Breaking

Tuesday, September 15, 2026

সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা [চত্বারিংশ ভাগ]

বঙ্গে সূর্য্যপূজা ও সূর্য্যের নূতন পাঁচালি *

বর্তমানে স্বতন্ত্র সৌরসম্প্রদায়ের অস্তিত্ব নাই সত্য; কিন্তু তথাপি হিন্দুসমাজে সূর্য্যদেবের সম্মান বিশেষ কমিয়াছে বলিয়া মনে হয় না। পাঁচটা প্রধান দেবতার পূজা করিয়া থাকে বলিয়া আধুনিক কালের হিন্দু 'পঞ্চোপাসক' নামে অভিহিত। এই পাঁচ-দেবতার মধ্যে সূর্য্য অন্যতম। সমস্ত কৃত্যের প্রাবন্তে বিঘ্ননাশের জন্য যেমন বিঘ্নবিনাশন গণেশের অর্চ্চনা করিবার বিধান আছে, সেইরূপ, সূর্য্যদেবের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্যদান করিবারও নিয়ম রহিয়াছে। ব্রাহ্মণের নিত্যকর্ত্তব্য সন্ধ্যোপাসনায় সূর্য্যের উপাসনাই যে প্রধান স্থান অধিকার করে তাহা সর্বজনবিদিত।

বঙ্গের নানাস্থানে প্রাপ্ত সূর্য্যমূর্ত্তি এককালে বঙ্গে সূর্য্যপূজার বহুল প্রচারের সূচনা করে।২ প্রসিদ্ধ বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাস তাঁহার একটা পদেও সূর্য্যপূজার উল্লেখ করিয়াছেন। তাহা ছাড়া, বঙ্গের নানা স্থানে বিভিন্নসময়ে সূৰ্য্যপূজা, সূর্যব্রত ও আনুষঙ্গিক উৎসবাদির প্রচলন আজ পর্য্যন্ত দেখিতে পাওয়া যায়। এই সকল অনুষ্ঠান সাধারণতঃ স্ত্রীসম্প্রদায়ের মধ্যেই বেশী প্রচলিত। কুমারীদিগের মাঘব্রত বা মাঘমণ্ডলব্রত, গৃহিণীদিগের চুঙীর ব্রত বা ইণুপূজা ও বর্ষীয়সীদিগের চাকরী বা সূর্য্যব্রত সূর্য্যোপাসনারই বিভিন্ন প্রকার।

* ১৩৩৯ বঙ্গাব্দের ২১এ মাঘ বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের মাসিক অধিবেশনে পঠিত।

১। এই পাঁচ দেবতার নাম সম্বন্ধে কিছু কিছু মতভেদ দেখিতে পাওয়া যায়। এক মতে 'সূর্যো বঙ্গিঃ শিবে। দুর্গা হতো বিরুশ্চ পঞ্চমঃ।' আর এক মতে-'গণেশ: সবিতা বিষ্ণুঃ শিবো দুর্গা ইতি ক্রমাং।'

২। সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকায় (১৩শ খণ্ড) চুঁচুড়ায় প্রাপ্ত এক সূর্য্যমূর্ত্তির বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। ফরিদপুরের অন্তর্গত কোটালিপাড়ায় প্রাপ্ত একটা প্যমুর্ত্তি বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের চিত্রশালায় রহিয়াছে। বিক্রমপুরের অন্তর্গত সোণারঙ্গ ও আবদুল্লাপুর প্রভৃতি গ্রামে এখনও সূর্য্যমূর্তি প্রতিষ্ঠাপিত ও পৃত্থিত হইতেছে (যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ঐতিহাসিক চিত্র, ১৩১৬, পৃঃ ৫৩৯)।

৩। চণ্ডীদাসের পদাবলী (বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ সংস্করণ-পৃঃ ২৮)

৪। সূর্যাদেবতাকে আশ্রয় করিয়া নানা লৌকিক কৃত্য কেবল বাঙ্গালা দেশে নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রদেশে প্রচলিত ছিল এবং আছে। জগতের আদিম অধিবাসীদিগের মধ্যে সূর্যদেবতার প্রভূত প্রতিপত্তি ছিল। ভারতের নানা স্থানে জনসাধারণের মধ্যে সূর্য্যপূজার স্বরূপ ক্রুক্ (W. Crook) সাহেবের An introduction to the Popular Religion awl Folklore of Northern hudia গ্রন্থের ৪-৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হইয়াছে।

৫। এই সকল অনুষ্ঠানের পূর্ণ বিবরণ এখনও সংগৃহীত হয় নাই। চুঙীর ব্রত পূর্ব্ববঙ্গে প্রচলিত। এই ব্রতে অগ্রহায়ণ মাসে রবিবারে নল গাছের চোঙার মধ্যে একুশটি দূর্ব্বা ভরিয়া উহা দুগ্ধে স্নান করাইয়া সূর্য্যকে নিবেদন করা হয়। ইহার 'কথা' পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত ইৎপুজার 'কথা'র অনুরূপ। মাঘমাসের শুক্লপক্ষের রবিবারে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অনুষ্ঠিত সূর্য্যব্রতের এক বিবরণ শ্রীযুক্ত রাজেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য্য মহাশয় কর্তৃক Journal of the Anthropological Society of Bonbay নামক পত্রে (১৩শ খণ্ড, পৃঃ ৩১৬) প্রদত্ত হইয়াছে।

সূর্য্যমাহাত্মাদ্যোতক এবং সূর্য্যচরিতবর্ণনাত্মক বিভিন্ন কাহিনী এই সকল ব্রতাদি উপলক্ষে শ্রদ্ধার সহিত গীত ও কথিত হইয়া থাকে। এই সকল কাহিনীর মধ্যে লহনা ও খুল্লনা-এই দুই ভগ্নীর করুণ বিবরণপূর্ণ কাহিনী বেহুলা-লখীন্দর, কালকেতু-ফুল্লরা, এবং শ্রীমন্ত ও ধনপতি সদাগরের কাহিনীরই ন্যায় করুণরসপূর্ণ। ইহাও সাহিত্যের একটা অমূল্য সম্পদ। তবে দুঃখের বিষয়, সাহিত্যিক সমাজে এই কাহিনী তেমন পরিচিত নহে। সূর্য্যপূজার কথা হিসাবে মেয়েলি ব্রতকথার পুস্তকগুলিতে এই কাহিনীটা বর্ণিত হইয়াছে। ১৬৩১ শকে রামজীবন এই কাহিনী অবলম্বন করিয়া সূর্য্যের এক পাঁচালী রচনা করেন। এই পাঁচালী চট্টগ্রামের স্বর্গগত কবি জীবেন্দ্রকুমার দত্ত মহাশয় কর্তৃক সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকার ত্রয়োদশ খণ্ডে: প্রকাশিত হইয়াছিল এবং শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র মিত্র মহাশয় কর্তৃক কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের Journal of the Department of Letters-এর পঞ্চদশ খণ্ডে ইংরাজীতে অনূদিত হইয়াছিল। সূর্য্যের বাল্যলীলা, বিবাহ দাম্পত্যজীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ-পূর্ণ আর একটা সরস' উপাখ্যানের কিয়দংশ শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয় কর্তৃক বঙ্গ-সাহিত্য-পরিচয় গ্রন্থে১ প্রকাশিত হইয়াছে এবং শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র মিত্র মহাশয় কর্তৃক ইংরাজীতে অনূদিত হইয়াছে। সম্প্রতি আমি ফরিদপুরের কোটালিপাড়া হইতে সংগৃহীত সূয্যের এক পাঁচালীতে এই উপাখ্যানের বিস্তৃত বিবরণ পাইয়াছি। তবে আমার সংগৃহীত উপাখ্যানও বোধ হয় সম্পূর্ণ নহে-অনেক স্থলেই ইহার অংশবিশেষের পরিসমাপ্তি নিতান্তই আকস্মিক বলিয়া মনে হয়। মাঘমণ্ডল ব্রতোপলক্ষে মাঘমাসে প্রাতঃকালে কুমারীগণ মধুর সুরে এই পাচালী গান করিয়া থাকে। মাঘমণ্ডল ব্রতের কিছু বিবরণ দেওয়া এই স্থলে অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। এই ব্রত শ্রীহট্টে প্রচলিত মাঘব্রতের অনেকটা অনুরূপ। ফরিদপুর অঞ্চলে কুমারীগণ গৃহপ্রাঙ্গণে বৃত্তাকার মণ্ডল উৎকীর্ণ ও করিয়া তাহার উপর পাঁচ বৎসর যাবৎ এই ব্রতের অনুষ্ঠান করে। এই বৃত্তের উপরে ও নীচে বৃত্তাকারে ও অর্দ্ধবৃত্তাকারে যথাক্রমে সূধ্য ও চন্দ্রের প্রতীক কল্পিত হইয়া থাকে। প্রতিবর্ষে এক একটা মধ্যবৃত্ত বদ্ধিত করিয়া পঞ্চম বর্ষে প্রতিষ্ঠার সময় পাঁচটা বৃত্ত অঙ্কিত হইয়া থাকেও।

প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করিয়া প্রতিনীকে দুর্ব্বাগুচ্ছ সহযোগে চোখে এবং মুখে জল ছিটাইয়া দিতে হয়। এই অনুষ্ঠানের নাম 'চউখে মুখে পানি দেওয়া'।

সূর্য উদিত হইলে 'বারৈল' ভাসাইতে হয় এবং এই প্রসঙ্গেই সূর্য্যের পাঁচালি গান করা

১। বঙ্গসাহিত্য-পরিচয়-প্রথমখণ্ড, পৃঃ ১৬৪ প্রভৃতি।

1 Journal of the Department of Letters, পঞ্চদশ খণ্ড।

৩। এইরূপ ব্রত অনেকদিন পূর্ব্ব হইতেই ভারতের নানা স্থানে চলিয়া আসিতেছে বলিয়া মনে হয়। গৌতমধৰ্ম্মসূত্রের ব্যাখ্যায় (২।২।২০) হরদত্ত এইরূপ একটা ব্রতের উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন-"মেষস্থে সৰিতরি চৌলেবু কুমাধ্যো নানাবর্ণৈরজোতি ভূমাবাদিত্যং সপরিবারমালিখ্য সায়ং প্রাতঃ পুজয়স্তি।” (গৌতমসূত্র, আনন্দাশ্রম সংস্কৃত সিরিজ, পৃঃ ৮৫)। তবে হরদত্তের উল্লিখিত ব্রত মাঘমাসে অনুষ্ঠিত না হইয়া বৈশাখে হইত।

বঙ্গাব্দ ১৩৪০।

বঙ্গে সূর্য্যপুজা ও সূর্য্যের নূতন পাঁচালি

হয়। মাটী দিয়া তৈয়ারী করা সূর্য্য ও গৌরীর প্রতীকের নাম বারৈল। এই বারৈল দুইটাকে ফুল ও দূর্ব্বা দ্বারা সুসজ্জিত করিয়া একখানি পিড়িতে বসাইয়া ব্রতিনী নিম্নোক্ত-রূপে গান করিতে করিতে উহ। পুষ্করিণীর জলে ভাসাইয়া দেয়।

বারৈল যান ভাসিয়া ভাই আসেন হাসিয়া। হলদিয়া পক্ষীটী ডালে ডালে আমার ভাই আস্তে লাগছেন কড়িয়া জাঙ্গালে। কড়িয়া জাঙ্গাল কড়িয়া জাঙ্গাল মিষ্ট মালুম মাজা। ভাই আমার লক্ষেশ্বর বাপ আমার রাজা ॥ দইলো লোচা লো চা। সূর্য্যাইরে দিব মোরা ক্ষীরোদের কোছা। ক্ষীরোদের কোছা না লো গরদের জোড়। আন্ গৌরীরে ডাক দিয়া বড় ঘরের ছাইচ দিয়া। বড় ঘর কড়মড় করে গৌরীর কানের সোনা লড়ে। গৌরী গো রসে মোর কম্ম দশে। গুয়া কাটে কুটি কুটি গৌরীর মায় ঝাটিকাটি পান সাজায় বাটা বাটা খাও লও গৌরীর জামাই চুনে আর খড়ে। তবে সে দিব মোরা গৌরমণিরে দানে ॥ ও গাঙের জালিয়া কে সোনার বারৈল জলে দিয়া জল ছিটাইয়া দে। আম কাঠালিয়া পিড়িখানি ঘুতে মম করে। তাতে বসিবে কে আমার ভাই তাতে বসিবে সে॥

বারৈল ভাসানের পর মণ্ডলের উপর ফুল ছড়াইতে হয়। এই অবসরে নিম্নলিখিত ছড়াগুলি আবৃত্তি করা হয়।

মাঘমণ্ডল মাঘমণ্ডল সোনার কুণ্ডলে ঢালিয়া লাড্ডু মাঘমণ্ডল সোনার কুণ্ডল সোনার কুণ্ডল। শাখার আগে সোনার খাড় ॥ সোনার কুণ্ডলে ঢালিয়া মৌ আমি বড় মানুষের পুতের বৌ ॥ রুক্মিণী পূজি কি বড় মাগি। আপনি স্থির সোয়ামী হইলেন পৃথিবীর বীর। আগ পূজিয়া মাগলাম বর ছোট জামাই বড় ঘর। ঘাইটা কাটিয়া লো ভাইটা পাইলাম। ভাইটার দুইটা শত্রু নখে খুটিয়। ফেলাইলাম।

সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা [ প্রথম সংখ্যা

দহেশ্বর কাটি মোরা পাজা পাজা ভাই মোর লক্ষেশ্বর বাপ মোর রাজা ॥ শ্রীসূর্য্যদেব তুমি ফের বাড়ী বাড়ী। আমি কাটি তোমার চাম্পা'র দাড়ী ॥ সূর্য্যের কাণে দিয়া ফুল ভরিয়া উঠুক দুই কুল। চন্দ্রের কাণে দিয়া ফুল ভরিয়া উঠুক দুই কুল ॥ মধ্য আকে২ দিয়া ফুল ভরিয়া উঠুক দুই কূল ৷

মঙ্গলকামনা এই ব্রতের একটা মুখ্য উদ্দেশ্য পিতৃকূল ও পতিকূলের সর্ব্বাঙ্গীণ দেখতে পাওয়া যায়। পতিবিষয়ক প্রার্থনার মধ্যে 'বড়মানুষের পুতের বৌ' হইবার ইচ্ছা, 'ছোট জামাই বড় ঘর' লাভের আগ্রহ এবং 'পৃথিবীর বীর' স্বামী পাইবার ঔৎসুক্য লক্ষ্য করিবার বিষয়। ধনী এবং বীর স্বামী পাইবার লোভ সকল দেশের ও সকল সময়ের স্ত্রীলোকেরই স্বভাবসিদ্ধ: 'ছোট জামাই' পাইবার প্রার্থনা পুরুষের বহুবিবাহ-প্রথার বহুল প্রচলনের যুগের সূচনা দেয়।

এই মাঘমণ্ডলব্রতের বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে সূয্যের পাচালির বিভিন্ন অংশ গীত হয়। শীতের প্রত্যুষে কুমারীকণ্ঠনিঃসৃত এই মধুর সঙ্গীত ঘরে ঘরে শুনিতে পাওয়া যায়। যিনি একবার এই সঙ্গীত শুনিবেন, তিনিই মুগ্ধ হইবেন, সন্দেহ নাই। অবশ্য এই পাঁচালি সর্ব্বত্র সুসঙ্গত নহে-ইহার সর্ব্বাংশের অর্থও তেমন সুপরিস্ফুট নহে। তথাপি ইহার অন্তনিহিত ব্যঙ্গ ও করুণরস শ্রোতৃমাত্রেরই হৃদয় স্পর্শ করে। সূয্যের পূর্ব্বরাগের বিবরণ সর্ব্বলোক প্রসিদ্ধ কৃষ্ণের পূর্ব্বরাগের কথা মনে জাগাইয়া দেয়। বিবাহের পরে গৌরীর শ্বশুরগৃহাভিমুখে যাত্রাকালীন যে করুণ দৃশ্যের বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে, তাহা বর্তমানকালে অল্পপরিচিত হইয়া উঠিলেও একেবারে অপরিচিত হইয়া পড়ে নাই। অন্যান্য গ্রাম্যসঙ্গীতের ন্যায় ইহাও অজ্ঞাত কবির হৃদয় হইতে স্বত-উৎসারিত; তাই ইহা অনায়াসেই শ্রোতা এবং পাঠকের প্রাণ স্পর্শ করে।

আমি এই পাঁচালি আমার নিজ পরিবারস্থ স্ত্রীলোকদের নিকট হইতে সংগ্রহ করিয়াছি। সাধারণের বোধসৌকর্য্যার্থ কোন কোন স্থলে শব্দের গ্রাম্য রূপ ত্যাগ করিয়া সাধু রূপ দিয়াছি মাত্র।

এই পাচালিতে উল্লিখিত সূর্য্যের শ্বশুর উড়িয়া ব্রাহ্মণ রাজা কে, তাহা নির্ণয় করিবার উপায় নাই। পুরাণমতে সূর্য্যের স্ত্রীর নাম ছায়া-আমাদের আলোচ্য পাঁচালির মতে তাঁহার নাম গৌরী, গৌরমণি, গৌরা বা গৌরা পার্ব্বতী। সূর্য্যকে একস্থানে পাঁচালি মধ্যে শিবাই শঙ্কর (৯৯ পংক্তি) বলা হইয়াছে। সূর্য্যের সহিত শিবের এই অভেদ স্থাপনের মূল কোথায় জানি না। তবে এই পাঁচালিতে এবং অন্তত্র একাধিক স্থলে সূর্য্যের সহিত বিষ্ণুর অভেদ

১। ঘাই, দহেশ্বর, চাম্পা-যাসজাতীয় বিভিন্ন উদ্ভিদ। ছড়া আবৃত্তির সময় এইগুলি নখ দিয়া ছিড়িতে হয়। ২। আক-দাগ।

বঙ্গাব্দ ১৩৪০]

বঙ্গে সূর্য্যপূজা ও সূর্য্যের নূতন পাঁচালি

প্রতিপাদন করা হইয়াছে। এই পাঁচালিতে (৬০, ৭২, ৯৭ পংক্তিতে) সূৰ্য্যকে জগন্নাথ, নারায়ণ ও গদাধর বলা হইয়াছে। সুয্যের অন্যান্য কোন কোন কাহিনীতে সুয্যনারায়ণ বা ইপনারায়ণ শব্দেও সূর্য্য ও নারায়ণের অভিন্নত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়১। এস্থলে ইহাও উল্লেখ করা কর্তব্য যে, শ্রীহট্টে অনুষ্ঠিত সূর্যব্রতে স্ত্রীলোকেরা কৃষ্ণের গান গাহিয়া থাকে।২

এই সকল কাহিনীতে কয়েকটা বিশেষ লক্ষ্য করিবার বিষয় 'আছে। দুই একটা বিবরণে সূর্য্যের আকৃতির বর্ণনা বিশেষ কৌতুকপ্রদ। যথা-

'ইথু নারায়ণ ঠাকুর নমঃ নমবর্ণে, তাঁমাহন কর্ণে, গেরুয়াবস্ত্র পরনে, হাঁতে শোঁটা ক'রে..' মহিলাব্রতকথা, কিরণবালা দাসী, (বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদগ্রন্থাবলা), পৃ: ৭৫

'লাটার ল্যাখান চৌখ, বাটার ল্যাখান মুখ, কুলার ল্যাখান কান, মুলার ল্যাখান দাত, তামরূণ্ডের মত মাথা, লাল লাঠি হাতে, রুদ্রাক্ষের মালা গলায়, চুঙীর ব্রতের কথা (ফরিদপুর)

শক্তিপূজায় যেরূপ কোন কোন স্থানে সাধক স্বগাত্র-রুধিরাদি দ্বারা দেবীর তৃপ্তি সাধনের চেষ্টা করিয়া থাকেন, সূৰ্য্যপূজায় সেইরূপ আচারের ইঙ্গিত আমরা সূর্য্যের এক কাহিনীতে পাইয়াছি। যথা-

"পাত্রের রাণী আপনার জিব কেটে সল্ভে ক'রে প্রদীপ দিলেন, হাঁটুর মালুইচাকি কেটে তাইতে ক'রে রূপ দিলেন, মাথার চুল দিয়ে চামর চুলাইতে লাগিলেন।" মহিলাব্রতকথা, কিরণবালা দাসী, পৃঃ ৭৮।

এই মুখবন্ধের পর আমরা নিম্নে আমাদের সংগৃহীত পাচালিটা লিপিবদ্ধ করিতেছি।

[ সূর্য্যের জাগরণ ]

ওঠো ওঠো রাউল রে ঝিকি মিকি দিয়া। সুবর্ণের পঞ্চম খাড়ু নিশিরে খইয়া ॥ নিশিরে থুইয়া না লো ঝাপুর ঝুমুর। আমাদের রাউলের হাতে তাম্বুল। হাতে তাম্বুল না লো পাছে গৃইয়া। নিয়া গেল বাওন ঝি কোলে করিয়া ॥ নিলি নিলি বাওন ঝি ও তোর কে। ৫ ভাসুর পো না লো দ্যাওর্ পো। দ্যাওর্ পো হৈয়া কি কাম করে। রাজার দুয়ারে পাশা খেলে। ১০

১। সূর্য্য ও নারায়ণের এই ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ও অভেদ এবং অন্যান্য বিষয় আলোচনা করিয়া গ্রিয়ারসন্ সাহেব সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন যে, সূর্যাপুজা হইতেই বৈষ্ণব বা ভাগবত ধৰ্ম্ম উদ্ভূত হইয়াছে। সম্প্রতি ডক্টর শ্রীযুক্ত সুশীলকুমার দে মহাশয় (Bulletin of the School of Oriental Studies পত্রিকার ৬ষ্ঠ খণ্ডে ৬৬৯ পৃষ্ঠায়) প্রিয়ারসন সাহেবের এই মতবাদ খণ্ডন করিয়াছেন। ২ শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (পূর্ব্বাংশ) - অচ্যুতচরণ চৌধুরী, পৃঃ ৯৩-৪।

১ রাউল- রাজা, যোদ্ধা। (এই পাদটীকাগুলি পাঁচালির পংক্তির সংখ্যানুসারে দেওয়া হইয়াছে)। ২ পঞ্চমথাড়-অলঙ্কারবিশেষ। নিশিরে-শিশিরে।

সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা প্রথম সংখ্যা

খেলুক পাশা জিনুক কড়ি। তা দিয়া কেনো মোরা সূর্য্যাই রাউলের পিড়ি। সূর্য্যাই রাউলের পিড়িখানি নেতে পিছল। তাতে লাইগংগা গেল ধোপাঝির আচল । নে নে ধোপাঝি নেতৃস্থান ধুইয়া। ১৫ যাইট কাওনের পান গুয়া খাইয়া ॥ যাইট কাওন না লো ঝড়ার মূল। ভায়া যাবেন লো বিক্রমপুর। বিক্রমপুর না লো বড় বড় লাড্ডু। মার্ লৈয়া আনবেন লো সুবর্ণের খাড়ু। ২০ সুন্দরবুনিয়া বাঘ ওরে সতাইরে ধরিয়া খাও। ছাপ ছিপ না লো বেড়ের মাটী ॥ আমাগো বাপ ভাই লোহার কাঠী ॥ লোহার কাঠী হইয়া কি কাজ করে। স্বর্গে উঠিয়া জোকার পাড়ে। ৩০ জয় দিব না লো জোকার দিব। সোণার দুইটি ভাই বুইন কোলে করিয়া নিব । আগর চল লো দুয়ার মেল লো। জুতি মালতী মেলিয়া মারলাম ঘরে। কত নিদ্রা যাও রে সূর্য্যাই জোর পাশর ঘরে। ৩৫ সূর্য্যাইর ঘরের দুয়ারে সোণার মৃদঙ্গ বাজে। তবু না সূর্য্যাই রাউলের নিদ্রা ভাঙ্গে।

বাপের লৈয়া আনবেন লো দোলা ঘোড়া। ভাইর লৈয়া আনবেন গো পাজি পুথি ॥ বুইনের লইয়া আনবেন লো খেলার ডুখি। সতাইর লৈয়া আনবেন কুইয়া পুঠি। এইয়া শুনিয়া সতাই তুমি সুন্দর বনে যাও। ২৫

১৩ নেত-রেশমনিৰ্ম্মিত বস্ত্র। ১৪ লাইগগা-লাগিয়া। ধোপাঝি-রজককন্যা। ১৬ কাওন-কাহণ। ২৩ ডুখি--মৃত্তিকা-নিশ্চিত খুড়িজাতীয় বস্তু। ২৪ কুইয়াপুঠি-অতি ছোট ছোট পুঁটিমাছ। সত্যাই---বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ২: সুন্দরবুনিয়া-সুন্দরবনের। ২৭ বেড়-ডোবা। ৩০ জোকার-উলুধ্বনি। ৩৪ মেলিয়া মারলাম-ছুড়িয়া মারিলাম।

বঙ্গে সূর্য্যপূজা ও সূর্য্যের নূতন পাঁচালি

ওঠো রাউল উদয় দিয়া নগুণ পৈতা গলায় দিয়া ছগুণ ছাতি মাথায় দিয়া রাঙা লাঠি হাতে কই আ বাওন বাড়ীর উপর দিয়া। ৪০ বাওনের মাইয়া বড় সেয়ান পৈতা কাটে অতি বেয়ান ॥ ওঠো রাউল উদয় দিয়া মালীর মাইয়া বড় সেয়ান ফুল জোগায় অতি বেয়ান ॥ ওঠো রাউল কুমারের মাইয়া বড় সেয়ান মাটী জোগায় অতি বেয়ান। 84 ওঠো রাউল বারৈর মাইয়া পান জোগায় অতি বেয়ান ॥ ওঠো রাউল তেল জোগায় অতি বেয়ান ॥ তেলির মাইয়া বড় সেয়ান ওঠো রাউল ধোপার মাইয়া বড় সেয়ান কাপড় জোগায় অতি বেয়ান ॥ ৫০ ওঠো রাউল বাওনের মাইয়া সেয়ান ফুল চন্দন জোগায় অতি রেয়ান। সূৰ্য্যাই ওঠেন কোন বর্ণে সূর্য্যাই ওঠেন তাম্বুল বর্ণে। ৫৫ সূৰ্য্যাই ওঠেন কোন দিক্ দিয়া সূৰ্য্যাই ওঠেন পূব দিক্ দিয়া তিতৈল গাছের আড় দিয়া তিতৈল গাছ মেলিল পাত সূৰ্য্যাই ঠাকুর জগন্নাথ। ৬০ আমতলার শীতল পানি তাতে সূর্য্যাইর গাড়ু গামছা ধোয়া পানি। চন্দনতলার শীতল পানি তাতে সূর্য্যাইর মুখধোয়া পানি ॥

[ সূর্য্যের পূর্ব্বরাগ ]

উড়িয়া রাজার দুইটা কন্যা বসিয়া রৈছে খাটে। তা দেখিয়া সূৰ্য্যাই ঠাকুর ফেরেন মাঠে মাঠে ॥ উড়িয়া রাজার দুই কন্যা মেলিয়া দিছে সাড়ী। ৬৫ তা দেখিয়া সূৰ্য্যাই ঠাকুর ফেরেন বাড়ী বাড়ী ॥'

সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা

উড়িয়া রাজার দুই কন্যা মেলিয়া দিছে কেশ রে। তা দেখিয়া সূর্য্যাই ঠাকুর ধরেন নানা বেশ রে। উড়িআ রাজার দুই কন্যা মলখাড়ু দিছে পায় রে। তা দেখিয়া সূৰ্য্যাই ঠাকুর বিয়া করতে চায় রে ॥৭০

[ সূর্য্যের স্বপ্ন দেখান ]

শুইয়া রইছ ব্রাহ্মণ ঠাকুর নিদ্রায় দিছ মন রে। চক্ষু মেলি চাইয়া দেখ শিয়রে নারায়ণ রে। তোমার ঘরে আছে কন্যা রত্নমালা সতী তাহার মনে বড় ইচ্ছা সূর্য্যাইরে পাবে পতি। তোমার ঘরে আছে কন্যা রত্নমালা নাম। ৭৫ শঙ্খবস্ত্র দিয়া কন্যা সূর্য্যাইরে কর দান ।

[ কন্যার পিতাকে সূর্য্যের সাহায্য দান ]

ব্রাহ্মণী বলেন-'ব্রাহ্মণ, বুদ্ধি নাই তোর ঘটে। ভিক্ষা করি খাও রে ব্রাহ্মণ কন্যা দিবা কারে।' কেমন করি দিব রে কন্যা আমার চালে নাই ছোন রে। সূর্য্যদেবের বরে লালো ঘরামি চৌদ্দ জন রে। ৮০ কেমন করি দিব রে কন্যা আমার উঠান ভরা বন রে। সূর্য্যদেবের বরে লালো ভূইমালি চৌদ্দ জন রে ॥ ঘর হৈল দুয়ার হৈল হৈল টাকা কড়ি। সূর্য্যদেবের বরে হৈল সোনার চৌয়াড়ি। যে দোকানে গৌরমণি শঙ্খ কেন্তে যায় রে ॥ ৮৫ সেই দোকানে ছাওয়াল সূর্য্যাই ছত্র ধরেন শিরে রে। সাক্ষী থাইক দেবধৰ্ম্ম সাক্ষী থাইকক তোমরা। অকুমারী গৌরা আমি। সম্মান নারিকেল তেলে কামারে দোকান মেলে। সোণা দিব সেরে সেরে (আরে) রূপা যত লাগে। ৯০ এমন করি গড় বা গয়না আমার গৌরীর অঙ্গে লাগে। দেখ দেখ মালিয়া রে কিসের ভরা আইসে। অর্দ্ধেক গাঙ জুড়িয়া রে ফুল মটুকের ভরা আইসে। আসুক আসুক আসুক ভরা লাগুক আসি ঘাটে। আমার গৌরমণির বিয়া শনি মঙ্গল বারে। ৯৫

৮২ ভূইমালি-যাহারা ভূমি পরিষ্কার করে। ৮৮ অকুমারী-কুমারী, অবিবাহিতা। ৯৩ ভরা- নৌকাপরিপূর্ণ জিনিষ

বঙ্গে সূর্য্যপূজা ও সূর্য্যের নূতন পাঁচালি

[ সূর্য্যের বিবাহ যাত্রা ]

ওপারে কিসের বাদ্য বাজে। রাউলের বেটা গদাধর বিয়া করতে সাজে ॥ আম পাতা মচ মচ করে কাঠাল পাতা কড়মড় করে শিবাই শঙ্কর বিয়া করে। সাজ সাজ গদাধর পায়ে নূপুর দিয়া। ১০০ ঘরে আছে গৌরা পার্ব্বতী তুলিয়া দিব বিয়া। সূর্য্যাই ঠাকুর যাত্রা করেন মায়ের আজ্ঞা লৈয়া। মায়েতে আশীর্ব্বাদ করেন শিরে হাত দিয়া ॥ বাচিয়া থাইক্কো ওরে সূর্য্যাই চিরঞ্জীবি হৈয়া। সূৰ্য্যাই ঠাকুর যাত্রা করেন বাপের আজ্ঞা লৈয়া ॥ ১০৫ বাপেতে আশীর্ব্বাদ করেন শিরে হস্ত দিয়া। বাচিয়া থাইক্কো ওরে সূর্য্যাই দিগ্বিজয়ী হৈয়া। স্বৰ্য্যাই ঠাকুর যাত্রা করেন গুরুপুরৈতের আজ্ঞা লৈয়া। গুরু পুটেরতে আশীর্ব্বাদ করেন শিরে হস্ত দিয়া ॥ বাচিয়া থাইক্কা ওরে সূর্য্যাই রাজরাজেশ্বর হৈয়া। ১১০ আমের ছত্র বিল্বপত্র দধির আশ্রয় দিয়া। সূর্য্যাই ঠাকুর যাত্রা করেন (সুদ্ধে) সোনার ঘটি লইয়া ॥ জননীতে ধোয়ায় হাত দুগ্ধেতে ডুবাইয়া। অঞ্চলে মুছাইয়া মুখ বলে কর্ণে গিয়া ॥ একেশ্বরে যাও গো রাম দোসরে আসিও। ১১৫ পরের ঝিরে পাইয়া না জননী পাসর ॥ সূৰ্য্যাই ঠাকুর যাত্রা করেন সুস্থে সোণার ঘটী। আগে পাছে লোক লস্কর মধ্যে নাচে নটী সূৰ্য্যাই ঠাকুর যাত্রা করিয়া এদিক্ ওদিক্ চান। যেদিকে শোনেন বাজনার শব্দ সেই দিক্ চলিয়া যান। ১২০ চন্দন গাছ কাটিয়া দেরে সূর্য্যাই হবেন পার।

[ সূর্য্যের বিবাহ ]

নব রত্তন পিড়িখানি মধ্যে মধ্যে সোনা। দেবগণে ধরিয়া তোলে পিড়ির চাইরো কোণা ॥ দেবগণ দেবগণ রত্নসিংহাসন। চারি চক্ষে দুই মুখে হইল দরশন । ১২৫

সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা প্রথম সংখ্যা

সূর্য্যাই ভাল বিচার কর নিকটিয়া ফুলের মালা উদয় মেলিয়া ধর। এক ফুল খোটেন সূর্য্যাই আরো ফুল চান। মালিয়ার মালঞ্চ পুষ্প অধরে যোগান। লামা লামা ডাক্ পড়ে লামা স্থিতি স্থলে। ১৩০ পঞ্চ হরতকী দিয়া দিয়া কন্যা দান করে। মানুষ জনে ডাকিয়া বলে আকাশে নাই রে তারা। শীঘ্র করিয়া তুলিয়া দ্যাও রে সূর্য্যাইর বিয়ার দাড়া শ্বাশুরীতে রাঁধেন দাড়া দুধে আর গুড়ে। শালা বৌতে ঢালেন দাড়া সুবর্ণের থালে। ১৩৫ শ্বাশুরী আইলেন ভাত দিতে খসিয়া পইল সাড়ী রাম রাম বলিয়া সূৰ্য্যাই নাকে দিলেন হাত। কেন বা আসিলাম আমি শ্বাশুরীর সাক্ষাৎ। ১৪০ তোমরা বল আমার সূর্য্যাই পাগল পাগল। আমার সূৰ্য্যাই পাগল নয় রে রসের নাগর ।

[ সূর্য্যের গৃহ প্রত্যাগমনের প্রস্তাব ]

সুবর্ণের খাটপাট নেতের মশারী। তাহার মধ্যে শয়ন করেন সূর্য্যাই আর গৌরী ॥ কাউয়ায় করে কল বল কোকিলের ধ্বনি। জাগ রে জাগ রে গৌরমণি দেশে যাব আমি। ১৪৫ 'তোমার দেশে যাব রে আমি মা বলিব কারে।' 'ঘরে আছে আমার মা যে মা বলিও তারে ॥' 'শোন রে বুদ্ধির সাগর বুদ্ধি নাই তোর ঘাড়ে। পরের মারে মা বলিলে কার প্রাণ ভরে। পরের বাপকে ডাকলে বাপ কার প্রাণ ভরে।' ১৫০

১৩৫ দাড়া-বিবাহের দিন ক্যার মাতা বা মাতৃস্থানীয়া অন্য কেহ ধান সিদ্ধ করিয়া শুকাইয়া সেই ধানের চাউল প্রস্তুত করেন। সেই চাউল হইতে রাত্রিতে অন্ন প্রস্তুত হয়। ধান সিদ্ধ করিবার সময় একটা আখের পাতার আঠার জন স্ত্রৈণ পুরুষের নাম লিখিয়া তাহা হাড়ির মধ্যে দেওয়া হয়; আড়াইটা আখের পাতা অন্য কাষ্ঠের সঙ্গে উনানে দেওয়া হয় এবং সিদ্ধকারিণী বা ধান্যপ্রস্তুতকারিণীকে মুখে মিষ্ট দিয়া চুপ করিয়া থাকিতে হয়। বিবাহান্তে বর এই অল্প উচ্ছিষ্ট করিয়া নববধূকে খাইতে দেয়। নববধূ ইহার কিছু অংশ গ্রহণ করে। এই অন্নের নামই দাড়া।

বঙ্গে সূর্য্যপূজা ও সূর্য্যের নূতন পাঁচালি ১১

দৌড় দিয়া যায় গৌরমণি মায়ের কাছে। 'আমারে যে নিতে আইচ্ছে লুকাইয়া রাখ পাশে ॥' 'টাকা নয় রে পয়সা নয় রে বাক্সে তুলিয়া খোব। পরের লইয়া হইছ গৌরা পরেরে সে দিব ॥'

[ সূর্য্যের ভ্রাতার বধূ আনয়নের প্রস্তাব ]

খাট খাট কলা গাছটা বাইয়া পড়ে মৌ। ১৫৫ সূর্য্যাই ঠাকুর বিয়া করছে বড় সুন্দর বৌ ॥ ছোট ভাই উঠিয়া বলে "বড় দাদা ভাই। গাদি ভরা পান দেও বউ আনিতে যাই ॥" ছোট ভাই কলসী ভড়া তেল দেও ১৬০ ছোট ভাই থান ভড়া সিন্দুর দেও

[ গৌরীর শশুর বাড়ী যাত্রা ও সকলের বিলাপ ]

সূর্য্যাই গৌরাই যাত্রা করাইয়া দিয়া। গৌরমণির মায় কাঁদে শানে পাছাড় খাইয়া ॥ আরসী কান্দে পরসী কান্দে সকল কান্দে রইয়া। ১৬৫ গৌরমণির যে মা-ধন কান্দে শানে পাছাড় খাইয়া ॥ আরসী কান্দে পরসী কান্দে সকল কান্দে পর। গৌরমণির যে মা-ধন কান্দে বেলা আড়াই ফর ॥ "আগে যদি জান্তাম মা-ধন পরে নিবে তোরে। কোলের ছাওয়াল মাটিতে রাখিয়া কোলে নিতাম তোরে ॥ ১৭০ আগে যদি কাণের সোণা খসাইয়া থুইয়া কাণে রাখতাম তোরে । আগে যদি গলার হার খসাইয়া থুইয়া গলায় রাখতাম তোরে।” আরসী কান্দে পরসী কান্দে সকল কান্দে রৈয়া। ১৭৫ গৌরমণির যে বাপ-ধন কান্দে মুখে গামছা দিয়া ॥ চৌদ্দ দাড়ের নৌকা খানি যোল ছয়জন মাঝি। "নাইয়ারে দিব তার বয়লা মাঝিরে দিব কড়ি।'

সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা [ প্রথম সংখ্যা

ধীরে ধীরে বাওরে নৌকা মায়ের কান্দন শুনি। ধীরে ধীরে বাওরে নৌকা বাপ ভাইর কান্দন শুনি ॥ ১৮০ এখন কেন কান্দ মা-ধন শানে পাছাড় থাইয়া। সেইকালে কৈছিলাম মা দূরে না দিও বিয়া ॥ এখন কেন কান্দ বাবা মুখে গামছা দিয়া। সেইকালে কৈছিলাম বাবা দূরে না দিও বিয়া ॥ এখন কেন কান্দ ভাই-ধন মুখে কাপড় দিয়া। ১৮৫ সেই কালে কৈছিলাম ভাই-ধন দূরে না দিও বিয়া ॥ এখন কেন কান্দ বুইন খেলার সজ্জা লইয়া। সেই কালে কৈছিলাম বুইন দূরে না দিও বিয়া ॥ এখন কেন কান্দ ভাইর বউ লেমু পান্থা লৈয়া। সেইকালে কৈছিলাম বউ দূরে না দিও বিয়া ॥” ১৯০

*[ সূর্য্যের গৃহপ্রত্যাবর্তন ]

"বিয়া করলা সূৰ্য্যাই ঠাকুর দানে পাইলা কি?” "ভাঙ্গা গাড়ু ভাঙ্গা থাল উড়িয়া রাজার ঝি। থাল পাইলাম গাড়ু পাইলাম অন্নজল খাইতে। উড়িয়া রাজার ঝি পাইলাম গৃহ বাস করিতে ॥ ভাঙ্গা গাড়ু ভাঙ্গা খাল ফেলিয়া আইলাম পথে। ১৯৫ উড়িয়া রাজার ঝিরে লইয়া আইলাম সাথে ॥"

No comments:

Post a Comment