ধর্মমঙ্গল কাব্যের কাহিনি
ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য ও তাঁর পুজো প্রচারের কাহিনি নিয়ে রচিত হয়েছে ধর্মমঙ্গল কাব্য। পুরাণের ধর্মরাজ যম, বৌদ্ধদেবতা বা সূর্যদেবতা অনার্যদের চিন্তা কল্পনায় ধর্মঠাকুরে রূপান্তরিত। ইনি অনার্য কল্পনাপ্রসূত আদিবাসীদের পুরুষ দেবতা। কালের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গো নানাধর্মের সমন্বয় ঘটেছে ধর্মঠাকুরের মধ্যে। ইনি প্রাক্-আর্য কৌমধারার দেবতা। ক্রমান্বয়ে শিব, বিন্নু, সূর্য, বরুণ, কূর্ম, কল্কি এমনকি ইসলামীয় ধর্মের সঙ্গে মিশে ইনি নবরূপ লাভ করেছেন। বিভিন্ন ভাবধারার বিবিধ তত্ত্ব ও তথ্য, ধর্মবিশ্বাস ও অনুষ্ঠান পদ্ধতির সমন্বয় সাধিত হওয়ায় ধর্মঠাকুর সর্বাত্মক ধর্মের নির্বিশেষ প্রতিভূ রূপে চিহ্নিত। এই দেবতার কোনো নির্দিস্ট রূপ নেই। প্রস্তরখণ্ডে ধর্মঠাকুরের আকৃতি পাদুকা চিহ্নিত কূর্মাকৃতি, কোথাও ডিম্বাকৃতি, আবার কোথাও পিতলের চক্ষুযুক্ত প্রতীকী। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় ধর্মঠাকুরকে প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ দেবতা বলেছেন। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য এঁকে আদিম জাতি পূজিত সূর্যদেবতা বলে প্রমাণ করতে প্রয়াসী। ভাষাতত্ত্ববিদ আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ধর্ম শব্দ প্রাচীন কুর্মবাচক অস্ট্রিক 'দড়ম' শব্দের সংস্কৃতায়িত রূপ বলে মনে করেন। তাঁর মতে বাংলাদেশে বসবাসকারী প্রাচীন দক্ষিণ জাতির লোকের মধ্যে প্রচলিত ধর্মের বিকৃত অবশেষ এই ধর্মঠাকুর। যা হোক, ধর্মদেবতা আদিতে যেভাবেই থাকুন না কেন নানা ধর্মের সমন্বয়ে ইনি বর্তমানে মিশ্রদেবতায় পরিণত হয়েছেন। এঁর কোনো বিশেষ অবয়ব নেই। শিলামূর্তিতে বিভিন্ন নামে ইনি পূজিত হন।
ধর্মঠাকুরের পুজো রাঢ় দেশে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে সুপ্রচলিত। ধর্মপুজোর পুরোহিতদের মধ্যে নিম্ন শ্রেণির ডোম, হাড়ি, কৈবর্ত, বাগদি ও শুঁড়ি প্রভৃতি প্রসিদ্ধ। ব্রাহ্মণ পূজারি খুবই কম। পূজারিরা পণ্ডিত উপাধি ধারণ করেন। ধর্মঠাকুর ফসল উৎপাদনের দেবতা, নারীর বন্ধ্যাত্ব ঘোচাবার দেবতা ও কুষ্ঠব্যাধি নিরাময়ের দেবতা। ধর্মঠাকুরের কাছে ছাগ, হাঁস, মুরগি ও শূকর প্রভৃতি বলি দেওয়া হয়। এই দেবতা অঘটন ঘটন পটীয়সী অলৌকিক শক্তির অধিকারী ও একান্ত ভক্তবৎসল। এই দেবতার 'ভক্তরা' বঁটি ও আগুনের উপর ঝাঁপ দিয়ে হাত পা বুকে শূল বিদ্ধ করে লোহার কাঁটার উপর গড়াগড়ি দিয়ে হাজার হাজার দর্শকের সামনে পুজো নিষ্পন্ন করে।
ধর্মমঙ্গলকাব্যের নায়ক লাউসেন ও ইছাই ঘোষ ছাড়া অন্যান্য নরনারী দেবতা-সম্পর্কহীন সাধারণ মানুষ। আত্মশক্তির উপর নির্ভর করেই তারা জীবন সমস্যার সামনে এসে অগ্রসর হয়েছে। কালু ডোম, লখাই ডোমনি প্রভৃতি তথাকথিত অন্ত্যজশ্রেণির নরনারী এবং কলিঙ্গ ও কানাডা প্রভৃতি অভিজাত বংশের নারীরা সবাই প্রবল শৌর্য ও সাহসের পরিচয় দিয়েছেন।
ধর্মঠাকুরের পুজো উপাসনা প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত থাকলেও ধর্মমঙ্গল কাব্যের উদ্ভব ষোড়শ শতাব্দীতে। কাব্যটি বীররসাত্মক ও যুদ্ধবিগ্রহে পরিপূর্ণ এবং পুরুষ চরিত্র অপেক্ষা স্ত্রী চরিত্রগুলি বেশি জীবন্ত ও ব্যক্তিবৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। বাংলা সাহিত্যে ধর্মঠাকুর সংক্রান্ত রচনাগুলিকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক রামাই পণ্ডিতের শূন্য পুরাণ ও ধর্মপুজোর বিধিবিধান। দুই ধর্মমঙ্গল কাহিনি কাব্য।
ধর্মমঙ্গল কাব্যে দুটি কাহিনি সন্নিবেশিত। একটি হল পুরাণকেন্দ্রিক রাজা হরিশ্চন্দ্রের কাহিনি, অন্যটি ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বীর লাউসেনের কাহিনি।
প্রথম কাহিনি: রাজা হরিশ্চন্দ্র ও রানি মদনা
প্রথম কাহিনিটি খুব প্রাচীন। রাজা হরিশচন্দ্র ও রানি মদনা নিঃসন্তান ছিলেন। ফলে তাঁদের অনেক বিদ্রূপ ও তিরস্কার সহ্য করতে হত। মর্মান্তিক দুঃখে রাজা-রানি ঘুরতে ঘুরতে একদিন এক নদীর তীরে এসে উপস্থিত হলেন। দেখতে পেলেন সেখানে ভক্তরা ধর্মঠাকুরের পূজার্চনায় রত। তাঁদের কাছে ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য শুনে পুত্রলাভের আশায় রাজা-রানি ভক্তিভরে ধর্মঠাকরের আরাধনা করলেন। পুজোয় সন্তুষ্ট ধর্মঠাকুর পুত্রলাভের বর দিলেন একটি শর্তে। পুত্র জন্মালে যথাসময়ে তাঁকে ঠাকুরের কাছে বলি দিতে হবে। পুত্রমুখ দেখার আশায় রাজা হরিশচন্দ্র সেই প্রস্তাবে রাজি হলেন। ধর্মঠাকুরের বরে রানি পুত্রবতী হলেন। ধর্মের বরপুত্রের নাম রাখা হল লুই ধর। সে বড়ো হয়ে উঠল। রাজা রানি প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে গেলেন। একদিন ধর্মঠাকুর ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে তাঁদের বাড়িতে এলেন। সেদিন একাদশীর ব্রত। রাজা ব্রাহ্মণকে ইচ্ছামতো খাবার দিতে চাইলেন। আর যায় কোথায়! ছদ্মবেশী ধর্মঠাকুর লুই ধরের মাংসাহারের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রাজা প্রচণ্ড বেদনা সত্ত্বেও অবিচলিত চিত্তে লুই ধরকে কেটে মাংস রান্না করলেন। রাজার নিষ্ঠায় অত্যন্ত খুশি হয়ে ধর্মঠাকুর লুই ধরকে পুনর্জীবিত করলেন। মহাসমারোহে রাজা-রানি ধর্মঠাকুরের পুজোর আয়োজন করলেন।
দ্বিতীয় কাহিনি: বীর লাউসেন
ধর্মমঙ্কালের দ্বিতীয় কাহিনি গড়ে উঠেছে লাউসেনের বীরত্বকে কেন্দ্র করে। অন্যান্য মঙ্গলকাব্যের মতো এখানের প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় চেতনা সুস্পষ্ট। ধর্মঠাকুর মর্তে পুজো প্রচারের জন্য উৎসুক। সে সুযোগ এসে গেল। স্বর্গের নৃত্যসভায় নর্তকী জাম্ববতীর তাল ভঙ্গ হওয়ায় শাপভ্রষ্ট হয়ে তিনি মর্তে বমতি নগরে বেণুরায়ের কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করলেন। নাম হল রঞ্জাবতী। রঞ্জাবতীর বড়দি গৌড়েশ্বরের পাটরানি। আর বড়ো ভাই মহামদ গৌড়েশ্বরের মন্ত্রী।
ঢেকুরগড়ের অধিপতি কর্ণসেন গৌড়েশ্বরের অধীনে সামন্ত রাজা ছিলেন। ইছাই ঘোষ গৌড়েশ্বরের আর এক সামন্ত। সে চণ্ডীর বরপুত্র। অসীম তার শক্তি। সে প্রচন্ডভাবে বিদ্রোহী হয়ে উঠলে গৌড়েশ্বরের নির্দেশে তাকে দমন করতে গিয়ে কর্ণ সেন পরাজিত হলেন। ছয় পুত্র ও পুত্রবধূরা যুদ্ধে মারা গেলেন। কর্ণসেন অত্যন্ত কারত হয়ে পড়লেন। বৃদ্ধ সামন্তরাজ কর্ণসেনের সঙ্গে গৌড়েশ্বর নিজ শ্যালিকা রঞ্জাবতীকে বিয়ে দিলেন। বিয়ের পর কর্ণসেন রঞ্জাবতীকে নিয়ে ময়নাগড়ে নতুন সামন্ত পদে অধিষ্ঠিত হলেন।
বৃদ্ধ কর্ণসেনের বিবাহে মহামদের ঘোরতর আপত্তি ছিল। সে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। সামনাসামনি গৌড়েশ্বরকে কিছু বলার তার সাহস ছিল না। তাই সে কর্ণসেনের সঙ্গে শত্রুতা শুরু করল। কর্ণসেনকে আঁটকুড়া বা পুত্রহীন বলে বিদ্রূপ করল। ক্ষোভে দুঃখে অভিমানে রঞ্জাবতী খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়লেন।
এই সংবাদে গৌড়েশ্বর খুবই খুশি হলেন। কিন্তু তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন মহামদ। লাউসেনের অনিষ্ট করার জন্য তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন। তাঁর নির্দেশে ইন্দা মেটে নামে এক অনুচর লাউসেনকে অপহরণ করল। পুত্রশোকে রঞ্জাবতী পাগল হয়ে উঠল। ধর্মঠাকুর কপূরবিন্দু থেকে এক শিশু তৈরি করে তাঁর কোলে দিলেন। নাম হল কপূর ধবল। আর অচিরে ধর্মঠাকুরের আজ্ঞায় হনুমান লাউসেনকে উদ্ধার করে এনে রঞ্জাবতীর কোলে তুলে দিল। রঞ্জাবতী হলেন দুই পুত্রের মা।কী লেজওটে চতনতা সি
লাউসেন বড়ো হয়ে লেখাপড়া ও অস্ত্রবিদ্যায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করল। মল্লবিদ্যায় কেউ তাঁর সঙ্গে পেরে ওঠে না। গৌড়েশ্বরের কাছে নিজের বীরত্ব দেখিয়ে খ্যাতি অর্জনের জন্য একদিন লাউসেন ভাই কপূর ধবলকে নিয়ে গোঁড় যাত্রা করল। পথে বাঘ, কুমির প্রভৃতি হিংস্র পশুদের বধ করল। ভ্রষ্টা রমণীদের প্রলোভন এড়িয়ে লাউসেন নৈতিক শুচিতার পরিচয় দিলেন। তাঁর খ্যাতি বেড়ে গেল।
গৌড়ে পৌঁছেই মহামদের চক্রান্তে লাউসেন কারারুদ্ধ হলেন। কিন্তু শীঘ্রই বাহুবল দেখিয়ে গৌড়েশ্বরকে সন্তুষ্ট করে কারামুক্ত হলেন। প্রচুর পুরস্কারসহ ময়নাগড়ের ইজারা পেলেন। দেশে ফেরার পথে কালু ডোম ও পত্নী লখ্যার সঙ্গে লাউসেনের বন্ধুত্ব হল। লাউসেন এদের নিয়ে ফিরলেন ময়নাগড়ে। কালু হল তাঁর সেনাপতি। এদিকে মহামদ চুপ করে বসে থাকার লোক নন। তাঁর চক্রান্তে গৌড়েশ্বর কামরূপরাজকে দমন করার জন্য লাউসেনকে পাঠালেন। মহামদ ভেবেছিলেন যুদ্ধে লাউসেনের মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু লাউসেন কামরূপরাজকে হারিয়ে তাঁর কন্যা কলিঙ্গকে বিয়ে করে দেশে ফিরলেন। মহামদ এতে জ্বলে পুড়ে মরতে লাগল। তাঁর চক্রান্তে গৌড়েশ্বর লাউসেনকে নিয়ে শিমুল রাজ্য আক্রমণ করলেন এবং লোহার গণ্ডার কেটে লাউসেন শিমুলরাজ হরিপালের কন্যা কানাড়াকে বিয়ে করলেন। আবার মহামদের চক্রান্তে অজয় নদের তীরে ইছাই ঘোষের সঙ্গে লাউসেনের তুমুল যুদ্ধ বাধল। ধর্মঠাকুরের কৃপায় লাউসেন বিজয়ী হলেন। যুদ্ধে পরাস্ত ও নিহত হল ইছাই ঘোষ। এবার অন্যভাবে মহামদ লাউসেনকে জব্দ করতে সচেষ্ট হলেন। গৌড়েশ্বরকে দিয়ে আদেশ করালেন, লাউসেন যদি ধর্মের বরপুত্র তবে দেখাক না পশ্চিমে সূর্যোদয়: না পারলে শাস্তি মৃত্যু। 'হাকন্দ' নামক স্থানে ধর্মঠাকুরের তপস্যা করে এই অসাধ্য সাধন করলেন লাউসেন। লাউসেনের হাকন্দে তপস্যার সুযোগে মহামদ ময়নাগড় আক্রমণ করে। যুদ্ধে পুত্র পত্নীসহ কালুরায় মারা যায়। লাউসেনের প্রথমা স্ত্রী কলিঙ্গাও নিহত হন। কিন্তু অবশেষে বীরাঙ্গনা কানাড়ার হাতে মহামদ পরাজিত হয়ে পালাতে বাধ্য হন। লাউসেন দেশে ফিরে ধর্মঠাকুরের স্তব শুরু করলেন। ঠাকুরের কৃপায় সবাই বেঁচে উঠল। মর্তে ধর্মঠাকুরের পুজো প্রচারিত হল। এদিকে মহাপাপের জন্য মহামদের কুষ্ঠ ব্যাধি হল। দয়াপরবশ হয়ে লাউসেন ধর্মঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করায় মহামদ কঠিন ব্যাধি থেকে মুক্ত হল। ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য প্রচার করে পরম গৌরবে কিছুকাল রাজত্ব করে স্বর্গারোহণ করলেন লাউসেন। পুত্র চিত্রসেন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হলেন।

No comments:
Post a Comment