দীর্ঘদিন ধরে যে প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছিল, তার উত্তর অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে উঠে এল। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) নিয়ে ২০২৬ সালের ২৫ আগস্ট প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চে যে তথ্য পেশ করা হয়েছে, তা রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে।
সিনিয়র আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন আদালতে জানান, আপিল ট্রাইব্যুনালগুলিতে বর্তমানে মোট ৩৮ লক্ষ ১০ হাজার আপিল জমা পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩১ লক্ষ অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশ আপিলই দায়ের হয়েছে কাউকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিরুদ্ধে। বাকি মাত্র ৭ লক্ষ আপিল করেছেন তাঁরা, যাঁদের নাম SIR প্রক্রিয়ায় বাদ পড়েছে এবং যাঁরা পুনরায় তালিকায় ফিরতে চাইছেন।
এই তথ্যের উৎস একটি RTI জবাব, যা সংসদ সদস্য ইশা খান চৌধুরীকে দেওয়া হয়েছিল। শঙ্করনারায়ণন আদালতে এই তথ্যকে "উদ্বেগজনক" বলে বর্ণনা করে বলেন, এই পরিসংখ্যান নির্বাচন কমিশনের নিজেরই আদালতে জমা দেওয়া উচিত ছিল, অথচ তা প্রকাশ পেল একজন সাংসদের RTI আবেদনের মাধ্যমে।
যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের আপিলে সাফল্যের হার প্রায় ৯০ শতাংশ
আদালতে আরও জানানো হয়, এখনও পর্যন্ত প্রায় ৮৩ হাজার আপিলের নিষ্পত্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৭৫ হাজার ৪৪৩টি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ফের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ যাঁরা বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আপিল করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে সাফল্যের হার প্রায় ৯০ শতাংশ। জলপাইগুড়ির উদাহরণ টেনে জানানো হয়, সেখানে ৬৬৫টি ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ এসেছে, বাদ পড়েনি একটিও।
শঙ্করনারায়ণনের যুক্তি ছিল, ট্রাইব্যুনাল তৈরি না হলে এই লক্ষাধিক মানুষ ভোটাধিকার হারাতেন। তিনি আদালতের কাছে অনুরোধ করেন, যাঁরা বাদ পড়েছেন তাঁদের ৭ লক্ষ আপিলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হোক, কারণ ডিসেম্বরে কলকাতা ও হাওড়া পুরনিগম নির্বাচন রয়েছে। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এই তথ্য শুনে মন্তব্য করেন, বাদ দেওয়ার আবেদনের সংখ্যা এত বেশি হওয়াটা "উদ্বেগজনক", কারণ এটাই সেই কমিশন যাকে ভরসা করতে হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ: নির্বাচন কমিশনকে হিসাব দিতে হবে
এই শুনানির পর বেঞ্চ নির্বাচন কমিশনকে হলফনামা জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে, যেখানে স্পষ্ট করে জানাতে হবে—
- ট্রাইব্যুনালে মোট কত আপিল বিচারাধীন
- তার মধ্যে কতগুলি বাদ পড়াদের এবং কতগুলি অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে দায়ের হয়েছে
- এখনও পর্যন্ত কতগুলির নিষ্পত্তি হয়েছে এবং কী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
- নিষ্পত্তির পর ভোটার তালিকা কীভাবে হালনাগাদ করা হচ্ছে
নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী দামা শেষাদ্রি নাইডু আদালতকে জানান, কমিশন সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য আদালতকে জানানো হবে। RTI-এর জবাবে উল্লিখিত পরিসংখ্যান নিয়েও নির্দেশনা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে তাঁকে।
তৃণমূলের দাবি: ৩১টি কেন্দ্রে জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি ভোট বাদ
একই শুনানিতে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতকে জানান, রাজ্যের ৩১টি বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির কাছে তৃণমূলের হারের ব্যবধানের চেয়ে সেই কেন্দ্রে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বেশি। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, একটি কেন্দ্রে (AC-145) হারের ব্যবধান ছিল মাত্র ৪০১ ভোট, অথচ সেখানে বাদ পড়েছে ৮৭৮৫টি নাম। মুর্শিদাবাদের একটি কেন্দ্রে হার হয়েছে ১৫ হাজার ভোটে, আর সেখানে বাদ পড়েছে ২৭ হাজার নাম।
এই তথ্য শুনে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত প্রশ্ন তোলেন, আদালত কি এই ভিত্তিতে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দিতে পারে? বিচারপতি বাগচী বলেন, বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে কতজন প্রকৃতপক্ষে আপিল করেছেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—কারণ কেউ যদি বাদ পড়া মেনে নেন, তাহলে বিষয়টি নিছক তাত্ত্বিক থেকে যায়। তৃণমূলের আইনজীবী জানান, কেন্দ্রভিত্তিক তথ্য নির্বাচন কমিশন প্রকাশ্যে দিচ্ছে না বলেই সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন হচ্ছে। আদালত অবশ্য জানিয়ে দিয়েছে, শুধু এই ৩১টি কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ না থেকে গোটা বিচারাধীন আপিলের দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়টিই তারা খতিয়ে দেখবে।
প্রেক্ষাপট: SIR প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল কীভাবে
এই বিতর্কের শিকড় অনেক গভীরে। ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গে SIR-এর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়। মোট ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজারেরও বেশি ভোটার এই প্রথম পর্যায়ের আওতায় ছিলেন। সেই সময় মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত ও ডুপ্লিকেট ভোটার হিসেবে প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়, এবং প্রায় ৩১ লক্ষ ৩৮ হাজার ভোটারের নাম ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়নি বলে তাঁদের শুনানিতে ডাকা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে ফেব্রুয়ারি মাসে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সময়সীমা বাড়িয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি করা হয়। এপ্রিল মাসে যখন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন ঘনিয়ে আসে (২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট), তখন প্রায় ৬০ লক্ষ নাম বিচারাধীন ছিল, যার মধ্যে প্রায় ৩২ লক্ষ যোগ্য এবং প্রায় ২৭ লক্ষ অযোগ্য বলে চিহ্নিত হয়। মুর্শিদাবাদে সবচেয়ে বেশি প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ নাম বাদ যায়, তারপরেই উত্তর ২৪ পরগনায় প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ।
এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দেয়, যাঁদের আপিল বিচারাধীন, তাঁরা ওই নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। একইসঙ্গে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের জেরে রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশন—উভয়ের নিয়োজিত আধিকারিকদের বদলে ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা থেকে আনা বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের হাতে দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তির দায়িত্ব দেওয়া হয়। মার্চ মাসে ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়, যেগুলির নেতৃত্বে রয়েছেন প্রাক্তন হাইকোর্ট বিচারপতিরা।
ধীরগতির নিষ্পত্তি নিয়ে বারবার উদ্বেগ
কলকাতা হাইকোর্ট এক পর্যায়ে মন্তব্য করেছিল, বর্তমান গতিতে চললে ৩৪ লক্ষ আপিল নিষ্পত্তি করতে প্রায় ২১ বছর লেগে যেতে পারে। জুলাই-আগস্ট মাসে সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার নির্বাচন কমিশনের কাছে নিষ্পত্তির হার সংক্রান্ত তথ্য চেয়েছে। ১১ আগস্টের শুনানিতে বিচারপতি বাগচী স্পষ্ট বলেছিলেন, শুধু আপিল দায়ের হওয়াটাই যথেষ্ট নয়, তার কী পরিণতি হচ্ছে সেটাও দেখা দরকার। প্রসেনজিৎ বসুর দায়ের করা একটি পিটিশনে বলা হয়েছিল, ৩৪ লক্ষ আপিলের মধ্যে তখন পর্যন্ত মাত্র ৩৮ হাজারের শুনানি হয়েছে। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ওঠে, মে মাস থেকে অন্তত তিনটি সরকারি আদেশে বাদ পড়া ব্যক্তিদের সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন কী দাঁড়াল
২৫ আগস্টের শুনানি একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—৩৪ লক্ষের আশেপাশের যে সংখ্যা নিয়ে এতদিন জল্পনা চলছিল, তার সিংহভাগই আসলে অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আপত্তি, বাদ পড়া ব্যক্তিদের নিজস্ব আপিল নয়। আর বাদ পড়াদের আপিলে সাফল্যের হার প্রায় ৯০ শতাংশ হওয়া প্রমাণ করে, ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা তৈরি না হলে বহু বৈধ ভোটার তালিকা থেকে ছিটকে যেতেন।
তবে এখনও পর্যন্ত মাত্র ৮৩ হাজার আপিলের নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৮ লক্ষের মধ্যে—যা মোট আপিলের ২ শতাংশেরও কম। ফলে বাকি লক্ষ লক্ষ মামলার নিষ্পত্তি কবে, কীভাবে হবে, এবং ডিসেম্বরের পুরনিগম নির্বাচনের আগে তা সম্পন্ন হবে কি না, সে প্রশ্ন এখনও খোলা। নির্বাচন কমিশনকে হলফনামা জমা দিতে বলা হয়েছে, ফলে আগামী শুনানিতে আরও স্পষ্ট চিত্র উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই গোটা প্রক্রিয়া রাজনৈতিক দিক থেকেও স্পর্শকাতর। তৃণমূল কংগ্রেস যেমন ভোটার বাদ পড়াকে নির্বাচনী ফলাফলের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছে, তেমনই বিজেপির মতো বিরোধী দল বরাবরই SIR প্রক্রিয়াকে অনুপ্রবেশ ঠেকানোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে সমর্থন করে এসেছে। নির্বাচন কমিশন নিজে বলেছে, প্রতিটি ক্ষেত্র খতিয়ে দেখেই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। দুই পক্ষের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানেই এখন গোটা প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশই ঠিক করে দেবে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকারের ভবিষ্যৎ।

No comments:
Post a Comment