Breaking

Tuesday, July 21, 2026

বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের এমন কিছু অজানা বীর, যাদের সম্পর্কে খুব কম লেখা হয়েছে।

বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের অজানা বীর: ইতিহাসের আড়ালে থাকা কিছু নাম

ক্ষুদিরাম বসু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, সূর্য সেন কিংবা মাতঙ্গিনী হাজরার নাম আমরা সবাই জানি। ইতিহাসের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে সিনেমা-সাহিত্য, সব জায়গাতেই এই নামগুলো বারবার ফিরে এসেছে। কিন্তু বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস শুধু এই কয়েকজনের গল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। শত শত মানুষ, বিশেষত অল্পবয়সী কিশোরী, নিভৃতচারী গবেষক, বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ কর্মী — যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, অথচ ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নাম রয়ে গেছে শুধু একটি পাদটীকা হয়ে। পুরনো আর্কাইভ, স্মৃতিকথা ও ঐতিহাসিক নথিপত্র ঘেঁটে এই আর্টিকেলে আমরা তুলে আনার চেষ্টা করেছি এমন কিছু নাম, যাঁদের সম্পর্কে খুব কম লেখা হয়েছে, কিন্তু যাঁদের অবদান কোনো অংশে কম নয়।

শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী: কিশোরী বিপ্লবীদের ইতিহাস

বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে বিস্ময়কর অথচ কম আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো কুমিল্লার দুই স্কুলছাত্রী শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরীর কাহিনি। ১৯৩১ সালে এই দুই কিশোরী, যাঁদের বয়স তখন মাত্র চোদ্দ-পনেরো বছর, কুমিল্লার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস স্টিভেন্সকে গুলি করে হত্যা করেন। যুগান্তর দলের সদস্য এই দুই ছাত্রী তাঁদের স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার শংসাপত্র নিতে যাওয়ার অজুহাতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পৌঁছান এবং সেখানেই এই সাহসী অভিযান সম্পন্ন করেন।

এই ঘটনার পর তাঁরা ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের সাজাপ্রাপ্ত নারী হিসেবে চিহ্নিত হন। এত অল্প বয়সে এই ধরনের সাহসিকতা দেখানো সত্ত্বেও, আজকের প্রজন্মের অনেকেই এই দুই কিশোরীর নাম জানেন না। বাংলার নারী বিপ্লবীদের ইতিহাসে প্রীতিলতা বা বীণা দাসের নাম যতটা আলোচিত হয়েছে, শান্তি ও সুনীতির অবদান ততটা প্রচার পায়নি।

হেমচন্দ্র কানুনগো: বিপ্লবী বোমা প্রযুক্তির জনক

আলিপুর বোমা মামলার নাম আমরা অনেকেই জানি, কিন্তু এই মামলার পেছনে যে মানুষটির প্রযুক্তিগত অবদান সবচেয়ে বেশি, তাঁর নাম বেশিরভাগ মানুষের কাছে অপরিচিত। হেমচন্দ্র কানুনগো ১৯০৭ সালে গোপনে প্যারিসে যান রাশিয়ান বিপ্লবীদের কাছ থেকে বোমা তৈরির প্রযুক্তি শিখতে। ফিরে এসে তিনি কলকাতার মানিকতলায় একটি গোপন কারখানা স্থাপন করেন, যেখানে বিপ্লবী কার্যকলাপের জন্য বোমা তৈরি করা হতো। এই কারখানাই পরবর্তীতে বিখ্যাত আলিপুর বোমা মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

গ্রেফতারের পর হেমচন্দ্রকে আন্দামানের সেলুলার জেলে নির্বাসিত করা হয়। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি রাজনৈতিক জীবন থেকে অনেকটাই সরে আসেন এবং নিজের স্মৃতিকথা লেখায় মনোনিবেশ করেন, যা পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের জন্য এক অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল হয়ে ওঠে। তাঁর লেখা থেকেই আমরা জানতে পারি কীভাবে বাংলার বিপ্লবী আন্দোলন আন্তর্জাতিক বিপ্লবী চিন্তাধারার সাথে যুক্ত হয়েছিল। অথচ প্রযুক্তিগত ও বৌদ্ধিক এই অবদানের জন্য হেমচন্দ্র কানুনগো ইতিহাসে যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল, ততটা পাননি।

কানাইলাল দত্ত ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু: জেলের ভেতরের এক ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান

আলিপুর বোমা মামলার আরেকটি কম আলোচিত কিন্তু নাটকীয় অধ্যায় জড়িয়ে আছে কানাইলাল দত্ত ও সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামের সাথে। মামলার তদন্তে সরকারপক্ষের সাক্ষী হয়ে যাওয়া নরেন্দ্রনাথ গোঁসাই বিপ্লবী দলের অনেক গোপন তথ্য পুলিশের কাছে ফাঁস করে দিয়েছিলেন, যা দলের বহু সদস্যের জীবন বিপন্ন করে তুলেছিল। এই পরিস্থিতিতে কানাইলাল দত্ত ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু এক অসাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা করেন — জেলের ভেতরেই এই সাক্ষীকে হত্যা করার।

জেলের কড়া নিরাপত্তা সত্ত্বেও তাঁরা এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করেন, যদিও এর ফলস্বরূপ তাঁদের নিজেদেরও জীবন দিতে হয়েছিল। এই ঘটনা সেই সময় বিপ্লবী আন্দোলনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং প্রমাণ করেছিল যে বিপ্লবীদের সংকল্প শুধু বাইরের জগতেই নয়, জেলের অভ্যন্তরেও অটুট ছিল। তবে আজকের প্রজন্মের কাছে এই দুই তরুণের আত্মত্যাগের কাহিনি প্রায় বিস্মৃত।

উল্লাসকর দত্ত: বোমা বিশেষজ্ঞ যাঁর মানসিক স্বাস্থ্য ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল

অনুশীলন সমিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য উল্লাসকর দত্ত ছিলেন আলিপুর বোমা মামলার প্রধান কারিগরদের একজন। তাঁর হাতেই তৈরি হয়েছিল সেই বোমা, যা দিয়ে বিপ্লবীরা তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বিচারে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হলেও পরে তা যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরে রূপান্তরিত হয় এবং তাঁকে আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলে পাঠানো হয়।

সেলুলার জেলে তাঁর ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তার ফলে তিনি সাময়িকভাবে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। বহু বছর পর মুক্তি পেয়ে তিনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার চেষ্টা করেন। উল্লাসকর দত্তের এই কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল্য শুধু শহীদদের রক্তেই নয়, বরং যাঁরা বেঁচে থেকেও সারাজীবন সেই নির্যাতনের ক্ষত বহন করেছেন, তাঁদের নীরব যন্ত্রণাতেও লেখা আছে।

তারকেশ্বর দস্তিদার: সূর্য সেনের ছায়ায় ঢাকা পড়া এক নাম

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনা বললেই আমাদের মনে আসে মাস্টারদা সূর্য সেনের নাম। কিন্তু এই ঐতিহাসিক অভিযানের সাথে যুক্ত ছিলেন আরও অনেক তরুণ, যাঁদের মধ্যে তারকেশ্বর দস্তিদার অন্যতম। ১৯৩০ সালের এই অভিযানে সক্রিয় অংশগ্রহণের পর তিনি দীর্ঘদিন গোপনে আত্মগোপন করে থাকেন এবং পরবর্তীতে গ্রেফতার হন।

বিচারে তাঁর ফাঁসির আদেশ হয় এবং আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। সূর্য সেনের নেতৃত্বের ছায়ায় তারকেশ্বরের মতো বহু তরুণের ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের কাহিনি চাপা পড়ে গেছে। অথচ চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সাফল্যের পেছনে এই তরুণদের সাংগঠনিক দক্ষতা ও সাহসিকতার ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

কমলা দাশগুপ্ত: যিনি অন্যদের ইতিহাস লিখে গেছেন, নিজের ইতিহাস রয়ে গেছে অগোচরে

বাংলার নারী বিপ্লবীদের মধ্যে কমলা দাশগুপ্তের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ তিনি শুধু নিজে বিপ্লবী কার্যকলাপে যুক্ত ছিলেন না, বরং পরবর্তীতে বাংলার নারী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ইতিহাস সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যুগান্তর দলের সাথে যুক্ত থেকে তিনি বিভিন্ন গোপন কার্যকলাপে অংশ নেন এবং ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন。

মুক্তি পাওয়ার পর কমলা দাশগুপ্ত তাঁর অভিজ্ঞতা এবং সমসাময়িক অন্যান্য নারী বিপ্লবীদের কাহিনি নথিবদ্ধ করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর লেখা স্মৃতিকথা ও গবেষণাগ্রন্থ আজ ইতিহাসবিদদের কাছে বাংলার নারী বিপ্লবীদের সম্পর্কে তথ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অথচ যিনি অন্যদের ইতিহাস বাঁচিয়ে রাখলেন, তাঁর নিজের নামটাই আজ অনেকাংশে বিস্মৃত।

কেন এই নামগুলো ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায়

এই প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে — কেন এত সাহসী মানুষের নাম ইতিহাসের মূলধারা থেকে হারিয়ে যায়? এর পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জাতীয় ইতিহাস রচনায় মূলত কংগ্রেস ও গান্ধীবাদী আন্দোলনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, ফলে সশস্ত্র বিপ্লবী ধারার অনেক কর্মীর অবদান তুলনামূলক কম আলোচিত থেকে গেছে। দ্বিতীয়ত, নারী বিপ্লবীদের ক্ষেত্রে সামাজিক কাঠামোর কারণে তাঁদের অবদান নথিবদ্ধ করার প্রবণতা কম ছিল। তৃতীয়ত, যাঁরা কারাবাসের পর সাধারণ জীবনে ফিরে গিয়েছিলেন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে যাননি, তাঁদের নাম ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। চতুর্থত, স্থানীয় ভাষায় লেখা অনেক স্মৃতিকথা ও নথি সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে বা এখনও ব্যাপক পাঠকের কাছে পৌঁছায়নি।

এই ইতিহাস মনে রাখা কেন জরুরি

শুধু কয়েকজন সুপরিচিত নেতার নামেই স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস সীমাবদ্ধ করে ফেললে আমরা এক বিশাল ঐতিহাসিক সত্য থেকে বঞ্চিত হই — যে স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তির অর্জন ছিল না, বরং লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফসল। শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরীর মতো কিশোরী, হেমচন্দ্র কানুনগোর মতো নিভৃতচারী প্রযুক্তিবিদ, কিংবা কমলা দাশগুপ্তের মতো ইতিহাস-সংরক্ষণকারী — এঁদের প্রত্যেকের গল্প আমাদের স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য বুঝতে সাহায্য করে।

আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব শুধু পাঠ্যবইয়ে থাকা নামগুলো মুখস্থ করা নয়, বরং আর্কাইভ, স্থানীয় জাদুঘর, পুরনো পত্রপত্রিকা ও পারিবারিক স্মৃতিকথা ঘেঁটে এই বিস্মৃত বীরদের কাহিনি নতুন করে সামনে নিয়ে আসা। কারণ ইতিহাস শুধু কয়েকজন মহানায়কের নয়, বরং প্রতিটি সাধারণ মানুষের সাহসিকতার সম্মিলিত রূপ, যাঁরা নিজেদের নাম-যশের কথা না ভেবেই দেশের জন্য নিজেদের সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলেন।

No comments:

Post a Comment