Breaking

Tuesday, July 21, 2026

কলকাতার ট্রামের ইতিহাস এবং এর ভবিষ্যৎ।

কলকাতার ট্রামের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ: এশিয়ার প্রাচীনতম ট্রাম ব্যবস্থার নতুন অধ্যায়

কলকাতার রাস্তায় ঘণ্টা বাজিয়ে ধীর গতিতে চলা ট্রাম শুধু একটি যানবাহন নয়, এটি শহরের আত্মার একটা অংশ। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক থেকে শুরু করে মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রে বারবার ফিরে এসেছে এই ট্রামের ছবি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস — বাংলা সাহিত্যেও ট্রাম এক পরিচিত চরিত্র। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই ঐতিহ্যবাহী পরিবহন ব্যবস্থা এক অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে, আবার ২০২৬ সালে এসে এক নতুন আশার আলোও দেখা যাচ্ছে। এই আর্টিকেলে আমরা কলকাতার ট্রামের দেড়শো বছরের ইতিহাস, তার পতনের কারণ এবং সাম্প্রতিকতম পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

কলকাতার ট্রামের সূচনা: ১৮৭৩ সালের গল্প

কলকাতায় ট্রাম পরিষেবা প্রথম শুরু হয় ১৮৭৩ সালে, যখন শিয়ালদহ থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত ঘোড়ায় টানা ট্রাম চালু করা হয়। সেই সময় এটি ছিল কলকাতা তথা সমগ্র এশিয়ার মধ্যে অন্যতম প্রথম আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা। প্রাথমিকভাবে এই পরিষেবা তেমন সাফল্য পায়নি এবং কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। তবে ১৮৮০-র দশকে ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি পুনরায় ঘোড়ায় টানা ট্রাম চালু করে, যা ধীরে ধীরে শহরের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

আসল বিপ্লব আসে ১৯০২ সালে, যখন কলকাতার ট্রাম ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুতায়িত করা হয়। এটি ছিল এশিয়ার মধ্যে প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম পরিষেবা, যা কলকাতাকে আধুনিক নগর পরিবহনের ক্ষেত্রে একটি অগ্রণী শহরে পরিণত করে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ট্রাম নেটওয়ার্ক দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকে এবং কলকাতার অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়。

স্বর্ণযুগ: যখন ৩৪০-এর বেশি ট্রাম চলত

কলকাতার ট্রাম ব্যবস্থার স্বর্ণযুগে শহরজুড়ে ৩০টিরও বেশি রুটে ৩৪০টির অধিক ট্রাম চলাচল করত। শিয়ালদহ, হাওড়া, গড়িয়াহাট, টালিগঞ্জ, বেলগাছিয়া — শহরের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ট্রাম নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত ছিল। সেই সময় ট্রাম ছিল সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে সস্তা ও নির্ভরযোগ্য যাতায়াতের মাধ্যম। ছাত্রছাত্রী, অফিসযাত্রী, ব্যবসায়ী — সব শ্রেণির মানুষই নিয়মিত ট্রামে যাতায়াত করতেন।

এই সময়ে ট্রাম শুধু পরিবহনের মাধ্যম ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল সামাজিক মেলামেশার একটা জায়গাও। ট্রামের জানালা দিয়ে শহরের দৈনন্দিন জীবন, রাস্তার বইয়ের দোকান, উপনিবেশিক আমলের স্থাপত্য দেখতে দেখতে যাত্রা করা কলকাতাবাসীর কাছে ছিল এক বিশেষ অভিজ্ঞতা。

পতনের সূত্রপাত: কেন কমতে থাকল ট্রামের সংখ্যা

স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকগুলোতে ধীরে ধীরে কলকাতার ট্রাম নেটওয়ার্ক সংকুচিত হতে শুরু করে। এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে:

  • যানজট সমস্যা: শহরের রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ট্রামের ধীর গতি ক্রমশ যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ ট্রাম লাইন পরিবর্তন করতে পারে না এবং নির্দিষ্ট ট্র্যাকে আটকে থাকে
  • অবকাঠামোগত অবহেলা: নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও বিনিয়োগের অভাবে ট্রাম লাইন ও কোচগুলো ক্রমশ জীর্ণ হয়ে পড়ে
  • মেট্রো ও বাস নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ: দ্রুতগামী মেট্রো এবং নমনীয় বাস পরিষেবা চালু হওয়ায় যাত্রীরা ধীরে ধীরে ট্রামের প্রতি আগ্রহ হারাতে থাকেন
  • আর্থিক ক্ষতি: পশ্চিমবঙ্গ পরিবহন নিগমের (WBTC) অধীনে ট্রাম পরিষেবা ক্রমাগত লোকসানে চলতে থাকে, যা রাজ্য সরকারের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করে
  • ডিপো বিক্রি: টালিগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রাম ডিপো আবাসন প্রকল্পের জন্য বিক্রি করে দেওয়া হয়, যা নেটওয়ার্ক সংকোচনের একটি বড় কারণ

২০২৪ সালের মধ্যে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে রাজ্য সরকার ঘোষণা করে, শুধুমাত্র এসপ্ল্যানেড থেকে ময়দান পর্যন্ত একটি হেরিটেজ রুট রেখে বাকি সব ট্রাম পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হবে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে দেখা যায়, ৩৪০টির বেশি ট্রামের জায়গায় মাত্র সাত-আটটি ট্রাম দুটি রুটে চলাচল করছে — এসপ্ল্যানেড-শ্যামবাজার এবং এসপ্ল্যানেড-গড়িয়াহাট。

আইনি লড়াই: ঐতিহ্য রক্ষার সংগ্রাম

সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কলকাতার নাগরিক সমাজ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণকারী সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশন (CTUA)-সহ বিভিন্ন সংগঠন আদালতের দ্বারস্থ হয়, যুক্তি দেখিয়ে যে ট্রাম শুধু একটি ঐতিহ্য নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের একটি বাস্তবসম্মত সমাধান। শ্যামবাজার ট্রাম ডিপোতে নাগরিকদের প্রতিবাদ সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়। CTUA-র সাধারণ সম্পাদক মহাদেব শী-র ভাষায়, ট্রাম কোনো জাদুঘরের বস্তু নয়, বরং কলকাতার পরিবেশ ও যানজট সমস্যার একটি বাস্তব সমাধান। এই আইনি লড়াই দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং ট্রামপ্রেমী নাগরিকদের কাছে এটি ছিল শুধু একটি যানবাহন বাঁচানোর লড়াই নয়, বরং শহরের আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াই。

২০২৬ সালের নতুন মোড়: পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা

দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী অর্জুন সিং সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন এক উচ্চাভিলাষী ট্রাম পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা, যা কলকাতার পরিবহন ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। এই পরিকল্পনার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • আধুনিক ট্র্যাম আমদানি: পুরনো, ধীরগতির কোচের বদলে ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার আদলে হালকা ওজনের, জ্বালানি-সাশ্রয়ী নতুন প্রজন্মের ট্রাম আমদানি করা হবে
  • ব্যাটারি-চালিত ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রাম: নতুন ট্রামগুলো হবে ব্যাটারি-চালিত এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, যা আন্তর্জাতিক মানের যাত্রী অভিজ্ঞতা প্রদান করবে
  • রুট সম্প্রসারণ: বর্তমান দুটি রুট থেকে বাড়িয়ে ৭০টি পর্যন্ত কার্যকরী রুট পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে
  • নতুন তীর্থ-সংযোগকারী রুট: দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও কালীঘাট কালীমন্দিরের মধ্যে সংযোগকারী একটি নতুন রুট তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা ধর্মীয় পর্যটনকে উৎসাহিত করবে
  • নতুন এলাকায় সম্প্রসারণ: রাজারহাট-নিউটাউন এবং সল্টলেকের মতো নতুন উন্নয়নশীল এলাকাতেও ট্রাম পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে
  • রাস্তার বাম পাশে ট্র্যাক স্থাপন: আগের তুলনায় ভিন্নভাবে, নতুন ট্রাম লাইনগুলো রাস্তার বাম পাশে বসানো হবে, যাতে অন্যান্য যানবাহনের সাথে সংঘর্ষের সম্ভাবনা কমে

এছাড়া কলেজ স্ট্রিটকে অক্সফোর্ড স্ট্রিটের আদলে একটি যানবাহনমুক্ত অঞ্চলে রূপান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে শুধু ট্রাম, ব্যাটারিচালিত গাড়ি ও সাইকেল চলাচল করতে পারবে। রেল মন্ত্রকের অধীনস্থ সংস্থা RITES-কে নতুন ট্রাম রুট সমীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এসপ্ল্যানেড-খিদিরপুর রুটটিকে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও মনোরম সবুজ পরিবেশের কারণে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

অর্থনৈতিক মডেল: কীভাবে টেকসই হবে এই পরিকল্পনা

আগের ব্যর্থতার একটি বড় কারণ ছিল আর্থিক অস্থিতিশীলতা। এবার সরকার একটি ভিন্ন কৌশল নিয়েছে — সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (Public-Private Partnership) মডেলের মাধ্যমে ট্রাম পরিষেবাকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করে তোলা। এই মডেলের আওতায় বেসরকারি সংস্থাগুলো ট্রাম কোচ ও ডিপোতে বিজ্ঞাপনের অধিকার পেতে পারে, যার বিনিময়ে তারা সরকারকে নির্দিষ্ট অর্থ প্রদান করবে। এই আয় ট্রাম নেটওয়ার্কের রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সরকার ট্রামকে শুধু ঐতি্যের প্রতীক হিসেবে নয়, বরং কলকাতার ভবিষ্যৎ পরিবহন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরছে, একে "শহরের আদি বৈদ্যুতিক যান" বলেও অভিহিত করা হয়েছে, যার স্বল্প কার্বন নিঃসরণ এবং বিপুল যাত্রী বহনের ক্ষমতা রয়েছে।

ট্রামের সামাজিক গুরুত্ব: কেন এটি শুধু নস্টালজিয়া নয়

ট্রাম বিশেষভাবে প্রবীণ নাগরিক ও নিত্যযাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর ভাড়া অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং ওঠানামা তুলনামূলক সহজ। ২৩ বছর বয়সী সাংবাদিকতার ছাত্র দীপ দাসের মতো তরুণ প্রজন্মের অনেকেই ট্রামকে নিজের শহরের পরিচয়ের অংশ বলে মনে করেন। অন্যদিকে বহু বছর ধরে ট্রাম চালানো কন্ডাক্টরদের কাছে এটি শুধু জীবিকা নয়, জীবনেরই একটা অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশগত দিক থেকেও ট্রামের গুরুত্ব অপরিসীম — এটি শূন্য নির্গমনের যান হওয়ায় কলকাতার বায়ু দূষণ সমস্যা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চ্যালেঞ্জ ও সংশয়ের জায়গা

তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে চ্যালেঞ্জও কম নয়। অতীতেও একাধিকবার ট্রাম পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৩ সালে একবার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রাম চালু হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান পরিকল্পনায় বিদেশ থেকে ট্রাম আমদানি, নতুন লাইন স্থাপন এবং রুট সমীক্ষা সম্পন্ন করতে যথেষ্ট সময় ও অর্থের প্রয়োজন হবে। এছাড়া রাস্তার স্থান বণ্টন নিয়ে অন্যান্য যানবাহনের সাথে সমন্বয় সাধনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হওয়া পর্যন্ত সতর্ক আশাবাদই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত অবস্থান।

উপসংহার: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

কলকাতার ট্রাম শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়, এটি শহরের দেড়শো বছরের ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। ঘোড়ায় টানা ট্রাম থেকে শুরু করে বিদ্যুতায়িত ব্যবস্থা, তারপর ধীরে ধীরে অবহেলা ও সংকোচনের মধ্য দিয়ে গিয়ে আজ যখন এই ব্যবস্থা এক নতুন পুনরুজ্জীবনের স্বপ্ন দেখছে, তখন এটা স্পষ্ট যে ট্রাম শুধু নস্টালজিয়ার বিষয় নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের টেকসই নগর পরিবহনের একটি বাস্তবসম্মত মডেলও হতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যবাহী পরিচয়ের এই মেলবন্ধন যদি সফল হয়, তাহলে কলকাতার ট্রাম শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং শহরের ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।

No comments:

Post a Comment