Breaking

Wednesday, June 17, 2026

চণ্ডীমঙ্গলকাব্যের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী

সাহিত্যে বাঙালির সমাজ ও চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের গুরুত্ব



১. সংক্ষিপ্ত চৈতন্য-জীবনী

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষার্ধে (১৪৮৬) বাংলাদেশে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত এক যুগান্তকারী ঘটনা। মধ্যযুগের এক ক্রান্তিকালে তাঁর আবির্ভাব। মধ্যযুগের বাংলাদেশে তিনি সর্বাপেক্ষা স্মরণীয় বরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর আবির্ভাবে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি যেমন গতানুগতিকতা থেকে মুক্ত হয়ে নতুন ভাবকল্পনা ও চিন্তাদর্শে সমৃদ্ধ ও বিকশিত হয়েছে, তেমনি বাংলার সমাজজীবনেরও জন্মান্তর, রূপান্তর সাধিত হয়েছে।

শ্রীচৈতন্যদেবের আদি বাসস্থান ছিল শ্রীহট্টে। তাঁর পিতা জগন্নাথ মিশ্র ছিলেন বৈদিক ব্রাহ্মণ। তিনি ও শ্রীহট্টের নীলাম্বর চক্রবর্তী সহ আরও অনেকে সামাজিক বিশৃঙ্খলা বা বিদ্যার্জনের জন্য নব্য ন্যায় চর্চার অন্যতম কেন্দ্র নবদ্বীপে এসে বসতি স্থাপন করেন। জগন্নাথের প্রথম সন্তান ছিলেন বিশ্বরূপ। তাঁর বয়স যখন বারো, তখন ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে ২৩ ফাল্গুন দোল পূর্ণিমার দিন সন্ধ্যাকালে মহাপ্রভুর জন্ম হয়। এর আগে শচীমায়ের পর পর কয়েকটি সন্তান মারা যায়। নবজাত শিশুর নামকরণ হয় বিশ্বম্ভর। ডাকনাম নিমাই। নিমাই মানে নিমের মতো তিক্ত। তাই যম তাঁকে স্পর্শ করতে পারবে গুরু। এই ছিল তৎকালীন সংস্কার। নিমাই-এর গায়ের রং কাঁচা সোনার মতো উজ্জ্বল বলে পাড়া-প্রতিবেশীরা তাঁকে গৌরাঙ্গ বলে ডাকত।

মহাপ্রভুর বাল্যকালে তাঁর বড়ো ভাই বিশ্বরূপ বিবাহের ভয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। সেই ভয়ে আদুরে সন্তান নিমাইকে পিতামাতা পাঠশালায় পাঠাননি। বাল্যকালে নিমাই অত্যন্ত দুরন্ত ও চপল ছিলেন। তাঁর নানা প্রকার অত্যাচারে নবদ্বীপবাসীগণ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। নিমাই কুপুত্র এবং নানাজনের নানাপ্রকার অভিযোগে চিন্তিত হয়ে জগন্নাথ তাঁকে গঙ্গাদাস পন্ডিতের টোলে ভর্তি করে দিলেন। তীক্ষ্ণধী নিমাই অল্পকালের মধ্যে কাব্য, ন্যায়, ব্যাকরণ প্রভৃতি শাস্ত্রে অদ্বিতীয় পণ্ডিত হয়ে উঠলেন। তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। নবদ্বীপে তিনি টোল খুলে ছাত্র পড়াতে লাগলেন। শ্রীহট্ট থেকেও অনেক ছাত্র এল।

টোল খোলার অল্পকাল পরে বল্লভ আচার্যের কন্যা লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে নিমাই-এর বিবাহ হল। তখন তাঁর বয়স ষোলো-সতেরো। তারপর পৈতৃক সম্পত্তি দেখাশোনার ব্যাপারে শ্রীহট্টে চলে যান। অল্পকাল পরে গৃহে ফিরে এসে শুনলেন সর্পদংশনে স্ত্রী লক্ষ্মীদেবীর মৃত্যু হয়েছে। এরপর পিতাও ইহধাম ছেড়ে চলে গেলেন। মায়ের পীড়াপীড়িতে আবার ধনী ও সম্ভ্রান্ত ঘরের কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে বিবাহ হল। দ্বিতীয়বার বিয়ের অল্পকাল পরে তেইশ বছর বয়সে পিতৃপিণ্ড প্রদানের জন্য গয়ায় গেলেন। সেখানে বিষ্ণুপাদপদ্ম দেখে দিব্য ভাবের আবেশে বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। বৈশ্বব ভক্ত সন্ন্যাসী ঈশ্বরপুরীর কাছে দশাক্ষর গোপাল মন্ত্রে দীক্ষা নিলেন। বৈরাগ্যে ভরে গেল চিত্ত। কৃষ্ণবিরহে সর্বদা আকুল মহাপ্রভুর জন্মান্তর ঘটল গয়ায়। নবদ্বীপে ফিরে এসে হরিভক্তদের নিয়ে সংকীর্তনে মেতে উঠলেন। একাজে কাজি ঘোরতর বিরোধিতা করল। চৈতন্য তাঁর ভক্তদের নিয়ে কাজি দলন করলেন। কাটোয়ায় কেশব ভারতীর নিকট মন্ত্রদীক্ষা নিয়ে সন্ন্যাসী হলেন। এরপর আর তিনি ঘরে ফিরলেন না। শান্তিপুরে গিয়ে অদ্বৈত আচার্যের গৃহে থাকেন। নিত্যানন্দ ও আরও অনেক ভক্ত সেখানে মিলিত হন। ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে অদ্বৈত ও নিত্যানন্দের ওপর বাংলায় বৈশ্ববধর্ম প্রচারের ভার দিয়ে চারজন সঙ্গী নিয়ে পুরীধামে যাত্রা করেন। সেখানে অদ্বৈতবাদী বাসুদেব সার্বভৌম তর্কে পরাস্ত হয়ে ভক্তিমার্গের পথিক হন। উড়িষ্যার রাজা প্রতাপরুদ্র তাঁকে গুরুর ন্যায় শ্রদ্ধাভক্তি করতেন। এরপর দক্ষিণ ভারত ও পশ্চিম ভারত পরিক্রমা করে সাধক তুকারাম, বেঙ্কটভট্ট ও রায় রামানন্দের সাহচর্য লাভ করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য রায় রামানন্দের সঙ্গে বৈশ্ববধর্মের আলোচনা। তারপর ফিরে আসেন পুরীতে। ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে বৃন্দাবন পরিক্রমায় বের হন। গঙ্গাতীর ধরে শান্তিপুর হয়ে গৌড়ে আসেন। শান্তিপুরে শেষ বারের মতো গর্ভধারিণী মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। আর তিনি বাংলায় ফেরেননি।

গৌড়ের নিকট রামকেলিতে হোসেন শাহের দুই মন্ত্রী দবীর খাস ও সাকর মল্লিকের আনুগত্য লাভ করেন। এঁরা চৈতন্যপথের পথিক হন। মহাপ্রভু এঁদের যাবনিক নাম বদলে রাখেন রূপ ও সনাতন। মহাপ্রভুর নির্দেশে দুজন বৃন্দাবন গিয়ে সংস্কৃতে নানা গ্রন্থ রচনা করে বৈশ্ববধর্মের দাশনিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এঁদের ভ্রাতুষ্পুত্র জীব গোস্বামীও বৃন্দাবনে গিয়ে বৈশ্ববধর্ম চর্চায় রত থাকেন। বৃন্দাবনে এঁদের সঙ্গে মিলিত হন রঘুনাথ দাস, রঘুনাথ ভট্ট ও গোপাল ভট্ট। এঁরা সবাই বৃন্দাবনের ষড় গোস্বামী নামে খ্যাত। মহাপ্রভু নানা তীর্থ ঘুরে ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে পুরীধামে ফিরে আসেন। এরপর আঠারো বছর তিনি পুরী ছেড়ে কোথাও যাননি। তাঁর বিশেষ সঙ্গী ছিলেন হরিদাস, স্বরূপ দামোদর, পরমানন্দপুরী ও রায় রামানন্দ।

মহাপ্রভু পুরীধামে সর্বদা কৃষ্ণবিরহে বাহ্যজ্ঞান রহিত হয়ে দিব্যভাবে বিভোর থ একতেন। কৃষ্ণবিরহে মহাপ্রভুর শরীর ক্রমশ ক্ষীণ হতে থাকে। অবশেষে ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি অমৃতলোকে পাড়ি দেন। তাঁর তিরোধান সম্পর্কে লোচন দাসের অভিমত তাঁর মরদেহ জগন্নাথ বিগ্রহে বিলীন হয়ে যায়। ভিন্নমতে, তিনি পুরীর সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আর ফেরেননি। জয়ানন্দ লিখেছেন পুরীতে রথযাত্রার সময়ে মহাপ্রভু আনন্দে রথের সামনে নৃত্য করতে থাকলে পায়ে ইষ্টকাবিদ্ধ হন। তারই বিষক্রিয়ায় যন্ত্রণা বাড়ে ও জ্বরাক্রান্ত হয়ে তিনি ইহলীলা সংবরণ করেন। আবার রাজনৈতিক চক্রান্তে পান্ডারা তাঁকে হত্যা করেছিলেন বলেও অভিমত প্রচলিত।

২. সমাজজীবনে চৈতন্যদেব

ভূমিকা বাংলার জাতীয় জীবনে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব (১৪৮৬ খ্রি.) এক যুগান্তকারী ঐতিহাসিক ঘটনা। বাঙালির সমাজজীবন ও ধর্মদশনের উপর তাঁর প্রভাব খুবই ব্যাপক ও সুদূরবিস্তারী। এই মহাপুরুষ যে বৈশ্ববীয় প্রেমধর্মের আদর্শ প্রচার করেন তাতে সমগ্র বাঙালি জাতির চিত্ত জড়ত্বের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে স্বচ্ছ ও বেগবতী ধারায় সমাজজীবনকে নানা দিক থেকে বিচিত্রমুখী বিকাশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বাঙালি জাতির নবজাগরণ ঘটে। বাঙালির চিন্তায়, কল্পনায়, কর্মসাধনায় ও সমাজ সংগঠনের ক্ষেত্রে শ্রীচৈতন্য বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রেরণা দিলেন। ষোড়শ শতাব্দী থেকে আজ পর্যন্ত যে ব্যক্তির মনন ও ধর্মাদর্শের প্রভাব বাংলার সমাজজীবন ও সাহিত্যকে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে লালনপালন করেছে তিনি হলেন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য। প্রকৃতপক্ষে মধ্যযুগের পটভূমিতে বাঙালির আত্ম-উজ্জীবনের সর্বাধিনায়ক শ্রীচৈতন্য।

সমকালীন সমাজ শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের পূর্বে বাংলাদেশ প্রায় আড়াইশো বছরের মুসলিম শাসনে বিপর্যন্ত ও বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল। মুসলিম শাসকরা অনেকে সাম্প্রদায়িক মনোভাবের ঊর্ধ্বে উদার মনোভাবাপন্ন ছিলেন বটে, কিন্তু অভিজাত হিন্দুরা মুসলমান শাসনব্যবস্থার স্তম্ভস্বরূপ হয়ে ওঠেন। ব্রাহ্মণ সমাজে আদর্শনিষ্ঠা ছিল না বললে চলে। অবৈশ্বব সম্প্রদায়রা তান্ত্রিক ক্রিয়াধর্ম নিয়ে ব্যভিচারে লিপ্ত। রাজকর্মচারীদের অত্যাচার লুণ্ঠন ও উৎপীড়ন প্রাধান্য পায়। সমাজে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক পরস্পর বিদ্বেষে সংঘর্ষে পর্যুদস্ত। মুসলমান শাসকদের নিষ্ঠুরতা- 'জোর যার মুল্লুক তার নীতি' ও হিন্দুসমাজের অন্তর্গত বর্ণবিভেদ, সম্প্রদায়ভেদ ও উচ্চনীচ জাতিভেদে বাঙালিজীবন বহুধা বিচ্ছিন্ন, ঐক্যভ্রষ্ট ও একান্ত পঙ্গু হয়ে পড়ে। সমগ্র জাতি তখন ঘোর নিরাশার অন্ধকারে ডুবুডুবু।

সমাজের ধনীরা স্বভাবতই বিলাসব্যসন প্রাচুর্যের মধ্যে দিন কাটাত। আর্থিক প্রাচুর্যের জন্যই ধর্মের নামে, পূজাচর্নার নামে ভক্তিবর্জিত নানা বাহ্য আড়ম্বর ও ব্যভিচার প্রশ্রয় পায়। অন্যদিকে দরিদ্ররা ছিল অর্থহীন, নানা কুসংস্কার ও লোকাচারের দাসানুদাস। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, সামাজিক নিষ্পেষণে নিম্নশ্রেণিভুক্ত হতম্লান হিন্দুরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। ইসলামের শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার মধ্যে তারা আত্মরক্ষার আশ্রয় খুঁজে পায়। সমগ্র হিন্দুজাতির এই মরণাপন্ন অবস্থায় শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব।

চৈতন্যধর্ম বৈশ্বব প্রেমধর্মের মাধ্যমে তিনি প্রচার করলেন বিশুদ্ধ উদার মানবিকতার বাণী। সবার ওপরে মানুষ ও মনুষ্যত্বই প্রকৃত জীবনসত্য। ঈশ্বর মানুষের বন্ধু তিনি সন্তান, তিনি প্রেমিক পুরুষ। প্রতি মানুষের হৃদয়দ্বারে প্রেমের কাঙালরূপে তিনি নিত্য বিরাজমান; দ্বার খুললেই মিলন ঘটবে। মানুষে মানুষে কোনো ভেদ নেই। মানবতা সার্থক হয় ঈশ্বরপ্রেমে। চণ্ডালও ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ যদি সে হরিভজনা করে।
'মুচি হয়ে শুচি হয় যদি হরি ভজে।'

মহাপ্রভু জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষকেই বক্ষে টেনে নিলেন। যবন হরিদাসকে তিনি গ্রহণ করলেন। দুই ঘোর তান্ত্রিক জগাই, মাধাই তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করল।। শুষ্ক নীতিতত্ত্ববাদী নৈয়ায়িক সার্বভৌম ঠাকুর প্রেমধর্মকে স্বীকার করে নিলেন।

মানবতার আদর্শ নৃপতি হুসেন শাহ চৈতন্যের প্রতি সহনশীলতার নীতি ঘোষণা করে ধর্মপ্রচারে আদেশ দিলেন। মহাপ্রভু স্বাধীনভাবে সকলের নিকট ধর্মপ্রচার করবেন-

'কাজি বা কোটাল কিবা হউ কোন জন / কিছু বলিলেই তার লইব জীবন।।'

রাজানুগত্যের ফলে হিন্দুর ধর্ম ও সংস্কৃতি ইসলাম ধর্ম ও সংস্কৃতির জীবনধারার অনুকরণ থেকে স্বধর্মে রক্ষা করার পথ তৈরি হল। পরধর্মের প্রতি ঘৃণা ও বিলুপ্তি নয়-পরধর্মসহিষ্ণুতাই আসল মানবধর্ম। এভাবে শ্রীচৈতন্য হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতিকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে জাতিকে নতুন শক্তিতে উদ্দীপ্ত করলেন। অপমানিত, লাঞ্ছিত, মূঢ়, মূক, ম্লান নতশির জাতিকে তিনি মানবতার নতুন মন্ত্রে দীক্ষিত করলেন। উচ্চনীচ, ব্রাহ্মণ-শূদ্র, পণ্ডিত-মূর্খ, ধনী-নির্ধন ও হিন্দু-মুসলমান সকলে মানবতার একাসনে বসার সুযোগ পেল। এই মানবিকতার আদর্শ ও সমন্বয়ের বাণী ভারতবর্ষের জাতীয় সংহতির মর্মবাণী তা বহু আগেই চৈতন্যদেবের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে।

এদিক থেকে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক। একটিমাত্র মানুষ একটি যুগকে, জাতিকে প্রেম ও অহিংসার সমন্বয়ে ও আদর্শে পরিশ্রুত করে যে নতুন চেতনা দেশে সঞ্চার করেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। একা শ্রীচৈতন্য মধ্যযুগের বাঙালি সমাজের অন্ধকারকে দীর্ণবিদীর্ণ করে মানবতার সত্য ও প্রেমের করুণ কোমল বিশ্বপ্লাবী নবজাগৃতির অরুণোদয় সম্ভব করে তুলেছিলেন। যুগন্ধর মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্যের প্রভাবে বাঙালি জাতির এই যে সর্বতোমুখী জাগরণ একে চৈতন্য-রেনেসাঁ নামে অভিহিত করা হয়েছে।

বাঙালির সমাজজীবনে চৈতন্যের প্রভাবের ফলশ্রুতি এই যে, সমস্ত অর্থহীন, আচার-সংস্কার ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে বাঙালি জাতিকে তিনি অখণ্ড জাতি হিসাবে আত্মপ্রতিষ্ঠার বিপুল প্রেরণা দান করেছেন। তিনি উদার ও মানবিক প্রেমধর্মের আদর্শ প্রচার করে অধঃপতিত বাঙালি জাতিকে মুক্তিদান করলেন। জাতি ঐক্যবদ্ধ হল। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- প্রেমের অধিকারে সৌন্দর্যের অধিকারে ভগবানের অধিকারে কারও কোনো বাধা থাকল না। হরিনাম সংকীর্তনই ছিল চৈতন্যদেবের ধর্মসাধনার সহজ পন্থা। এর ফলে ধনীনির্ধন ও উচ্চনীচের বৈষম্য এবং জাতিভেদ প্রথার কৃত্রিম বন্ধন আলগা হয়ে যেতে থাকে। মানবিক মূল্যবোধের নতুন মন্ত্রে বাঙালিজাতি নতুন শক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। কাউকে গ্রাস বা পীড়ন করে নয়, সকলকে নিয়েই মানবতার আদর্শচর্চার দীক্ষা দিলেন মহাপ্রভু। ফলে মনুষ্যত্বের সম্মান ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি নতুন হিন্দু সমাজ গড়ে উঠতে থাকে।

No comments:

Post a Comment