Breaking

Tuesday, September 15, 2026

প্রান্তবর্গের শিক্ষার অধিকার ও আজকের সময়

 


সামাজিক জীবনে শিক্ষার অধিকার কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আঁদ্রে বেতেই-এর কথায়, যে সদস্যদের দ্বারা সমাজ গঠিত, তাদের মধ্যে অধিকার স্বীকৃত বন্টন ছাড়া কোনো সমাজ চলতে পারে না। ১ অধিকারের সাহায্য ছাড়া কোনো সামাজিক সমস্যার সমাধান করা যায় না। তাই 'অধিকার' শব্দটি অনেক বেশি প্রশস্ত, নমনীয় ও রাজনৈতিক। অধিকার রক্ষা করা অধিকারকর্মীর একটা বড়ো কাজ। তাই তাদের সংঘবদ্ধ প্রতিবাদে প্রান্তবর্গের





শিক্ষার অধিকার রক্ষিত হতে পারে। করোনাকালে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার অধিকার বিঘ্নিত হয়েছে এবং এখনও পর্যন্ত হচ্ছে। শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত প্রান্তবর্গ। প্রান্তবর্গের প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হওয়ায় তাদের অবজ্ঞা করা সহজ হয়েছে। করোনাকে সামলানোর জন্য দেশসেবকরা স্কুল কলেজ সহ সমস্ত ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বন্ধ করে দিলেন এবং তাদের সমস্ত দায় যেন মিটে গেল- এই সিদ্ধান্তের দরুন। শিক্ষার্থীদের কী ক্ষতি হল, কতটা ক্ষতি হল তা ভাবার কোনো প্রয়োজন বোধ করল না দেশসেবকরা।

বিদ্যালয় বন্ধ রাখার দরুন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের যাদের অপরিসীম ক্ষতি হল, তারা সবাই সমাজের প্রান্তবর্গের ছেলেমেয়েরা। আজ ক্ষীণ আওয়াজ উঠছে বিদ্যালয় খোলার দাবিতে। বিদ্যালয় প্রায় ১৭ মাস বন্ধ। দেশসেবকরা শুধু ঘোষণা করে দেয় অনলাইন ও ই-কানেক্টটিভিটির মাধ্যমে পাঠদান হবে। সেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর শারীরিক উপস্থিতির কোনো সম্ভাবনা নেই। ভারত সরকারের শিক্ষা মন্ত্রেকের দেওয়া একটা ডেটা থেকে জানা যাচ্ছে, দেশের মোট বিদ্যালয়ের মাত্র ২২ শতাংশ বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট পরিষেবা চালু ছিল ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে। আর ১২ শতাংশ ইন্টারনেট ছিল সরকারি বিদ্যালয়ে। সক্রিয় কম্পিউটার সংখ্যা ছিল ৩০ শতাংশ। একমাত্র কেরালা রাজ্য এর ব্যতিক্রম, সেখানে সক্রিয় কম্পিউটারের সংখ্যা গড়ে ৮৩ শতাংশ, ঝাড়খণ্ডে ৭৩ শতাংশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ ১৪ শতাংশ এবং উত্তরপ্রদেশ ১৮ শতাংশ। বলে রাখা ভালো, এদিক থেকে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা উত্তরপ্রদেশের থেকে খারাপ। সারা বছর অনলাইন মাধ্যমে যে পঠন-পাঠন চলছে তা একরকম জোড়াতালি দিয়ে। কারণ দেশের বেশির ভাগ স্কুলে ইন্টারনেট ব্যবস্থা ঠিকঠাক নেই। কেবল তিনটি রাজ্যে ইন্টারনেট সহায়ক বন্দোবস্ত আছে- কেরালা ৮৮ শতাংশ, দিল্লি ৮৬ শতাংশ ও গুজরাট ৭১ শতাংশ। এছাড়া ওডিশা ৬.৪৬ শতাংশ, বিহার ৮.৫ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে ১০ শতাংশ এবং উত্তরপ্রদেশে ১৩.৬২ শতাংশ ইন্টারনেট পরিষেবা আছে। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা উত্তরপ্রদেশের থেকে খারাপ। সামগ্রিকভাবে কে কম বা বেশি এই হিসেব না করেও বলা যায় এর শোচনীয় প্রভাব পড়বে শিক্ষার্থীদের ওপর। শিক্ষককুল ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষাদানে অভ্যস্ত না হওয়ায় তারা ডিজিটাল বেড়াজালের সম্মুখীন। আসলে অনেক শিক্ষক কম্পিউটার সহযোগে পাঠদানে প্রশিক্ষিত নয়। সমগ্র বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হবার জন্য একটি সারণির মাধ্যমে উপস্থিত করা হল-


রাজ্য সমস্ত স্কুল সরকারি স্কুল সরকার পোষিত স্কুল বেসরকারি স্কুল
গোয়া ৬৯ ৪৪ ৭৫ ৭৮
পাঞ্জাব ৫৯ ৫৩ ২৪ ৬৫
গুজরাট ৫৭ ৬৪ ৪৫ ৪৪
মহারাষ্ট্র ৫৫ ৫০ ৪১ ৫২
কেরালা ৩৭ ৪৪ ৪২ ২৮
দিল্লি ৩৬ ২২ ১৫ ৫১
কর্ণাটক ৩৪ ২০ ১৯ ৫০
রাজস্থান ৩২ ৪০ ২৬
তামিলনাড়ু ৩০ ৩৮ ২৪ ২৬
হিমাচল ৩০ ২৩ ৩৭
সিকিম ২৭ ২৬ ৩৬ ৩১
হরিয়ানা ২৭ ৩৬
তেলেঙ্গানা ২৪ ২০ ১৬ ৩৮
ছত্তিশগড় ২০ ১০ ৩৬
নাগাল্যান্ড ২০ ১৫ ২৫
উত্তরপ্রদেশ ১৬ ২০
উত্তরাখণ্ড ১৫ ২১
ঝাড়খণ্ড ১৪ ৪৩
মণিপুর ১৩ ১৭
অন্ধ্র ১১ ১২ ১১
ওড়িশা ১০ ২৯
পশ্চিমবঙ্গ ১০ ২৮ ২৩
বিহার ১০ ২৭
মধ্যপ্রদেশ ১৪
অসম ১৫
অরুণাচল ২৭ ১৫
মেঘালয় ১১
মিজোরাম
ত্রিপুরা


এই সারণি থেকে জানা যাচ্ছে, বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও ওডিশায় শুধু ৩ শতাংশ সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক কম্পিউটার বিষয়ে প্রশিক্ষিত। গুজরাট, পঞ্জাব ও মহারাষ্ট্রের ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষক অনলাইনে পড়ানোর ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত। বেসরকারি স্কুলে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংখ্যা অনেক বেশি। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি। চোখে ঠুলি পড়ে সরকারবাহাদুর সারা বছর পড়াশোনা চালাতে চেয়েছে জোড়াতালি দিয়ে। ভুলে গেছে শিক্ষা যে প্রত্যেক নাগরিকের একটি জন্মগত অধিকার। এটাকে কোনোকিছুতেই অস্বীকার করাই যায় না। স্কুল বন্ধ রেখে চলছে অনলাইন ক্লাস। অথচ যেখানে আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষের দুবেলা পেটের ভাত জোগাতে নাভিশ্বাস উঠছে সেখানে নেট পরিষেবা কেনা তাদের কাছে দুসাধ্য ও অকল্পনীয়। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সমাজের প্রান্তবর্গ, যারা সংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ। স্কুল

বন্ধ থাকায় তফশিলি জাতি ও জনজাতির ছেলেমেয়েরা মা, ঠাকুমা, কাকিমাদের সঙ্গে জ্বালানি সংগ্রহ করতে যাচ্ছে বনেবাদাড়ে। কেউ গরু-ছাগল চরাচ্ছে সারাদিন। কেউ কেউ স্কুল বন্ধ থাকায় দিন মজুরির কাজ নিয়ে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে। পড়ার ব্যাপারে আগ্রহ নেই। তাদের মতে, গরিব পরিবারে রোজগার করলে কিছু সুবিধা হবে।' পড়ুয়াদের এই প্রবণতা নিয়ে অধিকাংশ শিক্ষক উদ্বিগ্ন। বাদাবন অঞ্চলের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকেরা জানালেন, গ্রামাঞ্চলে অনলাইনে পড়াশোনা কার্যত ফলপ্রসূ হয়নি। ইন্টারনেটের সমস্যা, মোবাইলের বাড়তি খরচের বোঝা অনেকেই বহন করতে পারছে না। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় বহু অভিভাবক ছেলেমেয়েদের স্মার্ট ফোন কিনে দিতে পারেননি। সর্বোপরি অনলাইনে পড়াশোনার সঙ্গে নিজেদের খাপখাওয়াতে পারেনি।' ফলে জন্ম নিচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য। উপেক্ষা করা হচ্ছে সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার। যদি আমরা এখনই প্রতিবাদ না করি তাহলে, শিক্ষাব্যবস্থা এলিট শ্রেণির হাতে কুক্ষিগত হতে বাধ্য।

তথ্যসূত্র:

১। আঁদ্রে বেতেই, গণতন্ত্র ও তার প্রতিষ্ঠানসমূহ অনু, দেবাশিস সেন, প্রথম অক্সফোর্ড বাংলা সংস্করণ, কলকাতা ২০১৮, পৃ.৮৯।

২। আর, রামানুজন, দ্য ক্রাইসিস অ্যাহেড ফ্রম লার্নিং লস টু রিজামশন, সম্পাদকীয় দ্য হিন্দু ২০ জুলাই ২০২১, কলকাতা, পৃ.৬:৩।

৩। বিশেষ সংবাদদাতা, ইন দ্য লাস্ট অ্যাকাদেমিক ইয়ার ২২% স্কুলস্ হ্যান্ড ইন্টারনেট, প্রতিবেদন, দ্য হিন্দু, ২ জুলাই কলকাতা ২০২১, পৃ.১:২।

81 নেটলস, সম্পাদকীয়, দ্য হিন্দু, ৩ জুলাই, ২০২১, কলকাতা, পৃ.৭:৪।

৫। সুমন্ত সেন ও অন্যান্য, ডেটা পয়েন্ট, দ্য হিন্দু, ১৪ জুলাই, ২০২১, কলকাতা, পৃ.৭:৪।

৬। প্রভাত কুমার শীট, স্কুলে কি ফিরবে ওরা, সম্পাদক সমীপেষু, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১২ জুলাই, ২০২১, কলকাতা, পৃ.৪:৫।

۹۱ নবেন্দু ঘোষ, স্কুল বন্ধ, রোজগারেই মন দিচ্ছে রবিউলেরা, প্রতিবেদন, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ জুলাই, ২০২১, কলকাতা, পৃ.৫:৩।

৮। তদেব, পৃ.৫:৩।

জচস

No comments:

Post a Comment