বিবাহ উত্তর কালীন সমস্যা ও আইনি প্রতিকার
এখন সাধারণ সমাজ ব্যবস্থায় বর্তমানে একটি গুরুত্ব পূর্ণ সমস্যা হচ্ছে- বিবাহ পরবর্তীকালে বধূ পীড়ন ও সেক্ষেত্রে বধূর অভিযোগের ভিত্তিতে বধূর স্বামী সর্ম্পকে জড়িত বা খাস বাংলায় "শ্বশুরবাড়ি”-র প্রতিটি সদস্যকে আইনগতভাবে প্রাথমিক অপদস্থতার শিকার হতে হয়।
ব্যাপারটা কি? তাহলে কতগুলি বিবাহ উত্তর কালীন সমস্যাকে কিভাবে মোকাবিলা করা যায় তা আগে জানা যাক। আইনগত ভাবে নীচের সমস্যাগুলির সন্তোষজনক উত্তর না পেলে "বিচ্ছেদ” এর আবেদন করা / বা চিন্তা করা চলে।
বিয়ের পর স্বামী যদি বৈধ'স্ত্রী ব্যতীত / স্ত্রী যদি ঐ বৈধ স্বামী ব্যতীত অপর কারো সাথে যৌন সম্পর্ক তৈরী করে। ভোগ করে / অংশগ্রহন করে।
- যদি বিয়ের পর যিনি অভিযোগকারিনী হবেন তার সঙ্গে অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়।
- বিয়ের পর ২ বৎসর কমপক্ষে কোনরুপ যোগাযোগ না। থাকে উভয়ের মধ্যে।
- ধর্মান্তরকরণ।
- বিকৃত মস্তিষ্ক বা তরূপ, যা কোন অবস্থাতেই স্বাভাবিক হওয়া সম্ভর নয়।
- সাধারণ জীবনে বীতশ্রদ্ধ ও সন্নাস গ্রহন।
- সাত বৎসর তদূর্ধ সময় নিখোঁজ।
এই হচ্ছে মোটামুটি ব্যাপারটা।
তবে সব সময় মনে রাখবেন আইনের বিধান এ যা বলা হয় প্রয়োগ ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা চলে ধরুন 'ক' বাবু বিয়ে করেছন। কিন্তু তার স্ত্রী তার স্বামীর বিরুদ্ধে চরিত্রহনন অথবা নিষ্ঠুরতার অভিযোগ আনল।
অথচ বাস্তবে স্ত্রী ভদ্রমহিলা ঠিক শারীরিক ভাবে সুস্থ নন, এক্ষেত্রে কি হবে? কেবল বিধান যা আছে তাই অনুযায়ী হলে তা বিচ্ছেদের জন্য আবেদন মঞ্জুর হবে তাই নয় কি?
কিন্তু না, ঐ যে অভিযোগ, "নিষ্ঠুরতা" তা প্রমানে কিন্তু অনেক পারিপার্শ্বিক প্রমান ও সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম বিষয় গুলি বিবেচনার পর ঐ আবেদন এর যথার্ততা অনুমোদন পায়।
সেই জন্য ঠিক একক ভাবে আইন কারো জন্য নয়। বিধান গুলি হচ্ছে "মূল" আর ঘটনা গুলি হচ্ছে "শিকড়”। শিকড় গুলি মূল সংলগ্ন বিনা অ পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিচার করা হয়।
ঐ ঘটনার সত্যতার প্রমানে প্রমান সহযোগে আইনজীবী জেলা আদালতে আবেদন করবেন তার "ক্লায়েন্ট" এর জন্য। আদালত নীচের বিষয়গুলি কে গুরুত্ব দেবার পর আবেদন কে অনুমোদন করবে-
- (১) আবেদন এর পূর্বে এক বছর একে অপরকে ছেড়েছিল
- (২) অপর পক্ষ দুরারোগ্য ব্যাধি যা কুষ্ঠও হতে পারে।
- (৩) ঐ নিষ্ঠুরতা তা আবেদন কারীর পক্ষে হয়েছে কিন্তু ওটা প্রমান করাও সম্ভব এবং ঐভাবে ঐ দাম্পত্য কখনই চালু থাকতে পারবে না।
- (৪) কোন প্রকার ভীষণ যৌনরোগ।
- (৫) মানসিক ব্যধিতে আক্রান্ত যা সুস্থ হবার না।
মানে, এক কথায় ঐ সব ব্যাপার যা বিধান এ আছে তার সঙ্গে অভিযোগকারিনীর অভিযোগের মিল আছে দেখে, বিচ্ছেদের মামলা অনুমোদন পাবে।
হ্যাঁ। তা সম্ভব। আদালত ও তা অনুমোদন করে।
'- কি করতে হবে?'
খুবই সহজ, মতে না মিললে উভয় একযোগে কারণ দেখিয়ে এবং সিদ্ধান্তের সপক্ষে আইনি যোগসুত্র রক্ষা করে যদি জেলা জজকে আবেদন করেন, তবে তা অনুমোদন এর গ্রাহ্য।
আবেদন এর পর আদালত সাধারনতঃ মিল করন এর একটা সুযোগ দিয়ে থাকে তবে অন্যথায় সুবিধাজনক সময়ের মধ্যে এই বিচ্ছেদের জন্য আদেশ দিয়ে থাকেন।
"ভরণ পোষণ" কেবল স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মনে রাখবেন বৃদ্ধ মাতা/ পিতাও ভরণ পোষন এর অধিকারী।
কি ভাবে বা কোন কারনে ভরণ পোষণ পাওয়া যাবে?
- স্ত্রী যদি নিজের ব্যায়ভার বহন না করতে পারে।
- সন্তান / বৈধ/ অবৈধ তাদের ব্যয়ভার বহন করতে না পারে।
- প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া স্বত্ত্বেও কোন শারীরিক / মানসিক ত্রুটি পূর্নভাবে আহত।
ফৌজদারী কার্যবিধির ১২৫ নং ধারাতে এই কার্যবিধি বর্নিত আছে।
তবে মনে রাখবেন:
- বিচ্ছেদের পর পুনঃ বিবাহিতার ক্ষেত্রে ভরণ পোষণ প্রযোজ্য নয়।
- যদি যথেষ্ট জীবিকা নির্বাহের রাস্তা থাকে তবে তার ক্ষেত্রে ঐ ১২৫ এ দাবী যথার্থতা না পাবার সম্ভাবনা বেশি।
হ্যাঁ। কোন ও আইনগত বাধা এতে নেই। তবে মনে রাখতে হবে পূনঃবিবাহ এর পূর্বে পূর্ব বিবাহ যাতে বিচ্ছেদ হয়েছে, তার আইনগত দিকগুলি সম্পূর্ণ হয়েছে সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত হতে হবে।
কোনরুপ বিধিগত নিষেধ যা উভয় ক্ষেত্রে প্রয়োজ্য ছিল কিন্তু হয়নি, আদালতের নির্দেশ স্বত্ত্বেও তবে আইন গত ত্রুটি পূর্ন তার জন্য ঐ পুনঃবিবাহ ঠিক সিদ্ধান্ত পায় নয়।
"বিচ্ছেদ” কাগজে কলমে হলেও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় পুনরায় ঐ দম্পতি আবার নতুন জীবন আরম্ভ করেছে। সেক্ষেত্রে আইনি বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। অন্যথায় ভবিষ্যতে জটিলতা বৃদ্ধি পাবে।
সুতরাং অভিজ্ঞতায় বলে যে মনের বিচ্ছেদই প্রকৃত বিচ্ছেদ। ঐ বিচ্ছেদকে সামাজিক ভাবে আইন স্বীকৃতি দেয়।
অসঙ্গত কারনে বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করা হয়েছে ঠিকই। তবু আবার নিজেদের মধ্যে মিল হয়েছে এ ক্ষেত্রে কি হবে?
তবে উপযুক্ত প্রমাণের উপর ভিত্তি করে নতুন দাম্পত্য শুরু করবার অধিকার মানে "দাম্পত্য অধিকার পুনঃরুদ্ধার" এর ধারাতে আদালত ঐ সম্পর্ককে পুনঃস্বীকৃতি দিতে পারে।
তাহলে ঐ বধূত্পীড় নের প্রশ্ন আসে কি ভাবে? বধূ-পীড়ন এর প্রশ্নটা ঐ বিচ্ছেদের সঙ্গে সমাধানের সূত্র পায় ঠিকই, জটিল মনস্তত্তের প্রতিফলন হচ্ছে বধূপীড়ন। বিবাহিত অবস্থায়, আদালতে তথ্য ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, প্রতিটি বধূর পারিবারিক সহাবস্থানের সঙ্গে নতুন অর্থাৎ বিয়ের পরে সহাবস্থান, দুটির মধ্যে মিল করণ সময় সাপেক্ষ। আইনি বিধানে জটিলতা বা সমস্যায় বিচ্ছেদ একটা সমাধান সূত্র ঠিকই, তবে মেয়ের বিয়ের পর বিচ্ছেদ ঘটিয়ে নতুন জীবন প্রাপ্তির ঠিক ততটা জনপ্রিয়তা এখনো ভারতীয় সমাজে সুদূর অস্ত।
আর ঠিক এই দুর্বল জায়গাটাই বধূ পীড়নের মূলধন।
অর্থ-সামাজিকচূড়ান্ত অব্যবস্থাতে মেয়ের বিয়ে দেওয়াটা যতটা কষ্ট তার উপর আছে পনের যা "ডিম্যান্ড' এর একটা চাপ। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা বলেছে যে ক্রমশ এই চাপটা বাড়তে বাড়তে একটা ভীষণই আকার নিল আর সঙ্গে "বধূ হত্যা" টা বাড়তে লাগল।
এতেই আসল ঐ পেনাল কোড এ ৪৯৮ এর ব্যাপক প্রচলন।
কর্তৃপক্ষ হিসাবে সরকারী সহযোগীতায় নতুন ঐ ধারার প্রচলন করে এ বিবাহ কেন্দ্রীক বিষয়ে যে অব্যবস্থা চলছে তাতে ঐ ধারা-র কঠোরতাতে বোধ হয় সুফল কিছুটা হয়েছে।
মূল ব্যাপারটা যে, বিয়ের পর কোন অবস্থাতে বধূর অত্যাচার- তা শারীরিক /মানসিক / সামাজিক / যাই হোক না ক্যানো, তাতে বধূর-র অভিযোগ অত্যন্ত" আবেগের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
কারণ না দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট শ্বশুড়বাড়ির লোকজন গ্রেপ্তার হতে পারেন। অভিযোগ প্রমানে দোষী বিবেচনায় শাস্তি পেতে পারেন। এই ধারায় অভিযোগ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রাযোগ হয় ও তরান্বিত হয়ে থাকে।
সুতরাং বধূ - পীড়ন এর অভিযোগ অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে বিবেচনা করা যুক্তিগ্রাহ্য।
কোন বিবাহিত হিন্দু নারী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পরও তার পূর্ব বিবাহ বাতিল হয় না এবং পূর্ব বিবাহ এর সম্পকিত তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন ও পেনাল কোড এর বধূ - পীড়ন এর অভিযোগ এর গভীর বাইরে যেতে পারেন না।

No comments:
Post a Comment