার মান্দাসে ভাসলেন। অনেকের প্রলোভন, লালসা বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে বেহুলা ভেসে চলেছেন। লখিন্দরের দেহ পচে কঙ্কাল অবশিষ্ট। কোনো কিছুতেই বেহুলা বিচলিত নন। এক নদীর ঘাটে এক ধোপানিকে অদ্ভুত কাজ করতে দেখলেন। দুষ্ট পুত্রকে মেরে ফেলে আবার তাকে বাঁচিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। আসলে মনসার সহচরী নেতা ছদ্মবেশে ধোপানির কাজ করছিল। নেতা বেহুলাকে মনসাদেবীর শরণ নিতে উপদেশ দিলেন এবং স্বর্গে গিয়ে নাচগানে দেবতাদের সন্তুষ্ট করে অভীষ্ট বর প্রার্থনা করতে বললেন।

নেতার পরামর্শে বেহুলা স্বর্গে পৌঁছে নৃত্যগীতে দেবতাদের সন্তুষ্ট করলেন। দেবতারা বেহুলার দুর্দশার বৃত্তান্ত শুনে মনসাকে ডেকে তাঁর স্বামী ও ভাসুরদের বাঁচিয়ে দিতে বললেন। মনসা একটি শর্তে রাজি হলেন। চাঁদকে দিয়ে তাঁর পুজো করাতে হবে। এই শর্ত মেনে নিয়ে বেহুলা মৃত স্বামী, ছয় ভাসুর, সপ্তডিঙা মধুকর ও সমস্ত হাবানো সম্পদ ফিরে পেলেন। বেহুলা গৃহে ফিরে এলে ভাগ্যহত চাঁদের আনন্দের সীমা নেই। ঠিক সেই মুহূর্তেই অশ্রুকাতর সতীনারী বেহুলার অনুরোধটি এড়াতে পারলেন না। চাঁদ ডান হাত দিয়ে শিবকে পুজো করেন। কাজেই বাম হাত দিয়ে পিছু ফিরে মনসার পুজো করলেন। চাঁদের পুজোর পর মনসার পুজো মর্ত্যে প্রচারিত হল।

৩. চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের কাহিনি

ভূমিকা শিবজায়া দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্যকাহিনি চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে বর্ণিত। এই দেবী মার্কণ্ডেয় পুরাণের মহিষমর্দিনী নন। এই চণ্ডী একটু ভিন্ন প্রকৃতির। ইনি শবরব্যাধ-পূজিতা অষ্টভুজা ও বণিকজাতি-পূজিতা কমলেকামিনী। এই বৈসাদৃশ্যের কারণ তুর্কি আক্রমণোত্তর পৌরাণিক ও লৌকিক সংস্কৃতির সমন্বয়ীকরণ। আর্যীকরণের পূর্বে ভারতবর্ষে অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় জাতির মধ্যে অরণ্য ও পশুর অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপে চণ্ডীদেবীর পুজো প্রচলিত ছিল। অনেকের মতে চন্ডীমঙ্গলের দেবী উক্ত অন্-আর্যদের পূজিতা দেবী।

আবার অনেক পণ্ডিত একথা মানতে চাননি। তাঁদের মতে মার্কণ্ডেয় চন্ডীর লৌকিক রূপান্তর ঘটেছে মঙ্গলকাব্যে। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের সমন্বয়ীভাব মতে-বাংলার লৌকিক দেবদেবী হিন্দুধর্মের পুনরুত্থানের যুগে হিন্দুভাবাপন্ন তন্ত্র বা পুরাণ কর্তৃক প্রভাবিত। চন্ডী বা মঙ্গলচণ্ডী তাঁদের অন্যতম। সেজন্য তন্ত্র বা পুরাণ ও স্মৃতিতে নানাভাবে তাঁর সঙ্গে একটা সামঞ্জস্য সাধনের প্রয়াস দেখা যায়।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, দেবী ভাগবত ও বৃহদ্ধর্মপুরাণ প্রভৃতিতে দেবীর আরাধনার পদ্ধতি বর্ণনা প্রসঙ্গে ব্যাধ কালকেতু ও শালবাহন নৃপতি প্রভৃতি চণ্ডী পূজকদের উল্লেখ আছে। সুতরাং মঙ্গলকাব্যের চন্ডী লৌকিক ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে পৌরাণিক ধর্মের মিলনজাত মিশ্রফল। বর্তমানে ছোটনাগপুরের 'ওরাওঁ' জাতির মধ্যে 'চণ্ডী' নাম্নী দেবীপুজো প্রচলিত। সাঁওতাল সমাজে চণ্ডী (চণ্ডী) দেবী ভয়ংকর। এই চণ্ডীর কালচন্ডী, শ্বাশান চণ্ডী ও শুকাম চণ্ডী প্রভৃতি সাতটি পরিচয় রয়েছে। ওরাওঁ এবং সাঁওতাল জাতির সঙ্গে বাঙালি জাতির সংমিশ্রণ ঘটেছে। চন্ডীমঙ্গল কাব্যের দেবী চণ্ডীকার উদ্ভব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে-

'পশুবলি প্রভৃতির দ্বারা যে ভীষণ পূজা এককালে ব্যাধের মধ্যে প্রচলিত ছিল, সেই পূজাই কালক্রমে উচ্চসমাজে প্রবেশলাভ করে। সুতরাং, মঙ্গলকাব্যের চণ্ডীর পশ্চাতে অন্-আর্য লৌকিক সংস্কৃতি অধিক পটভূনি সৃষ্টি করেছে।'

চন্ডীমঙ্গলের দুটি কাহিনি: প্রথমটি হল কালকেতু ও ফুল্লরা কাহিনি। দ্বিতীয়টি হল ধনপতি ও খুল্লনার কাহিনি। প্রথম কাহিনিটি প্রাচীন।

এক. কালকেতু ও ফুল্লরা

পাগল ও দরিদ্র শিবের ঘরে উত্যক্ত চণ্ডী পদ্মার পরামর্শে মর্তে নিজেরা পুজো প্রচারে মনস্থ করলেন। চন্ডীর কৌশলে নিরপরাধ শিবপুজোর পুষ্পচয়নকারী নীলাম্বরকে শাপভ্রষ্ট করলেন শিব। নীলাম্বর মর্তে ব্যাধের গৃহে ধর্মকেতুর পুত্র কালকেতুরূপে জন্মগহণ করলেন। তাঁর পত্নী ছায়া মর্তে ব্যাধকন্যা ফুল্লরারূপে জন্মগ্রহণ করলেন। বড়ো হয়ে কালকেতু রূপেগুণে পরাক্রমে ব্যাধ জাতির নেতা হয়ে উঠল। রূপসি ফুল্লরার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হল। কালকেতু বন থেকে কাঠ ও পশুপক্ষী শিকার করে আনে। ফুল্লরা গৃহে গৃহে হাটে মাংস বিক্রি করে। মোটামুটি স্বচ্ছলভাবে সংসার চলে। কালকেতুর বৃদ্ধ পিতামাতা কালকেতুর উপর সংসার ছেড়ে বারাণসী চলে যায়। কালকেতু পশু শিকার করে সংসার চালায়। তার অত্যাচারে বনের পশুরা দেবী চণ্ডীর কাছে বরাভয় প্রার্থনা করল।

তখন পশুগণকে অভয় দিয়ে দেবী-'সেইখানে সুবর্ণ গোধিকা রূপ হৈলা।' কালকেতু বনে গিয়ে শিকার পেললগ্ন না। পথে দেখল স্বর্ণ-গোধিকা-অশুভ লক্ষণ। বিরক্ত হয়ে কালকেতু-'নকুল বদলে তোমা খাইব'-বলে সাপটিকে ধনুকের ছিলায় বেঁধে নিয়ে বাড়িতে এল। সেটিকে খুঁটিতে বেঁধে কালকেতু বাসি মাংস নিয়ে গেল বাজারে; আর ফুল্লরা গেল প্রতিবেশীর নিকট খুদ ধার করতে। এই নির্জন অবসরে দেবী চণ্ডী গোধিকারূপ পরিত্যাগ করে অপরূপ সুন্দরী বেশে ঘরের দাওয়ায় বসে রইল। ফুল্লরা ফিরে এলে দেবী বললেন-

'এনেছে তোমার স্বামী বাঁধি নিজ গুণে।'

যুব্বরা অনেক কাকুতিমিনতি করে তাদের বারোমাসের দারিদ্র্যের বর্ণনা দিয়ে দেবীকে বিদায় করতে ব্যর্থ হয়ে স্বামীকে খবর দিতে বাজারে গেল। স্ত্রীর কাছে সব শুনে বিস্মিত কালকেতু ঘরে এসে দেখে ঘটনা সত্যি। সে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়েও দেবীকে বিদায় করতে পারল না। অবশেষে ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে হত্যা করার জন্য ধনুকে শর যোজনা করতেই দেবী স্বমূর্তি ধারণ করে বললেন-'আমি চণ্ডী আইলাম তোরে দিতে বর।' আর নির্দেশ দিলেন-

'পূজিবে মঙ্গালবারে পাতাইবে জাত, গুজরাট নগরের তুমি হবে নাথ।'

দেবী কালকেতুকে সাতঘড়া ধন ও বহুমূল্যের একটি আংটি দিলেন। ধূর্ত বণিক মুরারিশীল সেই আংটি নামমাত্র মূল্যে কিনতে গিয়েছিল, কিন্তু কালকেতুর প্রতি দেবীর কৃপায় ব্যর্থ হল। কালকেতু বিপুল অর্থ দিয়ে বন কেটে গুজরাট নগর পত্তন করলেন। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে নানা জাতির বসতি গড়ে উঠল। ভাঁড় দত্ত নামে এক ধূর্ত ছিল। ভাঁড়ুর মাতব্বরি, শঠতা ও অত্যাচারে বিরক্ত হয়ে অন্যান্য প্রজারা কালকেতুর কাছে নালিশ জানালে কালকেতু তাকে তাড়িয়ে দিলেন, অপমানিত ভাঁড়ু কলিঙ্গরাজকে উত্তেজিত করে যুদ্ধে নামিয়ে দিল। কালকেতু বন্দি হল। কলিঙ্গ কারাগারে অশেষ দুঃখে কালকেতু চণ্ডীর স্তব করে। কলিঙ্গ রাজ্যে দেবী বন্যার সৃষ্টি করলেন। স্বপ্নে রাজাকে ভয় দেখালেন যে শীঘ্র কালকেতুকে মুক্তি না দিলে তার কলিঙ্গ রাজ্য ধ্বংস হবে। কালকেতু চণ্ডীর বরপুত্র জেনে কলিঙ্গরাজ কালকেতুকে মুক্তি দিলেন। রাজ্যও ফিরিয়ে দেওয়া হল। ভাঁড় দত্তের মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢেলে রাজ্য থেকে তাড়ানো হল।

কালকেতু মহাসমারোহে দেবীর পুজো করলেন। পরম শান্তিতে দীর্ঘকাল রাজ্য শাসনের পর কালকেতু ও ফুল্লরা পুত্রকে রাজ্যভার দিয়ে শাপান্তে নীলাম্বর ও ছায়ারূপে ইন্দ্রের রথে চড়ে স্বর্গে ফিরে গেলেন। পৃথিবীতে দেবী চণ্ডীর পুজো প্রচালিত হল।

দুই, ধনপতি ও খুল্লনা

দেবী চণ্ডী মর্তে পুজো প্রচারের জন্য কৌশলে স্বর্গনর্তকী রত্নমালাকে অভিশাপগ্রস্ত করেন। দেবী রত্নমালা মর্তে লক্ষপতি বণিকের ঘরে অপরূপ সুন্দরী কন্যা খুল্লনারূপে জন্ম নেন। তাঁর গর্ভে অভিশপ্ত গন্ধর্ব মালব্য শ্রীমন্ত নাম নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এই শ্রীমন্তের সাহায্যে মর্তে দেবী চণ্ডীর পুজো প্রচারিত হয়।

উজানি নগরের ধনাঢ্য বণিক ধনপতির স্ত্রী লহনা নিঃসন্তানা। ধনপতি একদিন অপরূপ লাবণ্যে ভূষিতা খুল্লনাকে দেখে বিমুগ্ধ হলেন। লহনাকে বস্ত্র ও অলংকার দিয়ে তার সম্মতি নিয়ে ধনপতি বিয়ে করলেন। দুই স্ত্রী নিয়ে সুখে শান্তিতে ধনপতির দিন কাটতে লাগল। কিছুদিন পরে দেশের রাজার আদেশে স্বর্ণপিঞ্জর আনার জন্য ধনপতিকে গৌড়ে যেতে হল। খুল্লনার ভার দিয়ে গেলেন লহনার উপর। দাসী দুর্বলার কুপরামর্শে লহনা স্বামীর লেখা বলে এক জাল চিঠির মর্ম খুল্লনাকে জানিয়ে তার সব বস্ত্র ও অলংকার ছাড়িয়ে নিল। বনে ছাগল চরিয়ে, ঢেঁকিশালে আধপেটা খেয়ে খুল্লনাকে দিন কাটাতে হল। একদিন বনে 'সর্বশ্রী' নামে ছাগলটি হারিয়ে যায়। সেটাই খুঁজতে গিয়ে খুল্লনা চণ্ডীপ্রেরিত পঞ্চদেবকন্যাকে দেখতে পায়। তাদের কাছ থেকে চণ্ডীপুজো করতে শেখে এবং ভক্তিভরে চন্ডীপুজো করে। দেবী আবির্ভূতা হয়ে তাকে স্বামীপুত্রলাভে বর দিলেন। দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে লহনাও খুল্লনার সঙ্গে ভালো ব্যবহার শুরু করল। ঘরে ফিরে ধনপতি সব শুনে লহনাকে খুব তিরস্কার করলেন। খুল্লনা স্বামীর আস্থা ও প্রীতি ফিরে পেলেন。

এরপর রাজ আজ্ঞায় চন্দন লবঙ্গ ও নীলা প্রভৃতি আনার জন্য ধনপতিকে সিংহলে যেতে হল। যাবার আগে স্বামীর কল্যাণের জন্য খুল্লনা গোপনে চন্ডীর পুজো করে। এ ব্যাপার জানতে পেরে শৈবসাধক ধনপতি ক্রোধে পদাঘাতে চন্ডীর ঘট ভেঙে দিলেন।

সপ্তডিঙা নিয়ে ধনপতি সমুদ্রে ভেসে চলেছেন। চণ্ডী তার অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণের মানসে সমুদ্রবক্ষে প্রবল ঝড় তুললেন। ছয়টি ডিঙা ডুবে গেল। কোনোক্রমে একটি ডিঙা নিয়ে ধনপতি সিংহলের পথে কালিদহে এসে পৌঁছোলেন। সেখানে চণ্ডী তাকে কমলেকামিনী রূপে এক অদ্ভুত দৃশ্যে দেখা দিলেন। ভাসমান এক শতঙ্গল পদ্মের উপর এক সুন্দরী নারী একটি বড়ো হাতিকে একবার গিলছে আবার উদ্গিরণ করছে। ধনপতি সিংহলে পৌঁছে এই অলৌকিক কমলেকামিনী কথা রাজাকে জানালে তিনি বিশ্বাস করলেন না। ধনপতি প্রতিজ্ঞা করলেন- সেই দৃশ্য দেখাতে না পারলে বারো বছর সিংহল কারাগারে কাটাবেন। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে ব্যর্থ হন। মিথ্যাবাদী বলে ক্রুদ্ধ সিংহলরাজ ধনপতিকে কারাগারে নিক্ষেপ করলেন। স্বপ্নে আবির্ভূতা হয়ে চণ্ডী ধনপতিকে তাঁর পুজো করতে বললেন-ধনপতি রাজি হলেন না।

এদিকে শ্রীমন্ত বড়ো হয়েছে। পাঠশালায় গুরুমশায় তার জন্ম সম্পর্কে কটাক্ষ করলে শ্রীমন্ত মাতার কাছে সব বিবরণ শুনে পিতৃ অন্বেষণে সপ্তডিঙা নিয়ে সিংহল যাত্রা করলেন। তিনিও কালিদহে সেই কমলেকামিনী দৃশ্য দেখলেন। শ্রীমন্তও পিতার মতো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে সিংহলরাজকে সেই দৃশ্য দেখাতে পারলেন না। শ্রীমন্তের শর্ত অনুযায়ী শ্মশানে তার শিরশ্ছেদের ব্যবস্থা করা হল। এদিকে মাতা পুত্রের কল্যাণে চন্ডীর ধ্যান করেন, আর মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শ্রীমন্ত চণ্ডীর স্তব করতে লাগল। দেবী বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর বেশে ভক্তকে উদ্ধার করলেন। দেবীর ভূতপ্রেত সিংহল রাজার সব সৈন্য ধ্বংস করল। সিংহলরাজ সমস্ত ব্যাপার বুঝতে পেরে ধনপতি ও শ্রীমন্তকে মুক্তি দিলেন এবং নিজ শর্ত অনুযায়ী শ্রীমন্তকে অর্ধেক রাজ্য এবং একমাত্র কন্যা সুশীলার সঙ্গে তার বিয়ে দিলেন। তারপর চন্ডীর প্রসাদে সিংহলরাজকে কমলেকামিনী দর্শন করালেন। রাজা শালিবাহন চন্ডীর পুজো করতে মনস্থ করলেন। কিছুদিন সিংহলে বসবাসের পর পুত্র ও পুত্রবধূকে সঙ্গে নিয়ে স্বদেশে ফিরে এলেন ধনপতি। চণ্ডীর পুজো হল মহাধুমধামে। চণ্ডীর পুজো দেশে প্রচারিত হল। বাকি জীবন স্ত্রী-পুত্রবধূসহ সুখে কাটিয়ে শাপান্তে ধনপতি স্বর্গে ফিরে গেলেন।

No comments:

Post a Comment