দেউচা পাচামি: বীরভূমের মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা কয়লা-ভাণ্ডারের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও বাস্তবতা
আমাদের বীরভূম জেলার মহম্মদবাজার ব্লকের দেউচা ও পাচামি এলাকা আজ শুধু স্থানীয় পরিচয়ের সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় স্তরে আলোচিত এক নাম। এই মাটির নিচে লুকিয়ে আছে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম কয়লার ভাণ্ডার, যাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, জটিল ভূতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ এবং সেই সাথে মানুষের জীবন-জীবিকার এক গভীর সংকট। এই আর্টিকেলে আমি দেউচা-পাচামির ভূতাত্ত্বিক গঠন ও বৈজ্ঞানিক জটিলতা বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি আমার নিজের এলাকায় প্রত্যক্ষ করা বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও তুলে ধরার চেষ্টা করব।
ভূতাত্ত্বিক গঠন: কেন এই কয়লা এত কঠিন উত্তোলন
দেউচা-পাচামি কয়লা অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য হলো, এখানকার কয়লার স্তর ভূপৃষ্ঠের একেবারে কাছাকাছি নেই, বরং তা ঢাকা পড়ে আছে এক পুরু আগ্নেয় শিলার আস্তরণের নিচে, যাকে বলা হয় ব্যাসল্ট। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, এই ব্যাসল্ট স্তরের পুরুত্ব প্রায় ২২৫ থেকে ২৪৫ মিটার পর্যন্ত হতে পারে, যা প্রায় সত্তর তলা একটি ভবনের সমান উচ্চতার সমতুল্য। এই বিপুল পরিমাণ কঠিন আগ্নেয় শিলা অপসারণ না করে কয়লার স্তরে পৌঁছানো সম্ভব নয়, যা এই প্রকল্পকে বিশ্বের অন্যান্য প্রচলিত কয়লা খনির তুলনায় ভূতাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জে পরিণত করেছে।
এই কারণেই প্রাথমিকভাবে ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেডকে এই প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তারা এটিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে করেনি এবং কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি ২০১১ সালে ভারতীয় সংসদে দেওয়া এক সরকারি উত্তরেও তৎকালীন কয়লা প্রতিমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে এই প্রকল্প লাভজনক না হওয়ায় কোল ইন্ডিয়া এতে যুক্ত হবে না। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে রাজ্য সরকার এই দায়িত্ব হস্তান্তর করে পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম লিমিটেডকে (WBPDCL), যারা এখন এই প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
এশিয়ার বৃহত্তম কয়লা খনি: দাবি ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক
স্থানীয়ভাবে এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেউচা-পাচামিকে প্রায়ই "এশিয়ার বৃহত্তম কয়লা খনি" বলে উল্লেখ করা হয়, যদিও বিভিন্ন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সূত্র অনুযায়ী এটি প্রকৃতপক্ষে ভারতের বৃহত্তম কয়লা খনি হিসেবে বর্ণিত, এবং কোনো কোনো প্রতিবেদনে একে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম খোলামুখ কয়লা খনি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধরনের দাবিগুলোর মধ্যে কিছুটা তারতম্য থাকা স্বাভাবিক, কারণ "বৃহত্তম" শব্দটি মজুত কয়লার পরিমাণ, খনির আয়তন, নাকি সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষমতা — কোন মাপকাঠিতে বিচার করা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন উত্তর আসতে পারে। তবে যে বিষয়ে সবাই একমত, তা হলো এই কয়লাক্ষেত্র বীরভূম কয়লা অঞ্চলের একটি অংশ এবং এর মজুত ভাণ্ডারের পরিমাণ সত্যিই বিশাল, যা রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রকল্পের সূচনা: বেসাল্ট উত্তোলন থেকে শুরু
২০২৩ সালের বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিটে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেউচা-পাচামি ব্লকে খননকাজের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন। যেহেতু কয়লা উত্তোলনের আগে ওপরের বিশাল ব্যাসল্ট স্তর অপসারণ করা প্রয়োজন, তাই প্রথম পর্যায়ে চিহ্নিত জমি থেকে এই আগ্নেয় শিলা উত্তোলনের কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে। এই ব্যাসল্ট পাথর নির্মাণ শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় — রাস্তা নির্মাণ, কংক্রিটের উপকরণ এবং অন্যান্য নির্মাণকাজে এই পাথরের চাহিদা সারা দেশজুড়ে রয়েছে। আমার নিজের এলাকায় প্রত্যক্ষ করা অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, এই পাথর উত্তোলন ও সরবরাহ ইতিমধ্যেই একটি সক্রিয় বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে, এবং এখান থেকে উত্তোলিত পাথর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্যাসল্ট উত্তোলনের জন্য নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যেখানে একটি আয়-ভাগাভাগি পদ্ধতিতে নির্বাচিত সংস্থার সাথে চুক্তি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
জমি অধিগ্রহণ: প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক
এই বিশাল প্রকল্পের জন্য মোট প্রায় ৩,৪০০ একর জমির প্রয়োজন, যার মধ্যে প্রায় ১,০০০ একর সরকারি জমি এবং বাকি অংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি, যা অধিগ্রহণ করতে হচ্ছে। এই এলাকায় প্রায় একুশ হাজারেরও বেশি মানুষের বসবাস, যাদের একটি বড় অংশ আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত। সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল যে এই প্রকল্পে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে, যার মধ্যে দশ হাজার কোটি টাকা পুনর্বাসন প্যাকেজের জন্য বরাদ্দ থাকার কথা, এবং জমির মূল্য, ক্ষতিপূরণ ও চাকরির প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
তবে আমার নিজের এলাকা ময়ূরেশ্বর ১ ব্লকের প্রতিবেশী মহম্মদবাজার ব্লকে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করে যা লক্ষ করেছি, তা হলো এই প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে এক উল্লেখযোগ্য ফারাক। যাঁরা প্রকৃতপক্ষে নিজেদের জমি হারিয়েছেন, তাঁদের একটি বড় অংশ এখনও প্রতিশ্রুত সরকারি চাকরি পাননি। প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশগ্রহণকারী স্থানীয় মানুষদের কাছ থেকে যা জানা যায়, তা হলো কিছু ক্ষেত্রে অন্য জেলার মানুষ ঘুষের বিনিময়ে এই চাকরির সুযোগ নিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যদিও এই ধরনের অভিযোগের সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক প্রমাণ যাচাই করা কঠিন এবং এগুলো মূলত স্থানীয় জনশ্রুতি ও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রচলিত।
আদিবাসী প্রতিরোধ: জল-জঙ্গল-জমির লড়াই
দেউচা-পাচামি প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিরোধ আন্দোলন এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। "জল, জঙ্গল, জমির অধিকার ছাড়ব না" — এই স্লোগান নিয়ে বহু আদিবাসী পরিবার তাঁদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছাড়তে অস্বীকার করেছেন। ২০২৩ সালে স্থানীয় আদিবাসীরা রাজভবন অভিযানের মতো বড় আকারের প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করেছেন, যেখানে তাঁরা রাজ্যপালের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁদের দাবিপত্র পেশ করেন। তাঁদের মূল উদ্বেগ শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিয়ে নয়, বরং এই খোলামুখ কয়লা খনি প্রকল্পের ফলে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়া এবং তাঁদের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে।
পরিবেশগত উদ্বেগ: শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়
দেউচা-পাচামি প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ রয়েছে। একটি সম্পূর্ণ খোলামুখ কয়লাখনি প্রকল্প হিসেবে এটি বাস্তবায়িত হলে তা সবচেয়ে বেশি দূষণ সৃষ্টিকারী খনন পদ্ধতিগুলোর একটি হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া বিশেষজ্ঞদের একাংশ সতর্ক করেছেন যে ব্যাসল্ট স্তর অপসারণের ফলে ভূগর্ভস্থ জলস্তরের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে, কারণ এই পুরু আগ্নেয় শিলার স্তর একধরনের প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবেও কাজ করে থাকতে পারে। একই সাথে, বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার হ্রাসের প্রবণতার প্রেক্ষাপটে একটি সম্পূর্ণ নতুন বৃহৎ কয়লাখনি প্রকল্প শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েও পরিবেশবিদদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৬ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন: প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায়
দেউচা-পাচামি প্রকল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও একদম সাম্প্রতিক পরিবর্তনটি হলো, ২০২৬ সালে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। যে প্রকল্পকে পূর্ববর্তী রাজ্য সরকার তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পায়ন উদ্যোগ হিসেবে প্রচার করেছিল, ২০২৬ সালের রাজ্য বাজেটে নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী এই প্রকল্প সম্পর্কে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। এই নীরবতা প্রকল্পের সাথে যুক্ত মানুষদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও একই বাজেটে বীরভূম জেলার জন্য অন্যান্য একাধিক উন্নয়নমূলক ঘোষণা করা হয়েছে — যেমন সিউড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালকে মেডিকেল কলেজে উন্নীত করা এবং ময়ূরাক্ষী নদীর ওপর তিলপাড়া ব্যারাজে নতুন সেতু নির্মাণ — কিন্তু দেউচা-পাচামি নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত জমিহারা মানুষদের মধ্যে হতাশা আরও গভীর করেছে।
আমার নিজের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যাঁরা এখনও প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি, তাঁরা নিয়মিতভাবে স্থানীয় প্রশাসন ও জেলাশাসকের দপ্তরে যোগাযোগ করে চলেছেন, কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান এখনও পাওয়া যায়নি। নতুন সরকারের প্রতি যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই ধোঁয়াশায় পরিণত হয়েছে, এবং ভবিষ্যতে এই প্রকল্পের প্রকৃত রূপরেখা কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে স্থানীয় মানুষদের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
দুর্নীতির অভিযোগ: প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন
এই প্রকল্পকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগও সামনে এসেছে, যেখানে অভিযোগ উঠেছে যে প্রকৃত খনি উন্নয়নের বদলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। আদালতে দায়ের হওয়া একটি মামলায় এই বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবিও উঠেছে। এই ধরনের অভিযোগ, তা যতটাই প্রমাণিত বা অপ্রমাণিত হোক না কেন, স্থানীয় মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যেই বিদ্যমান অবিশ্বাসকে আরও গভীর করে তোলে, বিশেষত যেখানে প্রকৃত জমিহারা মানুষরাই এখনও প্রতিশ্রুত সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
উপসংহার: বিজ্ঞান, উন্নয়ন ও মানুষের বাস্তবতার সংঘাত
দেউচা-পাচামির গল্প একদিকে একটি চিত্তাকর্ষক ভূতাত্ত্বিক বিস্ময়ের কাহিনি — কয়েকশো মিটার পুরু আগ্নেয় শিলার নিচে লুকিয়ে থাকা বিপুল কয়লা-ভাণ্ডার, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই একই গল্পের অন্য দিকে রয়েছে হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার বাস্তবতা, যাঁরা প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যেকার ফারাকে দিনের পর দিন সংগ্রাম করে চলেছেন। আমার নিজের এলাকার এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে যা স্পষ্ট হয়, তা হলো, যে কোনো বৃহৎ প্রাকৃতিক সম্পদ-নির্ভর প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য শুধু বৈজ্ঞানিক বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে সেই প্রকল্পের সাথে যুক্ত মানুষদের প্রতি প্রতিশ্রুতি কতটা সততার সাথে পালিত হচ্ছে, তার ওপরেও। যতদিন না এই ফারাক দূর হবে, ততদিন দেউচা-পাচামি শুধু একটি ভূতাত্ত্বিক সম্পদ নয়, বরং এক অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতির প্রতীক হয়েই থেকে যাবে।
No comments:
Post a Comment