Breaking

Monday, September 14, 2026

গল্পকার বিভূতিভূষণ - সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়




'কল্লোল' যখন সব থেকে কল্লোলিত, যখন সমুদ্রপারের বাতাস এসে প্রায়শ চঞ্চল করে তুলছে প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর বাঙালি মধ্যবিত্তের নাগরিক অচরিতার্থতাকে, যখন কেউ শুনতে পাচ্ছেন প্রবৃত্তির অবিচ্ছেদ্য কারাগারে বন্দির যন্ত্রণার আর্তি, কেউ শুনতে পাচ্ছেন উত্তর মেরুর ডাক, কারো কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে 'কীটের পাখার অস্ফুটতম বেদনা'-র অনুভূতি, যখন পুরোনো শিকল ছিঁড়ে গেছে, শিকড় মনে হচ্ছে হারিয়ে গেছে, যখন একদিকে শ্রীকান্ত এক মফস্সলীয় ভবঘুরে, অপরদিকে, অমিত এক নাগরিক পলাতক একই সমাজ বাস্তবতার দুইপিঠকে ধরিয়ে দিচ্ছে, ঠিক সেইসময়ে বিভূতিভূষণ বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করেছেন শান্ত কিন্তু সুদৃঢ় পদক্ষেপ। নিরভিযোগ, নিরভিমান এবং নিরুদ্বেগ। তিনি একটা তত্ত্ববিশ্ব গড়ে নিয়েই যেন আসরে নামলেন। তাঁর রচনায় জীবনের স্ববিরোধ অপেক্ষা বিস্ময় বড়ো হয়ে দেখা দিল। মৃত্যু মিথ্যা নয়, কিন্তু তার থেকে বড়ো সত্য জীবন। ইন্দির ঠাক্কণের মৃত্যু যেন শুকনো বিবর্ণ হলুদ পাতার ঝরে যাওয়া। তার পাশেই অপু এবং দুর্গার জীবনোল্লাস। দুর্গার মৃত্যু বা ক্ষেন্তির মৃত্যুর কথা তিনি বলেন বটে, কিন্তু প্রবর্ধমান জীবন সেখানে আটকে থাকছে না। যে বিস্ময় বিপুল মহাকাশে ছড়িয়ে রয়েছে, সেই বিস্ময়েরই অংশ রয়েছে বর্ষার সজল বাতাসে, উগ্র ঘেঁটকোল ফুলের গন্ধে। বুধোর মায়ের কৃপণতা সমুদ্র সম্মুখীন হয়ে ভেঙে যায়। যখন বিপন্ন নাগরিকের নানা প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে নানা গল্পে, তখন বিভূতিভূষণ তাঁর সরল চরিত্র-জীবনাচরণের প্যাটার্নে নির্ভুল ভাষায় বুনে দেন মানবিক প্রত্যয়ের এক সদর্থক কথারূপ।


বাইরের গল্প বা ভিতরের গল্প, এ নিয়ে বিভূতিভূষণের বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। তিনি-অন্তত তাঁর গল্পের জগতে ঘুরে বেড়ালে মনে হয়- বিশ্বাস রেখেছিলেন হাট থেকে ফেরা, অথবা এক বাক্স টাকা কুড়িয়ে পাওয়া, গোটা কতক গ্রাম পেরিয়ে পৃথিবী দেখে আসা, পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়া, মেয়েদের শ্রেণি অভিজ্ঞান বিরহিত মেলামেশা, যে-কোনো বিষয়ই গল্পের বিষয় হতে পারে, যদি চরিত্র-বাস্তবতায় খাদ না থেকে যায়। ইচু ফকিরের গল্পটা কিসের গল্প? একি কেবলই ইচুর ফকির হয়ে যাবার গল্প? তা হলে এ গল্পের দাম তত বেশি হত না। এতটুকু গল্পের মধ্যে দেখতে দেখতে ইচু সমগ্র হয়ে ওঠে। তার জীবনের আর্থিক প্যাটার্ন, তার দাম্পত্য জীবন, তার নৈতিক ভিত্তি - সবকিছু পরস্পর সাপেক্ষে সত্য হয়ে উঠেছে। এক ভারতীয় চাষির আবহমান কালের এক আর্কেটাইপ ইচুর ব্যক্তিস্বভাবের সঙ্গে মিলেমিশে এই গল্পটিকে রসের দিকে সমুজ্জ্বল করে তুলেছে। অথচ মুসলমান জীবনের অনুপুঙ্খ বিস্তারের জন্য অনাবশ্যক আগ্রহ গল্পটিকে ভারাক্রান্ত করেনি। ইচুর জীবনে সংকট ছিল, কিন্তু সংশয় ছিল না, ইচুর জীবনে রিক্ততা ছিল, দৈন্য ছিল না। গল্পের টেকনিকও ঠিক এমনই। এই গল্পের কোনো একটি বাক্যের জন্যও বিভূতিভূষণ একবারের জন্যও দ্বিধান্বিত হননি। ইচু, ইচুর সংসার, ধান কাটতে কাটতে অজ্ঞ পথিকের


ওর মধ্যে ঢেলে দিলে। যেন সত্যই ও ভগ্নহৃদয় প্রৌঢ় রাজা শিখিধ্বজ, অবিশ্বাসিনী মধুছন্দা ওকে উপেক্ষা করে তার তরুণ প্রেমিকের সঙ্গে হাত-ধরাধরি করে চলে গেল!' হা-হা করে তার উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে যাওয়া যেন কালের দ্বারা পরিহৃত যদু হাজরারই ছুটে যাওয়া। ইউরোপীয় সাহিত্যে এই বিষয় নিয়ে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে গল্প আছে। সে তুলনাতেও এবং এককভাবে ভারতীয় সাহিত্যে এ গল্পের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।


তাঁর অনেকগুলি গল্পের প্রধান চরিত্র গ্রামীণ বেকার। কৃষিভিত্তিক আর্থ সম্পর্কের ভিতর দিয়ে তাঁর অনেক গল্পের চরিত্র যেন জীবনের অনেক প্রতিবাদকে স্পষ্ট করে তোলে। বারিক অপেরা পার্টির কথা এখানে অনেকের মনে পড়বে। এ প্রসঙ্গে অবশ্যই তাঁর বুড়োবুড়িরা যেন ধরিয়ে দেয় পারিবারিক সম্পর্কের অন্তঃসারশূন্যতা। এরা কেউ কেউ যেন প্রেমেন্দ্রের বেনামীবন্দরে বিবর্জিত ভাঙা জাহাজ। আজ তাদের কোনো দাম নেই। 'ঝগড়া' অথবা 'দাদু' অথবা 'উল্টোরথ' এমনকী বড়োদিদিমার সাদামাঠা গল্পও নিঃশেষিত সম্পর্ক বৃদ্ধ-বৃদ্ধার করুণ পরিণামের গল্প। এখানেও বলবার কথাটি এই যে, সময় আমাদের ফেলে রেখে এগিয়ে যায়। সম্পর্কের সুতোগুলো শুকিয়ে যায়। এ কথাটিও সঙ্গে সঙ্গে বলার কথা যে বিভূতিভূষণের গ্রামপটে প্রায়ই এমন সব চরিত্র দেখা দেয় যারা আমাদের ওয়ার্ডস্ট্রয়ার্থীয় প্রকৃতিপটে আঁকা অতি সাধারণ মানুষের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। এইসব গল্পের মধ্যে একটু আলাদা গল্প 'বরো বাগদিনী'। দুর্জয় সাহসিকতা আর দুঃসহ দারিদ্র্যের সহাবস্থানেও বঞ্চিত হয়েছে অপরাজেয় জীবন। সমাজ এবং ব্যক্তির নির্মম বৈপরীত্যের গল্প 'কবি কুণ্ডু মশায়'। মানুষ তার স্বপ্নকে বিসর্জন দেয় না। দোকান কর্মচারী জীবনের বিবর্ণ অস্তিত্ব মুছে ফেলতে পারে না কুণ্ডু মশায়ের শিল্পের স্বপ্ন। একটা ব্যাপার লক্ষ না করে থাকা যায় না। রবীন্দ্রনাথ তো বটেই অন্য লেখকদের সঙ্গেও তুলনায় আনুপাতিকভাবে বিভূতিভূষণের গল্পে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। রবীন্দ্রনাথের প্রায় শতাবধি গল্পের কোনোটাতেই বৃদ্ধের হতাশ বিষয়ীভূত হয়নি। পক্ষান্তরে বিভূতিভূষণের গল্পে এটা একটা পুনরাবৃত্ত প্রসঙ্গ। একজন উদীয়মান মধ্যবিত্তের (গ্রামীণ অথবা নাগরিক) সংশয়, সংকট, প্রত্যয় ও চ্যালেঞ্জের গল্প বলেছেন। তিনি বলেছেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সঞ্জাত নানা দ্বন্দু সংঘাতের গল্প। বিভূতিভূষণ যখন গল্প লিখতে বসেছেন, তখন ব্যক্তির ও শ্রেণির সেই উদীয়মান আভা অনেকদিন হল হারিয়ে গেছে। এই হচ্ছে সেইসময়ের শুরু যখন থেকে পূর্ব প্রজন্ম আর চলতি প্রজন্মের কাছে শ্রদ্ধা বা প্রতিবাদ কিছুই আকর্ষণ করতে পারবে না। তারা শুধু ভার, শুধু বোঝা, তারা বর্জনীয়। সুতরাং যুবকের রঙ্গমঞ্চ থেকে নিষ্প্রভ নেপথ্যে নিষ্ক্রান্ত বৃদ্ধেরা বারে বারে বিভূতিভূষণের কাছে হৃতসম্বল মধ্যবিত্তের সব প্রতিশ্রুতির শূন্যতাকে ধরিয়ে দেয় এবং অন্যদিকে বিপরীত কারণে সম্পূর্ণ পৃথক তাৎপর্যে হাজির করেন তিনি তাঁর শিশুচরিত্রগুলিকে যারা সকলে একযোগে জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত হবার জন্য ধাবমান।


শিশু বিভূতিভূষণের কাছে গভীর অভিনিবেশের পাত্র। ছোটো ছেলে-মেয়েরা অনেক সময়ে হয়ে উঠেছে তাঁর সংসারকে মেপে নেবার পাত্র। তাঁর 'তালনবমী' গল্পটি আমার বারবার মনে পড়ে। গরিবের ঘরের অনাদৃত উপেক্ষিত শিশুকে আমাদের ঔদাসীন্য, হয়তো অবজ্ঞা কঠিনভাবে ওর মধ্যে ঢেলে দিলে। যেন সত্যই ও ভগ্নহৃদয় প্রৌঢ় রাজা শিখিধ্বজ, অবিশ্বাসিনী মধুছন্দা ওকে উপেক্ষা করে তার তরুণ প্রেমিকের সঙ্গে হাত-ধরাধরি করে চলে গেল!' হা-হা করে তার উদ্‌ভ্রান্তের মতো ছুটে যাওয়া যেন কালের দ্বারা পরিহৃত যদু হাজরারই ছুটে যাওয়া। ইউরোপীয় সাহিত্যে এই বিষয় নিয়ে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে গল্প আছে। সে তুলনাতেও এবং এককভাবে ভারতীয় সাহিত্যে এ গল্পের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।


তাঁর অনেকগুলি গল্পের প্রধান চরিত্র গ্রামীণ বেকার। কৃষিভিত্তিক আর্থ সম্পর্কের ভিতর দিয়ে তাঁর অনেক গল্পের চরিত্র যেন জীবনের অনেক প্রতিবাদকে স্পষ্ট করে তোলে। বারিক অপেরা পার্টির কথা এখানে অনেকের মনে পড়বে। এ প্রসঙ্গে অবশ্যই তাঁর বুড়োবুড়িরা যেন ধরিয়ে দেয় পারিবারিক সম্পর্কের অন্তঃসারশূন্যতা। এরা কেউ কেউ যেন প্রেমেন্দ্রের বেনামীবন্দরে বিবর্জিত ভাঙা জাহাজ। আজ তাদের কোনো দাম নেই। 'ঝগড়া' অথবা 'দাদু' অথবা 'উল্টোরথ' এমনকী বড়োদিদিমার সাদামাঠা গল্পও নিঃশেষিত সম্পর্ক বৃদ্ধ-বৃদ্ধার করুণ পরিণামের গল্প। এখানেও বলবার কথাটি এই যে, সময় আমাদের ফেলে রেখে এগিয়ে যায়। সম্পর্কের সুতোগুলো শুকিয়ে যায়। এ কথাটিও সঙ্গে সঙ্গে বলার কথা যে বিভূতিভূষণের গ্রামপটে প্রায়ই এমন সব চরিত্র দেখা দেয় যারা আমাদের ওয়ার্ডস্ট্রয়ার্থীয় প্রকৃতিপটে আঁকা অতি সাধারণ মানুষের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। এইসব গল্পের মধ্যে একটু আলাদা গল্প 'বরো বাগদিনী'। দুর্জয় সাহসিকতা আর দুঃসহ দারিদ্র্যের সহাবস্থানেও বঞ্চিত হয়েছে অপরাজেয় জীবন। সমাজ এবং ব্যক্তির নির্মম বৈপরীত্যের গল্প 'কবি কুণ্ডু মশায়'। মানুষ তার স্বপ্নকে বিসর্জন দেয় না। দোকান কর্মচারী জীবনের বিবর্ণ অস্তিত্ব মুছে ফেলতে পারে না কুণ্ডু মশায়ের শিল্পের স্বপ্ন। একটা ব্যাপার লক্ষ না করে থাকা যায় না। রবীন্দ্রনাথ তো বটেই অন্য লেখকদের সঙ্গেও তুলনায় আনুপাতিকভাবে বিভূতিভূষণের গল্পে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। রবীন্দ্রনাথের প্রায় শতাবধি গল্পের কোনোটাতেই বৃদ্ধের হতাশ বিষয়ীভূত হয়নি। পক্ষান্তরে বিভূতিভূষণের গল্পে এটা একটা পুনরাবৃত্ত প্রসঙ্গ। একজন উদীয়মান মধ্যবিত্তের (গ্রামীণ অথবা নাগরিক) সংশয়, সংকট, প্রত্যয় ও চ্যালেঞ্জের গল্প বলেছেন। তিনি বলেছেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সঞ্জাত নানা দ্বন্দু সংঘাতের গল্প। বিভূতিভূষণ যখন গল্প লিখতে বসেছেন, তখন ব্যক্তির ও শ্রেণির সেই উদীয়মান আভা অনেকদিন হল হারিয়ে গেছে। এই হচ্ছে সেইসময়ের শুরু যখন থেকে পূর্ব প্রজন্ম আর চলতি প্রজন্মের কাছে শ্রদ্ধা বা প্রতিবাদ কিছুই আকর্ষণ করতে পারবে না। তারা শুধু ভার, শুধু বোঝা, তারা বর্জনীয়। সুতরাং যুবকের রঙ্গমঞ্চ থেকে নিষ্প্রভ নেপথ্যে নিষ্ক্রান্ত বৃদ্ধেরা বারে বারে বিভূতিভূষণের কাছে হৃতসম্বল মধ্যবিত্তের সব প্রতিশ্রুতির শূন্যতাকে ধরিয়ে দেয় এবং অন্যদিকে বিপরীত কারণে সম্পূর্ণ পৃথক তাৎপর্যে হাজির করেন তিনি তাঁর শিশুচরিত্রগুলিকে যারা সকলে একযোগে জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত হবার জন্য ধাবমান।


শিশু বিভূতিভূষণের কাছে গভীর অভিনিবেশের পাত্র। ছোটো ছেলে-মেয়েরা অনেক সময়ে হয়ে উঠেছে তাঁর সংসারকে মেপে নেবার পাত্র। তাঁর 'তালনবমী' গল্পটি আমার বারবার মনে পড়ে। গরিবের ঘরের অনাদৃত উপেক্ষিত শিশুকে আমাদের ঔদাসীন্য, হয়তো অবজ্ঞা কঠিনভাবে দিবারাত্রির কাব্য # বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যা


আঘাত করে। গোপাল ধরেই নিয়েছিল, তালনবমীর ব্রত উদ্যাপনের দিন জটি পিসীমাদের বাড়ির ভোজে তার নিমন্ত্রণ হবেই। সে অতটুক ছেলে অনেকখানি বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে জঙ্গল থেকে ভাদ্রের বর্ষায় তাল কুড়িয়ে এনে জটি পিসীমার হাতে তুলে দিয়েছিল। স্বপ্ন দেখেছে গোপাল জটি পিসীমার বাড়িতে তার নিমন্ত্রণ হয়েছে। কত কি চমৎকার রাঁধা হয়েছে। তার গন্ধ বাতাসে। স্বপ্নে সে দেখে তার পাতে গরম গরম তিল-পিটুলি ভাজা উজাড় করে দিল জটি পিসীমার মেয়ে লাবণ্য-দি। কিন্তু এ শুধু স্বপ্নই। তার প্রতীক্ষা, তার উৎকণ্ঠা, সবকিছু ছাপিয়ে গল্পটিতে সারাক্ষণ বেজে যাচ্ছে বর্ষার দিনের ঝমঝম শব্দ। জটি পিসীমা সবাইকে বলেনি বেছে বেছে বলেছে-তাই গোপালের নিমন্ত্রণ হয়নি। আশাহত, অবজ্ঞাত গোপালের চোখের সামনে দিয়ে নির্বাচিতেরা নিমন্ত্রণ বাড়িতে চলে গেল। আমাদের বঙ্কিম সামাজিক আচরণে আহত এক সরল শিশুমন আমাদের কোনো আত্মসমালোচনাকে কি তীক্ষ্ণ করে তোলে?


অবশ্যই বিভূতিভূষণ খুব বড়ো মাপের লেখক। এত বড়ো মাপের যে সহসা দু-কথায় তাঁকে জরিপ করে দেওয়া কারো পক্ষে সম্ভব হবে না। 'বিভূতিভূষণ প্রকৃতিরসিক', তাঁর বীণার প্রধান রাগ 'বনশ্রী রাগ'- এইসব বিরুদের মধ্যে নিশ্চয় কিছু না কিছু পরিচয়-সত্য নিহিত হয়ে আছে। কিন্তু সমগ্র বিভূতিভূষণ অবশ্যপ্রাপ্তব্য সমগ্র বিভূতিভূষণে। অন্য কোনো আংশিকতায় নয়। বই পড়ে নয়, হাঁটতে হাঁটতে তিনি বুঝেছিলেন, মানবিক এবং নৈসর্গিক বিস্ময়ে ভরা এই পৃথিবী। দূরবীক্ষণ লভ্য সুদূর গ্রহ-নক্ষত্র-নীহারিকা থেকে অনুবীক্ষণ লভ্য ইলেকট্রন প্রোটন পর্যন্ত চলেছে যে অহর্নিশ রাসলীলা। বহুকাল বাদে বাদে এক একজন মানুষ আসেন এই রাসলীলার লীলাশুক হিসেবে। তাঁরা তাঁদের নিজের মতো করে সৃষ্টি রহস্যের এই মহাকাব্যের পাঠক। বিশ্বস্রষ্টার সেই মহাকাব্য তাঁরা পাঠ করেন, যে কাব্য 'ন জীর্যতি', 'ন মমার'। বিভূতিভূষণ তাঁদেরই একজন।


তিনি তাঁর দৃষ্টিকে মেলে দিয়েছিলেন অনভিজাত বনজ ঘেঁটকোল ফুলের কাছ পর্যন্ত। তিৎপল্লার ডাক তাঁর কাছেই সঠিক তাৎপর্যে ধরা দেয়। 'বংশলতিকার সন্ধানে' গল্পে দেখা যায় নীরেন বরফ গলা লিপুলেকের গিরিপথে ঝব্বর পিঠে বোঝা চাপিয়ে পথ হাঁটার নিমন্ত্রণ উপেক্ষা করতে পারে বাংলার গ্রামের নিমগাছ তলার ডাকে। কীট্স যেমন করে বলেছিলেন, দূর দিগন্তের হাতছানি সত্ত্বেও 'Happy is England! I could be content / To see no other verdure than its own.' জীবনানন্দ যেমন করে বলেছিলেন, 'বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে চাই না আর', নীরেনও ঠিক তেমন করে অন্বিত হতে চেয়েছে তার সঠিক ঠিকানায়। দ্রবময়ী শান্তি পায়নি কাশীবাসে আধ্যাত্মিক সাধনায় লোকাত্তরকে খুঁজে ফেরায় তার সায় নেই। সে ফিরে আসতে চেয়েছে তার স্বগ্রামে। বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণা থেকে নিজেকে শনাক্ত করার নির্ভুল পটভূমিকায় ফেরত এলেন দ্রবময়ী। পিরথিমিটার সীমা মুড়ো আছে কিনা মাপতে বেরিয়েছিল সিঁদুরচরণ। কোথায় মার্কো পোলো আর কোথায় বা সিঁদুরচরণ- কিন্তু পথে বেরিয়ে পড়া তো ঘরে ফিরে আসার জন্য। সিঁদুরচরণের গল্প তারই গল্প। সে দুই প্রৌঢ়ের গল্প? যাঁরা প্রতিবার ছুটির আগে পরিকল্পনা করেন কোথাও একটা যেতে হবে। কী কী সঙ্গে নেওয়া হবে, পথে কী খাওয়া হবে সব পরিকল্পনা খাড়া করা যায়। কিন্তু যাওয়া আর হয়ে ওঠে না। আকাঙ্ক্ষা আর চরিতার্থতার মধ্যে ব্যবধান যে বড়ো দুস্তর। শেষ অবধি যাওয়া হল। পাহাড়ে নয়, সমুদ্রে নয়। কাছাকাছি একটা গ্রামে। অভাবিতকে পাওয়া গেল সেখানেও। মাইল কিলোমিটার দিয়ে তার মাপ নয়।


বিভূতিভূষণ সাধারণ আঁচড়ে, তুলির সামান্য টানে ফুটিয়ে তোলেন দেখতে দেখতে অসাধারণকে। জীবনের ক্ষতির দিকটি তিনি বলেন না, এমন নয়। কিন্তু বেশি বলেন ক্ষতিপূরণের কথা। 'পুঁইমাচা'-র থিম ছিল যে কোনো লেখকের কাছে খুবই বিপদজনক। একটু এদিক-ওদিক হলে গল্পটি হয়ে যেত শোকার্ত কান্নার একটি বন্ধ জলাভূমি। অত্যন্ত শক্ত হাতে লেখক গল্পের রাশ ধরেছেন। ক্ষেন্তির প্রাণবত্তা এবং তার অদম্য জীবনপিপাসাকে প্রথম সঠিক মাত্রায় উপস্থাপিত করা হয়েছে। তার মৃত্যুর ঘটনাকে গল্পে প্রত্যক্ষ করে তোলা হয়নি। তা ক্ষেন্তির মৃত্যুর একবছর পরের একটা প্রাসঙ্গিক কথাবার্তার ভিতর দিয়ে আমরা জানতে পারি। শোকের প্রত্যক্ষ অভিঘাত তখন ম্লান হয়ে এসেছে। মাছ ধরতে যাওয়ার ব্যস্ততা তখন প্রধান। আরও কিছুদিন কেটে গেছে। এসেছে পৌষ সংক্রান্তির রাত। অন্নপূর্ণা ছেলেমেয়েদের পিঠে গড়ে দিচ্ছেন। একজন পিঠে খেতে খেতে বলল, 'দিদি বড় ভালবাসত...' তখনি বোঝা গেল কেউ ভোলে না। কেউ ভোলেনি। কিন্তু - এখানেও গল্প বলা সারা হয়নি। হলে, তা হয়ে যেত স্মৃতিভারে মন্থর একটি সমাপ্তি। এর পরেই এসেছে সেই পুঁইমাচাটির কথা। তখনই সব বিমর্ষতাকে ছাড়িয়ে প্রতীকটি হয়ে উঠল জীবন্ত। প্রবর্ধমান, উচ্ছ্বসিত, উল্লসিত জীবন মৃত্যুর কাছে হার মানে না এটাই তখন হয়ে উঠল গল্পটির আসল কথা।


বিভূতিভূষণের গল্পের বিষয় প্রধানত সাধারণ মানুষ। তাদের নিয়ে যে 'গল্প' হয় সেটা অভাবনীয়। কিন্তু বিভূতিভূষণের হাতে পড়লে তারা শুধু যে গল্পের বিষয় হয়ে ওঠে তাই নয়, তারা জীবন ভাষ্যেরও বিষয় হয়ে ওঠে। সাধারণ চরিত্রের এমন অসাধারণ মিছিল আর কোনো গল্পকারের গল্পে নেই, এমন কথা বলছি না। কেননা, বাংলা ছোটগল্পের জনক রবীন্দ্রনাথ তো আমাদের সামনেই আছেন। কিন্তু বিভূতিভূষণ তাঁর বিস্তৃত গ্রামীণ অভিজ্ঞতার সাহায্যে এই সাধারণেও এনেছেন বহুধা বৈচিত্র্য। আমরা ভুলতে পারি না 'তালনবমী'-র সেই ছেলেটিকে, 'হাট' গল্পের পটোল বিক্রেতাকে, নসুমামাকে, ইংরেজি শিখতে উন্মুখ সেই চাষিকে, রুপো বাঙালকে, পাগল ঠাকুরকে, অরন্ধনের কুমিকে। ভোলা সম্ভব নয় বারিক অপেরা পার্টির বারিককে, কাঠ কাটা বুড়োকে, 'ডাকগাড়ি' গল্পের রাধাকে।


এমন কয়েকটি গল্প তিনি লিখেছেন, যে গল্প তিনি ছাড়া আর কারো কাছ থেকে আমরা আশা করতে পারি না। এমন একটি গল্প 'ভণ্ডুল মামার বাড়ি'। স্বতন্ত্র এই গল্প। এ গল্প ভণ্ডুল মামার বাড়ি হবার গল্প নয় - বাড়ি না হবার গল্প। প্রথমেই আমাদের নাড়া দেয় 'ভণ্ডুল' এই নামকরণ। গল্পটি শেষ হয়ে যাবার পর নামকরণের তাৎপর্য ধরা পড়ে। আমরা সকলেই শেষ পর্যন্ত নিজেদের কাছে 'ভণ্ডুল'। যা আমরা হতে চাই তা আমরা হতে পারি না। যা হই, তা হতে চাইনি। আমাদের অভিপ্রায় ভগ্নসৌধের মতো পড়ে থাকে। অথবা সেই অসমাপ্ত প্রয়াসকে ছেড়ে আমাদের অভিপ্রায় অন্য কোথাও চলে যায়। এ সব বাইরে থেকে বললে তত্ত্বকথা। কিন্তু তিনি কোনো তত্ত্ব প্রচার দিবারাত্রির কাব্য # বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যা


করলেন না, তিনি দর্শনের ধার ধারলেন না। তাঁর বলার গুণে গল্পটি শেষ করার পর মনে হবে-এর চেয়ে সত্য বুঝি আর কিছু হয় না, এমনকী প্রতীক বা সংকেত এসবের ধারে কাছেও তিনি গেলেন না। গল্পটি 'ভণ্ডুলমামার বাড়ি'। গল্পের কথক দেখল ভণ্ডুলমামার বাড়ি কোনোদিন সমাপ্ত হল না। তা খানিক খানিক গাঁথা হয়- আগাছা আর শ্যাওলায় তা ধীরে ধীরে আবার আক্রান্ত হয়। 'যেন অনন্তকাল, অনন্ত যুগ ধ'রে ভণ্ডুলমামার বাড়ির ইট একখানি পর আর একখানি উঠছে.... শিশু থেকে কবে বালক হয়েছিলুম, বালক থেকে কিশোর, কৈশোর কেটে গিয়ে এখন প্রথম যৌবনের উন্মেষ, আমার মনে এই অনাদ্যন্ত মহাকাশ বেয়ে কত শত জন্মমৃত্যু, সৃষ্টি ও পরিবর্তনের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে ভণ্ডুলমামার বাড়ি হয়েই চলেছে... ওরও বুঝি আদিও নেই, অন্তও নেই।'


'ভণ্ডুল' নামটি, আগেই বলেছি ভারি লাগসই। নামটি এখানে ব্যক্তিটির জীবনব্যাপী প্রয়াসের অচরিতার্থতার দিকে ইঙ্গিত করছে। বিভূতিভূষণ অবলীলাক্রমে তাঁর গল্পের পাত্রপাত্রীদের নাম দিতেন। ভণ্ডুল ব্যক্তিটি কিন্তু জীবনব্যাপী প্রয়াসের অচরিতার্থতার কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। গল্পের কথক তার পাঁচবছর বয়স থেকে কখনো দু-বছর পাঁচবছর বা আরও বেশি সময়ের ব্যবধানে বাড়িটিকে হতে দেখেছে। কোনো সময়েই সে বাড়ি পূর্ণতা পেল না। বিভূতিভূষণ যদি দুর্বল লেখক হতেন, তাহলে বলে ফেলতেন, আমাদের কোনো ইচ্ছাই সঠিক পূর্ণতা পায় না। আমাদের সাধের স্বপ্নমাত্রেই ভাঙা স্বপ্ন। কিন্তু তিনি বড়ো মাপের লেখক বলেই শুধু জীবনের কয়েক পাতা মেলে ধরেছেন। আমরা যা পাবার সেখান থেকেই পাব। কোনটা গল্প, কোনটা অগল্প এবিষয় সম্বন্ধে তিনি অনাগ্রহী। গল্পকার বিভূতিভূষণের শিল্পকলায় মূল রহস্যের ঠিকানা মিলবে এখানে। যাঁরা বলেন তিনি রোমান্টিক ছিলেন, তাঁরা রোমান্টিক শব্দটির অভিধানিক অর্থকে মাত্র জানেন। চেখভ যে অর্থে বস্তুবাদী, বিভূতিভূষণ সেই অর্থে বস্তুবাদী। আপাতবাস্তবতাকে তিনি সব থেকে ভালো চিনতেন- কিন্তু গূঢ় বাস্তবতায় তাঁর অধিষ্ঠান। সেই বাস্তবতায় বিভূতিভূষণ সরাটির চর থেকে লবটুলিয়ার অরণ্য পর্যন্ত দ্রষ্টা শিল্পী। আমরা যদি তাঁর সমস্ত গল্পগুলির কথা একবার একসঙ্গে ভাবি তাহলে দেখি তাঁর গল্পে কয়েকটি ধরন একাধিকবার আবৃত্ত হয়েছে:


ক. প্রত্যাবর্তনের গল্প - দ্রবময়ীর কাশীবাসের গল্প এদের মধ্যে প্রতিনিধি স্থানীয়।


খ. অচরিতার্থ কবি বা লেখকের গল্প অথর রামতারণের গল্প মনে করতে পারি।


গ. পথচলতি মানুষ পথ থেকে কুড়িয়ে নিল এমন গল্প 'জাল' গল্পটি স্মরণীয়।


ঘ. ছোটো ছেলে বা মেয়ের প্রবল জীবনাগ্রহের গল্প - পুঁইমাচা।


ঙ. কালান্তরের অভিঘাতে বাতিল হয়ে যাওয়া মানুষের গল্প 'যদু হাজরাও শিখিধ্বজ' গল্পটি আজও নতুন গল্প।


আমি একটি করে গল্পের নাম করেছি। এক একটি ধরনের তিনটি চারটি গল্প আছে। প্রতি গল্প কিন্তু গল্পের নিজস্ব নিয়মে, রসের নিজস্ব স্রোতে পৃথক গল্প। আর আশ্চর্য তাঁর গল্পের নারী প্রতিমা। সহসা মনে পড়ে যাবে রূপসী বাংলার নারী প্রতিমা। আমরা বারবার যে তাঁর গল্পের কাছে ফিরে যাব, তা এই শাশ্বত বাঙালিনীদের টানে।

No comments:

Post a Comment